একজন বাঙালী মা অথবা বাবা, যিনি বাংলাদেশে লেখাপড়া করেছেন, ভালো-মন্দ বহু ধরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন, তিনি যখন শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত একটা দেশে গিয়ে নিজের সন্তানের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতার অংশী হচ্ছেন, তখন তাকে কিভাবে দেখছেন, বা নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে কিভাবে চমৎকৃত বা হতাশ হচ্ছেন - এটা খুব সহজ-সরলভাবে তুলে ধরাই ছিল এই পাণ্ডুলিপি পরিকল্পনার প্রধান বিবেচ্য । একইসাথে লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের একজন বাবা অথবা মা বর্তমানে যেভাবে তাঁর বাচ্চার শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতার অংশী হচ্ছেন তাকেও এই পাণ্ডুলিপিতে পাশাপাশি রাখা ।
বইঃ তিন ভুবনের শিক্ষা জাপান-নেদারল্যান্ডস-বাংলাদেশ লেখকঃ তানজিনা ইয়াসমিন, তানবীরা তালুকদার, রাখাল রাহা প্রকাশনা সংস্থাঃ বাতিঘর প্রথম প্রকাশ ২০১৯ মুদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা
বইটার নামের মধ্যেই বইটা নিয়ে কথা আছে। তিন ভুবনের শিক্ষা সাথে দেশের নাম। অর্থাৎ তিনটি দেশ (জাপান-নেদারল্যান্ডস-বাংলাদেশ) এর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বইটি লিখেছেন তিনজন। তিনজন বাবা মায়ের একজন মা সন্তান বড় করেছেন জাপানে, একজন বাবা সন্তান বড় করছেন বাংলাদেশে এবং একজন মা সন্তান বড় করছেন নেদারল্যান্ডস এ। মূলত তিন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ারের মাধ্যমে গল্পাকারে বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে এ জাতীয় বই পড়েছিলাম তোত্তোচান এবং বলা বাহুল্য সেটি আমার খুব পছন্দের বই। একটা দেশের কালচার প্রতিফলিত হবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এবং সেটাই স্বাভাবিক। আমরা অনেক সময় শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে হা হুতাশ করি, মানিয়ে নেই কিন্তু তলিয়ে দেখি না যে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পার্থক্য কি। হুমায়ুন আহমেদ বা জাফর ইকবালের বইতে পড়েছিলাম আমেরিকায় তাদের বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার জন্য অস্থির থাকতো আর বাংলাদেশে এসে বাচ্চারা স্কুলে যেতে চায়না। একই ফিডব্যাক দেখলাম নেদারল্যান্ডস এর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। মেঘ তার নাম, সোনা বাচ্চাটা স্কুল মিস দিতে রাজি না কারন এতই মজা হয় স্কুলে। নেদারল্যান্ডসে বিশ্বাস করে বাচ্চার জন্য আলাদা সময় এবং এফোর্ট দিতে হবে। সে জন্যই বোধয় নেদারল্যান্ডসে বাচ্চারা সবচেয়ে সুখী বাচ্চা। যে বাচ্চা যে বিষয়ে পারদর্শী তাকে সে বিষয়ে সুযোগ দিয়ে তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নেদারল্যান্ডসে। নেদারল্যান্ডসে একটা বিষয় খুব মজা লেগেছে, যেমন বাচ্চাদের জুতোর ফিতে বাধা শেখার উপরে ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেয়া হয়। অর্থাৎ নিজের কাজ নিজে করতে শেখা বা সেলফ ডিপেন্ডেন্ট হওয়াকে উৎসাহিত করা হয়। অপরদিকে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা বেশ পরিকল্পিত এবং স্টেপগুলো সাজানো। খুব ছোট থেকেই বাচ্চাদের বিনয় এবং নিয়মানুবর্তিতা ও নিজের কাজ নিজে করতে শেখানোর মধ্যে দিয়ে স্বাবলম্বী করে বড় করে তোলা হয়। মেধাকে সুযোগ দেয়া হয়। জাপান আর নেদারল্যান্ডসের একটা বিষয় হল ওরা মোটামুটি চেষ্টা করে সব স্কুলগুলোকে একটা স্ট্যান্ডার্ড মেন্টেইন করানোর। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা আমি এখানে লিখতে চাইনা। বইতে আছে একজন সচেতন অভিভাবকের সন্তানের শিক্ষা নিয়ে লড়াই করার গল্প। পাঠক পড়ে নিয়েন। তাহলেই বুঝবেন বাংলাদেশ বাকি দুটি দেশের চেয়ে অন্তত শিক্ষা ব্যবস্থায় কত কত পিছিয়ে এবং ভয়ের ব্যাপার হল স্টুডেন্ট ফ্রেন্ডলি বা জীবনমুখি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের কোন সম্ভাবনার দেখাও পাওয়া যায়না। গল্পচ্ছলে লেখা বইটা পড়ে বেশ দুশ্চিন্তা হল আর মনে হল- বাংলাদেশে অন্তত বাচ্চার মা বাবাদের পড়া উচিৎ এ বইটা। এছাড়াও শিক্ষা নিয়ে ভাবেন বা স্কুলকলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য ভালো একটা চক্ষু উন্মোচনকারী বই হতে পারে এটি। ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪/৫ ফেবু পেজঃ boikothareadndiscuss
জাপান, নেদারল্যান্ড এবং বাংলাদেশ। তিনটি রাষ্ট্র। তিন ভুবন। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার আকাশ-পাতাল পার্থক্য যেন দুই ভুবনের সাথে এক ভুবনের। লিখেছেন তিন বাঙালি।
স্মৃতিচারণমূলক এই বইয়ে জাপান চ্যাপ্টার লিখেছেন তানজীনা ইয়াসমিন। জাপানে নিজের সন্তান ও তার শিক্ষা প্রক্রিয়া নিয়ে লেখিকার নিজস্ব বক্তব্যে অনেক কিছুই চলে এসেছে। শিক্ষাব্যবস্থায় যে জাপান কতটুকু ডিসিপ্লিনড এবং শিশুর বিবিধ মনোদৈহিক উন্নয়নে নিবেদিত তা আছে উক্ত অধ্যায়ে। অনিন্দ্যসুন্দর সিস্টেম কিভাবে শিশুদের পরিশ্রমী ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলে তা চোখের সামনে যেন ভেসে উঠেছে। অভিভাবক-শিক্ষক-শিক্ষার্থী যেন এক ফাংশনাল টিম। প্রতিযোগিতা নয় বরঞ্চ সহযোগিতামূলক মনস্তত্ত্বের কারণে জাপানে একজন বাঙালি শিশুর বেড়ে ওঠা দেখে বিস্মিত হতে হয়।
নেদারল্যান্ডের শিশুরা নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী। সেই সাথে মা-বাবারাও। তানবীরা তালুকদার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছেন নেদারল্যান্ড অধ্যায়ের কথা। যেখানে শিশুদের গড়ে তুলা হয় শিক্ষার মানবিক দিকটির প্রতি সর্বোচ্চ মনোযোগ প্রদান করে। শিশুর খাদ্যগ্রহণ, অর্থনৈতিক অবস্থা, বয়োসন্ধিক্ষণের জটিলতা এড়িয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দেখা যায় উক্ত সিস্টেমে। শিক্ষা বিষয়টা যে স্কুল পুরোপুরি নিজ দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষার্থীকে দেয় সেটির উজ্জ্বল উদাহরণ নেদারল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা।
রাখাল রাহা লিখেছেন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা-প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিভাবক থেকে যেখানে বাধ্য হয়ে খোদ লেখক স্কুল কমিটিতে যোগদান করেন। অর্থ, পেশীশক্তি, শিক্ষকদের মধ্যকার রাজনীতি, জাতীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত মানুষজনের দখলদারিত্ব, প্রশ্নফাঁস এবং দায়িত্বে অবহেলার এক নির্মানবিক বাস্তবতার তিক্ত স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক। যেখানে সরকারী সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে পছন্দের প্রকাশকদের বই সিলেক্ট করে শিশুদের ব্যাগের ওজনবৃদ্ধির করুণ কথা বলেছেন রাখাল রাহা।
জিপিএ ফাইভ, গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ, কোচিং, প্রতিযোগিতার আফিমে বুঁদ হয়ে থাকা বাংলাদেশের শিশুদের নিয়ে তার উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। রাজনীতি, আঞ্চলিকতা, বানিজ্যিক উদ্দেশ্যের কাছে শিক্ষার্থীদের বিবমীষাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা আছে এই পার্টে। যেখানে ধনপতি, বড় রাজনীতিবিদদের সন্তানেরা চিরাচরিত নিয়মে দেশের বাইরের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে থাকেন। আবার বাংলাদেশের শিশুরা থেকে যায় অন্য এক ভুবনে।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যেসব বাঙালি মা-বাবা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অন্যান্যরা চিন্তা করেন এই বই খুব সম্ভবত তাদের জন্য।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
তিন ভুবনের শিক্ষা লেখক : তানজীনা ইয়াসমিন, তানবীরা তালুকদার, রাখাল রাহা প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : সব্যসাচী মিস্ত্রী প্রকাশক : শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন (শিশির) জঁরা : বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে স্মৃতিচারণ, বিশ্লেষণাত্মক এবং তুলনামূলক রচনা। রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
তিন ভিন্ন দেশে বাঙালী তিন মা তাদের সন্তানদের ব��় করে তোলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। ওদের শিক্ষা ব্যবস্থার পুরো আলোচনা এতে উঠে আসেনি। এসেছে আমাদের দেশীয় গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তফাৎ এবং ওদের শিক্ষাব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য।
জাপানিদের বিনয় নজর কাড়ার মতোন। ওরা ছোটোবেলা থেকেই সমাজের অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধার ব্যাপারটা ভীষণ চমৎকার ভাবে তৈরী করে। নেদারল্যান্ডসের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার লেগেছে প্রতেক্যের মাঝে নিজের সক্ষমতার সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়াটা। আর আমাদের দেশের ছোটোবেলা থেকে পরীক্ষাভীতি, মুখস্তবিদ্যার উপর নির্ভরশীলতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিশৃঙ্খলাতাই মূলত পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ।
চলতি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দলিত পিষ্ট হয়ে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি প্রায়। প্রথম দুই দেশের বর্ণনা পড়ে যেমন স্বপ্নের দেশ বলে মনে হচ্ছিল, শেষের অংশ না পড়েই জেনে গিয়েছিলাম বাস্তবতা আছে সেখানে। তবে তার খুব সামান্যই লেখক সেখানে তুলে ধরেছেন। বর্তমান শিক্ষার্থীরা লিখতে বসলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাতকাহন রচনা করে ফেলবে নিমিষেই। সকল অভিভাবকের উচিত বইটা অন্তত একবার পড়ে দেখা। আর কিছু না হোক, নিজের সন্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব সৃষ্টি হবে।
বই: তিন ভুবনের শিক্ষা : জাপান.নেদারল্যান্ড.বাংলাদেশ লেখক: তানজীনা ইয়াসমিন, তানবীরা তালুকদার,রাখাল রাহা রেটিং: ৫.০/৫.০ প্রকাশনা: শিশির (শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন)
এই বইটি আমার একজন বন্ধুর অনুরোধে কিনছিলাম। আসলে বইটি হাতে নিয়ে বইটির গঠন অসাধারণ লাগছিল। বাংলাদেশ এর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমার বরাবরই অভিযোগ ছিল। এবং আমি বিশ্বাস করি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা কে যুগোপযোগী না করলে দেশ কখনো স্বপ্নের সোনার বাংলার সন্ধান পাবে না। এই বইটি আসলে এই কথাটি সত্যিকারের উদাহরণ দিয়ে ব্যবহারিক ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমি তিনজন লেখককে আসলে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নাই। আপনারা আসলে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন আমাদের শিক্ষা নীতি প্রণয়নকারী, শিশুদের বাবা-মা, শিক্ষক শিক্ষিকা কি অসাধারণ ভুলের রাজ্যে বসবাস করি। আমি অনেকবার বলেছি বিভিন্ন আলোচনায় ও লেখাতে উন্নত বিশ্বে কিভাবে জীবনমুখী শিক্ষা দেয়া হয়। এই বইতে আসলে আমি সরাসরি উদাহরণ পেলাম। বইয়ের তিনজন লেখক তিনটি দেশে তাদের সন্তানদের শিশু শিক্ষার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। দেশ তিনটি হচ্ছে জাপান, নেদারল্যান্ড এবং বাংলাদেশ। পাঠক বইটি পড়তে গিয়ে জাপান ও নেদারল্যান্ড এর শিক্ষানীতিতে ৭০-৮০% মিল পাবেন। কিন্তু বাংলাদেশের এর শিক্ষানীতির সাথে ৯৯% অমিল পাবেন দুই দেশের শিক্ষা নীতিতে। উন্নত দেশগুলো শিক্ষাব্যবস্থা থেকে একটা বিষয় পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন যেটাকে বলে প্রতিযোগিতা যার জন্য আমাদের শিশুদের বাবা-মা, বন্ধু বান্ধব জীবন দিয়ে দিতেও রাজি আছে।আরো পাবেন বাংলাদেশ অংশে একজন পিতার শিক্ষানীতি পরিবর্তনের সংগ্ৰাম। প্রতিটি শিক্ষা নীতি প্রণয়নের জন্য প্রচুর গবেষণা দরকার। গবেষনার জন্য এই বইটি সহজ ভাষায় রচিত একটি সহজপাঠ হতে পারে। এবং প্রতিটি শিক্ষক-শিক্ষিকার উচিত বইটি পড়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সকলের উচিত এই বইটি পড়া। যারা শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করেন তাদের উচিত এই বইটি সহজপাঠ হিসেবে নিয়ে আরো গভীরে চিন্তা করা। একসময় পাঠকের মনে হবে এটাই সর্বোত্তম ব্যবস্থা কিন্তু আপনি দেখবেন জাপান বা নেদারল্যান্ড মনে করে এখনো অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং এর জন্য গবেষণা দরকার। অনেকদিনের গবেষণা তাদেরকে এই অবস্থায় এনেছে। একসময় আমি মনে করতাম বাংলাদেশ আসলে শিক্ষাক্ষেত্রে ২০২০ এর জায়গায় ১৯২০ এ আছে। কিন্তু এই বই পড়ার পর সংখ্যাটি ১৯২০ না বলে ১৮২০ বলাই শ্রেয়। জাপান: প্রতিটি শিশুই এক-একটি ফুল, প্রতিটি ফুলই স্বতন্ত্র। নেদারল্যান্ড: পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী শিশুদের শিক্ষা। বাংলাদেশ: পাথরে লেখা আছে অধঃপতন। #ধূসরকল্পনা
পড়লাম অনেক কান্ড করে। দুই ভুবনের সুন্দর সব কথার ভীড়ে যখন দেখি আমাদের নিজেদের ভুবন কে হারিয়ে যেতে; থেমে গিয়েছিলাম। পড়তে ইচ্ছা করছিলনা। আমাদের ভালো গুলো কবে লেখা হবে মনে হচ্ছিল। জাপানে বলা হয় "প্রতিটি শিশুই একটি ফুল"। ঠিক তাই। তবু পড়তে পড়তে কোথায় যেন মনে হলো, শিশুদের রোবট বানিয়ে ফেলা হচ্ছে না তো। সবচেয়ে সুখীদের দেশে পিছু ছাড়ে না বর্ণবাদ। আর আমাদের দেশে? সে কথা আমরা যারা সন্তানের বাবা, মা, ভাই বা বোন, পদে পদে ঠেকে জানি। তবু মনে হলো একটু আশার আলো দিয়ে কি সমাপ্তি হতে পারতো না? এ কবছরে কি কিছুটা পাল্টাইনি আমরা?!! আহ! পদ্ম ছোট থাকতে স্বপ্ন দেখেছি, যেদিন চট্টগ্রাম চলে যাবো ওর বাবার কাছে, শহরে বাসা নেবো। কারণ আবুল মোমেনের "ফুলকি" শহরে। সেই পদ্ম এখন নালন্দায় পড়ছে। এখানে শিক্ষক নেই, আছেন শিক্ষাকর্মী। আপু আর ভাইয়া। অভিভাবক, শিশু আর বিদ্যালয় (যেখানে আছেন আপুমনি আর ভাইয়ারা, আরো অনেকে) এই তিন মিলে আমার মেয়ের "নালন্দা"। আমার মেয়েটিকে দেখি আর মনে হয়, আলো হাতে যে মানুষ গুলো আমাদের পথ দেখান তাদের আমার আয়ু টুকু দিয়ে দিতে চাই। এই যে শিক্ষাভাবনায় পরিবর্তন, খুব আশা ছিল এটা কিছুটা হলে ও উঠে আসবে। ফুলকি, নালন্দা, তক্ষশীলা, অরণি, সহজপাঠ... ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলাদেশে।
তিন বাঙ্গালী বাবা-মায়ের তিনটি লেখা। জাপান, নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশ- এই তিন দেশে কিভাবে তাদের বাচ্চারা বড় হয়েছে, কেমন ছিল (এবং আছে) তাদের শিক্ষাব্যবস্থা। দেশগুলো নিয়ে ৩ টি লিখা উপরিল্লিখিত ক্রমেই সাজানো। জাপানের শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিয়মানুবর্তী নাকি হয়। এক বছরের বাচ্চা হাঁটি হাঁটি পা করে নিজের জুতো গুছিয়ে রাখে। নেদারল্যান্ডসের শিশুরা সবচেয়ে সুখী। সেখানে বসবাসকারী বাঙ্গালী মা লিখেছেন, তাঁর মেয়ে স্কুলে যাবার জন্য উন্মুখ থাকতো। এমনও হয়েছে তারা স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বাসায় ফিরলেন দুপুরে। সেদিনও মেয়ে বাকি আধাবেলা ক্লাস করার জন্য স্কুলে ছুটে গেছে। প্রথম দুটো লেখা পড়ে এত ভালো লাগছিলো! মনে একটা ক্ষীণ আশা জাগে, বাংলাদেশের শিক্ষা এতো ভালো না হোক, ইতিবাচক কিছু তো আছে অবশ্যই। হায়, যতই এগুচ্ছি আতঙ্কে শিউরে উঠছি। হতাশ আর আশাহত হচ্ছি...। বর্তমানটাই কি সবচেয়ে বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন? নাকি এটাই আমাদের নিয়ে যাচ্ছে আগামীর চুড়ান্ত অন্ধকারের দিকে? সেটা আরো কত গভীর?
বেশ কিছুদিন ধরেই আমাদের নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে সবার মধ্যে খুব হইচই দেখা ���িচ্ছে। বাচ্চাদের যদি পরীক্ষাই না থাকলে তাদের পড়তে বসানো যাবে কিনা এসব ভেবে অনেক অভিভাবকরা এই নতুন শিক্ষানীতিকে সাপান্ত করে যাচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি পরীক্ষা ছাড়া বাচ্চাদের পড়াশোনা করানো সম্ভব? আমাদের শিক্ষকেরা কি পারবে প্রতিটা ছাত্রের সঠিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন করতে? কয়েকদিন আগে "তিন ভুবনের শিক্ষা" বইটি পড়ছিলাম, যেখানে জাপান, নেদারল্যান্ডস এবং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চমৎকার ও মজার অনেক তথ্য দেয়া রয়েছে। সুশিক্ষায় এগিয়ে থাকা বিশ্বের বড় দেশগুলোর মধ্যে জাপান আর নেদারল্যান্ডস কিভাবে প্রাথমিক শিক্ষার কার্যক্রম সাজিয়েছে, কিভাবে ৩/৪ বছর বয়সী বাচ্চাদেরকে শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে সাবলম্বী করে গড়ে তোলা হচ্ছে ওসব থেকেই কিছু তথ্য আজকে শেয়ার করি।
প্রথমেই শুরু করবো বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষের দেশ নেদারল্যান্ডসকে দিয়ে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এদেশে বাচ্চাদের প্রি-স্কুলিং শুরু করা যায় দুই বছর বয়স থেকেই। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। অভিভাবক বাচ্চার চার বছর হওয়ার আগে যেকোনো সময়ই তাদের শিশুকে নিয়ে প্রি স্কুলে ভর্তি করাতে পারে। এই স্বাধীনতা থাকার জন্য প্রতিমাসেই তাদের স্কুলে নতুন বাচ্চা দেখা যায়। আর এজন্য স্কুলে নিয়ম করে দেয়া হয় নতুন কেউ আসলে যাতে পুরোনো বাচ্চারা তাদের সাহায্য করে। এখান থেকেই অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা শিশুদের মধ্যে গড়ে উঠে।
এদেশে প্রি স্কুলে সময় থাকে সপ্তাহে দুইদিন, ২ ঘন্টার মতন। শেখার প্রথম ধাপে থাকে নিজের কাজ নিজে করা। জামা কাপড় পড়তে পারা থেকে শুরু করে নিজের খেলনা গোছানো, সকালের নাস্তা তৈরি করা এধরণের নানা কিছু স্কুলে শেখানো হয়।
ডাচ শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধা তালিকা বলে কিছু নেই৷ রেজাল্ট কার্ডে লেখা হয় ভালো, যথেষ্ট বা যথেষ্ট নয়। রেজাল্ট কার্ড গণহারে একসাথেও সবাইকে দেয়া হয় না। প্রত্যেক অভিভাবকের সাথে অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে, তাদের আলাদা করে ডেকে আলোচনা করে রেজাল্ট দেয়া হয়৷ ফলে অভিভাবকদের নিজেদের মধ্যে রেজাল্ট নিয়ে তুলনা করার সুযোগ মিলে না। মোটকথা পরিক্ষার ফল নিয়ে প্রতিযোগীতাকে তারা অসুস্থ সংস্কৃতি বলে মনে করে।
শিক্ষকেরা বাচ্চাদের রিপোর্ট কার্ডও খুব চমৎকার উপায়ে তৈরি করে। রিপোর্ট মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়৷ সামাজিক উন্নয়ন, মানসিক উন্নয়ন আর পড়াশোনা। ক্লাসে বন্ধুদের প্রতি আচরণ, অন্যদের সাথে ব্যবহার, সাহায্য করার মনোভাব এসব থাকে সামাজিক উন্নয়নের কাতারে। মানসিক উন্নয়নে দেখা হয় বাচ্চারা বয়স অনুযায়ী তাদের অনুভূতি প্রকাশ করছে কিনা। আর সবশেষে পড়াশোনার হালচাল বিচার করা হয় ছাত্ররা তাদের গ্রুপ অনুযায়ী আশানুরূপ ফল করছে কিনা তা দেখে। সবকিছু মিলিয়ে এই বয়সেই বাচ্চা ভবিষ্যতে কোন ধরণের পেশায় যেতে পারে তার দিকনির্দেশনা দেয়া হয়। নেদারল্যান্ডসে প্রাইমারী শিক্ষা মূলত আট বছরের। স্কুলে ১০ বছরের নিচে বাচ্চাদের কোনো বাড়ীর কাজ দেয়া হয় না। প্রাইমারী স্কুল শেষ করার সময় সরকারী ভাবে একটা বোর্ড এক্সাম নেয়া হয় যেটার নাম হলো সিটো, তাদের ভাষায় (CITO- Central Instituut voor Toets Ontwikkeling)। এই পরিক্ষার ফল আর ক্লাসের ফল দুটাকে একসাথে তুলনা করে সেকেন্ডারী স্কুলের গ্রেড ঠিক করা হয়। এখানে মজার বিষয় হলো কোনো কারণে কোন শিক্ষার্থী যদি সরকারী পরিক্ষায় রেজাল্ট খারাপ করে তাহলে স্কুলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। কারণ বাচ্চাটিকে তার শিক্ষকই সবচেয়ে ভালো চিনে। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে যেটা ভাবাও যায় না! বাচ্চাদের সিটো এক্সামটাও হয় এক অদ্ভুত নিয়মে। সারা দেশে ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের জন্যে সরকারীভাবে প্রশ্ন বিতরণ করা হয়। কিন্তু পরীক্ষা নেয়া হয় ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে। বাড়তি কোনো পড়া বা আড়ম্বরতা থাকে না বিধায় পরিক্ষার কোন চাপ বা ভয় বাচ্চারা অনুভব করতে পারে না। প্রাইমারি শেষে সিটোর ফল অনুযায়ী তাদের সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি করানো হয়। তবে ভালো গ্রেড পেয়ে সেকেন্ডারিতে গিয়ে যদি লাগাতার পরীক্ষা খারাপ করে তাহলে তাকে মাঝারীতে নামিয়ে দেয়া হয়। আবার মাঝারীর কোন ছাত্র ভালো রেজাল্ট করতে থাকলে তাকে উপরে ওঠার সুযোগ করে দেয়া হয়। এবং এই পদ্ধতি সেকেন্ডারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত চলতে থাকে।
আমার কাছে ওদের যেই জিনিসটা সবথেকে অভিনব লেগেছে তা হলো ক্লাস এইটে উঠার পরই বাচ্চারা কে কোন দিকে পড়তে চায় এটা নিয়ে ভাবার জন্য তাদের ছয় মাস দেয়। কোনো বিষয় খালি ভালো লাগলেই হবে না, ছাত্রটির সে বিষয় পড়তে পারার মতন যোগ্যতা আছে কিনা সেটাও শিক্ষকরা খতিয়ে দেখে। আর এই যোগ্যতা খালি পরিক্ষার ফলের উপর নির্ভর করে না, বাচ্চার মানসিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা সেটাকে সমর্থন করে কিনা তাও দেখা হয়।
আর শুধু আলোচনা করেই যে স্কুলের দায়িত্ব শেষ তা না, দেশ বিদেশের বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাদারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে আয়োজন করা হয় "শিক্ষা মেলা"র। প্রত্যেকটি সাবজেক্টের সিনিয়র ছাত্রছাত্রীরা আলাদা করে বুথ তৈরি করে, তারা যে বিষয়ে পড়ছে বা হাতে কলমে কাজ করছে তার উপর ছোটদের কৌতূহলের উত্তর দেয়। আর যেসব বাচ্চারা তখনও মনস্থির করতে পারেনি কি নিয়ে পড়বে, তাদের নানা বিষয়ে আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করা হয়। বাচ্চাদের ডিটেইল অ্যাড্রেস রাখা হয় পরবর্তীতে বিষয় অনুযায়ী বিভিন্ন তথ্য পাঠানোর জন্য৷ আর এর মধ্যে দিয়ে প্রতিটি বাচ্চা নিজের চাহিদা, সক্ষমতা বুঝে বিষয় ঠিক করার জন্য যথেষ্ট সুযোগ ও সুবিধা পায়। এই পুরো কাজই সরকার করে যায় দেশের স্বার্থে। তাদের মূল মন্ত্র অনেকটা এরকম: পড়াশোনা না পারলে হতাশা দিয়ে জীবন না গড়ে যেটা পারো সেটা করো, টেকনিক্যাল লাইন বা অন্যকিছু। এত বড় জীবন যাতে খালি বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না হয়ে থাকে। ডাচদের এই অভিনব শিক্ষা পদ্ধতির জন্য অন্যান্য দেশের মতন "SAT" বা "ACT" পড়ে অমানবিক মানসিক চাপ আর আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয় না।
সুখী মানুষের দেশ নিয়ে তো অনেকক্ষণ বললাম, এখন চলুন দেখে আসা যাক জাপানে বাচ্চাদের শিক্ষাজীবন কেমন করে কাটে।
জাপানে চাকুরীজীবী মায়েদের জন্য ৩ মাস বয়স থেকেই কিন্ডারগার্ডেনে বাচ্চা রাখার সুবিধা দেয়া থাকে। প্রথমে কয়েকদিন ২ ঘন্টা করে রাখার পর ধীরে ধীরে ৭/৮ ঘন্টা পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।
জাপানি মানুষদের নিয়মানুবর্তিতা জগত জুড়েই বিখ্যাত। আর এর ভিত্তি শুরু হয় বাচ্চাদের এই কিন্ডারগার্টেন জীবন থেকেই। আমাদের দেশে যেখানে প্লে নার্সারিতে বাচ্চাদের বর্ণমালা মুখস্থ করানো হয়, সেখানে জাপানে শেখানো হয় স্কুল থেকে ফেরার পরে ঘরে ঢুকে জুতা গুছিয়ে রাখা, টিফিন বক্সে খাবার শেষ করে তা বেসিনে রাখা, নিজের জামা নিজে পরা, যেকোনো জায়গায় ময়লা দেখলে তা তুলে ফেলা, দৈনন্দিন নানা কাজের এমন সুশৃঙ্খল উপায় সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে হাতে কলমে শেখানো হয়।
মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর হাতেখড়িও শুরু হয় এই বয়স থেকেই। ছোট কাউকে "চান" বা "কুন", বয়স্কদের "সান" বা "সামা", এমনকি যেকোনো ধরণের জড় বস্তু যেমন বিশাল পাহাড় মাউন্ট ফুজিকে সম্মান দিয়ে "ফুজিসামা" বলা হয়। আর এদিকে আমাদের এখানে একটু কম পারিশ্রমিকের পেশাজীবীদের মুরগীওয়ালা, ময়লাওয়ালা বলে ডাকি, আর এতে যে দোষের কিছু আছে এটা ভেবেও দেখা হয় না।
শক্তসাবল করে গড়ে তোলার জন্য কিন্ডারগার্টেনে মজার সব পদ্ধতি নেয়া হয়। যেমন শীতকালে বাচ্চাদের জামা খুলে রোদে বসিয়ে শীত সইতে শেখানো, সিগন্যাল বুঝে রাস্তা পাড় হওয়া, যেকোনো ধরণের সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, নিজের কাজ নিজে করা, সব��ই মিলে একসাথে কাজ করা এসব কিছুতে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়। নজর রাখা হয় কোন কাজে বাচ্চারা যাতে হীনমন্যতায় না ভুগে।
কিন্ডারগার্টেনের শেষ বছরে বাচ্চাদের বয়স যখন পাঁচ তখন তাদেরকে টিচারের সাথে ক্যাম্পিংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে বাচ্চারা নিজেরাই নিজেদের সব কাজ করার মতন যোগ্যতা রাখে। এরকম নানা স্বনির্ভরতার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বাচ্চাদের সাবলম্বী করে গড়ে তোলা হয়।
জাপানে সকল এলাকার স্কুলেই একই মান নিয়ন্ত্রিত করা হয়। তাই ভালো স্কুলের জন্য বাসা থেকে কয়েক মাইল দূরে জ্যাম ঠেলে সময় নষ্ট করতে হয় না। এখানকার স্কুলে রোল তৈরি করা হয় নামের বানান অনুসারে, রেজাল্ট ভালো হলে যে রোল ১ হবে এমন বৈষম্য তৈরি করা হয় না। প্রাইমারিতে কোনো পরীক্ষা না থাকায় ডাচদের মতন জাপানিজ শিক্ষকরাও রিপোর্ট কার্ড বানায় বাচ্চাদের সামাজিক উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে৷ কার্ডে শিক্ষকদের মন্তব্য থাকে বাচ্চারা সামাজিক কিনা, টিমওয়ার্ক করতে পারছে কিনা, শেয়ারিং এ কেমন, কতটা মনোযোগ গিয়ে শিখছে এসব দেখা হয়। প্রাইমারীর পরেই পড়া���োনার পাশাপাশি বিভিন্ন এক্সটা কারিকুলাম ক্লাস এবং স্পোর্টস ক্লাব শুরু হয়ে যায়। খেলাধুলার পাশাপাশি সাতার, সেলাই, রান্না, এসব ছেলেমেয়ে সবাইকেই শেখানো হয় যাতে করে ঘরের কাজ সবাই সামলাতে পারে৷
বাচ্চাদের প্রথম সেণ্টার পরিক্ষা শুরু হয় জুনিয়র হাইতে উঠে। এই বোর্ডের ফল আর নাইনের ফাইনাল রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে তাদের হাইস্কুল ঠিক করা হয়। রেজাল্ট খুব ভালো হলে শিক্ষক প্রথম গ্রেডের একটি সরকারি আরেকটা বেসরকারি স্কুল নির্ধারণ করে দেয় পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। রেজাল্ট মোটামুটি ভালো হলে দ্বিতীয় গ্রেডের স্কুল, এভাবে করে এগিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে হাইস্কুল পাশ করে একই উপায়ে নির্ধারিত হয় কোন ইউনিভার্সিটিতে সে পরীক্ষা দিতে পারবে। এছাড়া আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মতন যাতে সব বিশ্ববিদ্যালয়েই পরীক্ষা দিতে না পারে এজন্য ইউনিভার্সিটির ফি খুব বেশী ধরা হয়। তাদের মতে, শত জায়গায় ভর্তি পরীক্ষা দেয়া শুধু ভোগান্তিই না, পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হলে ছেলেমেয়েদের মনোবলও সহজে ভেঙ্গে যায়।
এখন যদি এতক্ষণের আলাপ সব একত্র করি তাহলে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠার আগ পর্যন্ত এদুটো দেশের শিক্ষাক্রমে পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক, মানসিক আর শারীরিক উন্নয়নকে সমান তালে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তাদের প্রাইমারীতে পরীক্ষা বলতে কিছু থাকছে না। একটা বাচ্চার সুস্থ বিকাশে যা যা প্রয়োজন, সব পূরণ করাই হলো এদের শিক্ষার মূল লক্ষ্য। এখন আশার কথা হলো এই, আমাদের দেশের নতুন শিক্ষাক্রম কিছুটা এমন করার লক্ষ্যে আগাচ্ছে। পিইসি, জেএসসির মতন বোর্ড পরীক্ষাগুলো বাদ দিয়ে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিশুদের কোনো পরীক্ষা রাখা হয়নি। এসময় পুরোটা মূল্যায়ন হবে সারা বছর ধরে চলা বিভিন্ন রকমের শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে। পরবর্তীতে চতুর্থ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচটি বিষয়ে কিছু অংশের মূল্যায়ন হবে শিখনকালীন, বাকি অংশের মূল্যায়ন হবে পরীক্ষার ভিত্তিতে। একেবারে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে গিয়ে ৭০ শতাংশ সামষ্টিক ও ৩০ শতাংশ শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে। সামষ্টিক মূল্যায়নে যোগ হবে অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থাপন, যোগাযোগ, হাতে-কলমের কাজ ইত্যাদি বহুমুখী পদ্ধতি। জিপিএ বা গ্রেড পয়েন্ট অ্যাভারেজের ভিত্তিতে যে ফল প্রকাশ হতো, তার বদলে তিন শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে।
সুতরাং কিছু অভিভাবক অভিযোগ করলেও আমার মতে এ সিদ্ধান্ত খুবই সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যায়নের এ ধরণে পরিবর্তন আনার ফলে বাচ্চারা মুখস্থ, পরীক্ষা নির্ভরতা আর পরীক্ষাভীতি এসব থেকে বের হয়ে এসে প্রতিদিনের পড়াশোনাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। আর প্রথাগত পরীক্ষা না থাকায় কোচিং ও গাইড বইয়ের প্রয়োজনীয়তাও আর থাকবে না। এখন আমাদের শিক্ষকদের মাধ্যমে এই নতুন শিক্ষাক্রম সকল স্কুলে বাস্তবায়ন করাটাই হলো মূল চ্যালেঞ্জ। আমরা জানি আমাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাকি দেশগুলোর তুলনায় ভয়াবহ রকমের বেশি এবং জাপান বা নেদারল্যান্ডসের মতন হতে গেলে আমাদের সবদিক থেকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হবে, কিন্তু এই নতুন শিক্ষাক্রমের জন্য যতটা পরিবর্তন আসছে তাকে সাধুবাদ না জানিয়ে পারি না।
তিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা বইটি পড়ে অবাক হয়েছিলাম। সবচেয়ে অবাক হয়েছি, বাংলাদেশ অংশের লেখাটা পড়ে। পড়ে মনে হয়েছে, আসলেই একই পৃথিবীতে তিনটা মানুষ তিন রকম হতে পারে, শুধুমাত্র তাদেরকে শেখানোর পরিবেশ ভিন্ন বলে। ছোটবেলায়ই একজন কিসের সম্মুখীন হচ্ছে সেটাকে ভিত হিসেবে গ্রহণ করলে পরবর্তীতে ’মানুষ’ হবার অনেক কিছুই নির্ভর করে..
চট করে কমবয়সী মানুষগুলোকে আমরা জাজ করে ফেলি..
তাদেরকে আমরা কি দিয়েছি এবং দিচ্ছি তা পড়ে আসলেই লজ্জা পেয়েছি।
আমার নিজের এবং চাচাতো, মামাতো ভাই বোনকে দেখেছি, দেশের ইতিহাস বিষয়ে ভালোই অজ্ঞ। বাচ্চাগুলো আবার করোনার সময়কার auto-pass নিয়ে উপরের ক্লাসে ওঠা কপাল পোড়া শিক্ষার্থী। ভাইকে বললাম তার নবম-দশম শ্রেণির সমাজ বই নিয়ে আসতে, দেখি আসলেই ইতিহাসের ছিটা ফোটাও নেই। কোথায় পাল বংশ, মোঘল আমল?
কিন্তু আমার প্রশ্ন, আমার ভুলটা কোথায় ছিল? আমি তো কোন পড়ার চাপ দেই নি! আমার সাধ্য মত পড়ার বইয়ের পাশাপাশি গল্পবই ও দিয়েছি, youtube এ TED-Ed এর video দেখিয়েছি, খবরের কাগজ পড়তে দিয়েছি, সব দেশের cinema cartoon দেখতে দিয়েছি।
সেই প্রশ্ন থেকেই বইটা কেনা। পড়ে পর বুঝলাম, নাহ, আমাদের অভিভাবকদের মধ্যে অনেক lacking আছে, শিক্ষা ব্যাবস্থার কথা আমি আর ধরলামই না। লেখক রাখাল রাহা এতটাই সুন্দর করেই তুলে ধরেছেন যে, আমার পড়া শেষে frustration এ হাসি আসছিল, ব্যাঙ্গাত্মক হাসি 🤣🤣
বইটা সবারই পড়া উচিৎ। তাহলেই বোঝা যাবে আমাদের ব্যাক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সমস্যাটা কোথায়।
আমার ভাইয়ের স্কুলের প্রথম দিন, বাচ্চাটা এমনেই ভয় পেয়ে ছিল। Play group এ দিয়েছি। সবাইকে line করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে স্কুলের বাহিরে। গেট খুলে দিলে এক জন একজন করে ঢুকবে। গেট খোলার সাথে সাথে ৮০% বাচ্চার বাবা মা বাচ্চাকে ধাক্কা ধাক্কি করে গেইটের ভিতরে ঢোকানোর চেষ্টা করছিলেন। বাকি ২০% এই ধাক্কা ধাক্কিতে বাচ্চা ব্যাথা পাবে দেখে টেনে লাইন থেকে বের করে আনলেন। আমি এবং আমার মাও তাদের একজন। সামনে কিছু বাচ্চা ব্যাথা পেয়েছিল কারণ তাদের পেছনের বাচ্চার বাবা মা তাদের তোয়াক্কা না করে, ধাক্কা দিয়ে নিজেদের বাচ্চাকে গেইটে ঢোকাতে ব্যাস্ত ছিলেন। এটা যদি একটা বাচ্চার স্কুলের প্রথম দিনের experience হয়, তাহলে তাদের স্কুল কেন ভালো লাগবে? আর ওসব বাবা মা একটা playgroup এর বাচ্চাকে ধাক্কা দিয়ে কতটুকু extra জ্ঞান স্কুল থেকে আমদানি করতে পারবেন আল্লাহ ভালো জানেন। লেখক তানবীরা তালুকদার Netherland এর বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ এবং তার কারণ গুলো খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন এ বইয়ে। একটা reason তার মধ���যে বাবা মা সুখি থাকা। আমাদের দেশের বাবা মারা খুবই প্রতিযোগিতা মনোভাব নিয়ে রাখেন, আর যার কারণে বাচ্চার পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা ভেবেই continuous অসুখি থাকেন। এগুলোর ফলই হচ্ছে বাচ্চার পড়তে না চাওয়া। লেখক নিজের মনোভাবটাও এত সুন্দর করে লিখেছেন যে, আমরা আমাদের মন-মানসিকতার একটা প্রতিচ্ছবি তার মাধ্যমে দেখতে পাই।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, জাপানের শিক্ষা ব্যাবস্থার বর্ণনা। লেখক তানজিনা ইয়াসমিনের লিখা অসাধারণ। উনি একদম জন্ম থেকে শুরু করে, এতো visually সন্তানের বেড়ে ওঠাটা portray করেন, যেটা আমাদের ও বুঝতে সাহায্য করে, আমরা কতটা পিছিয়ে, কতটা irresponsible নিজের সন্তানদের ব্যাপারে। জাপানের বাচ্চারা শুধু শিক্ষক ও পরিবারের আদরে আদরে বড় হয় নি, তাদেরকে কষ্ট সহ্য করা বা washroom পরিষ্কার করার মত বাঙ্গালীর perspective এ নোংরা কাজও করানো হয়।
সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার ছিল, জাপানের ও নেদারল্যান্ডের অংশটুকু বাচ্চাদের জীবন নিয়ে ছিল। বাংলাদেশেরটা পড়তে গিয়ে, অর্ধেক পথে মাথায় আসলো, politics কেন, বাচ্চাটা কই? 🤣 কি পড়া শুরু করলাম? আর কি পড়ছি🤣
আমার ছোট ভাইয়ের নার্সারির ক্লাস পার্টি থেকে আসার পর তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কি করেছিল তারা? খুব excited হয়ে বলেছিল, "হুক্কা বার" গানে নেচেছে। আমি হা! নাচটা দেখাতে বললাম, দেখি হাত music videoর সাথে মিল। পরিবারের সবাই হতবাক। চিক্ষকই এই নাচটা শিখিয়েছেন।
সেই স্কুল থেকে তাকে নিয়ে আসি তার দু তিন মাস পরই, কারণ আমার ভাইকে প্রিন্সিপালের মেয়ে চড় দিয়ে কান ব্যাথা করে দিয়েছে, সামনে বসে থাকা অন্য বাচ্চার মা এবং স্কুল stuff তাকে কান্না থামানোর তো চেষ্টা করেই নি, নির্বিকার ভাবে বসা ছিলেন। জবাব ও দিচ্ছিলেন না কেন বাচ্চা দুটোর মধ্যে ঝামেলা লাগলো। এরপর তো আমার মা, principle এর মেয়ে সহ স্কুল stuff দের শাসন করেছেন, আর এজন্য principle এর অফিসে পরের দিন ডাক পড়েছে। এক কথায় : তার বাচ্চা কখনোই কাউকে মারতে পারে না, আমার মা কে হন ওনার বাচ্চাকে শাসন করার। দু পক্ষের overprotective & biased attitude এ অতিষ্ঠ হয়ে আমার বাবা ভাইকে ওই স্কুল থেকে বের করে নিয়ে আসেন।
আমরাই যদি ধর্য্য, সহিষ্ণুতা, বিনয়ী হওয়া না দেখাই বাচ্চাদের, তারা কিভাবে তাহলে শিখবে?
আর আমাদের দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, office এর অনুষ্ঠানে, জন্মদিন থেকে বিয়ে সবকিছুতেই নিজের সাংস্কৃতির জিনিস কম বাহিরের গান নাচ বেশি।কেন? কারণ আমাদের বাচ্চাদের সৃজনশীলতা আমরা গড়েই তুলছিনা নতুন নতুন, ভালো ভালো গান, নাচ বা গল্প সৃষ্টি জন্য। বিয়ে বাড়িতে আনন্দের সাথে নাচার মত কটা বাংলা গান আছে? এবারের বইমেলায় ও দেখছি, troll করতে গিয়ে উদ্ভট কিছু বইয়ের free publicity হচ্ছে। তার ভিড়ে ভালো ভালো বইগুলো ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। আজ আমরা বৈদেশিক গান নিয়ে মেতে আছি, কারণ দেশের গান অত ভালো লাগে না। কাল যখন মৌলিক বইয়ের অভাব দেখা দিবে, তখন আমরা আমাদের সাহিত্যও হারিয়ে যাবে।
নিজেদের তো ধ্বংস করেই ফেলেছি, এবার নাহয় বাচ্চাগুলোর ব্যাপারে একটু সচেতন হই। এরাই তো বড় হয়ে পরিবারের ও দেশের হাল ধরবে! খোদা হেদায়াত দান করুক।
এই বইটা সব মানুষেরই পড়া উচিৎ। আমার পড়া best non fiction বই এটি। লেখকদের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ এই বইটা লিখার জন্য। কিছু বই perspective change করার ক্ষমতা রাখে। এই বইটি তার মধ্যে একটি। আর সময়োপযোগী ও।
জাপান, নেদারল্যান্ডস আর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্তা নিয়ে এই বই। তিনজন অভিভাবক যারা তাদের সন্তানদেরকে এই তিন ভিন্ন দেশের স্কুলে পাঠিয়েছেন, তারাই এই অংশগুলি লিখেছেন।
বইয়ের তিনটি অনুচ্ছেদের নাম এরকম - জাপানঃ প্রতিটি শিশুই এক-একটি ফুল, প্রতিটি ফুলই স্বতন্ত্র নেদারল্যান্ডসঃ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী শিশুদের শিক্ষা বাংলাদেশঃ পাথরে লেখা আছে অধঃপতন
জাপান আর নেদারল্যান্ডস উন্নত দেশ। তাদের এই উন্নতির মূল শক্তি অবশ্যই তাদের নিজস্ব জনগণ। তাদের সেই শিশুকাল থেকেই যোগ্য হিসাবে গড়ে তোলা হয়। উন্নত দেশ হলেও তাদের এই দুই দেশের শিক্ষা ব্যবস্তাও ভিন্ন ধরনের।
জাপান এর শিশুরা সব সময় প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বড় হয়ে উঠে। এই পৃথিবীতে তারা যেন নিজেকে কিভাবে ছাড়িয়ে যাবে, সেই প্রতিযোগিতাই করে। ২ বছরের শিশু নিজে কষ্ট করে সাইকেলের সিটে উঠার চেষ্টা করে, তাও তার মা তাকে কোলে তুলে উঠিয়ে দিবে না। কেননা - " এতে ওর আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাবে। আর সবসময় ভাববে ওকে কেউ না কেউ করে দিবে। এতে করে ও নিজের কাজ নিজে করার কোন গরজ অনুভব করবে না।" ভালো কলেজে পড়ানোর জন্য বেশ প্রতিযোগিতা পূর্ণ পরীক্ষা, কোচিং, এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
অন্যদিকে ডাচরা তাদের শিশুদের কে বড় করে জীবনকে উপভোগ করে। তাদের প্রাথমিক শিক্ষার একটা বড় অংশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লাইফ লেসন শেখা - জুতার ফিতা বাঁধা, সাতার শেখা, সাইকেল চালানো ইত্যাদি। আরও বড় হলে নাচ, গান, অভিনয় এর মধ্য থেকে কোন বিষয় অবশ্যই নিতে হয়। খুব ছোট বেলার রিপোর্ট কার্ডে থাকে - মানসিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন আর পড়াশোনা এই তিন বিভাগ। শিক্ষা ব্যবস্তা শুধু পড়ালেখার জন্যই নয়, শিশুকে প্রকৃতই নিজের জীবন নিয়ে যোগ্য করে গড়ে তুলবে। " পারছো না, জায়গা ছেড়ে দাও। যেটা পারো সেটা করো। তুমিও স্বাভাবিক থাকো, অন্যও সুযোগ পাক। হতাশা দিয়ে বিস্বাদ দিয়ে জীবন গড় না। পড়াশোনায় হচ্ছে না, টেকনিক্যাল লাইনে দেখো, কিংবা আরো অন্য কিছু। এত বড় জীবনটাকে, বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ করে দিও না।"
আর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্তা নিয়ে কীইবা বলার আছে। ক্লাস, পরীক্ষা, অযোগ্যতা, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, কোচিং- প্রাইভেট, প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষায় রাজনীতি - দুর্নীতি, নিত্য নতুন সিলেবাস-বই-কারিকুলাম পরিবর্তন করে আমরা সামনে যে কিইবা পেতে পারি জানি না।
বাংলাদেশ অংশে আছে, ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুলের কথা। একটা স্কুল চালানোর জন্য অনন্ত একটা কমিটি লাগে, সেই কমিটি যখন রাজনীতি আর দুর্নীতিতে ভরে যায়, তখন সেখান থেকে কিইবা আশা করতে পারি। পাতার পর পাতা পড়ে শুধু কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কিইবা করার আছে। ১০০ বছরের পুরনো স্কুলে বেশ কয়েকটা শিলালিপি বা নামফলক আছে, তার মধ্যে আছে - রমেশচন্দ্র মজুমদার এর উদ্বোধন করা লাইব্রেরি, স্বাধীনতার পর তৎকালীন মন্ত্রী এমপির করা ভবন। শেষে আছে, নবনির্মিত প্রধান ফটকের নামফলক। এটাতে আবার খোদাই করা নামগুলো বিরোধী পক্ষ নষ্ট করে রেখে গেছে। এই গেট আবার বানানো হয়েছে স্কুলের নিজস্ব ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙ্গে। দায়িত্বে কিংবা ঠিকাদার হিসাবে ছিলেন স্কুল কমিটির একজন।
আমাদের দেশটাও কি সেই দিকেই যাচ্ছে নিজের টাকা গুলি শেষ করে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণে? জানি না । হয়তো বিরোধী পক্ষ এসে শুধু নাম পরিবর্তন করতে পারবে, কিন্তু যা ছিল ততদিনে তাও হয়তো শেষ হয়ে যাবে।
বন্ধু নাজমুল হাসান ফেরদৌস নিমন্ত্রনে এলেন ছয়খানা পরাটা আর একখানা বই নিয়ে!আমার মনে হয় মানুষজনের এই ট্রেন্ড ফলো করা উচিত যেমন আমাদেরও ফলো করা উচিত আরো অনেক কিছু। ফলো?নাকি ইম্প্রোভাইজ?বইটা পড়া শুরু করেছি রাত দশটার কিছু পরেই,শেষ করলাম ভোর পাচটা একান্নতে!মাঝখানে তাওহীদ(পড়ুনঃএকজন অমানবিক মহামানব) এর সাথে নানাবিধ কথাবার্তা,কথাবার্তায় রচা ফিকশন!
জাপান,নেদারল্যান্ডস এর শিক্ষাব্যবস্থাও আমার কাছে যেমন ফিকশনের মতো মনে হয়েছে।আর দেশীয় বাস্তবতা? শেষে রাখাল রাহার লেখায় উঠে এসেছে,একবিন্দুও যে মিথ্যা না তা আমি আমার কলেজিয়েট স্কুলে পড়ুয়া ছাত্তরকে দেখেই বুঝতে পারি।রাখাল রাহার কথাবার্তা সরাসরি শুনেছিলাম এইতো মাত্র কিছুদিন আগেই!এভাবে আবারো কথা শুনলাম... নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে তারা কথাবার্তা বলছেন,পরিবর্তন দরকার! হ্যাঁ, সেটা ভালোর দিকেই হোক!
তবে যেহেতু আমি exist করি না।সেহেতু এইসবে আমার কিছু যায় আসেনা!
জাপান, নেদারল্যান্ডস আর বাংলাদেশে শিশুদের শৈশব কিভাবে কাটে তার একটা তুলনামূলক আলোচনা । জাপান আর নেদারল্যান্ডসের দিনগুলোর যতটা না মুগ্ধ হয়ে পড়লাম, ততটাই বিষণ্ণ লাগল বাংলাদেশের দিনলিপি পড়ে ।
জাপান - প্রতিটি শিশুই এক-একটি ফুল, প্রতিটি ফুলই স্বতন্ত্র
মালী যেভাবে বাগানের ফুলের যত্ন নেয় ঠিক তেমন করেই যেন পুরা একটা জাতি তাদের শিশুদের যত্ন নেয় । স্কুলগুলোর সময়, স্থান, কারিকুলাম সবকিছুই অভিভাবক আর শিশুদের আগ্রহ, আর্থিক অবস্থা, বাসস্থান এগুলো অনুসারে আলাদা করা । শিশুদের মাঝে প্রথম দ্বিতীয় হওয়ার প্রতিযোগিতার চাইতে একসাথে কাজ করার মানসিকতা তৈরির পিছনে জোর বেশি । কিছুটা বর্ণবাদীতা বা রক্ষণশীলতার উপস্থিতিও দেখা যায় তাদের সমাজে । তবে সেটা তাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবে নিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া যায় ।
নেদারল্যান্ডস - পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী শিশুদের শিক্ষা
নেদারল্যান্ডসের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমাগত বিবর্তনের মাঝ দিয়ে গিয়েছে বা যাচ্ছে । তাদের পড়ার মুল উদ্দেশ্যই হচ্ছে শিক্ষার্থী যেন নিজের পথ নিজেই খুঁজে পায় । পুরা ডাচ জাতিটাই পরিবেশবান্ধব । শিশুদের মাঝেও একেবারে শুরু থেকেই এই চর্চাটা গড়ে তোলার চেষ্টা আছে । বেশ ইতিহাস সচেতন তাদের কারিকুলাম । জাপানিজদের তুলনায় তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আচার-আচরণের গুরুত্ব কম ।
বাংলাদেশ - পাথরে লেখা আছে অধঃপতন
প্রথম দুই দেশের গল্প পড়ার পর আমি বিরতি নিয়েছিলাম । সুখানুভূতিটুকু যেন না চলে যায় সেজন্য । ঠিকই বইয়ের এই অংশে এসে মন বিস্বাদে ভরে যায় । রাজনীতির কুপ্রভাব থেকে এই দেশের শিশুরাও মুক্ত না । এই অংশ নিয়ে বেশি কিছু লিখতে মন চাচ্ছে না । তবে বিভিন্ন ঘটনা প্রেক্ষিতে এই অংশের লেখকের চেষ্টার প্রশংসা করা যায় ।
শিক্ষা নিয়ে ভাবেন, শিক্ষানুরাগী, স্কুলকলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য ভালো একটা টোটকা হতে পারে এই বই ।