নিরেট বাস্তবতার এই সব গল্পে নানা অসম্ভব ঘটনাও ঘটে; ফলে বাস্তবতার চেনা রূপের ভেতর থেকেই মূর্ত হয়ে ওঠে সম্ভবপর বাস্তবতার আরও অনেক রূপ; যাপিত অভিজ্ঞতার জগৎ পেরিয়ে যাত্রা ঘটে জিজ্ঞাসা ও উপলব্ধির জগতে।
Mashiul Alam was born in northern Bangladesh in 1966. He graduated in journalism from the Peoples’ Friendship University of Russia in Moscow in 1993. He works at Prothom Alo, the leading Bengali daily in Bangladesh. He is the author of a dozen books including Second Night with Tanushree (a novel), Ghora Masud (a novella), Mangsher Karbar (The Meat Market, short stories), and Pakistan (short stories).
গল্পকার তার প্রজ্ঞা নিয়ে গল্পের শেষে হাজির হন নি অথবা হাজির হতে চান নি। পাঠকের মনে হবে, উপযুক্ত উপসংহারের মুহূর্ত ঠিক এটা নয় অথবা আরেকটু আয়োজন লেখক করতেই পারতেন। স্পষ্টতই মশিউল আলমের তেমন ইচ্ছা ছিলো না। তিনি শুধু নির্বিকারভাবে গল্পটা বলে, কোনো সমাধান প্রত্যাশা না কোরে, স্রেফ থেমে গেছেন। গণজাগরণ মঞ্চ, ব্লগার হত্যা, সাঈদিকে চাঁদে দেখার গুজব, মুক্তিযুদ্ধ, সোভিয়েত রাশিয়ার পতন, সন্তানের সাথে দাদার বদলে যাওয়া, সন্তান নেওয়ার জন্য বেপরোয়া নারী - সব গল্প বা ঘটনাতেই প্রবল একটা বিপন্নতা আছে, অসহায়ত্ব আছে। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক, অন্তরঙ্গে ও বহিরঙ্গে ভাঙন আছে, ধ্বংস আছে। আর এসব ভাঙনগুলো আমাদের নিজেদের বলে চিনতে একটুও ভুল হবে না পাঠকের।
২০১৩ সাল, গণজাগরণ মঞ্চ। "ব্লগার" গল্পটা এই প্রেক্ষাপটে রচিত। আমার চোখে বইয়ের সবচেয়ে চমৎকার গল্পও এটাই। তাই নামকরণেই পাওয়া যাচ্ছে একে৷ মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারের বিচারের দাবির গল্প দিয়ে শুরু হওয়া বইয়ের ঠিক পরের গল্পটাই অবাক করা। একজন রাজাকারের পজেটিভ রোল। পরস্পর একেবারেই বিপরীত প্রেক্ষাপট কিছুটা কৌতুহল জাগানিয়া৷ এরকম ব্যাপারটা একটু পর আবার মিলে যায়। "ফাতেমা ও তার ছেলে" গল্পে তীব্র মাতৃস্নেহ অন্যদিকে এরপরের "নাবিলা" গল্পে সন্তান লাভের জন্য অসহায় হাহাকার। একটু বলে রাখি "নাবিলা" গল্পে শুন্যতার যে উপাদান দিয়ে যেভাবে সাজিয়েছেন তার ফলে এই গল্পটা বইয়ের আমার দ্বিতীয় পছন্দের। অবশ্য শুন্যতার খোজ "মায়া" গল্পতেও পাওয়া যায়। একই অনুভূতির ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ। "কবি" গল্পটাতে দুটো আলাদা ঘটনার দেখা মেলে। উভয় ঘটনাই মৃত্যুশয্যায় উপস্থিত কথকের দাদাকে নিয়ে বলা। এটাও বেশ লাগলো। বইতে মোট গল্প আছে দশটা, এদের মাঝে আছে যথেষ্ট বৈচিত্র্য।
মশিউল আলমের গদ্য বরাবরই উপাদেয়। ব্যতিক্রম নয় এ গ্রন্থটিও। তাই গল্পগুলো পড়তে ভালো লেগেছে। তবে মনে রাখার মতো কোনো গল্প পেলাম না। কিছু গল্পে তো মনে হলো নিজের আগের লেখা গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন লেখক। এর আগে পড়া তাঁর ‘মাংসের কারবার’ এবং ‘পাকিস্তান’ গল্পগ্রন্থের তুলনায় ‘ব্লগার ও অন্যান্য গল্প’ অ্যাভারেজ একটি গল্পগ্রন্থ।
মশিউল আলম আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন লেখক। এ পর্যন্ত তার যে কয়টা বই পড়েছি, সব গুলোই ভালো লেগেছে। 'ব্লগার ও অন্যান্য গল্প' সেই ভালোলাগা বইয়ের লিস্টে সবার শেষে আসবে। মানে অন্যান্য বইয়ের সাথে তুলনা করলে, এটা খুব একটা ভালো লাগেনি। মশিউল আলমের যে গল্প বলার ধরণ, গল্পের গঠন আর কাহিনির বিস্তৃতি সেটা এই বইতে অনেকটা অদৃশ্য। দশটা গল্প আছে এই বইতে, যার সব গল্প বিভিন্ন সময়ে লেখা। পরে একত্রিত করে প্রকাশ করছে। দশটা গল্পের ভেতর পাঁচটা গল্প পছন্দ হইছে। 'বিহারি বাবুলাল' গল্পে পরিচিত মশিউল আলমের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের গল্প, 'এটা নাবিলা' গল্প মনে করিয়ে দেয় তার ডিস্টোপিয়ান বই প্রিসিলার কথা। উত্তরাধিকার, মায়া আর কবি গল্পটাও ভালো। আর 'পানপর্ব: ১৯৯১' মনে করিয়ে দেয় তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত উপন্যাসের কথা।
কয়েকটি গল্প ভালো, প্লট - চেনা, গদ্য - সাবলীল। মশিউল আলমকে পড়া আনন্দায়কও। কিন্তু জরুরি কোনো গল্পগ্রন্থ মনে হলো না, যেরকম 'পাকিস্তান' আছে। রুশ সাহিত্যের সাথে যোগাযোগের হেতু মশিউল আলমকে চেনা। ঘোড়ামাসুদ, পছন্দের বই। আরও কিছু উপন্যাস ও গল্প পড়ে দেখতে হবে তার।
প্রথম গল্পটা বেশ। এরপর সবচেয়ে ভাল গল্পটা হচ্ছে "নাবিলা" । কিন্তু বেশিরভাগ গল্পই পূর্ণতা পায় নি। মশিউল আলম সাহেব এখানে একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা দিছেন বলে মনে হয় না। নইলে গল্পগুলা পরিপূর্ণ এক রূপ পাইত।
মশিউল আলমের লেখায় যে ভিন্নতা আছে তা বেশ আগেই লক্ষ ক'রেছি, বিশেষত ওঁনার ছোটগল্পগুলোতে। সেগুলো আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। উনি যেমন বাস্তব, অতিবাস্তব বা পরাবাস্তব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, কিছুটা জাদুবাস্তবতারও ব্যবহার ক'রেছেন। 'ব্লগার ও অন্যান্য গল্প' সংকলনে দশটি ছোটগল্প স্থান পেয়েছে। গল্পগুলো দেশের সমাজচিত্র, রাজনীতি, দারিদ্র্য, জনসংখ্যার চাপ, পরিবেশদূষণ ইত্যাদি বিষয় ছাড়াও 'বিহারি বাবুলাল' গল্পে একাত্তর সনের একটা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরেছেন। 'পানপর্বঃ১৯৯১' ওনার মস্কোর ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ বলা যেতে পারে, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন মানুষের মোহ কেটে যাওয়ার বর্ণনা, গল্পটাকে অনেকটা তাঁর উপন্যাস 'তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত' উপন্যাসের খসড়া বা precursor মনে হয়েছে। এ গল্পে তিনি সমাজতন্ত্র নিয়ে স্বপ্নভঙ্গের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন যে, মানুষ তার স্বার্থের আগে কিছুই বোঝে না, 'আমাদের' থেকে 'আমার' তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আকাংক্ষিত। সমাজতন্ত্রের পতনের জন্য আমার ব্যক্তিগত মতটা লেখকের সাথে মিলে গেছে।
'মানুষ শুধু খেতে জানে, পান করতে জানে, ঢেকুর তুলতে জানে।'
সংকলনের গল্পগুলো হতাশ তো করেইনি বরং বেশ ভালো লেগেছে। যদিও ওনার 'মাংসের কারবার' ও 'আবেদালির মৃত্যুর পর' সংকলন দু'টোর সমান উচ্চতায় যেতে পারেনি, তাই রেটিং থেকে একটা তারা কেটে নিয়েছি।