বিধিবদ্ধ মার্জনা প্রার্থনা : ছয় বছর আগে এমনই এক অগস্টের নিস্তব্ধ দ্বিপ্রহরে প্রথমবার বইটির পাঠ। পর্যালোচনা লিখতে একটু দেরি হয়ে গেল বটে, তবে এ বিলম্বও যেন পাঠ-অভিজ্ঞতার স্থায়িত্বের সাক্ষী।
বাঙালি পাঠক রহস্য আর রোমাঞ্চে চিরকালই অভ্যস্ত। ফেলুদা, ব্যোমকেশ বা কিরীটির উত্তরাধিকার বহন করে আজকের বাজারে যখন সমকালীন সংকলনের অভাব প্রকট, তখন অরণ্যমন প্রকাশনীর বৃশ্চিক ২ নিঃসন্দেহে এক দুঃসাহসী প্রয়াস।
ষোলোটি গল্পে ছড়িয়ে রয়েছে অলৌকিক সন্ত্রাস, মনস্তাত্ত্বিক খেলা, বিদেশি ছায়া থেকে ধার করা প্লট, এমনকি সায়েন্স ফিকশন—অর্থাৎ থ্রিলারের প্রায় প্রতিটি শাখার স্বাদ এক মলাটে। ঋজু গাঙ্গুলীর সম্পাদনা ও অর্ক পৈতণ্ডীর অলংকরণে এটি একটি “প্রোডাক্ট” বলার চেয়ে বেশি, একটি সচেতন কিউরেটেড অভিজ্ঞতা।
গল্পগুলির মান অবশ্য অসমান। দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের 'ভীমরতি' স্থান-কাল বর্ণনায় দীপ্ত হলেও ক্লাইম্যাক্সে পুরোনো ফর্মুলায় আটকে যায়। মনীষ মুখোপাধ্যায়ের 'বেতালি তান্ত্রিক' আতঙ্কে ভরসা রাখে, তবে প্রেজেন্টেশন দুর্বল। তমোঘ্ন নস্করের 'আয়নাঘর', ফ্রেডরিক ব্রাউনের ভাবানুবাদ, দারুণ ধারণা হলেও ভাষার কাঠিন্যে ভুগেছে। অন্যদিকে মিলন গাঙ্গুলীর 'একটি সোনালি খুন'—রসিকতার বুননে রোমাঞ্চকে অন্য উচ্চতায় তোলে। অনুষ্টুপ শেঠের 'দৃষ্টি' উপস্থাপনায় কিঞ্চিৎ হালকা হলেও প্লটের টুইস্টে চমক আছে।
সবচেয়ে সার্থক দুটি রচনা হল দোলা দাসের 'মাতৃরূপেন' ও ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের 'দেবাংশী'। প্রথমটি এক নিটোল মনস্তাত্ত্বিক-রহস্য, দ্বিতীয়টি তন্ত্র ও বিজ্ঞানের দুর্লভ মিশ্রণ—যেখানে ভয় এবং চিন্তার খোরাক দুটোই জেগে ওঠে। দ্বৈতা গোস্বামীর 'গিরগিটি' ও সোহম গুহর 'পুনর্ভব' আরও একবার দেখিয়ে দেয়, বাংলা গল্পকারেরা সাইকোলজিক্যাল হরর ও বায়োথ্রিলারের ক্ষেত্রেও সপ্রতিভ। তবে কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'খুনের সহজপাঠ' বা দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের 'লেভেল' প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি—একঘেয়ে প্লট ও অতিরিক্ত বিদেশি স্বাদের কারণে।
এই বৈচিত্র্যই বৃশ্চিক ২-কে বিশ্বসাহিত্যের নামী সংকলনগুলোর সঙ্গে একাসনে বসিয়ে দিতে বাধ্য। যেমন আমেরিকার Best American Mystery Stories কিংবা Best American Short Stories, ইংল্যান্ডের The Mammoth Book of Best British Crime, বা ইউরোপের Best European Fiction সিরিজ—প্রতিটিই বছরে নতুন কণ্ঠকে প্রতিষ্ঠিত করে, তবু সেগুলির ভেতরেও প্রায়শই মিশে থাকে অনুবাদ, পুনর্লিখন, কিংবা বারবার ব্যবহৃত থিম। ফ্রান্সের Les meilleurs récits policiers কিংবা আমেরিকান পপ-কালচারের গাঢ় আবহে জনপ্রিয় Ellery Queen’s Mystery Magazine Anthology একই ধারা মেনে চলে। বৃশ্চিক ২ও ঠিক তেমনই করেছে—কিছু গল্প সরাসরি ভাবানুবাদ, কিছু সম্পূর্ণ মৌলিক, আর কিছু মাঝামাঝি। পার্থক্য একটাই—বাংলা পাঠকের কাছে এই ধরনের ধারাবাহিক সংকলন এখনও নতুন, তাই প্রতিটি লেখার পরীক্ষামূলক ঝুঁকি অনেক বেশি চোখে পড়ে।
প্রচ্ছদ নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে, তবে অলংকরণে অর্ক পৈতণ্ডীর কাজ অসাধারণ—প্রতিটি গল্পের হেডপিস যেন একটি আলাদা ভিজ্যুয়াল সিনোপসিস। বাঁধাই, টাইপসেটিং, মুদ্রণ—সব মিলিয়ে বইটি হাতে নিলে আন্তর্জাতিক কোনো থ্রিলার অমনিবাসের সঙ্গে তুলনা টানতেই হয়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়: বাংলা সাহিত্যে কি যথেষ্ট মৌলিক থ্রিলারের রসদ আছে? নাকি বিদেশি প্রভাবই মূল চালিকা শক্তি? বৃশ্চিক ২ সেই দ্বন্দ্বের নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন।
কিছু দুর্বলতা সত্ত্বেও এটি একালের বাংলা থ্রিলার সংকলনের মধ্যে সবচেয়ে সুসংহত, সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী। সেকালের গোয়েন্দা কাহিনী আমাদের ফেলে আনে ব্যোমকেশের যুগে; বৃশ্চিক ২ নিয়ে যায় একালের অন্ধকার গলিতে, যেখানে ভয়, রহস্য ও কল্পনা মিলেমিশে তৈরি হয় এক নতুন বেঞ্চমার্ক।
"বৃশ্চিক" প্রকাশের পর গল্প বাছাই, ইলাস্ট্রেশন, বাইন্ডিং, উপস্থাপনা-- সব দিক দিয়েই এ বই হয়ে উঠেছিল যাকে বলে একেবারে বেঞ্চমার্ক প্রোডাক্ট! তাই স্বাভাবিক ভাবেই দু'নম্বর বৃশ্চিক চলা শুরু করলে, লেজ ধরে তাকে কৌটো বন্দি করতে দেরি করিনি একবারও। আর সেই কৌটোয় নাক ঠেকাতেই প্রথমেই ্যেটা চোখে পড়ে অর্ক পৈতণ্ডীর স্পর্ধিত আঁচড়! আতঙ্কিত চোখের ওপর সোনালি বিছের দাঁড়া! তবে খুব ডিটেলে আঁকা হলেও প্রচ্ছদ হিসেবে কিন্তু আমি এখনও "বৃশ্চিক"কেই এগিয়ে রাখব। সাদার ওপর কালো লালের যে কম্বিনেশন তাতে ফুটে উঠেছিল এবং পাঠকমনে, ফেলে রাখা সাদাটুকু যে পরিমাণ প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা "বৃশ্চিক ২"-তে কিছুটা হলেও যেন মিসিং। সঙ্গে সঙ্গে এও ঠিক যে ভেতরের অলংকরণের ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা একদম উলটো। এখানে অর্কবাবুর সুদক্ষ ইঙ্কিং ছাপিয়ে গেছে "বৃশ্চিক"-এর মুগ্ধতাও! পুরো গল্পটারই যেন সিনপসিস করে তিনি পুরে দিয়েছেন তাদের হেডপিসে। এতটাই কথা বলেছে তাঁর শিল্প! আমি প্রত্যেকটা গল্প পড়ে তাকিয়ে থেকেছি হেডপিসের দিকে আর শিল্পীর উদ্দেশ্যে স্যালুট ঠুকেছি বারবার।
এবার গল্পগুলো একে একে পড়ে ফেলা যাক।
১) ভীমরতি - দেবারতি মুখোপাধ্যায়
ঝরঝরে গদ্য, সুন্দর বুনোট, মেদহীন বলা না গেলেও সাবলীল বলা যেতে পারে। আর গল্পটা পড়তে পড়তে সব থেকে বেশি চোখে পড়ে ও চোখে লাগে সেটা হল লেখিকার অধ্যয়ন। অধ্যাবসায়ের যথেষ্ট প্রতিফলন লেগে আছে গল্পের পরতে পরতে। যদিও সেই জ্ঞান ভাণ্ডার গল্পের মূল প্লটে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করেনি। বরং অদরকারি মেদ বাড়িয়ে ফেলেছে বেশ কিছুটা। আর তা ছাড়া বংশের অভিশাপ মার্কা ব্যাপারগুলো বড্ড পুরোনো হয়ে গেছে এখন। তা সত্ত্বেও রহস্যটা বেশ বজায় ছিল গল্পে। "কী হয় কী হয়" ব্যাপারটাও চেপে এসেছিল খানিক। কিন্তু শেষে সেই একই বহু ব্যবহৃত ক্লাইম্যাক্স পড়ে, গল্পটার থেকে কয়েকটা জেনারেল নলেজ বাদে পাওয়ার কিছুই রইল না।
২) বেতালি - মনীষ মুখোপাধ্যায়
এক কথায় লেখকের সমস্ত পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়কে উড়িয়ে দেওয়ার কাজটা সহজ হলেও ব্যাপারটায় নৈতিকতার অভাব থেকেই যায়। যেমন এই গল্পে। আসলে ব্যাপারটা হল, লেখক প্রচুর খেটেছিলেন। লেখার জন্য তথ্যও সাজিয়েছিলেন বিস্তর। কিন্তু পরিবেশনায় অতিরিক্ত দুর্বলতার ফলে পড়ে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, শেষ করাটাই বেশ শ্রমসাধ্য হয়ে পড়ল আমার কাছে।
৩) আয়নাঘর - তমোঘ্ন নস্কর
গল্পটি আসলে ফ্রেডরিক ব্রাউনের "হল অফ মিরর্স"-এর ভাবানুবাদ। যদিও আমরা সেটা জানতে পারি গল্পের শেষে গিয়ে! তার আগে বা সূচিপত্রের কোথাও এর উল্লেখ নেই। তাই প্রথম থেকে তমোঘ্নবাবুর গল্প জেনে পড়লেও, শেষে গিয়ে বলতে হয় অনুবাদ বেশ দুর্বল। মূল গল্প আমি পড়িনি। তাই সেখানেও এমন কাঠ কাঠ ভাষার ব্যবহার ছিল কিনা তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু ভাবানুবাদের ক্ষেত্রে প্লট একই বা ক্ষেত্র বিশেষ পালটে, গল্পের উন্নতি সাধনের সুযোগ থাকে বলেই আমার ধারণা।
৪) একটা সোনালি খুন - মিলন গাঙ্গুলী
প্লট হিসেবে মন্দ নয়। রহস্য ঘনীভূত করা এবং সেই ধোঁয়াশায় পাঠককে ঘুরিয়ে মারার যথেষ্ট স্কোপ ছিল। এমন কী, শেষের দিকে একটা মায়াবী অ্যাঙ্গেলও ছিল দিব্যি। কিন্তু পুরো গল্প জুড়ে হিউমার ও বিশেষণের ভুলভাল ব্যবহার আরও ভাল করে বললে জোর করে হাসানোর চেষ্টাগুলো গোটাটার ভরাডুবি করে ছেড়েছে।
৫) দৃষ্টি - অনুষ্টুপ শেঠ
এই গল্পটা বেশ লাগল। ঝরঝরে স্বাস্থ্যবান গদ্য। বেশ সুন্দর ছিমছাম বর্ণনা। গোছানো প্লট। পড়তে পড়তে হালকা করে সাসপেন্স ভাবটা দিব্যি আসে। আর শেষে টুক করে বসিয়ে দেওয়া একটা ভাল দেখে ক্লাইম্যাক্স পয়েন্ট। যদিও আমাদের মত ডোরেমন বা বেন টেন গিলে বড় হওয়া বাচ্চাদের কাছে, এই টুইস্ট একদমই নতুন নয়।
৬) প্রহরণ - পল্লব বসু
চমৎকার লেখা। আহামরি কিছু প্লট না থাকলেও, সমাজের একটা জ্বলন্ত সমস্যাকে কেন্দ্র করে লেখা এগিয়েছে। এ বিষয়ে লেখালেখি নতুন নয়। তবে আমার মতে সমাজের এই ঘৃণ্যতম অপরাধকে নিয়ে যতই লেখা হোক, তা দিনের শেষে কমই পড়ে যায়। তা ছাড়া ক্রাইম থ্রিলার হিসাবে মন্দ নয়। ওপেন এন্ডেড। রহস্য উদঘাটনের ব্যাপারে লেখক কোন অতিলৌকিক বা কাকতালীয় পন্থা নেননি। চরিত্রগুলির চরিত্রায়নও খুব বাস্তবসম্মতভাবে করা হয়েছে। কখনই তাদের লাথি মেরে দেওয়াল ভেঙে দেবে বলে মনে হয়নি। মোটের ওপর শেষ অব্দি দাঁড়িয়ে থাকার মত গল্প। পরেরবার রহস্য বোনার ব্যাপারে আরেকটু মন দিলে, লেখকের কাছ থেকে আরও অনেক উন্নতমানের লেখা আমরা আশা করতেই পারি।
৭) মাতৃরূপেন - দোলা দাস
এই গল্প বা উপন্যাসিকাটি না থাকলে "বৃশ্চিক ২" কেনার শোক অনেকদিন পর্যন্ত থেকে যেত। পাঠকের আসরে ওঁর লেখা কয়েকবার পড়েছি। ভাল লেগেছে। কিন্তু "মাতৃরূপেণ"-এর মত মুগ্ধতা আগের কোনো লেখায় পাইনি! কী গল্প! কী নিটোল প্লট! প্রত্যেকটা চরিত্রকে এমন ধরে ধরে আঁকা! জাস্ট অসাধারণ। রোমাঞ্চ কতটা এসেছে বলতে পারি না। কিন্তু মনের খাতা কানায় কানায় ভরে গেল। প্লিজ কেউ খারাপভাবে নেবেন না। কিন্তু যাঁরা নতুন লিখছেন বা লেখালেখির জগতে পা রাখতে চলেছেন, তাঁরা এই উপন্যাসিকা থেকে প্লট বিস্তার বা চরিত্র নির্মাণের প্রাথমিক পাঠটুকু পেতে পারেন।
৮) জুউনো তোমার জন্য - প্রসেনজিত দাশগুপ্ত
জেন ইয়োলেন-এর লেখা “ফর দ্য লাভ অফ জুউনো”-র ভাবানুবাদ গল্প। বেশ ভাল কাজ। পড়তে ভাল লাগল। প্লটের অভিনবত্ব নজর কাড়ে।
৯) দেবাংশী - ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
আবারও মুগ্ধ করলেন। ফেসবুকের দেওয়ালে লেখকের কিছু লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সেই গুণমান তিনি এই উপন্যাসিকাতেও দিব্যি বজায় রেখেছেন। অল্প কিছু আঁচড়েই পরিবেশ সৃষ্টি করার অদ্ভুত ক্ষমতা ভদ্রলোকের। তেমনই মুন্সিয়ানার পরিচয় রেখেছেন চরিত্র সৃষ্টির সময়তেও। বেশ একটা গা শিরশিরানি গল্প পড়লাম বটে।
১০) গিরগিটি - দ্বৈতা গোস্বামী
সাইকোলজিক্যাল গল্প। গল্পটার খুব ভাল ও ধৈর্য সহকারে ট্রিটমেন্ট করা হয়েছে এবং লেখার পেছনে হয়ে আসা লেখিকার পরিশ্রম পাঠকের নজর কাড়তে বাধ্য। সব থেকে বড় কথা শেষটুকুও বেশ অন্যরকম। দারুণ লাগল।
১১) লেভেল - দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায়
যথেষ্ট টানটান গদ্য হওয়া সত্ত্বেও বড্ড বেশি চেনা প্লট হওয়ায় গল্পটা যেন ঠিক জমল না। গল্প-উপন্যাসে তো বটেই, নব্বই দশকের বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমাগুলোতেও এ এক চেনা গল্প। তবে হ্যাঁ, গল্পের সুতোগুলো আরেকটু ধৈর্য নিয়ে বুনলে ভাল কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু ছিলই। একজ্যাক্ট কী করলে আরও আকর্ষণীয় হত, তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবু মনে হল, জাম্প শটগুলোর আগে ডেট, টাইম, লোকেশন দিয়ে দিলে বেশ অন্যরকম হত জিনিসটা। আর সাদার্ন অ্যাভিনিউর গগনচুম্বী ফ্ল্যাটের সিনটা না রাখলেও গল্পের কিছু ক্ষতি বৃদ্ধি হত বলে তো আমার মনে হয় না।
১২) পুনর্ভব - সোহম গুহ
কল্পবিজ্ঞানের গল্প। পৃথিবীতে প্রাণের বা আরও ভাল করে বললে উন্নত প্রাণীর উদ্ভব নিয়ে লেখা সায়েন্স ফিকশনগুলোর মতই এতেও প্রাণ আসে অন্য গ্রহ থেকে। হলিউড ঘেঁষা প্লট। এই থিওরি নিয়ে অনেক বই, সিনেমা হয়ে গেছে এত দিনে। তবে গল্প বলার স্টাইলটা চমৎকার লাগল। অধ্যায় ভাগগুলো বেশ অন্যরকম। বাংলায় বড় একটা দেখা যায় না এমন।
১৩) খুনের সহজ পাঠ - কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়
তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। সুন্দর বিশ্লেষণ, লেখার স্টাইল দুর্দান্ত। কিন্তু গল্পের “গ”ও নেই কোথাও। আপনি যখন গুঁড়ি মেরে একগাদা জেনারেল নলেজ নিয়ে শেষ প্যারায় মাথা তুলবেন, “এবার নিশ্চয়ই কিছু হবে? পুরো মাথা ঘুরে যাওয়া টুইস্ট একখান?” কিন্তু কিছুই হয় না। গল্পের শেষ ফুলস্টপটা দিয়ে লেখিকা কলম নামিয়ে রাখেন দিব্যি! এত চমৎকার ট্রিটমেন্ট করা গল্পের শুধু শেষ ভাল না হওয়ায় গল্পটা মিইয়ে গেল না, ঝরে পড়ল।
১৪) খোঁজ - নীলাদ্রি মুখার্জি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা রহস্য গল্প। যদিও রহস্যে প্যাঁচ লাগানোর চেয়ে লেখক তথ্য পরিবেশনে বেশি মন দিয়েছেন। প্লট সামান্যই। সিন বলতে দুটো ইন্ডোর সিন। আর কথকদের মুখে, ঘামে, বিধ্বস্ত মেকআপের সাহায্যে ব্যাকগ্রাউন্ডে হয়ে আসা দৌড়ঝাঁপের কথা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে পুরো গল্পে। এমনি পড়তে মন্দ লাগে না। বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে লেখা গল্পগুলোর খুব কমন ফ্যাক্ট হল, গল্পগুলো দাঁড়িয়ে থাকে এমন কিছু জিনিস বা তথ্যের ওপর যেগুলো পাওয়া গেলে ঘুরে যেতে পারে যুদ্ধের মোড়! এবং ফিকশন গল্প হলে অবশ্যই ইতিহাসের খাতিরেই সেগুলো গল্পের শেষে হারিয়ে যায়! এখানেও তার অন্যথা হয়নি। সেই হারিয়ে যাওয়ার ক্লাইম্যাক্সও আছে বেশ। তবে চমকে দেওয়ার মত কিছু না।
১৫) রক্তিম- ঋজু গাঙ্গুলী বব ম্যাডিসন-এর ‘রেড সানসেট’ অনুবাদ, মেদহীন গদ্য। আর গল্প বাছাইও দুর্দান্ত। কোথাও মূল চরিত্রের নাম উল্লেখ না থাকলেও, পাঠকের তাকে চিনে নিতে অসুবিধা হয়না একবারও।
১৬) মায়া -সৌমিত্র বিশ্বাস
বেশ ভাল গল্প। সেই বাগান বাড়িতে ঘুরতে গিয়ে ভূতে পাওয়া প্লট। কমন, তবে উপস্থাপনা ও শেষে হালকা একটা মোচড়ের জোরে, পাঠককে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে দিয়েও, ক্লিনচিট পেয়ে বেরিয়ে যায় দিব্যি।
ব্যস, এই হল সমগ্র বক্তব্য। একটাই কথা "বৃশ্চিক"-এর ফাটিয়ে দেওয়া পারফর্মেন্সের পর "বৃশ্চিক-২" যেন অনেকটাই ম্রিয়মান।
আনন্দ পাবলিশার্স থেকে একটা নস্টালজিক সংকলন প্রকাশ হয়েছে- “সেকালের গোয়েন্দা কাহিনী”। পুরনো দিনের ভালো ভালো কিছু টকঝাল গোয়েন্দা কাহিনীর পুনর্সঙ্কলন। যাইহোক, প্রসঙ্গ সেই বইটি নয়। তবে তুলনা টেনে যদি “একালের গোয়েন্দা কাহিনী” খুঁজতে যাই, ভালো কোনো সংকলন পাবো কি? নাকি বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু উদ্দেশ্যহীনভাবে লেখা “গোয়েন-দা” গল্পের বই ই পাবো? যেগুলো পড়ে মন সেই বাংলার ফেলুদা, ব্যোমকেশেই ফিরে গিয়ে শান্তি পাবে? যাইহোক, একালের ভালো গোয়েন্দা বা থ্রিলার সংকলন খুঁজতে গিয়ে এক সুন্দর বিকেলে অরণ্যমন থেকে কিনে নিলাম বহুলচর্চিত ও প্রশংসিত এই বইটি। তবে বইটি শুধুমাত্র গোয়েন্দাগিরি নিয়ে নয়। একেবারে ১৬ টি রহস্য রোমাঞ্চ গল্পের সংকলন, যাতে ঠাঁই পেয়েছে রোমাঞ্চকর এবং কখনো কখনো অলৌকিক কিছু থ্রিলার এবং বিদেশী ছায়া অবলম্বনে কিছু অনুপ্রেরিত গল্প। তবে শুধুমাত্র এতেই থেমে নেই বৃশ্চিক, পৌঁছে গেছে সুদক্ষ লেখকের হাত ধরে বায়োথ্রিলার এবং কল্পবিজ্ঞানের গ্রহেও। সব গল্পগুলিতেই লেখক লেখিকাদের চিন্তাভাবনা এবং কল্পনার প্রসার ও পরিশ্রম প্রশংসনীয়। ব্যক্তিগত ভাবে আমার দু একটি গল্প ভালো লাগেনি এবং মনে হয়েছে গল্পচয়নের ক্ষেত্রে আরো মানোন্নয়নের চেষ্টা করা যেতে পারত। তবে যে গল্পগুলি আমার সবথেকে ভালো লাগল সেগুলো হল-
ভীমরতি/দেবারতি মুখোপাধ্যায়: গল্পের ম��্যে দিয়ে স্থান কাল ও পাত্রের পরিচয় সুদক্ষ লেখনীপ্রতিভার পরিচায়ক। তবে স্থানের বর্ণণা সবাই তথ্যবহুল ও সুপাঠ্য ভাবে লেখেন না। লেখিকা ব্যতিক্রম। এটি থ্রিলার ও, আবার স্থান ও পরিবেশ বর্ণণার মধ্যে দিয়ে যেন ভ্রমণকাহিনীও। গ্রামবাংলার এক পারিবারিক ইতিহাসের থ্রিলার এটি।
বেতালি/মনীষ মুখোপাধ্যায়: একটি রোমাঞ্চকর অলৌকিক কাহিনী। একের পর এক ঘটতে থাকা খুনের জন্য দায়ী কি কোনো খুনী? নাকি কোনো সত্ত্বা? তন্ত্রসাধনা যদি ভুল হয়ে যায়, কোনো ভয়ংকার সত্ত্বা কি আবির্ভাব হয় তখন? পরিচিত অথচ উত্তেজনাপূর্ণ ফর্মূলার গল্পটি অবশ্যপাঠ্য।
আয়নাঘর/তমোঘ্ন নস্কর: অপূর্ব! অসাধারণ! গল্পের শেষে উল্লেখ করা আছে যে মূল কাহিনী হল ফ্রেডরিক ব্রাউনের “হল অফ মিরর্স”। তবে এটা পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুবাদ নাকি অনুপ্রেরিত রচনা তা জানিনা। প্রথম পুরুষ অর্থাৎ “আমার” চোখ দিয়ে সময়যাত্রা নিয়ে কল্পবিজ্ঞানের আধারে লেখা এই গল্পটি অসাধারণ লাগল।
একটা সোনালী খুন/মিলন গাঙ্গুলী: হাসতে হাসতে মরে গেলাম। অবশ্যই একটি ভালো থ্রিলার, কিন্তু সবথেকে বেশী নজর কাড়ে লেখকের সেন্স অফ হিউমর! যেটাকে উনি গল্পের বিভিন্ন জায়গায় মুঠো মুঠো করে ছড়িয়ে রেখেছেন। শেষটুকু ভারি অদ্ভূত কিন্তু! পাঠককে হতভম্ব করে দেয় শেষের আবিষ্কারটুকু। ভালো লাগল।
দৃষ্টি/অনুষ্টুপ শেঠ: হন্টেড হাউস নিয়ে এভাবেও ভাবা যায়! লেখিকার চিন্তাশক্তির জাদুতে চমকে দেওয়া একটি গল্প পড়ার সৌভাগ্য হল! পোর্টাল বা টাইম-ওয়ার্প/ টাইম-জাম্প... যেটাই নাম দিন, এ বিষয় নিয়ে বাংলা ভাষায় এরকম চমকপ্রদ টুইস্ট আমার খুব একটা পড়ার সৌভাগ্য হয়নি বাংলা ভাষায়। বাকরুদ্ধ করা এন্ডিং!
জুউনো, তোমার জন্য/ প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: বৃশ্চিক ২ এর অন্যতম একটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা রোমাঞ্চকর গল্প। যেখানে অপার্থিব ভালোবাসা রুপ বদলে নিয়ে আসে মানসিক প্রশান্তি এবং বিকৃতি। গল্পের শেষে উল্লেখ করা আছে যে জেন ইয়োলেনের একটি লেখা অবলম্বনে গল্পটি রচিত। তবে বাংলা ভাষায় যৌনতা, ভালোবাসা ও মানসিক বিকৃতির পরিচায়ক গল্পটি একেবারে অন্যরকম এক ভালোবাসার উপাখ্যান।
গিরগিটি/ দ্বৈতা গোস্বামী: আমেরিকান সাইকো নামের একটি জনপ্রিয় সিনেমার পরিণতির সঙ্গে এই গল্পটির পরিণতির মিল আছে। তবে সেটুকু শুধুমাত্র অনুপ্রেরণাই। কারণ গল্পটি পড়ার সময় আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি যে নানান চরিত্র নিয়ে লেখা গল্পটি শেষ অবধি এরকম ইউ-টার্ন নেবে! দারুণ লাগল।
লেভেল/দেবাঞ্জন মুখার্জী: সিক্ত যৌনতা এবং গনগনে প্রতিহিংসা নিয়ে লেখা রচনাটি প্রাপ্তবয়স্ক থ্রিলারের একটি সম্পদ। যৌনতার আবেশ ও বিভিন্ন চরিত্রের অন্ধকার দিকগুলি নিয়ে পড়তে পড়তেই পাঠক খুঁজে পায় এক অনন্য রিভেঞ্জ-স্টোরি।
পুনর্ভব/সোহম গুহ: বায়োথ্রিলার, কল্পবিজ্ঞান এবং লেখনীর অন্যরকম স্টাইল এই গল্পটিকে বইটির প্রাণবিন্দু করে তুলতে সক্ষম। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল যেন রিডলি স্কটের এলিয়েন সিরিজের কোনো নতুন ইউনিভার্সের সঙ্গে পরিচয় ঘটছে। অপূর্ব কল্পনা এবং উত্তেজনাপূর্ণ একটি রোমাঞ্চকর গল্প।
মায়া/সৌমিত্র বিশ্বাস: সব ভালো যার শেষ ভালো। বৃশ্চিক ২ এর অন্তিম গল্প হিসেবে এটি সঠিক স্থানাধিকারী। কারণ শেষ আবেশটুকুই মনে দীর্ঘস্থায়ী হয়। গল্পের মধ্যে দিয়ে একটি বিশেষ চরিত্রের উন্মাদনার গল্প এবং তার পাশে লেখকের অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে, প্রথম পুরুষের চোখ দিয়ে। কিন্তু সত্যিই কি উন্মাদনা সেই বিশেষ চরিত্রের, নাকি গল্প পরিণতি পায় অন্য এক হতবিহ্বল করা সত্যের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে? এই ক্লিফহ্যাঙ্গার এন্ডিং টুকু ভীষণ ভালো লাগল। গল্পের সঙ্গে সঙ্গে সংকলনটির পরিণতি হিসেবেও সার্থক এই লেখনী।
প্রচ্ছদ, অলংকরণ থেকে শুরু করে পৃষ্ঠাবিন্যাস, বাঁধাই... সবই খুব ভালো লাগল। সম্পাদনা, প্রকাশনা ও মুদ্রণের কাজও প্রশংসনীয়। কি কি বাজে লাগল? ব্যক্তিগত মতামত দিতে চাইলে আগেই বলে রাখি, প্রত্যেক লেখক লেখিকা এবং সম্পাদকের প্রয়াসকে সম্মান জানাই এরকম কঠিন এক স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য। এই বইতে কারোর লেখা একটি দুটি গল্প পাঠকের ভালো লাগেনি মানে এই নয় যে সেই লেখকের অন্যান্য রচনাও ভালো নয়। তবে বলতেই হয়, অত্যধিক এবং অপ্রয়োজনীয় বিদেশী স্বাদ, বিদেশী দাঁতভাঙ্গা নাম, বিদেশী পরিবেশ, বিদেশী স্থান ইত্যাদি খুব স্থূলভাবে বর্তমান সারা বইজুড়ে। একটা গল্পে তো শুরু থেকে শেষ অবধি অপ্রয়োজনীয় ও বিরক্তিকর “আই নো, কান্ট বি, আই প্রমিস আই উড সি এ গুড ডক” ইত্যাদি বাংলিশ উক্তিতে আসল গল্পের প্রাণটাই চাপা পড়ে গেছে। বইয়ের আয়তন বৃদ্ধি তবেই সার্থক যদি গল্প চয়ন সঠিক হয়। তবে এর সমাধানের কথা ভাবলে একটাই প্রশ্ন মনে আসে, বাংলা ভাষায় পর্যাপ্ত থ্রিলারের রসদ কি বর্তমান যুগে সত্যিই আছে? নাকি বেশীরভাগটাই বিদেশী সাহিত্যের অনুপ্রেরণা? বর্তমান কলকাতা, লোকাল ট্রেন আর পলিউশনের আবহাওয়ায় কি বাংলা থ্রিলার রচনা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম? এর উত্তর লেখকের কাছে, সম্পাদকের কাছে। আবার উত্তরটা পাঠকের কাছেও। বৃশ্চিক সিরিজের প্রথম বইটি আমার পড়া হয়নি। আশা করবো বৃশ্চিক ৩ ও অদূর ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই আসবে। দারুণ সম্ভাবনাময় প্রাপ্তবয়স্ক সংকলনটির মানোন্নয়নের জন্য লেখক, সম্পাদক, পাঠক... প্রত্যেককেই প্রয়োজন। বাংলা ভাষায় আর পাঁচটা “রোমাঞ্চ অমনিবাস” কেনার সঙ্গে সঙ্গে এরকম সৎ প্রচেষ্টাকে পাঠক ও ক্রেতারা সাপোর্ট করলে নিশ্চয়ই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরোত্তর মানবৃদ্ধিও ঘটবে বৃশ্চিকের। তবে নিঃসন্দেহে বলতে হয়, “একালের রহস্য রোমাঞ্চ” সংকলন হিসেবে বৃশ্চিক ২ বইটি নিজের পরিচয়ে সুদীপ্ত, সুপাঠ্য এবং বেশ থ্রিলিং! আর দারুণ সম্ভাবনাময় তো বটেই।
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া বইয়ের নাম: বৃশ্চিক ২ সম্পাদনা: ঋজু গাঙ্গুলী প্রকাশক: অরণ্যমন মূল্য: ২৭৫₹
প্রথম খণ্ডের মত এই খণ্ডেরও সাবটাইটেলেই বিষয়বস্তু বলা আছে: রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী সংকলন। তবে এবারে রহস্য রোমাঞ্চের সঙ্গে ভয়ও প্রতিফলিত হয়েছে নানা গল্পে। গতবারে এক ডজন গল্প থাকলেও এবার গল্পের সংখ্যা বেশি। পুরো ষোলখানা গল্প দিয়ে ষোলআনা সাজানো বৃশ্চিক ২। এবারে মৌলিক কাহিনীও বেশি। অনুবাদও আছে, তুলনায় কম। মোটে ৩টে। এবার চলে আসি গল্প অনুসারে আলোচনায়।
ভীমরতি: দেবারতি মুখোপাধ্যায় রুদ্র-প্রিয়ম সিরিজ খ্যাত দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের একেবারে গুণমুগ্ধ ভক্ত না হলেও এর আগে বহুবার নানা সাহিত্য সংক্রান্ত আড্ডায় বলেছি যে লেখিকার ছোটগল্প লেখার হাত অসাধারণ। এই ধারণা আমার হয়েছিল গত বছর শারদীয়া শুকতারায় 'পোলোর পরিজনেরা' পড়ে। পরবর্তীকালে 'ঝিঁঝিঁপোকার মালা' পড়ে সে ধারণা বদ্ধমূল হয়। এবং এ ধারণা যে অমূলক নয়, তা এ গল্প প্রমাণ করে দিয়েছে। প্রতিটা প্লট টুইস্ট, গল্প কথন, সব মিলিয়ে একটা অসাধারণ প্যাকেজ।
বেতালি: মনীষ মুখোপাধ্যায় লেখকের লেখনীর সঙ্গে এই প্রথম আলাপ হল। ফার্স্ট ইম্প্রেশন চমৎকার। শক্তি গোঁসাইকে নিয়ে একটা সিরিজের অপেক্ষায় রইলাম।
আয়নাঘর: তমোঘ্ন নস্কর মূল কাহিনী: হল অফ মিররস রচয়িতা: ফ্রেডরিক ব্রাউন গল্পটা একটু ঘোঁট পাকানো গল্প। বুঝতে পারিনি। তবে এই কাহিনীটাকে ঠিক অনুবাদ বলা যায় না। বঙ্গীকরণ বলাটাই ঠিক হবে।
একটা সোনালি খুন: মিলন গাঙ্গুলী এই গল্পটার জন্য ২৭৫টাকা উসুল হয়ে গেছে বলতে পারেন। অসম্ভব ভাল গল্প কথ��, আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুরন্ত পোর্ট্রেয়াল, ফাটাফাটি প্লট টুইস্ট নিয়ে একাই একশো। গল্পটা এভাবে শেষ হবে ভাবিনি কখনওই।
দৃষ্টি: অনুষ্টুপ শেঠ ছোট গল্প, ভালো প্লট। কিন্তু প্রেজেন্টেশনটা আরও অনেক ভাল হতে পারত। ভাল লাগেনি পড়ে।
প্রহরণ: পল্লব বসু অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্টের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এতগুলো চরিত্র এসে ঢুকেছে গল্পের মধ্যে যে তারা নিজেদের বিকশিত করার স্পেসই পায়নি। আলোর চেয়েও বেশি গতিবেগে গল্প ছুটে শেষ হয়ে গেছে। তবে এ গল্পে মশলা ছিল। আরও বড় হলে আরও ভাল হত এই গল্পটা।
মাতৃরূপেন: দোলা দাস এই বইয়ের সবচেয়ে বড় গল্প। রহস্যের চেয়েও যেটা বেশি স্থায়ী হয়েছে গল্পে তা হল মনস্তত্ত্ব। সেই সঙ্গে প্লটের ঘুরপাকও প্রশংসনীয়। কিন্তু গল্পটা অতিরিক্ত টেনে বড় করা হয়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত মতামত। পটভূমি তৈরি করার জন্য প্রয়োজনের অধিক শব্দ খরচ করেছেন লেখিকা। তবে 'অধিকন্তু ন দোষায়' বলেই গল্পটা দাঁড়িয়ে গেছে ভালোভাবে।
জুউনো, তোমার জন্য: প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত মূল কাহিনী: ফর দ্য লাভ অফ জুউনো রচয়িতা: জেন ইয়োলেন রহস্য কম, কল্পবিজ্ঞান বেশি। কিন্তু ভাল অনুবাদ। সাবলীল।
গিরগিটি: দ্বৈতা গোস্বামী খুদে গল্প। তবে পরিমিত মাত্রায় শব্দ খরচ করেছেন লেখিকা। গল্পের প্লটের সঙ্গে মিলিয়ে হিসেব করলে এর চেয়ে বেশি গোটা কাহিনীকে টানলে জিনিসটা বিগড়ে যেতে পারত।
দেবাংশী: ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় তন্ত্রের সঙ্গে বিজ্ঞানের মিশেল ঘটিয়ে একটা দারুণ গল্প বুনেছেন লেখক। শিরদাঁড়া দিয়ে শিরশিরিয়ে ভয়ও যেমন নেমেছে, তেমনই শেষে লেখকের বলা কিছু কথা মনে দাগও কেটেছে। মনীষবাবুর মতো এঁর কাছেও একই অনুরোধ: রায়মশাইকে নিয়ে সিরিজ হোক।
লেভেল: দেবাঞ্জন মুখার্জী ভালো গল্প। তবে আহামরি না। প্রেডিক্টেবল।
পুনর্ভব: সোহম গুহ এই গল্পটার রহস্যকাহিনী হিসেবে আমি সার্থকতা বুঝিনি। তবে কল্পবিজ্ঞান কাহিনী হিসেবে দারুণ গল্প।
খুনের সহজপাঠ: কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে যদি প্রতিটা গল্পকে দশের মধ্যে রেটিং দিতে বলা হয়, এই গল্পটাকে আমি দশে এক দেব। কোনো টুইস্ট নেই, কিস্যু নেই। এক দিলাম শুধু মাত্র কিছু নতুন রহস্যকাহিনীর নাম জানতে পারলাম বলে। খুব বোকাবোকা প্লট।
খোঁজ: নীলাদ্রি মুখার্জি এরকম বাঁধা গতের গল্পের পর হতাশা দূর করে দিতে পারে এই গল্পটা। দুর্ধর্ষভাবে বোনা রহস্য। দারুণ গল্পকথন। এই বইয়ের দ্বিতীয় সেরা গল্প।
রক্তিম: ঋজু গাঙ্গুলী মূল কাহিনী: রেড সানসেট রচয়িতা: বব ম্যাডিসন প্রথম দিকে বোর লাগলেও শেষ দিকটা বেশ ইন্টারেস্টিং। সাবলীল অনুবাদ
মায়া: সৌমিত্র বসু তন্ত্র, রহস্য, আতঙ্ক - এই তিনের মিশেল বলা যায় এই গল্পকে। ফিনিশার হিসেবে চরম ভাল গল্প।
সব শেষে যথারীতি অলংকরণের দায়িত্বে থাকা অর্ক পৈতণ্ডীর কথা বা বললেই নয়। তাঁর প্রতিটা আঁকার মাধ্যমে গল্পের পুরো অ্যাম্বিয়েন্সটা ফুটে উঠেছে এবারেও।