লেখক-সাংবাদিক জামিল আহমেদ শেভ করতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় আয়নায় নিজের ছবিটা ঝাপসা। কয়েক ঘণ্টা পরে সে দেখে, আয়নায় তার কোনো ছবিই আর ফুটছে না। তারপর ছাপার অক্ষরে নিজের নাম, অ্যালবামে নিজের ছবি—কিছুই সে দেখতে পায় না। এক সকালে ঘুম ভাঙলে জামিল দেখতে পায়, সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না। অভিজ্ঞতাপূর্ব এক অদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় চল্লিশ বছর বয়সী চাকরিজীবী সাংবাদিক ও স্বপ্নজীবী গল্পলেখক জামিল আহমেদের জীবনে, যাকে প্রতিদিন ঘড়ি ধরে কাজে যেতে হয়, বাজার করতে হয়, ছোট ছোট দুই সন্তানকে সময় দিতে হয়, স্ত্রীর সঙ্গে ঘুমাতে হয়। আর দশজনের মতো তাকেও মুখোমুখি হতে হয় বাংলাদেশের সমসাময়িক বাস্তবতার, কিন্তু সেই বাস্তবতাকে দুঃস্বপ্ন থেকে পৃথক করতে পারে না সে। যেভাবে নাই হয়ে গেলাম বিভীষিকাময় বাস্তবতা ও ব্যক্তিমনের ওপর তার তীব্র ও গভীর অভিঘাতের এক অতিবাস্তব আখ্যান।
Mashiul Alam was born in northern Bangladesh in 1966. He graduated in journalism from the Peoples’ Friendship University of Russia in Moscow in 1993. He works at Prothom Alo, the leading Bengali daily in Bangladesh. He is the author of a dozen books including Second Night with Tanushree (a novel), Ghora Masud (a novella), Mangsher Karbar (The Meat Market, short stories), and Pakistan (short stories).
একজন সাধারণ সাংবাদিকের বিজার ওয়ার্ল্ডের স্টোরি। বিয়ে কিংবা সংসারজীবনে অনাগ্রহী ব্যক্তিগণ বইটি চাইলে এড়িয়ে যেতে পারেন। কেননা, যে মায়ার সাথে মশিউল আলম পরিবারের খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন তাতে ইমোশনাল হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। মশিউল আলম লেখক হিসাবে চমৎকার। "দ্বিতীয় খুনের কাহিনী" বইটি দিয়ে লেখকের সাথে ডেব্যু হয়। পরবর্তী বই হিসেবে বইটা পড়ে আমি যারপনাই মুগ্ধ। উনার সর্বপরি ভক্তসংখ্যা এখন গণনা করলে একজন বেশি পাওয়া যাবে। নতুন ভক্তটা আমি। উনার বাকি সবগুলো পড়ার ইচ্ছে জাগ্রত হলো।
সমাজে অনেক সেক্টরেই একটা অটোক্রেসি চলে আসছে। ইয়ুংকার উচ্চারণের মতন সাধারণ জিনিস নিয়ে যেভাবে তুলে ধরছেন- ভাল লাগছে। এ উপাখ্যান এক আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা সাংবাদিকের কথা যে কিনা নিজেকে আয়নায় দেখে না কিংবা নিজের অস্তিত্ব আর খুঁজে পায় না। সমাজে এ ধরণের মনস্তত্ত্ব এর মানুষ বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। জামিল সাহেবের কন্যার মতন মানুষ প্রয়োজন এদের। তাহলে হয়ত অস্তিত্বহীনতা অনুভবের দুঃখ কিছুটা কমবে।
হারুন ভাই নিজ দায়িত্বে বইটা কিনে আমাকে পড়তে দিছেন। উনারে অনেক বেশি ধন্যবাদ। গুডরিডসে মেনশন সিস্টেম নাই। তাও আশা করি ধন্যবাদখানা উনি দেখবেন।
বইটা শেষ করেছি প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেল। এখনও মাথা হ্যাং হয়ে আছে আমার। আর এই বইয়ের রেশ যে আরো অনেকদিন পর্যন্ত থেকে যাবে, সেটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি। ১১২ পৃষ্ঠার বই, ভেবেছিলাম তাড়াহুড়োর দরকার কি! ধীরেসুস্থে পড়ি, বাকিটা কাল পড়া যাবে। কিন্তু না, লেখক সাহেব তার লেখার জালে এমনভাবে আটকে দিলেন যে একবসায় পুরোটা শেষ না করে বই ছেড়ে ওঠা একটু মুশকিলই হয়ে গেল। এত ইউনিক কনসেপ্টের লেখা এর আগে পড়েছি বলে মনে পড়ছে না। পরিশেষে বলতে চাই, 'যেভাবে নাই হয়ে গেলাম' বিভীষিকাময় বাস্তবতা ও ব্যক্তিমনের ওপর তার তীব্র ও গভীর অভিঘাতের এক অতিবাস্তব আখ্যান, যা মশিউল আলমের জাদুময় লেখনীতে হয়ে উঠেছে অনবদ্য।
৩.৫/৫ হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার চেহারা আয়নায় দেখতে পাচ্ছেন না। আইডি কার্ডে আপনার নাম, ছবি দেখা যাচ্ছেনা কিন্তু বাকিসব তথ্য ঠিকঠাক আছে৷ অবশ্য আশেপাশে সবার কাছেই আপনি দৃশ্যমান, স্বাভাবিক। শুধু আপনার কাছেই আপনি নাই হয়ে গেলেন!
এতোটুকু পড়ে বুঝতেই পারছেন এই গল্প অস্তিত্ব সংকট নিয়ে। যে সংকটে প্রত্যেক প্রানীই দিশেহারা হয়ে পড়ে৷ তাই গোটা গল্প জুড়েই মূল চরিত্রকে আমরা খোঁজে পাই বিচলিত, বিভ্রান্ত অবস্থায়। প্লট নিঃসন্দেহে দারুণ তবে ঘটনা বিস্তৃতিতে আরো চমকারিত্বের জায়গা সম্ভবত ছিলো৷
মূল ঘটনা থেকে সরে গিয়ে বেশকিছু ব্যাপার নজরে পড়লো যাতে করে গল্পটাকে এই দশকের আখ্যান বলা যায়৷ যেমন ইন্টারনেট ঘেটে ডাক্তারি জ্ঞান ফলানো, অটোক্রেসি, গনতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবাধ ব্যবহার নিয়ে প্রচলিত তর্ক, নিরাবেগ ভঙ্গিতে স্পর্শকাতর কলাম লিখে ফেলা। অবশ্য সন্তানবাৎসল্য এর অংশটুকু গল্পের সবচেয়ে আলাদা এবং মায়াময়তা নিয়ে লিখা। মশিউলভ আলমভস্কি যেভাবে শুরু করেছিলেন পুরোটা একই ধারায় বর্ণনা করতে পারলে বাংলা সাহিত্যের বিশেষ সংযোজন হতে পারত বইটা।
মাঝে ইয়াঙ্কার নিয়ে একটু বেশি পেচিয়ে ফেলা ছাড়া পুরোটা বেশ লেগেছে। ধন্যবাদ হারুন ভাইকে বইটা সাজেস্ট করার জন্য। যদিও বই সাজেস্ট করার ১১ মাস পর পড়লাম।
আমি মশিউল আলমের ছোটগল্পের অনুরাগী। অবশ্য ওনার 'ঘোড়ামাসুদ' উপন্যাসটা আমার ভালো লেগেছে। 'যেভাবে নাই হয়ে গেলাম' নামের এই নভেলাটাও বেশ ভালো লেগেছে। মশিউল আলমের লেখা appreciate করতে হলে ওনার উদ্ভট ফিকশানকে মেনে নিয়েই করতে হয়। এখানেও তার কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। সরলরৈখিক লেখা পড়তে চাইলে মশিউল আলমকে আপনার ভালো লাগবে না। বাঙালি পাঠক অনেকক্ষেত্রেই সেন্টিমেন্টে জবজবে লেখা প'ড়তে পছন্দ করে, this wlil not prove to be their 'kettle of fish'.
অত্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতিকে তিনি একটা পরাবাস্তব রূপ দিয়ে উপস্থাপন করেছেন এই ছোট্ট উপন্যাসে। 'জ্বর ও গোঙানির গল্প' নামে ওনার একটা ছোটগল্প আছে, সেটাকেই expand ক'রে এই উপন্যাসের জন্ম। গত দুই দশকে শত উন্নয়নের মাঝেও দেশের প্রকৃত আর্থসামাজিক তথা রাজনৈনিক অবস্থার অবক্ষয়, বিবেকের মৃত্যু, লুটেপুটে খাওয়ার মন:বৃত্তি, একটা দলের ক্ষমতার দম্ভ, সমাজের এলিট শ্রেণির দাপটে মানুষের ক্ষোভ, নপুংসতা, সব উঠে এসেছে এক বিবেকবান মানুষের ইহজাগতিক শারীরিক বিস্মৃতিতে। লেখকের বাম ঘরানার চিন্তা এখানে উঠে এসেছে, তাকে কট্টর মৌলবাদি বা পুঁজিবাদিরা rant বলে উড়িয়ে দিতে পারেন কিন্তু তার রূপকের মাঝে যথেষ্ট জোর আছে বলে আমি মনে করি। 'নাই হয়ে যাওয়া' যেন মনুষ্যত্বের মৃত্যুরই ইঙ্গিত দেয়। এর বেশি বললে তা spoiler হয়ে যাবে, তাই এখানেই ইতি টানি। বইটা প'ড়লে সময় নষ্ট হবে না, এটুকু বলাই যায়।
Jean-Claude Juncker -এর নামের উচ্চারণ নিয়ে তিনি অটোক্রেসির যে রূপক সৃষ্টি করেছেন তা অনবদ্য।