বেসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছদ্মবেশে সেনাশাসন, শান্তিরক্ষা মিশন বন্ধের চিঠি ও সেনাপ্রধান পদে 'নোয়াখালী কানেকশন' - সবকিছু মিলেই মহিউদ্দিন আহমদের প্রায় ছয় শ পাতার বই ' এক-এগারো: বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮'।
জ্যােষ্ঠতা লঙ্ঘন করে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও জুনিয়রকে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান বানানোর শুভারম্ভ জিয়াকে ডিঙিয়ে শফিউল্লাহকে চিফ অফ স্টাফ ঘোষণার মাধ্যমে। এই লঙ্ঘনকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসকে বদলে দেয়। আরও একটি রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ সুখকর ফল বয়ে আনেনি। যার মাসুল এখন সারা বাংলাদেশকে রক্ত দিয়ে শোধ করতে হচ্ছে।
হাসান মশহুদ চৌধুরীর পর সেনাপ্রধান হওয়ার কথা লে.জে. (অব.) এ টি এম জহিরুল আলমের। কিন্তু তাকে সেনাপ্রধান করা হয়নি। সেনাবাহিনীর পদ-পদবি বন্টনে বড়ো ভূমিকা রাখতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোটো ভাই সাবেক মেজর সাঈদ এস্কান্দার। তিনি মইন ইউ আহমেদের নাম সুপারিশ করেন। দুইটি বিশেষ যোগ্যতায় জহিরুল হককে পেছনে ফেলে সেনাপ্রধান হন মইন।
এক. তিনি সাঈদ এস্কান্দারের ভায়রা অর্থাৎ পিএম বেগম জিয়ার আত্মীয় এবং
দুই. জেনারেল মইনও বৃহত্তর নোয়াখালীর সন্তান।
সেনাবাহিনীতে মইনের চাইতে বিশ্বস্ত বেগম জিয়ার কেউ ছিল না। এই মইন কখনো বিএনপি ও বেগম জিয়ার সাথে প্রতারণা করতে পারে তা তিনি হিসাবে আনেননি।
'নোয়াখালী কানেকশন' ব্যবহার করে আরও একজন সেনাবাহিনীতে প্রবল প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন। তিনি হলেন লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি সেনাবাহিনীর নন। মূলত, রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া একমাত্র কর্মকর্তা মাসুদ, যিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেলের মতো বড়ো পদে এবং সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন। এই ডিভিশনকে ঢাকার সদর দপ্তরের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হিসেবে অলিখিতভাবে বিবেচনা করা হয়৷ লে. জে. মাসুদ দুইটি কারণে রক্ষীবাহিনী নিয়ে বিএনপির এত অভিযোগ, ক্ষোভ ও অবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি পেয়ে ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন।
এক. তিনি বেগম জিয়ার ভাই সাঈদ ইস্কান্দার অত্যন্ত অনুগত ও ঘনিষ্ঠ এবং
দুই. তার জন্মস্থান ফেনীতে। যা বেগম জিয়ার নির্বাচনি এলাকা
জেনারেল মইন ও লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী - এই দুইজন ব্যক্তি এদেশে ২০০৭ সালে পরোক্ষ সেনাশাসন ও পরবর্তী নির্বাচনে একটি দলকে জয়ী করতে এক ধরনের ভূমিকা রাখেন। মহিউদ্দিন আহমদ সরাসরি এই কথা লিখতে পারেননি। কিন্তু যা বলেছেন তার মানে এটাই দাঁড়ায়। অথচ এই দুজনকে এক ধরনের স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল এবং তারাই সময়মতো তাদের পদোন্নতিদাতার সঙ্গে বেইমানি করে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন নিয়ে এত ভয়-ভীতির সূচনা ২০০৭ সালে। একটি চিঠির মাধ্যমে। তখন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ছিলেন রেনাটা লক। সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ দাবি করেন, রেনাটা লক একটি জরুরি চিঠি সেনাপ্রধানকে পাঠান। সেই চিঠিতে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত রুখতে ব্যর্থ হলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশকে আর অংশগ্রহণ করতে দেবে না - এমন হুমকি ছিল।
এই ভয়াবহ সংবাদ পেয়ে অস্থির সেনাপ্রধান, নৌপ্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান, পুলিশ, বিজিবি, Rab ও সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেলদের নিয়ে একটি জরুরি সভা আহ্বান করেন। এই সভায় আবেগভরা কণ্ঠে সেনাপ্রধান মইন বলেন,
আমরা যদি এখন হস্তক্ষেপ না করি তাহলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের বাহিনীগুলো সুযোগ হারাবে। তিনি যুক্তি দেন, আজীবন চাকরি করে যা পাই তার চাইতে অনেক বেশি পাই শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়ে। যদি আমাদের মিশনে যাওয়া বন্ধ হয় তাহলে বাহিনীগুলোতে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে৷ দেশের বাইরে সুনাম নষ্ট হতে পারে। তাই আমাদের উচিত হস্তক্ষেপ করা।
প্রমাণ হিসেবে রেনাটা লকের চিঠি নিয়ে আসেন সেনাপ্রধান। যদিও সেই চিঠি সভায় উপস্থিত কেউ খুলে দেখেননি। এই চিঠির পর মোটামুটি সবাই ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে জোর করে সরিয়ে দিতে সম্মত হয়। বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তাদেরকে সব ধরনের সমর্থন দেন স্বয়ং 'নোয়াখালী কানেকশন'-এর মাধ্যমে পদোন্নতিপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ও নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
বিএনপির অদূরদর্শিতা, ইয়াজউদ্দিনকে 'ইয়েসউদ্দিনে' পরিণত করা - তাদেরকে ক্ষমতার গদি থেকে দূরে ছিটকে ফেলে। তাদের 'মাই ম্যান' সেনাপ্রধান মইন পরোক্ষভাবে ক্ষমতা দখলের পর দলটির মনোবল ভেঙে পড়ে। ইউনূস সাহেব হঠাৎ রাজনীতি নিয়ে সরব হলেন। বিবৃতি দিতে থাকলেন। দল গঠনের প্রস্তুতির কথা জানালেন এবং অনেকটাই যেন তা সেনাবাহিনীর আরশতলে। তাকেই পহেলা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হওয়ার আমন্ত্রণ জানায় সেনাবাহিনী। তখনকার ডিজিএফআইয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার আমিন ঘন্টার পর ঘন্টা ইউনূস সাহেবকে 'ম্যানেজ' করার চেষ্টা করেন। কিন্তু 'সময় কম' পাবেন - এই ভেবে তিনি রাজি হয়নি। অবশ্য দুই বছর ক্ষমতা থাকা যাবে তা তখন সেনাবাহিনী জানতো না। এরশাদের মতো 'হোমওয়ার্ক' করে তারা গদি দখল করেনি। তাই ফখরুদ্দীনকে প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং তিনি খুশিমনে রাজি হয়ে যান।
ইয়াজউদ্দিনের নিস্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ সেনা-নির্দেশিত নতুন সরকারের সাথে এক ধরনের ভাব-ভালোবাসার নিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু বিএনপি গোস্বা করে বসে থাকে৷ তারা ফখরুদ্দীনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সাথে শীতল লড়াইয়ে নামে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ৩৩ টি আসন পেয়ে ধ্বংসের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েই থামে।
মইন ইউ আহমেদসহ সেনাবাহিনীর বড়ো কর্তারা বিএনপি নিয়ে স্বস্তিতে ছিলেন না। তারা মনে করতেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে এলে ওয়ান-ইলেভেনের জন্য বেগম জিয়া তাদেরকে দেখে নেবেন। সেই বিবেচনায় আওয়ামী লীগ তাদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় ছিল। যদিও দুইটি দলের প্রধানকেই তারা সরিয়ে দিতে চেয়েছেন। দলগুলোর নেতাকর্মীদের গণহারে মামলা ও বড়ো নেতাদের মারধর করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি। সেই সব স্বীকারোক্তি এখনো ইউটিউবে পাওয়া যাবে। উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া একটি তারবার্তার উদ্ধৃতি দিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমদ ইউএসে যান একটি সফরে। সেখানে তার সাথে শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি দীর্ঘ সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন, গওহর রিজভী। এই রিজভী সাহেব ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার পদ অলঙ্কৃত করেন।
সেনাপ্রধানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আরও একটি 'মিসিং লিঙ্ক' পাই ভারতের প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনীতে। তিনি সেখানে স্পষ্ট লিখেছেন, সেনাপ্রধান মইন ভারতে যাওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণববাবুর সঙ্গে তার কথা হয়। তিনি দুই নেত্রীকে ছেড়ে দিতে বলেন এবং নিশ্চয়তা দেন, শেখ হাসিনা মইন ইউ আহমেদকে মাফ করে দেবেন।
শান্তিরক্ষা মিশন নিয়ে চিঠিটি ছিল ভুয়া। রেনাটা লক পরবর্তীতে দাবি করেন, ভয় দেখিয়ে এমন কোনো চিঠি কস্মিনকালেও তিনি দেননি এবং এই বিষয়ে কিছু জানেন না। অন্যদিকে, মহিউদ্দিন আহমদকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অনেক কিছুই বলেছেন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। তার কথা হলো, শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাদ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চিঠি রেনাটা লক পাঠিয়েছিলেন। তার কাছে চিঠির অনুলিপি আছে। যদিও তা মহিউদ্দিন আহমদকে তিনি দেখাননি।
এক-এগারো নিয়ে বইটির তথ্যের প্রধান উৎস সাক্ষাৎকার ও সেই সময়ে প্রকাশিত পত্রিকার সংবাদ। ডিজিএফআইয়ের বিগ্রেডিয়ার বারী, সেনাকর্মকর্তা জহিরুল আলম ইত্যাদি ব্যক্তির সাক্ষাৎকার থেকে অনেক কিছুই জানা গেছে। রাজনীতি কোন পরিস্থিতিতে গেলে সেনাশাসন ফরজ হয়ে ওঠে তা বুঝতেই বইটি পড়ি। পটভূমি বোঝা গেছে। সব সত্য ও তথ্য জানা যায়নি। লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সেনাবাহিনী-নির্দেশিত সরকারের অন্যতম ভিত ছিলেন। ফখরুদ্দীন, মইনউদ্দীন, বারীসহ এক-এগারোর অনেক কুশীলব দেশের বাইরে নিরাপদ জীবনযাপন করছেন। কিন্তু ব্যতিক্রম মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি ২০১৮ সাল থেকে টানা দুইবার জাপার মনোনয়নে ফেনী-৩ থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে আছেন। অর্থাৎ, ক্ষমতারসঙ্গী তিনি তখনো ছিলেন, এখনো আছেন। তার বয়ান ছাড়া এক-এগারো আধুরা। ফখরুদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকার দরকার ছিল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংস্কারপন্থি ও নেত্রীপন্থি সিনিয়র নেতাদের সাক্ষাৎকার থাকলে আরও কিছু জানতে পারতাম।
সামরিক আমলাদের পাশাপাশি সেই সময়ে উচ্চপদে থাকা বেসামরিক আমলাদের সাক্ষ্য থাকতে পারতো।
এক-এগারোর সময় মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। প্রথমা বইটির প্রকাশক। মহিউদ্দিন আহমদ কেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বয়ান জানতে চাননি তা আমাকে অবাক করেছে৷
'এক-এগারো' বইটি এখন পড়া প্রয়োজন। কোন পটভূমিতে দেশে সেনাশাসন আসে তা বোঝা জরুরি। কাদের কর্মকাণ্ড দেশ থেকে বেসামরিক সরকারকে নির্বাসিত করে তা-ও অনুধাবন করতে চাইলে বইটা পড়তে পারেন।
ছয় শ পাতার বইটিকে মহিউদ্দিন আহমদ চাইলেই সর্বোচ্চ চার শ পৃষ্ঠায় মলাটবন্দি করতে পারতেন। সাক্ষাৎকারগুলোর কিছু কথা একাধিকবার এসেছে ; পাতার পর পাতা ভরিয়েছেন পত্রিকার সংবাদ ও ছবি দিয়ে। নিজস্ব বিশ্লেষণের চাইতে কে, কী বললো - তা সংগ্রহ করে রাখতেই মহিউদ্দিন আহমদের ঝোঁক বেশি লক্ষ করেছি।
২০০৭ সালের সেনাশাসন নিয়ে ভালো বই নেই। মওদুদ আহমদের বইটা মন্দের ভালো৷ মহিউদ্দিন আহমদের এই ঢাউস কিতাব তবুও পড়তে পারেন৷