What do you think?


দুর্ভাবনা ও ভাবনা : রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে
রবীন্দ্রপ্রতিভার মূল্যায়ন নিয়ে নানা রকম মতবিরোধ আছে। একদল বাঙালি মনে করেন রবীন্দ্রনাথ বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই মতের প্রতিপক্ষ দল মনে করেন রবীন্দ্রনাথকে অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যেসব ধারণা বা অপধারণা প্রচলিত আছে, এই বইয়ে সেগুলো যাচাই ও সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথকে যেসব প্রশ্নে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেসব প্রশ্নের বেশির ভাগই অসার। অন্যদিকে যেসব প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথকে অতি উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সেসব প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের যেসব দুর্বলতা ছিল, সেগুলো চাপা দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক বিশ্লেষণে রবীন্দ্রনাথ একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন না, পরিপূর্ণ ব্যক্তি কেউই হন না। সবাই দোষে-গুণে মানুষ, রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম নন। এই বইয়ে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সাতটি ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, অন্যদিকে ছয়টি প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথের শুভানুধ্যায়ীরা রবীন্দ্রনাথের অবদানকে অতিরঞ্জন করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মুসলমানদের যেসব দুর্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কেও চারটি অধ্যায় রয়েছে এই বইয়ে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নতুন আলোকপাত পাঠককে আলোড়িত করবে।
333 pages, Hardcover
Published January 1, 2019
About the author
Akbar Ali Khan
17 books126 followersAkbar Ali Khan (Bengali: আকবর আলি খান) was a Bangladeshi economist and educationist who served as a bureaucrat until 2001. He was the SDO of Habiganj during the Bangladesh Liberation War, when he decided to join the war. Later he served as an official of the Mujibnagar Government. After the independence he joined back the civil serviceand reached to the highest post of Cabinet Secretary and also worked as a university teacher. His book Porarthoporotar Orthoniti (Economics of Other-minding) has been a popular book on economics à la Galbraith.
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 7 of 7 reviews
March 29, 2019
আকবর আলি খান শারীরিকভাবে সুস্থ নন। নিজে লিখতে পারেন না। ডিকটেশন দেন, আরেকজন লিখে দেয় তাঁকে। তবুও থামান নি লেখালেখি। অর্থনীতির সাথে তাঁর সম্পর্ক চাকরিসূত্রে। ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ ইতিহাস বিভাগের ছাত্র হিসেবে। সাহিত্য নিয়েও তিনি অনাগ্রহী নন। এটা বোঝা গেল জীবনানন্দকে নিয়ে 'চাবিকাঠির খোঁজে' শীর্ষক বইটি লেখার পর। এবার তিনি লিখলেন বিশ্বসাহিত্যের গৌরব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে। কেন লিখেলেন ৩ শ' ৩৩ পাতার ভারী বইটি-
' এই বইয়ের লক্ষ্য হলো রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও জীবন নিয়ে যেসব বাদানুবাদ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমার বক্তব্য তুলে ধরা। তবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন অগুনতি মনের মানুষ। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সব বিতর্ক এ বইয়ে আলোচিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যেসব বিতর্কে আমি ব্যক্তিগতভাবে আলোড়িত হয়েছি, পনেরোটি অধ্যায়ে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। '
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনা-প্রতিআলোচনা সাম্প্রতিক কালের নয়। বরং রবীন্দ্রপক্ষীয় চর্চা এবং রবীন্দ্র বিরোধিতার অতীত বেশ পুরাতন।
দিজেন্দ্রলাল রায়, রাজেন্দ্রপাল, চিত্তরঞ্জন দাশ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের কট্টর সমালোচক ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছেন! তাঁর লেখা কুম্ভিলকতার দোষের দুষ্ট! তিনি 'চুটকি' লেখেন! রবীন্দ্রনাথ শুদ্ধ ইংরেজি লিখতে অপারঙ্গম এমনও অভিযোগ তাঁকে জীবদ্দশায় সইতে হয়েছে।
মার্কসবাদীদেরও চোখের বালি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিনয় ঘোষ, সুশোভন সরকার তাঁদের কলম শাণ দিয়েছেন রবীন্দ্রবিরোধিতা করে। বাংলাদেশের বামপন্থীরাও তাঁকে বিশেষ আদরের চোখে দেখে এমনও নয়৷
আমাদের দেশের আহমদ ছফা, আহমদ শরীফ রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করেছেন। ছফা রবীন্দ্রনাথকে পুরোপুরি বর্জন করেন নি। তাঁকে নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি গ্রহণও করেছেন। তবে আহমদ শরীফ কঠোরভাবে বিরোধিতা করেছেন রবীন্দ্রনাথের। এই বিরোধিতার মাত্রা সীমাজ্ঞানও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। জামাতপন্থী বুদ্ধিজীবী এবনে গোলাম সামাদও তাকে নিয়ে নানা 'কু'কথা বলতে পছন্দ করেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকও ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে ছিলেন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও মানুষ রবি ঠাকুরের মধ্যে অনেকগুলো সত্তা লীন হয়েছিল। তাই নিয়ে উচ্ছ্বাসের যেমন কমতি নেই। তেমনি তাঁকে ঘিরে কাঁদা ছোড়াছুড়িও কম হয়নি। তারই মধ্যে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে আরও একটি কেতাব বাড়লো আকবর আলি খানের বইটির মাধ্যমে।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আগ্রহের প্রাচুর্যের কারণেই হোক আর নিজের মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাতিত্বের জন্যই হোক, আমি বলব আকবর আলি খান রবীন্দ্রজীবনের উজ্জ্বল অঞ্চলগুলোকে আরো আলোকিত করেছেন। তেমনি কবিগুরুর সীমাবদ্ধতা যেসব অঙ্গনে ছিল, সেসবকে খুবই হালকাভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিছুক্ষেত্রে আশ্রয় নিয়েছেন খোঁড়া যুক্তির। যেমন-
১. রবীন্দ্রনাথের বাংলায় শতকরা ৫৪ ভাগ ছিল বাঙালি মুসলমান। ঠাকুরদের জমিদারির সিংহভাগ প্রজা ধর্মে মুসলমান, জাতে বাঙালি আর পেশায় ছিল কৃষক। কিন্তু কবিগুরুর মাত্র ৭টি সাহিত্যকর্মে জায়গা পেয়েছে মুসলমানরা। বাঙালি মুসলমানদের উপস্থিতি বিচারে সংখ্যা আরো কম। এই কম হওয়ার সপক্ষে আকবর আলি খান রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীন চিন্তাধারাকে সামনে আনতে চেয়েছেন। তাহলে তো সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহিত্যকর্মের চরিত্রায়নে আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রভাব থাকার কথা। কিন্তু বইয়ে বর্ণিত সারণি ৫. ২ মতে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের নিয়ে এক গল্পগুচ্ছেই ৮৬টি গল্প! নিম্নবর্গের হিন্দুদের উপস্থিতও রবীন্দ্র রচনাবলীতে নেই!
২. প্রায় ১১ বছর জমিদারি দেখাশোনার ভার ছিল রবীন্দ্রনাথের ওপর। মার্কসবাদীরা জমিদার রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করে। আকবর আলি খান জমিদার রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলে দিলেন, ঠাকুদের গোষ্ঠী-জ্ঞাতি অনেক বড় ছিল। তাদের ভরণপোষণ চলতো জমিদারি থেকে প্রাপ্ত অর্থে। তাই চাইলেও জমিদারপ্রথার বিরুদ্ধে যেতে পারেন নি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু জমিদারপ্রথার কুফল নিয়ে কতটা সোচ্চার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ এর বিশেষ প্রমাণ তিনি দেন নি। দিতে পারেন নি। মার্কসবাদীদের সামন্তপ্রভু রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার মোক্ষম জবাব দেওয়া হয় নি আকবর আলি খানের। অথচ তিনি সামন্ত রবীন্দ্রনাথকে হালকাভাবে দেখাতে চেয়েছেন।
৩. কবিগুরুর প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক ফেল মারল। আকবর আলি খান লিখলেন, সেই ব্যাংক ফেল মারার আগে কবির ভ্রাতুষ্পুত্র বেশ বড় অংকের ঋণ নিয়েছিলেন। ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার বড় কারণ ভাতিজাকে দেওয়া ঋণ নাকী গরিব কৃষকপ্রজাকে দেওয়া ঋণ? এই প্রশ্নটির মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আকবর আলি খান তা পরিষ্কার করেন নি।
৪. কবি তাঁর তিন কন্যাকে বড় অংকের যৌতুক দিয়ে বাল্য বিবাহ দিলেন। ব্রাহ্ম বলে রবীন্দ্রনাথের কন্যারা সুপাত্র পাবে না - এমন ভীতি থেকে যৌতুক ও বাল্যবিবাহে ব্যক্তিগত সমর্থনের কাজটি করেছেন তিনি। এমনটাই দাবি আকবর আলি খানের। অথচ তিনিই লিখেছেন ঠাকুরবাড়ির কন্যাদের ২৫-৩০ বছর বয়সেও ভালো ঘরে বিয়ে হওয়ার নজির রয়েছে। যে কবি ব্যক্তিমানুষ হিসেবে পণপ্রথা ও বাল্যবিবাহের মতো কুপ্রথার সমর্থন যোগান তাঁকে নিয়ে যথাযথ বিশ্লেষণে ব্যর্থ হয়েছেন আকবর আলি খান। বরং এর প্রচ্ছন্ন সমর্থন লক্ষ করা গেছে লেখায়।
৫. সম্প্রতি শশী থারুরের 'An Era Of Darkness' নামে একটি বই পড়লাম। বইতে শশী থারুর প্রমাণ দিয়েছেন যে, ব্রিটিশশাসনে অবিভক্ত ভারতবর্ষের দুই পয়সার লাভও হয়নি। বরং যা ক্ষতি হয়েছে তা কোনোদিন সারাতে পারবে না উপমহাদেশ। অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁর চোখো ব্রিটিশশাসনের গুণ দেখতে পেয়েছেন। সেসব স্বীকার করতেও কুন্ঠিত হন নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ী থেকে শাসক বনে যাওয়ার প্রধান দায় তিনি ভারতবাসীকে দিয়েছেন। কারণ তারা বাঁধা দিতে পারে নি। অপরদিকে, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইংরেজদের এই উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন নিয়ে কবির কন্ঠস্বর তত সরব না। এক জালিওয়ানবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগকে মুখ্য করেছেন আকবর আলি খান। রবীন্দ্রনাথের লেখায়, ভাবাদর্শে সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে দ্রোহিতা নরমপন্থীদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
৬.আরো একটি বিষয় খারাপ লেগেছে। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ খন্ডন করতে আকবর আলি খান বারবার কাজী নজরুল ইসলামকে সামনে আনছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, নজরুল তো শুধু মুসলমানদের জন্যই লেখেন নি। তাঁর কলমে হিন্দু দেব-দেবীর কথাও বহুবার প্রাধান্য পেয়েছে। তাহলে তাঁকে মুসলমানরা নির্দ্বিধায় কেন গ্রহণ করেছে? নজরুল নিজ সম্প্রদায় মুসলমানদের জন্য কলম ধরেছেন। লিখেছেন বাংলায় গজল, হামদ, নাত এবং 'ফাতেহা ইয়াজদাহম'এর মতো কবিতা। হিন্দুদের দুর্গা, কালী, শ্যামাকে নিয়েও রচনা করেছেন গান, কবিতা। অর্থাৎ সাহিত্যিক নজরুল পাশাপাশি বসবাসরত দুই সম্প্রদায়কে ভিন্ন চোখে দেখেন নি। এ তো একজন লেখকের বিরাত্বেরই প্রমাণ দেয়। লেখায় 'হিন্দুয়ানীর' দায়ে কাঠমোল্লাদের কটূক্তি নজরুলকে বারবার জর্জরিত করেছে এই তথ্য কী আকবর আলি খানের অজানা?
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা না থাকাটা বইয়ের সীমাবদ্ধতা বলে মনে হয়েছে। কবির ছোট বৌঠান এবং কবির স্ত্রী নিয়েও কিছু আলোকপাত থাকলে মন্দ হতো না। পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তাঁর সমর্থন ছিল এমন একটি গুজব বাজারে আছে। 'কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে'র সুরকার ও গায়ক কুষ্টিয়ার গগন হরকরার সুর 'চুরি' সম্পর্কীত গুজব এবং লালনের গানের বই ফেরত না দেওয়া নিয়ে দুষ্টুলোকের রটনার সত্যাসত্য নির্ণয়ের চেষ্টা চললে ভালোই লাগতো।
বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বিস্ময় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনেক অসত্য ঊর্ণনাভের মতো জাল বিছিয়েছে আমাদের মধ্যে। সেসবের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে দেওয়াল গেঁথেছেন আকবর আলি খান। যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এটা হলো তাঁকে নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের সবচেয়ে বড় মিথ্যা। এই মিথ্যাকে প্রমাণ দিয়ে একেবারে জলে ফেলে দিয়েছেন আকবর আলি খান। তিনি অত্যাচারী জমিদার ছিলেন - এ হলো তাঁকে নিয়ে আরেকটা মিথ্যা। আহমদ শরীফের মতো ব্যক্তিত্ব এসব প্রচার করেছেন! অথচ কোনো প্রমাণ দিতে পারেন নি। তিনি ধর্মান্ধ ছিলেন এমনটি হলো তাঁকে ঘিরে আরেকটি বাজে কথা। বরং আজীবন প্রত্যক্ষ পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধাচারণ করেছেন তিনি।
বহু শাখায় বিস্তৃত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন। তাঁর মতো বড় মানুষের ভালো-মন্দ মাত্র ৩শ পাতায় করা কঠিন নয়, অসম্ভব। কারণ রবীন্দ্রনাথের মাঝে লুকিয়ে ছিল অনেকগুলো রবীন্দ্রনাথ। তাঁদের প্রত্যেকেই একজন অপরজনের থেকে ব্যতিক্রম চরিত্রে অভিনয় করেছেন জগৎসংসারে। আকবর আলি খান পড়তে জানেন। খাটতে জানেন। তাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এতো তথ্যসমৃদ্ধ এবং গতিশীল গদ্যে একটি গবেষণাধর্মী বই লেখা। এই মানুষটির প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা।
' এই বইয়ের লক্ষ্য হলো রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও জীবন নিয়ে যেসব বাদানুবাদ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমার বক্তব্য তুলে ধরা। তবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন অগুনতি মনের মানুষ। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সব বিতর্ক এ বইয়ে আলোচিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যেসব বিতর্কে আমি ব্যক্তিগতভাবে আলোড়িত হয়েছি, পনেরোটি অধ্যায়ে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। '
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনা-প্রতিআলোচনা সাম্প্রতিক কালের নয়। বরং রবীন্দ্রপক্ষীয় চর্চা এবং রবীন্দ্র বিরোধিতার অতীত বেশ পুরাতন।
দিজেন্দ্রলাল রায়, রাজেন্দ্রপাল, চিত্তরঞ্জন দাশ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের কট্টর সমালোচক ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছেন! তাঁর লেখা কুম্ভিলকতার দোষের দুষ্ট! তিনি 'চুটকি' লেখেন! রবীন্দ্রনাথ শুদ্ধ ইংরেজি লিখতে অপারঙ্গম এমনও অভিযোগ তাঁকে জীবদ্দশায় সইতে হয়েছে।
মার্কসবাদীদেরও চোখের বালি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিনয় ঘোষ, সুশোভন সরকার তাঁদের কলম শাণ দিয়েছেন রবীন্দ্রবিরোধিতা করে। বাংলাদেশের বামপন্থীরাও তাঁকে বিশেষ আদরের চোখে দেখে এমনও নয়৷
আমাদের দেশের আহমদ ছফা, আহমদ শরীফ রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করেছেন। ছফা রবীন্দ্রনাথকে পুরোপুরি বর্জন করেন নি। তাঁকে নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি গ্রহণও করেছেন। তবে আহমদ শরীফ কঠোরভাবে বিরোধিতা করেছেন রবীন্দ্রনাথের। এই বিরোধিতার মাত্রা সীমাজ্ঞানও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। জামাতপন্থী বুদ্ধিজীবী এবনে গোলাম সামাদও তাকে নিয়ে নানা 'কু'কথা বলতে পছন্দ করেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকও ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে ছিলেন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও মানুষ রবি ঠাকুরের মধ্যে অনেকগুলো সত্তা লীন হয়েছিল। তাই নিয়ে উচ্ছ্বাসের যেমন কমতি নেই। তেমনি তাঁকে ঘিরে কাঁদা ছোড়াছুড়িও কম হয়নি। তারই মধ্যে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে আরও একটি কেতাব বাড়লো আকবর আলি খানের বইটির মাধ্যমে।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আগ্রহের প্রাচুর্যের কারণেই হোক আর নিজের মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাতিত্বের জন্যই হোক, আমি বলব আকবর আলি খান রবীন্দ্রজীবনের উজ্জ্বল অঞ্চলগুলোকে আরো আলোকিত করেছেন। তেমনি কবিগুরুর সীমাবদ্ধতা যেসব অঙ্গনে ছিল, সেসবকে খুবই হালকাভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিছুক্ষেত্রে আশ্রয় নিয়েছেন খোঁড়া যুক্তির। যেমন-
১. রবীন্দ্রনাথের বাংলায় শতকরা ৫৪ ভাগ ছিল বাঙালি মুসলমান। ঠাকুরদের জমিদারির সিংহভাগ প্রজা ধর্মে মুসলমান, জাতে বাঙালি আর পেশায় ছিল কৃষক। কিন্তু কবিগুরুর মাত্র ৭টি সাহিত্যকর্মে জায়গা পেয়েছে মুসলমানরা। বাঙালি মুসলমানদের উপস্থিতি বিচারে সংখ্যা আরো কম। এই কম হওয়ার সপক্ষে আকবর আলি খান রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীন চিন্তাধারাকে সামনে আনতে চেয়েছেন। তাহলে তো সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহিত্যকর্মের চরিত্রায়নে আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রভাব থাকার কথা। কিন্তু বইয়ে বর্ণিত সারণি ৫. ২ মতে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের নিয়ে এক গল্পগুচ্ছেই ৮৬টি গল্প! নিম্নবর্গের হিন্দুদের উপস্থিতও রবীন্দ্র রচনাবলীতে নেই!
২. প্রায় ১১ বছর জমিদারি দেখাশোনার ভার ছিল রবীন্দ্রনাথের ওপর। মার্কসবাদীরা জমিদার রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করে। আকবর আলি খান জমিদার রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলে দিলেন, ঠাকুদের গোষ্ঠী-জ্ঞাতি অনেক বড় ছিল। তাদের ভরণপোষণ চলতো জমিদারি থেকে প্রাপ্ত অর্থে। তাই চাইলেও জমিদারপ্রথার বিরুদ্ধে যেতে পারেন নি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু জমিদারপ্রথার কুফল নিয়ে কতটা সোচ্চার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ এর বিশেষ প্রমাণ তিনি দেন নি। দিতে পারেন নি। মার্কসবাদীদের সামন্তপ্রভু রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার মোক্ষম জবাব দেওয়া হয় নি আকবর আলি খানের। অথচ তিনি সামন্ত রবীন্দ্রনাথকে হালকাভাবে দেখাতে চেয়েছেন।
৩. কবিগুরুর প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক ফেল মারল। আকবর আলি খান লিখলেন, সেই ব্যাংক ফেল মারার আগে কবির ভ্রাতুষ্পুত্র বেশ বড় অংকের ঋণ নিয়েছিলেন। ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার বড় কারণ ভাতিজাকে দেওয়া ঋণ নাকী গরিব কৃষকপ্রজাকে দেওয়া ঋণ? এই প্রশ্নটির মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আকবর আলি খান তা পরিষ্কার করেন নি।
৪. কবি তাঁর তিন কন্যাকে বড় অংকের যৌতুক দিয়ে বাল্য বিবাহ দিলেন। ব্রাহ্ম বলে রবীন্দ্রনাথের কন্যারা সুপাত্র পাবে না - এমন ভীতি থেকে যৌতুক ও বাল্যবিবাহে ব্যক্তিগত সমর্থনের কাজটি করেছেন তিনি। এমনটাই দাবি আকবর আলি খানের। অথচ তিনিই লিখেছেন ঠাকুরবাড়ির কন্যাদের ২৫-৩০ বছর বয়সেও ভালো ঘরে বিয়ে হওয়ার নজির রয়েছে। যে কবি ব্যক্তিমানুষ হিসেবে পণপ্রথা ও বাল্যবিবাহের মতো কুপ্রথার সমর্থন যোগান তাঁকে নিয়ে যথাযথ বিশ্লেষণে ব্যর্থ হয়েছেন আকবর আলি খান। বরং এর প্রচ্ছন্ন সমর্থন লক্ষ করা গেছে লেখায়।
৫. সম্প্রতি শশী থারুরের 'An Era Of Darkness' নামে একটি বই পড়লাম। বইতে শশী থারুর প্রমাণ দিয়েছেন যে, ব্রিটিশশাসনে অবিভক্ত ভারতবর্ষের দুই পয়সার লাভও হয়নি। বরং যা ক্ষতি হয়েছে তা কোনোদিন সারাতে পারবে না উপমহাদেশ। অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁর চোখো ব্রিটিশশাসনের গুণ দেখতে পেয়েছেন। সেসব স্বীকার করতেও কুন্ঠিত হন নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ী থেকে শাসক বনে যাওয়ার প্রধান দায় তিনি ভারতবাসীকে দিয়েছেন। কারণ তারা বাঁধা দিতে পারে নি। অপরদিকে, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইংরেজদের এই উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন নিয়ে কবির কন্ঠস্বর তত সরব না। এক জালিওয়ানবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগকে মুখ্য করেছেন আকবর আলি খান। রবীন্দ্রনাথের লেখায়, ভাবাদর্শে সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে দ্রোহিতা নরমপন্থীদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
৬.আরো একটি বিষয় খারাপ লেগেছে। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ খন্ডন করতে আকবর আলি খান বারবার কাজী নজরুল ইসলামকে সামনে আনছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, নজরুল তো শুধু মুসলমানদের জন্যই লেখেন নি। তাঁর কলমে হিন্দু দেব-দেবীর কথাও বহুবার প্রাধান্য পেয়েছে। তাহলে তাঁকে মুসলমানরা নির্দ্বিধায় কেন গ্রহণ করেছে? নজরুল নিজ সম্প্রদায় মুসলমানদের জন্য কলম ধরেছেন। লিখেছেন বাংলায় গজল, হামদ, নাত এবং 'ফাতেহা ইয়াজদাহম'এর মতো কবিতা। হিন্দুদের দুর্গা, কালী, শ্যামাকে নিয়েও রচনা করেছেন গান, কবিতা। অর্থাৎ সাহিত্যিক নজরুল পাশাপাশি বসবাসরত দুই সম্প্রদায়কে ভিন্ন চোখে দেখেন নি। এ তো একজন লেখকের বিরাত্বেরই প্রমাণ দেয়। লেখায় 'হিন্দুয়ানীর' দায়ে কাঠমোল্লাদের কটূক্তি নজরুলকে বারবার জর্জরিত করেছে এই তথ্য কী আকবর আলি খানের অজানা?
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা না থাকাটা বইয়ের সীমাবদ্ধতা বলে মনে হয়েছে। কবির ছোট বৌঠান এবং কবির স্ত্রী নিয়েও কিছু আলোকপাত থাকলে মন্দ হতো না। পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তাঁর সমর্থন ছিল এমন একটি গুজব বাজারে আছে। 'কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে'র সুরকার ও গায়ক কুষ্টিয়ার গগন হরকরার সুর 'চুরি' সম্পর্কীত গুজব এবং লালনের গানের বই ফেরত না দেওয়া নিয়ে দুষ্টুলোকের রটনার সত্যাসত্য নির্ণয়ের চেষ্টা চললে ভালোই লাগতো।
বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বিস্ময় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনেক অসত্য ঊর্ণনাভের মতো জাল বিছিয়েছে আমাদের মধ্যে। সেসবের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে দেওয়াল গেঁথেছেন আকবর আলি খান। যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এটা হলো তাঁকে নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের সবচেয়ে বড় মিথ্যা। এই মিথ্যাকে প্রমাণ দিয়ে একেবারে জলে ফেলে দিয়েছেন আকবর আলি খান। তিনি অত্যাচারী জমিদার ছিলেন - এ হলো তাঁকে নিয়ে আরেকটা মিথ্যা। আহমদ শরীফের মতো ব্যক্তিত্ব এসব প্রচার করেছেন! অথচ কোনো প্রমাণ দিতে পারেন নি। তিনি ধর্মান্ধ ছিলেন এমনটি হলো তাঁকে ঘিরে আরেকটি বাজে কথা। বরং আজীবন প্রত্যক্ষ পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধাচারণ করেছেন তিনি।
বহু শাখায় বিস্তৃত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন। তাঁর মতো বড় মানুষের ভালো-মন্দ মাত্র ৩শ পাতায় করা কঠিন নয়, অসম্ভব। কারণ রবীন্দ্রনাথের মাঝে লুকিয়ে ছিল অনেকগুলো রবীন্দ্রনাথ। তাঁদের প্রত্যেকেই একজন অপরজনের থেকে ব্যতিক্রম চরিত্রে অভিনয় করেছেন জগৎসংসারে। আকবর আলি খান পড়তে জানেন। খাটতে জানেন। তাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এতো তথ্যসমৃদ্ধ এবং গতিশীল গদ্যে একটি গবেষণাধর্মী বই লেখা। এই মানুষটির প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা।
April 9, 2022
ভর্তি পরীক্ষা দেবার সময় শুনতে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করার পক্ষপাতী ছিলেন না। এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে দুইদিন পরপর পক্ষে বিপক্ষে হাজারোটা যুক্তি সম্বলিত স্ট্যাটাস পাওয়া যায়। কিন্তু আসল কাহিনী কি, তা বের হয় না।
আকবর আলী খান স্যার তৎকালীন সময়ের সে সব ধারণা ও ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আলাপ করেছেন। উনার বই বরাবরই আমার জন্য সুখপাঠ্য, তবে এটা পড়া আমার জন্য অঅত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল।
আকবর আলী খান স্যার তৎকালীন সময়ের সে সব ধারণা ও ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আলাপ করেছেন। উনার বই বরাবরই আমার জন্য সুখপাঠ্য, তবে এটা পড়া আমার জন্য অঅত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল।
March 22, 2020
"সুর নাই, তাল নাই, অথচ এই কবিতা পড়িয়া তাঁহার অন্ধ ভক্তগণ মোহিত। কেন? কারণ শেলি বোঝা যায় না, এও বোঝা যায় না। তার ওপর রবীন্দ্রবাবু স্বয়ং এ কবিতা লিখিয়াছেন। এ কি হয়, যে এ কবিতার অর্থ নাই? আর লেখকের মতে অর্থ যদি বোঝাই গেল সে তো গদ্য হইয়া গেল। - গভীর।"
রবীন্দ্রনাথের 'সোনার তরী' কবিতার সমালোচনায় এই কথাগুলোই লিখেছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার ও জাতীয়তাবাদী কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বা ডি এল রায়। শুধু তিনিই নন স্যার যদুনাথ সরকার, বিপিনচন্দ্র পাল, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, রাধাকমল মুখোপাধ্যায় ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ইত্যাদি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী ও ভদ্রলোক সমাজের সভ্যগণ। তাদের দাবি রবীন্দ্র রচনা কুম্ভিলক ও গুরুচণ্ডালী দোষে দুষ্ট এবং অর্থহীন। বাদ যায়নি বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে নোবেল পাওয়ার পরও ১৯১৪ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রবীন্দ্র সাহিত্যকে 'চুটকি' সাহিত্য বলে দাবি করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপকরা ছিলেন আরেক কাঠি উপরে। সেবছরের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় রবীন্দ্রনাথের রচনার একটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তা "বিশুদ্ধ ও সুষ্ঠু" বাংলায় রূপান্তরিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরকমভাবেই পদেপদে বিরোধিতার মুখোমুখি হতেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তি জীবনে। জীবিত অবস্থায় সেসব বিতর্ক নিয়ে তিনিও সরব হয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বিতর্ক যেন অন্য রূপ নিয়েছে। বিতর্ক যেমন রবীন্দ্রনাথকে ছাড়ে না, রবীন্দ্রনাথের স্তুতি বন্দনাও যেন থামে না। একদল রবীন্দ্রনাথকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে দাবি করে তো অন্যদল তাঁকে হেয় করে তুলোধুনো করে। এরকম বিভিন্ন দলের প্রচার ও অপপ্রচারের বিশ্লেষণ নিয়েই আকবর আলি খান লিখেছেন "দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে" বইটি। এখানে সর্বমোট ১৫টি প্রবন্ধ রয়েছে। যার মধ্যে শুরুর প্রস্তাবনা ও শেষের সারমর্মমূলক প্রবন্ধ বাদ দিলে বাকি ১৩টিই ছিল বিভিন্ন অপপ্রচার ও অতিরঞ্জনের বিশ্লেষণ। এর মধ্যে প্রথম সাতটি অপপ্রচার সংক্রান্ত ও শেষ ছয়টি অতিরঞ্জকতা সংক্রান্ত।
অপপ্রচার এর মধ্যে প্রথম চারটি বাংলাদেশে ও মুসলিম সমাজে বহুল প্রচলিত। পরের দুটি হিন্দু সমাজে ও সর্বশেষটি আন্তর্জাতিক মহলে বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রনাথ পৌত্তলিক বা পৌত্তলিকতার প্রচারক, মুসলিম বিদ্বেষী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী, 'আমার সোনার বাংলা' বাংলাদেশ ও মুসলিম মূল্যবোধের বিরোধী, রবীন্দ্রনাথের হিন্দু বিদ্বেষ, সাহিত্যিক মানের ন্যূনতা, গান্ধী বিরোধী মনোভাব প্রভৃতি অপপ্রচার এর বিশ্লেষণ।
পরবর্তী ছয়টি প্রবন্ধ রবীন্দ্র অনুরাগীদের অতিরঞ্জকতার বিশ্লেষণ। যার মধ্যে অন্যতম নারী বাদ, জাতিভেদ প্রথা নিরসনে ভূমিকা, শিক্ষা ভাবনা, পল্লী সমাজের উন্নয়ন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব প্রভৃতি বিষয়। যেখানে লেখক দেখিয়েছেন এসকল ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ চিন্তা ভাবনা ও কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন দুর্বলতার দিকগুলো।
আকবর আলি খান দেখিয়েছেন জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। একসময়ের জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথ হয়ে যান জাতীয়তাবাদ বিরোধী রবীন্দ্রনাথ। সবিশেষে রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর জীবনের পরিবর্তন সম্পর্কে লিখেছেন। সেসব লেখা উল্লেখ পূর্বক আকবর আলি খান দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের জীবন একটি মালা হলে তা ফুল ও কাঁটা উভয়েই যুক্ত। তাই বলে শুধু ফুলের গন্ধে মোহিত হয়ে থাকা উচিত নয় আবার উচিত নয় কাঁটা নিয়ে শুধু অভিযোগ করার। তিনিও মানুষ, তিনিও দোষগুণের ঊর্ধ্বে নন। আকবর আলি খান লিখেছেন কেবল ৩০০ পৃষ্ঠার মধ্যে রবীন্দ্র মূল্যায়ন সম্ভব নয়। সত্য। তবুও আকবর আলি খান তাঁর শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে থেকেও শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে এরকম একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন তার জন্য কুর্নিশ না জানালেই নয়। তিনি সুস্থ থাকলে হয়তো আরও বিশ্লেষণ থাকতে পারতেন, অন্যান্য আরও অপপ্রচার নিয়ে জবাব দিতে পারতেন। তবে এও বা কম কিসে?
ব্যক্তিগত রেটিং: 4.5/5
রবীন্দ্রনাথের 'সোনার তরী' কবিতার সমালোচনায় এই কথাগুলোই লিখেছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার ও জাতীয়তাবাদী কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বা ডি এল রায়। শুধু তিনিই নন স্যার যদুনাথ সরকার, বিপিনচন্দ্র পাল, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, রাধাকমল মুখোপাধ্যায় ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ইত্যাদি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী ও ভদ্রলোক সমাজের সভ্যগণ। তাদের দাবি রবীন্দ্র রচনা কুম্ভিলক ও গুরুচণ্ডালী দোষে দুষ্ট এবং অর্থহীন। বাদ যায়নি বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে নোবেল পাওয়ার পরও ১৯১৪ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রবীন্দ্র সাহিত্যকে 'চুটকি' সাহিত্য বলে দাবি করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপকরা ছিলেন আরেক কাঠি উপরে। সেবছরের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় রবীন্দ্রনাথের রচনার একটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তা "বিশুদ্ধ ও সুষ্ঠু" বাংলায় রূপান্তরিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরকমভাবেই পদেপদে বিরোধিতার মুখোমুখি হতেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তি জীবনে। জীবিত অবস্থায় সেসব বিতর্ক নিয়ে তিনিও সরব হয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বিতর্ক যেন অন্য রূপ নিয়েছে। বিতর্ক যেমন রবীন্দ্রনাথকে ছাড়ে না, রবীন্দ্রনাথের স্তুতি বন্দনাও যেন থামে না। একদল রবীন্দ্রনাথকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে দাবি করে তো অন্যদল তাঁকে হেয় করে তুলোধুনো করে। এরকম বিভিন্ন দলের প্রচার ও অপপ্রচারের বিশ্লেষণ নিয়েই আকবর আলি খান লিখেছেন "দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে" বইটি। এখানে সর্বমোট ১৫টি প্রবন্ধ রয়েছে। যার মধ্যে শুরুর প্রস্তাবনা ও শেষের সারমর্মমূলক প্রবন্ধ বাদ দিলে বাকি ১৩টিই ছিল বিভিন্ন অপপ্রচার ও অতিরঞ্জনের বিশ্লেষণ। এর মধ্যে প্রথম সাতটি অপপ্রচার সংক্রান্ত ও শেষ ছয়টি অতিরঞ্জকতা সংক্রান্ত।
অপপ্রচার এর মধ্যে প্রথম চারটি বাংলাদেশে ও মুসলিম সমাজে বহুল প্রচলিত। পরের দুটি হিন্দু সমাজে ও সর্বশেষটি আন্তর্জাতিক মহলে বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রনাথ পৌত্তলিক বা পৌত্তলিকতার প্রচারক, মুসলিম বিদ্বেষী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী, 'আমার সোনার বাংলা' বাংলাদেশ ও মুসলিম মূল্যবোধের বিরোধী, রবীন্দ্রনাথের হিন্দু বিদ্বেষ, সাহিত্যিক মানের ন্যূনতা, গান্ধী বিরোধী মনোভাব প্রভৃতি অপপ্রচার এর বিশ্লেষণ।
পরবর্তী ছয়টি প্রবন্ধ রবীন্দ্র অনুরাগীদের অতিরঞ্জকতার বিশ্লেষণ। যার মধ্যে অন্যতম নারী বাদ, জাতিভেদ প্রথা নিরসনে ভূমিকা, শিক্ষা ভাবনা, পল্লী সমাজের উন্নয়ন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব প্রভৃতি বিষয়। যেখানে লেখক দেখিয়েছেন এসকল ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ চিন্তা ভাবনা ও কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন দুর্বলতার দিকগুলো।
আকবর আলি খান দেখিয়েছেন জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। একসময়ের জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথ হয়ে যান জাতীয়তাবাদ বিরোধী রবীন্দ্রনাথ। সবিশেষে রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর জীবনের পরিবর্তন সম্পর্কে লিখেছেন। সেসব লেখা উল্লেখ পূর্বক আকবর আলি খান দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের জীবন একটি মালা হলে তা ফুল ও কাঁটা উভয়েই যুক্ত। তাই বলে শুধু ফুলের গন্ধে মোহিত হয়ে থাকা উচিত নয় আবার উচিত নয় কাঁটা নিয়ে শুধু অভিযোগ করার। তিনিও মানুষ, তিনিও দোষগুণের ঊর্ধ্বে নন। আকবর আলি খান লিখেছেন কেবল ৩০০ পৃষ্ঠার মধ্যে রবীন্দ্র মূল্যায়ন সম্ভব নয়। সত্য। তবুও আকবর আলি খান তাঁর শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে থেকেও শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে এরকম একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন তার জন্য কুর্নিশ না জানালেই নয়। তিনি সুস্থ থাকলে হয়তো আরও বিশ্লেষণ থাকতে পারতেন, অন্যান্য আরও অপপ্রচার নিয়ে জবাব দিতে পারতেন। তবে এও বা কম কিসে?
ব্যক্তিগত রেটিং: 4.5/5
September 14, 2024
রবীন্দ্রনাথ পরিপূর্ণ মানুষ নন। কারো পক্ষেই পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া সম্ভবও না। তার যেমন অগুনতি গুন রয়েছে তেমনি দুর্বলতাও রয়েছে। তার অন্ধ অনুরাগীরা যেমন তার দুর্বলতা ঢেকে রাখার প্রচেষ্টা করেন, তার অবদানকে অতিরঞ্জিত করেন তেমনি তার সমালোচকরা তার সৃষ্টিশীল প্রতিভার অবমূল্যায়ন করেন, তাকে কটাক্ষ করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় হিন্দুভদ্রলোক সমাজ দ্বারা ক্রমাগত সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছেন। নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হবার পরেও তারা ক্ষ্যান্ত হননি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে যেসব সমালোচনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে জনশ্রুতি রয়েছে সেগুলোই লেখক বিশ্লেষণ করেছেন। জাতীয় সঙ্গীতকে ঘিরে বিতর্ক, পৌত্তলিকতা প্রচার, তার মুসলিম বিদ্বেষমূলক আচরণ ও সাম্প্রদায়িক বিতর্ক, তাঁর জমিদারীতে প্রজা নির্যাতন, সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে তার অবস্থান ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণপুষ্ট একটা বই। অনেক অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত হলাম। রবীন্দ্রনাথের মত ব্যক্তিদের নিয়ে আরো চর্চা হওয়া দরকার। এর ভিতর থেকেই সত্য উদঘাটন হোক। এতে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও মূল্যায়ন দুটোই হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে যেসব সমালোচনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে জনশ্রুতি রয়েছে সেগুলোই লেখক বিশ্লেষণ করেছেন। জাতীয় সঙ্গীতকে ঘিরে বিতর্ক, পৌত্তলিকতা প্রচার, তার মুসলিম বিদ্বেষমূলক আচরণ ও সাম্প্রদায়িক বিতর্ক, তাঁর জমিদারীতে প্রজা নির্যাতন, সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে তার অবস্থান ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণপুষ্ট একটা বই। অনেক অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত হলাম। রবীন্দ্রনাথের মত ব্যক্তিদের নিয়ে আরো চর্চা হওয়া দরকার। এর ভিতর থেকেই সত্য উদঘাটন হোক। এতে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও মূল্যায়ন দুটোই হবে।
July 6, 2020
রবীন্দ্রসাহিত্যের ব্যাপকতা নিয়ে আমাদের সকলেরই কমবেশি জানা। তাঁর সম্পূর্ণ সাহিত্য আমার এখনো পড়া সম্ভব হয়নি, তবে কিছু কিছু পড়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনাগুলো বোঝার চেষ্টা করি। একই সাথে তাঁকে নিয়ে বিদগ্ধজনদের মূল্যায়ন টুকটাক জানতে চেষ্টা করি।
কোন একটা বিষয়কে ত্রুটিহীনভাবে মেনে নেয়া এক ধরনের মৌলবাদিতা, যা রবীন্দ্রানুরাগীদের মাঝে প্রায়ই দেখা যায়। তাঁদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথকে বসিয়েছেন প্রায় দেবতার আসনে, তাঁর কোন ত্রুটিই মানতে চান না। আবার কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে এতটাই অবমূল্যায়ন করেন যে তাঁর অসংখ্য অবদানকেও এক লহমায় অস্বীকার করে বসেন। আসলে দু ধরনের ভাবনাই ভুল।
রবীন্দ্রনাথ দেবতা ছিলেন না, ছিলেন একজন মানুষ। হ্যাঁ, সাধারণ মানুষ অবশ্যই নন। তাই তাঁর ভুল-ত্রুটির পরিমাণ কম থাকলেও আছে তো অবশ্যই।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাই নানা ধরনের ঠিক-ভুল ভাবনা এবং তার যৌক্তিকতা-অযৌক্তিকতা নিয়ে স্বনামধন্য আকবর আলি খানের এই প্রয়াস।
মোট পনেরোটি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে বইটিকে। প্রথম এবং শেষ অধ্যায়কে বলা যায় গোটা বইটার সারসংক্ষেপ। বাকি ১৩টা অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁকে নিয়ে নানান গুজব এবং ধোঁয়াশাগুলো।
রবীন্দ্রনাথ পৌত্তলিক ছিলেন কিনা, মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন নাকি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, নারীদের কীভাবে মূল্যায়ন করতেন তিনি, জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাঁর কেমন ভাবনা ছিল, কৃষি এবং শিক্ষা নিয়ে তাঁর কাজ এবং রবীন্দ্রসাহিত্য এবং তাঁর দর্শনের বর্তমান সমাজে প্রাসঙ্গিকতা, সবকিছুই বেশ সাবলীলভাবে উঠে এসেছে এই বইয়ে।
আকবর আলি খান প্রচুর গবেষণা, তথ্য এবং তাঁর নিজস্ব ভাবনা দিয়ে সাজিয়েছেন বইটি। অসম্ভব তীক্ষ্ণ যুক্তিজাল এবং তথ্য-উপাত্তের সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেছেন নানান গুজবের অসারতা। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ও সীমিত পরিসরে আলোচিত হয়েছেন।
সমৃদ্ধ এই বইটি রবীন্দ্রনাথের কাজকে বুঝতে বেশ সহায়তা করেছে। আরো করবে, যখন আমি বাকি রবীন্দ্রসাহিত্য পড়ে শেষ করব। বইটি আবার তখন পড়তে হবে নিজস্ব চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা দেখার জন্য।
আকবর আলি খানকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। ইতিহাস, অর্থনীতিতে তাঁর ডিগ্রী কিন্তু লেখনশৈলী এত চমৎকার যে মনেই হয় না তিনি সাহিত্যের ছাত্র নন। মুক্তিযোদ্ধা এই লেখক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় দায়িত্ব পালন করেছেন। অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে বইটি লিখে তিনি বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ এবং জ্ঞানের জগতে যোগ করেছেন একটি নতুন পালক।
কোন একটা বিষয়কে ত্রুটিহীনভাবে মেনে নেয়া এক ধরনের মৌলবাদিতা, যা রবীন্দ্রানুরাগীদের মাঝে প্রায়ই দেখা যায়। তাঁদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথকে বসিয়েছেন প্রায় দেবতার আসনে, তাঁর কোন ত্রুটিই মানতে চান না। আবার কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে এতটাই অবমূল্যায়ন করেন যে তাঁর অসংখ্য অবদানকেও এক লহমায় অস্বীকার করে বসেন। আসলে দু ধরনের ভাবনাই ভুল।
রবীন্দ্রনাথ দেবতা ছিলেন না, ছিলেন একজন মানুষ। হ্যাঁ, সাধারণ মানুষ অবশ্যই নন। তাই তাঁর ভুল-ত্রুটির পরিমাণ কম থাকলেও আছে তো অবশ্যই।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাই নানা ধরনের ঠিক-ভুল ভাবনা এবং তার যৌক্তিকতা-অযৌক্তিকতা নিয়ে স্বনামধন্য আকবর আলি খানের এই প্রয়াস।
মোট পনেরোটি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে বইটিকে। প্রথম এবং শেষ অধ্যায়কে বলা যায় গোটা বইটার সারসংক্ষেপ। বাকি ১৩টা অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁকে নিয়ে নানান গুজব এবং ধোঁয়াশাগুলো।
রবীন্দ্রনাথ পৌত্তলিক ছিলেন কিনা, মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন নাকি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, নারীদের কীভাবে মূল্যায়ন করতেন তিনি, জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাঁর কেমন ভাবনা ছিল, কৃষি এবং শিক্ষা নিয়ে তাঁর কাজ এবং রবীন্দ্রসাহিত্য এবং তাঁর দর্শনের বর্তমান সমাজে প্রাসঙ্গিকতা, সবকিছুই বেশ সাবলীলভাবে উঠে এসেছে এই বইয়ে।
আকবর আলি খান প্রচুর গবেষণা, তথ্য এবং তাঁর নিজস্ব ভাবনা দিয়ে সাজিয়েছেন বইটি। অসম্ভব তীক্ষ্ণ যুক্তিজাল এবং তথ্য-উপাত্তের সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেছেন নানান গুজবের অসারতা। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ও সীমিত পরিসরে আলোচিত হয়েছেন।
সমৃদ্ধ এই বইটি রবীন্দ্রনাথের কাজকে বুঝতে বেশ সহায়তা করেছে। আরো করবে, যখন আমি বাকি রবীন্দ্রসাহিত্য পড়ে শেষ করব। বইটি আবার তখন পড়তে হবে নিজস্ব চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা দেখার জন্য।
আকবর আলি খানকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। ইতিহাস, অর্থনীতিতে তাঁর ডিগ্রী কিন্তু লেখনশৈলী এত চমৎকার যে মনেই হয় না তিনি সাহিত্যের ছাত্র নন। মুক্তিযোদ্ধা এই লেখক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় দায়িত্ব পালন করেছেন। অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে বইটি লিখে তিনি বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ এবং জ্ঞানের জগতে যোগ করেছেন একটি নতুন পালক।
August 11, 2023
ভাবনা ও দুর্ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে
আকবর আলি খান
প্রথমা প্রকাশনী
মুদ্রন মূল্য ৬২০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৩০
রিডিং টাইম - ১২ দিন
বর্তমান সময়ের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক আকবর আলি খানের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এই যে, উনি বিশেষ কোনো এজেন্ডা থেকে গবেষণাধর্মী বই লিখেন নাহ, বরঞ্চ যুক্তি-প্রমাণের সাপেক্ষে, তথ্য উপাত্তের বিচারে যেটা ভাল, তাকে ভালো বলেন আর যা খারাপ তাও তুলে ধরেন।সাথে অসাধারণ ভাষাচয়নের কথা নাহ বললেই নয়।বাংলাদেশকে লেখকের আরো অনেক কিছু দেয়ার ছিল, আফসোস লাগে যে ২০২২ এর শেষেই লেখক মারা যান।
রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক জীবন নিয়ে এত সুন্দর, গোছানো রেফারেন্সসমৃদ্ধ বই আর আছে কিনা আমার জানা নেই।বইটির রিভিউ হিসেবে আমি লেখকের বইয়ের শুরু, আর শেষের বইয়ের সামগ্রিক তথ্য আলোচনা নিয়ে লিখা শর্ট রিভিউই তুলে ধরছি নিচে -
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের লক্ষ্য হলো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যেসব দুর্ভাবনা ও ভাবনা বাংলাদেশে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা । গ্রন্থটিতে ১৫টি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে দুর্ভাবনা ও ভাবনার উৎস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।বাংলাদেশে অনেক মুসলমানের দুর্ভাবনা এই যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় পৌত্তলিকতা প্রচার করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথ আদৌ পৌত্তলিক ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর- ভাবনার বিবর্তন নিয়েও আলোচনা হয়েছে।বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কতগুলো ভুল ধারণা রয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়ে এ ভুল ধারণাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলার মুসলমানদের একটি বড় আক্ষেপ যে রবীন্দ্রসাহিত্যে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলমানদের জীবন ও ভাবনা প্রায় অনুপস্থিত।অন্যদিকে অভিযোগ করা হয় যে রবীন্দ্রসাহিত্যে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ প্রচার করা হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে এসব ধারণা মোটেও সঠিক নয় এবং রবীন্দ্রনাথ মুসলমানদের সম্পর্কে খুব কম লিখলেও মুসলমানদের সম্পর্কে অন্তত তাঁর দুটি রচনা বিশ্বসাহিত্যে বিশেষ মর্যাদার আসন পাওয়ার উপযুক্ত।
পঞ্চম অধ্যায়ের বিষয় হলো রবীন্দ্রনাথ ও সাম্প্রদায়িকতা। বিশেষ করে বাংলাদেশে একটি গুজব প্রচলিত আছে যে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন। এখানে এ বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করা হয়েছে।সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ নিয়ে তাঁর অবস্থান সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে বাংলাদেশের হিন্দু ভদ্রলোকেরা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ব্যক্তিগত কুৎসাসহ যেসব অপপ্রচার করেছেন, তার বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এসব কুৎসার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়ের শিরোনাম হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বনাম মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী। এঁরা একে অপরের খুব কাছাকাছি ছিলেন কিন্তু দার্শনিক দিক থেকে একের অবস্থান ছিল অপরের থেকে অনেক দূরে। এঁদের বিরোধের উৎস ও তাৎপর্য এ অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অষ্টম অধ্যায়ের শিরোনাম হলো : রবীন্দ্রনাথ কি এখনো প্রাসঙ্গিক? এই প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বাইরে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা অসাধারণ পর্যায়ে পৌছায়। আবার কয়েক বছরের মধ্যেই এই জনপ্রিয়তায় ধস নামে। কয়েক বছরের ব্যবধানে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তার অসাধারণ উত্থান ও পতনের কারণ সম্পর্কে এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে নোবেল পুরস্কার লাভের পর বাংলাদেশের ভেতরে এক শ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে ও বিদেশে তাঁর লেখার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ একজন জমিদার ছিলেন। তিনি জমিদারির কুফল সম্পর্কে লিখেছেন কিন্তু জমিদারি উচ্ছেদের জন্য কিছু করেননি এবং লেখেনওনি। প্রজাদের আর্থিক কষ্ট সম্পর্কে তিনি লিখেছেন কিন্তু তিনি তাঁদের খাজনা মওকুফ করেননি। জমিদারি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ও তাঁর আচরণের মধ্যে অসংগতি লক্ষ করা যায়। নবম অধ্যায়ে এই অসংগতিসমূহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
দশম অধ্যায়ের বিষয় হলো রবীন্দ্রনাথ ও নারীবাদ । অনেকে রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করে থাকেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে রবীন্দ্রনাথ মোটেও নারীবাদী ছিলেন না। এ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে এবং এই অধ্যায়ে সেই প্রশ্নসমূহের উত্তর খোঁজা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ জাতিভেদ প্রথাকে ঘৃণা করতেন। তবু জাতিভেদ উচ্ছেদের জন্য তিনি বাস্তব কোনো উদ্যোগ নেননি। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকেও তিনি দূরে থেকেছেন। একাদশ অধ্যায়ের উপজীব্য বিষয় হলো জাতিভেদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত অবস্থান কী ছিল, তা নির্ণয় করা।
রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবন অতিবাহিত হয়েছে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসনকালে। তাঁর জীবদ্দশায় সারা পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদই ছিল রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রধান সত্য। রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, আবার সাম্রাজ্যবাদের সুফল নিয়ে লিখেছেন। দ্বাদশ অধ্যায়ে সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ কী চিন্তা করতেন, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় বাঙালি জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য ছিল পল্লি অঞ্চলে ব্যাপক দারিদ্র্য। জমিদার হিসেবে তিনি অতি কাছ থেকে তাঁর প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট দেখেছেন। পল্লি উন্নয়নের জন্য তিনি সমবায় ব্যাংক স্থাপন করেছেন, যান্ত্রিক চাষাবাদসহ অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাঁর উদ্যোগসমূহ সফল হয়নি । ত্রয়োদশ অধ্যায়ে পল্লি উন্নয়ন সম্পর্কে তাঁর বিভিন্ন ধারণা ও উদ্যোগ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন নিরীক্ষা করেছেন, নিজে পাঠ্যপুস্তক লিখেছেন, বিদ্যালয় পরিচালনা করেছেন। নতুন নতুন শিক্ষাপদ্ধতির প্রবর্তন করেছেন এবং তাঁর স্বপ্নের বিশ্বভারতীকে বিশ্বের একটি সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর সব উদ্যোগ সফল হয়নি । শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর বিভিন্ন নিরীক্ষা থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা কী শিখতে পারে, সে সম্পর্কে চতুর্দশ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
পঞ্চদশ অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে প্রচলিত ভাবনা ও দুর্ভাবনা সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ আগের অধ্যায়সমূহে করা হয়েছে, সেগুলোর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই আলোচনায় দেখা যায় যে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্ব ও কর্মকাণ্ড একমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক। রবীন্দ্রনাথের নানা রূপ রয়েছেতাই এই অধ্যায়ের নাম রাখা হয়েছে ‘নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা'।
সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন নিয়ে মতবিরোধ থাকা স্বাভাবিক কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এ মতবিরোধের মাত্রা ছিল খুবই বেশি। একদল বাঙালি মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি সন্তান। এই মতের প্রতিপক্ষ মনে করে যে রবীন্দ্রনাথকে অতি মূল্যায়ন করা হয়েছে । এই বইয়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যেসব গুজব বাজারে প্রচলিত রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছেবিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথকে যেসব প্রশ্নে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেসব প্রশ্নের বেশির ভাগই অসার। অন্যদিকে যেসব প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথকে অতি উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সেসব প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের যেসব দুর্বলতা ছিল, সেগুলো চাপা দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক বিশ্লেষণে রবীন্দ্রনাথ একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন না, পরিপূর্ণ ব্যক্তি কেউই হন না । সবাই দোষে-গুণে মানুষ, রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম নন । এই বইয়ে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সাতটি ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, অন্যদিকে ছয়টি প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথের শুভানুধ্যায়ীরা রবীন্দ্রনাথের অবদানকে অতিরঞ্জন করেছেন।
October 19, 2022
রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে আমাদের সমাজে কতগুলো মিথ্যায় ভরপুর মিথ আছে। রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে অতিরঞ্জিত ঘটনা গুলো অধিকাংশই মিথ্যা। রবীন্দ্রনাথ কে সাম্প্রদায়িক বানাতে কিংবা মুসলিম বিদ্বেষী বানাতে আমাদের সমাজের কিছু মানুষ না জেনে মিথ্যা টা লিখে বেড়াই। লেখক এই অতিরঞ্জিত, মিথ্যা মিথ গুলোর সত্যি ঘটনা আর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। বইটির বিভিন্ন অনুচ্ছেদে আমাদের সমাজে রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে যে ভুল ধারণা গুলো ছিল তার উত্তর দেওয়া হয়েছে। বইটি অনেক গবেষণা ধর্মী, তথ্যবহুল যারা রবীন্দ্রনাথ এর জীবন সম্পর্কে ভালো করে জানতে চান তাদের জন্য এই বই অবশ্যই পড়া দরকার।
Displaying 1 - 7 of 7 reviews








