এই বইটা নিয়ে অনেকেই তাদের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কিন্তু সত্যি বলতে এটা পড়ে আমি পুরো বোমকে গেছি। কি লিখবো বুঝছিনা। আমার পড়া বাংলায় এটা অন্যতম সেরা ফ্যান্টাসি থ্রিলার। চমকের পর চমক, বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা অবধি রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা।
বইয়ের কভার, পেজ কোয়ালিটি সবই বেশ ভালো। তবে লেখা নিয়ে সত্যি কিছু বলতে পারছিনা। 5 টা মানুষ কে খুঁজে বার করা, তাদের দ্বারা মানুষ কে বাঁচানোর চেষ্টা... পদে পদে বিপদ... ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে চলা। শুধু তাই নয়, খুব ডিটেইলে সেই স্পেশাল অথছ খুব সাধারণ মানুষ গুলোর জীবনের বর্ণনা দেওয়া....অসাধারণ...যারা থ্রিলার পছন্দ করেন তাদের জন্য এবং যারা ফ্যান্টাসি পছন্দ করেন তাদের জন্য পুরো কম্বো প্যাক।
আমরা কেত মেরে বলি বটে। কিন্তু বই কেনার সময় প্রচ্ছদের হালকা একটা চোরা টান একেবারে অস্বীকার করার উপায় বোধহয় কারোরই নেই। অবশ্য আমার নিজের বেলায় খুব কম বইই প্রচ্ছদ দেখে কিনতে ইচ্ছে করে। তার মধ্যে "মিশন পৃথিবী" বোধ করি অন্যতম।
এরকম স্মার্ট গ্রাফিকাল রিপ্রেজেন্টেশন আমি বাংলায় অন্তত কমই দেখেছি। সে টেক্সচারের ব্যবহারই বলুন কী ক্যালিগ্রাফিখানা ব্যাকগ্রাউন্ড কভারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া! রিয়্যালিস্টিক ফাটলের দাগ, প্রত্যেকটা লেয়ারকে কালার কারেকশন করে এমন ভাবে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়া, যাতে করে লেখিকার নামটুকু বাদে বাকি অংশটুকু একটার সাথে আরেকটা আলাদা করার উপায় থাকে না কোনও।
সহজ ভাষায়, মনে হবে ক্যালিগ্রাফি সহ পুরোটাই যেন কোনও গুহাচিত্র। কালের নিয়মে যা মলিন হয়ে এলেও, তার এখনও অনেক গল্প বলার আছে। পৃথিবীর গল্প। পৃথিবীতে মানুষ নামে এক জীবের ফিরে আসার অলীক আখ্যান। এই বইও তো তাই। সেই চিরাচরিত দেব দানবের যুদ্ধ। মানুষের বেঁচে ওঠার, জয়ী হয়ে ওঠার বীজমন্ত্র।
বইয়ের চুম্বক খানা কিছুটা এরকম-- খুব বেশি পরের কথা নয়। ক্যালেন্ডারে তখন ২০৪০। বিশ্বজুড়ে আরও একবার জেগে ওঠে অশুভ শক্তি। আর কালের নিয়মেই অন্যদিকে একত্র হতে থাকে শুভ শক্তির আধার দেবদেবীরা। সেই দেবদেবীর মধ্যে যেমন আছেন অ্যাশগার্ডের রাজপুত্র থর তেমনি রাগে হনুমানের লেজ আছড়ানোও দিব্যি মিশে গেছে জিউসের উপদেশের সাথে সাথেই। তাঁরাই মানুষের মধ্যে থেকে বেছে নেন বিশুদ্ধ হৃদয়ের কিছু যোদ্ধা। যারা হয়ে উঠবে এই পৃথিবীর রক্ষাকর্তা। তারপরে পাতার পর পাতা রামায়ণে যুগ থেকে চলে আসা শুভ-অশুভর সেই সংগ্রাম গাথা। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, সেটা হল অশুভ শক্তিকে এই গল্পে নিরাকার দেখানো হয়েছে। গোটা বইয়ে তার উপস্থিতি পরতে পরতে বেশ টের পাওয়া গেলেও, কে বা কারা এর পিছনে আছে সেটা অধরাই থেকে যায় শেষ পর্যন্ত।
সবমিলিয়ে আহামরি না হলেও বেশ সুন্দর প্লট। সত্যি কথা বলতে বাংলায় মনে রেখে দেওয়ার মত ফ্যান্টাসি থ্রিলার নেহাতই হাতে গোনা। ইদানীং কালের মধ্যে বোধহয় সৈকত মুখোপাধ্যায়ের "পরের পাতায় নরক" একটা উল্লেখযোগ্য নাম।
যাক গে, যেটা বলছিলাম -- থ্রিলার মাত্রই যা হয় তা হল পাতা উল্টানোর স্পিড বেড়ে যাওয়া, যেটা কিনা আবার নির্ভর করে লেখার গতির ওপর। সামান্য পাঠক হিসেবে আমি কমই জানি। তাও পাঠ জীবনের আলগা ধারণা যে, কমা, দাড়ি বা বাক্য গঠনের অদল বদলেই বুঝি বা ঘটে যায় সেই সব ম্যাজিক, যার বলে রহস্য উপন্যাসের পাঠক শেষ পাতার আগে হাঁসফাঁস করে খানিক স্পয়লার বাতাসের আশায়! আবার ওই একই লেখা আরও কিছু রদবদলেই হয়ত পাঠক ভেসে চলে স্বপ্নে, পায়ের নীচের ইঁটকাঠ বাস্তবেও সাহস পেয়ে যায় ঘুরে দাঁড়ানোর। গল্প হয়ে যায়, আমার আপনার সবার!
একই ভাবে থ্রিলার ফ্যান্টাসির ভাষাও বোধহয় স্বতন্ত্র। ঠাকুমার ঝুলির পেলবতা বা সামাজিক গল্পের গঠন এতে খাটে না। অন্তত আমার তাই ধারণা। আর সেই কাঙ্ক্ষিত বাক্য গঠন এ বইয়ের কোথাও আমি পেলাম না। লেখায় যেন গতি নেই। পরতে পরতে লেখিকার ছুঁয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা বেশ অনুভূত হয়। কিন্তু কোথায় গিয়ে যেন ছানা কেটে জল বেরিয়ে পড়ে। লেখক পাঠকের মিশে যাওয়ার মাঝে যেন একটা কাচের আস্তরণ কাজ করে যায় প্রতিনিয়ত। তাই তখন আর এগোতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় উলটে রেখে এবার পরের বইটা তুলে নিই। ধার করা বই হলে হয়তো সেটা করেও ফেলতাম। কিন্তু, সেটা করলে লেখিকার পরিশ্রম ও নিজের পকেট দুটোর প্রতিই বড্ড অবিচার করা হত।
তাই এগিয়ে যাই। পর্ব ভাগের সময় ঝাঁকুনি লাগে। এডিটিংয়ের পরিভাষায় আমরা যাকে বলি জার্ক শট। তাছাড়াও বেশ কিছু জায়গায় একই বাক্যের মধ্যে কোনও কোনও শব্দের একাধিক ব্যবহারের ফলে বেশ একটা বিরক্তিই চলে আসে আপনা আপনি।
“চলতে ফিরতে ওর চোখে পড়ে গেছে বৌদির গর্তে বসা কালি পড়া চোখের নীচে মুছতে ভুলে যাওয়া জলের ফোঁটা।“
এই ধরণের বড় বাক্য গঠনের সময় আরও যত্নবান হওয়া উচিত ছিল। প্রয়োজনে মাঝে যতিচিহ্ন ব্যবহার করা যায়। নিজে লেখক হলে হয়ত বলে দিতে পারতাম ঠিক কী দিলে বাক্যে গতি আসত। কিন্তু তাও পাঠক হিসেবেই প্রশ্ন জাগে, একটা বাচ্চার পক্ষে “ঘিনঘিন” করে কাঁদা কি আদৌ সম্ভব?
আসলে লেখিকা গতি বজায় রাখার যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। ভাষায় চমক আনতে চেয়েছেন বহুবার। কিন্তু “সমুদ্রের আনাচে কানাচে চেনে নিজের বাড়ির বাথরুমের মত“ ধরণের বিশেষণ কী সেই চেষ্টায় সাফল্য আনতে পেরেছে?
তারিখও দেখলাম প্রথম দুই অধ্যায় ছাড়া সারা বইতে আর কোথাও উল্লেখ নেই। অথচ সেটা করলে কাল প্রবাহটুকু বেশ ধরা যেত। দিতে না চাইলে অধ্যায় ১-এ র আগে ২০৪৭ বসিয়ে দিলেই দিব্যি মানিয়ে যায়।
অধ্যায় ১-এর কথা যখন উঠলই, তখন তার আগে প্রাককথার ব্যাপারে না বললেই নয়। শক্তিশালী হলেই যে চিরকাল টিকে থাকা যায় না, সেটা এখানে খুব সুন্দর করে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু, এর মাধ্যমে লেখিকা বাদবাকি উপন্যাসে যে বার্তাটুকু মিশিয়ে দিতে চেয়েছেন, সেটাই আরও সূক্ষ্মতার প্রয়োজন ছিল বলে মনে হল।
তবে? অসাধারণ কিছুই কী নেই? আছে তো! ন্যাট আর জোহানার হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার দৃশ্যটুকু বড় মায়াময় ভাবে লিখেছেন লেখিকা। এখানে এসেই কাহিনী যেন হঠাৎ বেগ পেল। ছুটিয়ে নিয়ে চলল বেশ কিছুটা।
আমার খুব আবছা ধারণা, এ বই বহুদিন ধরে কিস্তিতে কিস্তিতে লেখা। ঘুরতে ফিরতে যেমন যেমন এসেছে, লিখে গেছেন। হয়ত দীর্ঘদিন কিছুই আসেনি! সেই দীর্ঘতাগুলো যে কী অকল্পনীয় যন্ত্রণায় কেটেছে তাঁর! কিন্তু, তারপর ওয়ান ফাইন মির্নিং, হয়তো লেখা এসে আবার ধরা দিয়েছে তাঁর কলমে। পড়ে থাকা পাণ্ডুলিপি আবার পেয়েছে উড়ে বেড়াবার স্বাদ। এমন তো হয়ই, তাই না? কিন্তু সমস্যা হল,অনেক সময় আগের অংশের সঙ্গে পরের অংশ ব্লেন্ড করে না। কনট্রাস্ট এরিয়া থেকে যায় স্পষ্ট!
ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই ব্লেন্ডিং ব্যাপারটা, এই ভাতের সাথে ডালের মিশে যাওয়াটা শিল্পের সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে জরুরি। যা এই বইয়ের প্রচ্ছদে যতটা অসাধারণ ভাবে পেলাম, বইয়ের মধ্যে ততটাও পেলাম বলে মনে হল না। ব্যস, এই আর কী!
*পাঠ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া : কভারটা ভেসে আসছে বারবার। আর কয়েক ঝলক লাল বিদ্যুৎ। মনে হচ্ছে লেখাটা আরেকটু গোছানো হলে ভাল হত। আরও ডিটেলড। আসলের লেখিকার কল্পনার অলিগলি তো আমরা ঠিক চিনি না। তাই প্যারামাউন্ট বললেই যেমন মনে ডাবের শরবত চলে আসে আপনি-আপনি, তেমনি অন্যের কল্পনার কোনও ল্যান্ডমার্ক জানা না থাকলে কোনও দৃশ্যই আর ফুটে ওঠে না। চোখে আসে শুধু শব্দগুলোই। এক্ষেত্রে লেখক-লেখিকাদের লেখনীই হয়ে ওঠে পাঠকের চোখ। মনের গলি দিয়ে এগিয়ে চলার একমাত্র রাস্তা।