এপার বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল 'পরিবর্তন'! তার পেছনে লুকিয়ে থাকা ঘটনা, কিংবদন্তি আর রক্তের দাগ নিয়ে পলিটিক্যাল থ্রিলার লিখতে খুব বেশি মানুষ সাহস পান না এই তথাকথিত গণতান্ত্রিক পরিবেশেও। ব্যতিক্রম হিসেবে এতদিন শুধু সম্ভ্রম আর ভালোবাসার সঙ্গে দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের নাম নেওয়া যেত। এবার থেকে অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের নামও নিতে হবে। সসম্মানে। কী লিখেছেন অরিন্দম তাঁর এই উপন্যাসে? হাওড়া স্টেশনে একটা বিস্ফোরণ ঘটল। তাতে সাসপেক্ট হিসেবে কেউ এল। কেউ এল ভিকটিম হয়ে। ইনভেস্টিগেশন হল। কিন্তু ঘাগু অফিসারের সন্দেহ হল, এর পেছনে অন্য কিছু আছে। আরও বড়ো, আরও গভীর কিছু। এই উপন্যাস সেই 'গভীরে যাও' আহ্বানে সাড়া দেওয়ার। এর প্রতি অধ্যায়ে আছে একটা করে মোচড়। এতে রেড হেরিং আর মুখোশ, শত্রু আর মিত্রের অবস্থান বিনিময়ে মাথা গুলিয়ে যায়। এতে গল্পের মাঝপথে জমে ওঠা প্রশ্নের উত্তরমালা পেতে-না-পেতেই শুরু হয়ে যায় অন্য প্রশ্নের ঢেউ। কিন্তু এই উপন্যাস তা সত্বেও, এর বেশ কিছু অসঙ্গতি এবং সরলীকরণ নিয়েও আপনাকে বাধ্য করে গল্পের শেষ অবধি ছুটতে। কেন বলুন তো? কারণ থ্রিলারের আসল যে দুটো জিনিস এপার বাংলার অধিকাংশ রহস্য উপন্যাসে আদৌ থাকে না, সেই দুটো এতে আছে প্রবল পরিমাণে। এতে আবেগের লুজ-মোশন আর চরিত্রচিত্রণের নামে অনন্ত ব্যাকস্টোরির বদলে আছে সলিড ঘটমান বর্তমান। এর চরিত্ররা নিজেদের নিয়ে একগাদা অ্যাপলজি দেয় না। তার বদলে এরা যা করার তা করে। এই চরিত্রদের ইতিহাস গল্পের ভূগোলকে চালিত করে, উলটোটা নয়। এবং এতে আছে গতি! একেবারে নির্দয়, নির্মম সে গতি পাঠককে বই শেষ হওয়ার আগে থামতে দেয় না। কিন্তু... প্রথমত, এই বই একটা দাবাখেলার প্রথমার্ধের কশমাকশ মাত্র। এর এন্ডগেমের আভাসটুকু দিয়েই শেষ হয়েছে এই কাহিনি। "অন্তরে অতৃপ্তি রবে" টাইপের অনুভূতি আমরা বাংলা উপন্যাসের শেষে পেতে অভ্যস্ত নই। তবে 'অরফ্যান এক্স' থেকে শুরু করে অন্য অজস্র থ্রিলারে এই জিনিস ঘটেছে। আমি আশা রাখি, আগামী দিনে এই বইয়ের পরবর্তী অধ্যায় আমরা পাব লেখকের কাছ থেকে। আজ্ঞে হ্যাঁ, যে প্রবাদপ্রতিম থ্রিলারটির নাম আমি এই প্রসঙ্গে নিলাম, লেখক যে তেমন কিছু এই বাংলাতেও একদিন লিখবেন, সেই আশাও আমার আছে। দ্বিতীয়ত, লেখক আরও বড়ো ক্যানভাসে, আরও বড়ো আকারে এই কাহিনি নির্মাণ করলে ভালো করতেন। শ্বাসরোধী গতি আনতে গিয়ে এই লেখায় যেভাবে একের পর এক দৃশ্যে জাম্প-কাট ঘটেছে, তা পাঠককে বিরক্ত ও রুষ্ট করবে। ওই একই কারণে গল্পের শেষটা অতি-সরলীকরণ, এবং মূল চরিত্রদের বেশ কিছু ব্যাখ্যাহীন আচরণে কিঞ্চিৎ হতাশাজনক হয়ে গেছে। তৃতীয়ত, বর্ণশুদ্ধির ব্যাপারে আমাদের সবার কাছে মডেল ঋষা ভট্টাচার্য(য) এই বইয়ের দায়িত্বে থাকা সত্বেও 'পড়লো', 'জানেনা', ''জানাবো' জাতীয় বানানে গোটা বই ঠাসা দেখে অবাক হলাম। একইভাবে বেশ কিছু অধ্যায়ের সূচনায় একটি নয়নাভিরাম হেডপিস থাকলেও অন্যগুলোতে তা নেই কেন, বুঝলাম না। 'অকুস্থলে অকস্মাৎ' অধ্যায়ের শুরুতে অন্য একটি অংশের ক্ষুদ্রভাগ হয়তো ভুল করেই ছাপা হয়ে গেছে, যা আমরা সচরাচর কাফে টেবিলের বইয়ে দেখি না। উদ্ধৃতিচিহ্ন আর '-' চিহ্নের ব্যবহারেও যে পরিমাণে মিশ্রণ ঘটেছে তা অপ্রত্যাশিত। সব মিলিয়ে মনে হয়, এই বইটা আরেকটু যত্ন আর সময় নিয়ে হলে আরও ভালো হত। লেখককে আবারও ধন্যবাদ জানাই এমন একটি বুদ্ধিদীপ্ত ও গতিময় থ্রিলার আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে আরও ভালো, আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখা পাবে এই শুভেচ্ছাও জানাই তাঁকে। যদি আপনি সত্যিকারের থ্রিলারের অনুরাগী হন, যেখানে বিছানায় ছানা কাটার বদলে লেখক আপনাকে বসিয়ে দেন একটি আই.ই.ডি-র ওপর, তাহলে এই বইটি আপনার পড়া উচিত বলে আমার ধারণা। পাঠ, শুভ হোক।
প্রশান্ত দত্ত তার স্ত্রী শাঁওলী এবং ছেলে রেয়ানকে নিয়ে শ্বশুড়বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। হাওড়া স্টেশনে এসে প্রশান্ত শাঁওলী এবং ছেলেকে এটিএমের সামনে দাঁড় করিয়ে একটু বাথরুমে যায়। কিন্তু অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও সে না আসলে শাঁওলী তাকে ফোন করতে থাকে। ঠিক এই সময়ই স্টেশনে আকস্মিকভাবে ঘটে যায় বোমা বিস্ফোরণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় পুলিশ এই বিস্ফোরণের জন্য প্রশান্তকে সন্দেহ করে। কিন্তু কেন? এক ছাপোষা স্কুল মাস্টার প্রশান্তকে সন্দেহের কারণ কী? আর এই বোমা বিস্ফোরণেরই বা কারণ কী?
এরপর কাহিনী চলে যায় কুড়ি বছর আগে উড়িষ্যার চন্ডিকা গ্রামে। সেখানে ফুটে উঠেছে পশুপতি মাদিয়া, চন্দন সামালের জীবন সংগ্রাম। সাথে দেখা যায় কীভাবে রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতা দখলের জন্য নকশালবাদীদের হাত করে ক্ষমতা দখলের পর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদেরই পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে, তাদের হত্যা করছে। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া কিছু মানুষের মনে জ্বলতে থাকে প্রতিহিংসার আগুন। সেই প্রতিহিংসার আগুন এরপর কী রূপ নেয় তা নিয়েই কাহিনী এগোতে থাকে।
এটি একটি আদ্যোপান্ত পলিটিক্যাল থ্রিলার। খুব চেনা একটা প্লট হলেও লেখায় অভিনবত্ব আছে। কাহিনীতে রয়েছে একের পর এক টুইস্ট। একবার বইটা ধরলে পড়া শেষ না করে উঠতে ইচ্ছে করবে না। থ্রিলার বই হিসেবে এরকম টানটান উত্তেজনাময় লেখা সবসময় ভালোই লাগে। তবে এটা বলতেই হয় এই বইতে কিছু ধোঁয়াশা রয়েছে যেগুলো আমার ভালো লাগেনি, কারণ এর কোনো ব্যাখ্যা পেলাম না। ১) প্রশান্তর মোবাইলের মতো একই মোবাইল দ্বিতীয়টা রেখে যাওয়ার কারণটা বুঝলাম না। ২) আরশাদ ও আরমান ভাইয়ের চরিত্রের সঙ্গে কাহিনীর সম্পর্ক আমি ঠিক বুঝলাম না। এছাড়া আমার মনে হয়েছে নিরাময়বাবুর চরিত্রটা এখানে হয়তো না আনলেও হতো।
থ্রিলার হিসাবে পড়তে খারাপ লাগে নি। কিন্তু কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা না পাওয়ায় সেই জায়গাগুলো আমার ভালো লাগেনি। তবে ধোঁয়াশার ওই বিষয়গুলো বাদ দিলে থ্রিলার প্রেমীরা বইটি অবশ্যই একবার পড়ে দেখতে পারেন। পাঠে থাকুন।
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের 'একটি মিথ্যে ঘটনা অবলম্বনে' একটি মিথ্যের মুখোশে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘদিনের জমে থাকা সত্য উন্মোচনের জার্নি। এটি এমন এক উপন্যাস, যেখানে মিথ্যে শুধু ছলনা নয়—তা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের মুখবন্ধ, প্রতিশোধের মাধ্যম, আর আদর্শভঙ্গের প্রহসন। যদিও পাণ্ডুলিপিতে একে ‘পলিটিক্যাল থ্রিলার’ বলা হয়েছে, বাস্তবে এটি কেবল হাওড়া স্টেশনের এক বিস্ফোরণ বা ষড়যন্ত্রের কাহিনী নয়—বরং এটি এক অন্তর্জগতের যুদ্ধ, যেখানে ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা, রাজনৈতিক পাপবোধ, এবং সময়ের পাঁকে আটকে পড়া আদর্শ একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
এই উপন্যাসে মিথ্যের পরতে পরতে গাঁথা আছে এক নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের সুর, যা পলিটিক্সের পাশবিক চাতুরির ভেতরেও হারায় না। কুড়ি বছরের পুরনো সেই বন্ধন, যেখানে "মিথ্যে বললেও তার চোখে একটা সত্য ছিল", তাকে কেন্দ্র করেই পাঠক বুঝে যায়—এই কাহিনী সত্যকে ঢেকে রাখে না, বরং তাকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে।
শুধু কাহিনী নয়, timeline jumps এবং flashback ব্যবহার করে লেখক বর্তমান ও অতীতকে এমনভাবে সংযুক্ত করেছেন, যেন সত্য ও মিথ্যের ব্যবধান ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়। এক সময় পাঠকের মনে হতে পারে—“সত্যই কি সত্য, না তা শুধু স্মৃতি আর বিকারগর্ভ ব্যাখ্যার ফসল?”
গল্পের চরিত্রগুলিও বাস্তবের কাছাকাছি। প্রশান্ত দত্ত—যিনি কবি থেকে পরিণত হন প্যারা টিচারে, যাঁর জীবন যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয় মধ্যবিত্তের গ্লানি, অসম্পূর্ণতা এবং নিঃশব্দ প্রতিরোধ। শাঁওলী, নিরাময় বাবু, আরশাদ-আরমান, চন্দন সামল বা পশুপতি মাদিয়া—প্রতিটি চরিত্র যেন কোনও না কোনও সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক। কেউ আদর্শে বিশ্বাস করে ধ্বংস হয়, কেউ বিশ্বাসঘাতকতায় জিতে গিয়ে আত্মার অংশ হারিয়ে ফেলে।
"বিপ্লবীরা মরেও থেকে যায়—স্মৃতিতে, অভিশাপে, বা প্রতিশোধে"—এই উপন্যাস তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
অরিন্দমের লেখা কখনও সিনেম্যাটিক, কখনও রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষ্য, আবার কখনও নিছকই এক কাব্যিক আকুতি। কখনও মনে হয়, “জীবনটা একটা দাবার মতো, যেখানে প্রত্যেক চালেই হয় আত্মা কাটা, নয় আত্মা বিক্রি।”
তবে, পাঠকের সন্তুষ্টি একেবারে নিরবিচ্ছিন্ন নয়। কিছু চরিত্রের উপস্থিতি অকারণ বলে মনে হয়, কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলে না। বিশেষ করে প্রশান্তের মোবাইলের মতো একই আরেকটি ফোন কেন, অথবা আরশাদ-আরমানের ভূমিকা কেন এমন দুর্বল, এই প্রশ্নগুলো পাঠকের মনে রয়ে যায়। এই অসমাপ্ততাই যেন বলে, “প্রতিটি সত্যেরও একটা অসমাপ্ত পাঠ থাকে।”
তবু, এই প্রথম উপন্যাসেই লেখক যে আত্মবিশ্বাস, ভাষার দাপট ও গতিশীলতা দেখিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। গল্পটি শেষ হয়, কিন্তু তাতে “শেষ হয়েও হইল না শেষ”—এই অনুভব রয়ে যায় পাঠকের মনে।
সবশেষে, ‘একটি মিথ্যে ঘটনা অবলম্বনে’ কেবল থ্রিলার নয়, এটি সময়ের বিরুদ্ধে এক কাব্যিক প্রতিবাদ, যেখানে প্রশ্ন থেকে যায়, উত্তরের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে। এই বই একবার পড়লে পাঠকের মনে গেঁথে যায় সেই অদ্ভুত সত্য— “মিথ্যে কথা যদি গভীর কোনও সত্য ঢেকে রাখে, তবে তাকে বিশ্বাসঘাতক বলব, না বিপ্লবী?”
গল্প শুরু হয় হাওড়া স্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে, যেখানে একটি মোবাইল বোমা বিস্ফোরণ পুরোনো ভালোবাসার ছবিটাকে ছিন্ন করে দেয়—এবং সেই অগ্নিসাক্ষীর ধোঁয়ায় ধরা পড়ে গরিব প্যারাটিচার প্রশান্ত দত্ত। “সত্য তো যে হিসেব-নিকেশ ছাড়িয়ে যায়,” যেমন কোনো চেনা কবিতার লাইন হূদয়ে বাজে, ঠিক তেমনি এই বিস্ফোরণের ছায়ায় দাগ চলে আসে বিশ বছর আগের এক রাজনৈতিক অভিসন্ধির। প্রথমদিকে সিক্ত হয় প্রেমের মধুরতা দিয়ে—শাঁওলী আর প্রশান্তের ক্লিশে‑সুখ দৃষ্টিতে, বিয়ের পরের জীবনের টানাপোড়েন আর সংসারের হতাশায়। তবে ঠিক তখনই, যখন পাঠক মনে করেন আশি‑নব্বইয়ের এক সতেজ প্রেমকাহিনি বলছেন, লেখক সেই ছকই ভেঙে ফেলেন এবং গল্প এক ঝটিকায় হয়ে ওঠে তীব্র রাজনৈতিক থ্রিলার।
“প্রতিটি মিথ্যের অন্তরে লুকিয়ে থাকে এক অবিস্মৃত সত্য,”—এমনই এক অনুভূতি বইয়ের পাতায় পাতায় ঘুরেফিরে ধরা দেয়। প্রশান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়: ধুলো‑বালি, কড়া‑কড়া গ্রিল, আর মায়ের অশ্রুসিক্ত মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পুরনো প্রতিশোধের আগুন। ২০১৯-এর কলকাতা এবং ১৯৯৯-এর উড়িষ্যার এক ছোট গ্রামে দীর্ঘ দশকের ফাঁকপোকরায় বাঁধা সেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র খোঁজে ফেরে দুই ভিন্ন সময়ে, দুই ভিন্ন ভূগোলে—আর পাঠক টের পায়, কী অসীম হিমশীতলতার সঙ্গে লুটিয়ে রাখা হয় ইতিহাস।
লেখক যেভাবে ‘timeline jump’ অবলম্বন করে বর্তমান আর অতীতের মধ্যকার সলসলানো সেতু পাড়ি দেন, তা সত্যিই সাহসের পরিচয়: “সময় কখনও সোজা লাইন নয়, বরং বাঁকানো এক নদীর মতো,” যেমন একটা নীরব পাঠকের মনে ফিসফিস করে ওঠে। প্রশান্ত‑শাঁওলী দম্পতির বৈবাহিক জীবনের বারো কেলেক টুকুই যেন ছিল প্রস্তুতি; কিন্ত মূল সময়ে—উঠোনে ছড়িয়ে থাকা গাছের ছায়াপথ, সিটি‑লাইটের নীচে জ্বলজ্বল করা ছেঁড়া স্মৃতি, আর দমন করা মাওবাদীদের প্রতিশ্রুতিমূলক আগুন—সেসবই ন্যাড়া ফাটিয়ে করে দেয় বইয়ের হাড়ে দাঁত ঠোকা উত্তেজনা।
এই রাজনৈতিক ময়দানে প্রতিশোধের খেলা শুরু হয় তখন, যখন আরশাদ‑আরমানের মতো অথচ ‘half‑baked’ চরিত্রেরা নেমে পড়ে খেলা করে—তারা হয় শক্তির ছদ্মবেশী অক্টোপাস, নয়তো প্রতিরোধের ছদ্মমায়ার প্রহরী। “যার পেখমে যত্ন থাকে না, তার বিপ্লবে উত্তেজনার খোঁজ পাওয়া যায় না,”—এই সত্যটাও পাঠক বুঝতে দ্বিধা করে না। তবে সেই সব খুঁতও পাঠককে ছেড়ে যায় না, যেমন—কেন প্রশান্তের দুটি একরকম মোবাইল? আর নীরব নিরাময় বাবুর বারবার ফেরা, যেন এক অপ্রয়োজনীয় উপশম?
তবুও, অরিন্দমের তীক্ষ্ণ ভাষা, ব্রেক‑নেক গতির রস, আর সহস্র টুইস্টের হ্যান্ড্গ্রেনেডই বইকে ‘unputdownable’ বানায়। “একটি মিথ্যে ঘটনা অবলম্বনে” পড়ে বুঝতে হলে, থ্রিলারের গণ্ডি সিঁচড়ে আঁকতে হয় সাহসী হৃদয়—যাতে কেবল ‘কি ঘটল’ নয়, ‘কেন ঘটল’ আর ‘কি সত্যি ছিল’ সেই প্রশ্নগুলোর অবিরাম সংস্করণও বাজে।
শেষে, এ বই হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না, তবে অবশেষে বলে ফেলে—“মিথ্যা যখন সত্যের মুখোশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানেই শুরু হয় মানুষের আসল লড়াই।” যদি আপনি সেই লড়াইয়ের সাক্ষী হতে চান, এই থ্রিলার আপনার জন্য লিখিত।
কাহিনির প্রতিটি স্তরে উড়িষ্যার চণ্ডকা গ্রামের ‘পশুপতি’ মাদিয়া, বিপ্লবী চন্দন সামল ও ছিটে-ফোঁটা—তিন বীরের জীবনগাঁথা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আদর্শের অজস্র বীজ সেখানেই বোনা হয়েছিল, যেখানে মাটিতে পা রাখতে না পারতেই গুলিয়ে ফেলা হয় সাহসী স্বপ্নগুলোকে। একবার বিশ্বাসঘাতকতার দংশনে আক্রান্ত হয়ে তারা যে একসময় “সমাজের শৃঙ্খল ভাঙতে” অঙ্গিকারবদ্ধ ছিল, শেষ পর্যন্ত দেখা যায়—তারা নিজেই সেই শৃঙ্খল ভাঙার আগুনে বিভৎসায়িত। বিপ্লবীর বীরত্ব থেকে প্রতিশোধের অন্ধকারে পতন এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর লেখকের সুকৌশলী হাতে ফুটে উঠেছে, যেন প্রতিটি শব্দই বলছে—“সত্যের বীজ কখনো ধ্বংসের আগুনের মধ্যে শেকড়া গাড়ে।”
গল্পের গতি সত্যিই প্রশংসনীয়—লেখকের কলম চালায় নির্মম, নির্দয় এক ছন্দে, যেন প্রতিটি বাক্য একটি নতুন টুইস্ট আর ক্লাইম্যাক্সের প্রতিশ্রুতি বহন করে। অল্প কিছু খটকা-অসঙ্গতি ঠাঁই পেয়েও, এই বলবান ছন্দই পাঠককে শেষ পাতা উল্টিয়ে নিতে বাধ্য করে। রাজনৈতিক পটভূমি যেমন কড়া করে ধরে রাখে, তেমনি রূপক, সম্পর্ক, প্রতিশোধ আর দুর্নীতির ছড়াছড়ি আবহমান জালে আটকে ফেলে—যেখানে উড়িষ্যার পর্বতের ধূলোমাখা মাটি থেকে শুরু করে কলকাতার জমজমাট মেসের আড্ডা পর্যন্ত সবই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, যেন লেখকের বর্ণনাই এক ভিজ্যুয়াল সিনেমার ফ্রেম।
তবে গল্পে কয়েকটি প্রশ্ন পাঠকের ঘুম হারাম করেই—একই ধরনের দুটো মোবাইল ফোন রেখে দেওয়ার রহস্য কী? আরশাদ-আরমানের ভূমিকা কী, শুধুমাত্র পরিস্থিতি প্লট ঠানতে, না কোনও লুকিয়ে থাকা কূটকৌশল? নিরাময় বাবুর চরিত্র কি কেবল অপ্রয়োজনীয় পরিপূরক, নাকি ঘটনার গভীরে তার কোনও অলীক সূত্র বাঁধা আছে? ডায়েরির অনন্য স্ট্রাকচার থ্রিলারের টানকে অনেকগুণ বাড়িয়েছে, তবে ঘটনার ক্রম মাঝে মাঝে এলোমেলো মনে হতে পারে; কিছু চরিত্রের ‘আধবেক’ অবস্থাও স্পষ্ট হলে প্লট আরও শক্তিশালী হতো।
যেমন যুগান্তকারী গ্রিক আইনপ্রণেতা সোলোন বলেছিলেন, “Of all falsehoods, the worst is a half-truth.”
এখানেই ‘একটি ���িথ্যে ঘটনা অবলম্বনে’র দারুণ শক্তি আর দারুণ সৌন্দর্য লুকিয়ে—পাঠককে যতটা টেনে আনে, ততটাই প্রশ্নের জালে পোক্ত হতে বাধ্য করে।
যদিও বইটি লেখকের প্রথম উপন্যাস, তথাপি তার নির্মাণে যে সাহস, সেই সাহস বাংলা সাহিত্যে নতুন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। থ্রিলার মানে শুধুই রহস্য নয়, তার মধ্যে রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক টানাপোড়েন, সম্পর্কের ভাঙন, এবং আদর্শের ধ্বংস সব মিলিয়ে দিতে পারলে তবেই তা মনে রাখার মতো হয়—এ বই সেইরকম এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস।
'পরিবর্তন'-উত্তর বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা এই বইয়ে একটি পটভূমি হিসেবে নয়, বরং একটি সক্রিয় চরিত্র হিসেবে কাজ করে। মিথ্যের গা-ঢাকা দিয়ে যে সত্য বারবার উঠে আসে, সেটাই গল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
লেখার গতি, চরিত্রের মুখোশ, ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সুতোয় বাঁধা নির্মাণ এবং ক্লাইম্যাক্সে এসে রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে এটি এক অনবদ্য চেষ্টা। লেখকের প্রতি অনুরোধ, সিক্যুয়েল নিয়ে যেন আর দেরি না হয়।
যে সুতোয় তিনি শেষ করেছেন, তা টেনে না ধরলে পাঠকের অতৃপ্তি ঘুচবে না। "একটি মিথ্যে ঘটনা অবলম্বনে" আদতে একটি সত্যের খোঁজে বেরোনো অভিযাত্রা, যা পড়ে শেষ করলে মনে হয়—মিথ্যে তো আছেই, কিন্তু তারও একটা আদর্শ আছে।
শুধু বড় বড় কথা লেখা। এটা থেকে নিজে লেখার টপিক পাইসি কিন্তু গল্পটা পইড়া ভাল্লাগে নাই। মূলত টাইমলাইন আগে পিছে করে সফল গল্প বলা যায় কিন্তু এইটা গুলায়ে ফেলসে সেইটারে। এক্সট্রা ইনফো দিয়ে ঝামেলা করে দিসে আর ট্র্যাক রাখা যায় না। যে আসা নিয়ে পড়তে বসছিলাম তার কোনোটাই পুরাপুরি পাইনাই। লেটডাউন। P.R. : 2.2/5