১৯৮৮ সালে আমি একটা সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ছয়মাসের জন্য আমেরিকায় ছিলাম। আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। আমাকে অনেকেই বলেন, এতো দেশ ঘুরেছেন, কিছু ভ্রমণকাহিনী লিখেন না কেন। আমেরিকায় কাটানো ছয়মাসে অনেক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে, অনেক জায়গায় গিয়েছি, অনেক রকমের মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। আনন্দ, বেদনা, আর অচেনা, অদ্ভুত, এসব বিষয়গুলি নিয়ে নিঃসন্দেহে একটা “ভ্রমণ কাহিনী” লেখা যায় । - বদরুল মিল্লাত
"আমেরিকা, আমেরিকা" একটা ভ্রমণকাহিনী না স্মৃতিগল্প?
ধরে নিন ট্রেনিং এ যাচ্ছেন আপনি। খুব যাচাই বাছাই এর পর পেলেন সেই সুযোগটা আর লুফে নিতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আপনি। তবে একদম অজানা অচেনা শহর, নাই কোনো পরিচিত বন্ধু বান্ধব! দেশ থেকে দুরে, পরিচিতবর্গ থেকে দুরে একা আপনি! এরকমই দ্বৈত মনোভাব নিয়েই আমেরিকা পাড়ি জমান কথক! সালটা ১৯৮৮! ফোর্ট বেনিং স্কুল অফ ইনফেন্ট্রিতে প্রশিক্ষণ নেবার সুযোগ পান কথক! কিন্তু শেষতক হয়টা কি?
যাত্রার শুরু বিঘ্নতার মাঝে! বুহিয়ান, বুহুনিয়ান সদৃশ কিছু তিঁতঘুটে উচ্চারণে নিজের নাম শুনে বিস্মিত লেখকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মত ঘটনাটি ঘটে! কি সেটা?
লাবলু ভাই! ঠিকানাহীন উদ্বাস্তুর মত যখন একা অচেনা শহরে আর সেখানে আশ্রয়ের একটু সুযোগ তিনি! কিন্তু যদি জানতে পারেন তিনি সেই পরিচিত লোক নন, অন্য কোনো ব্যক্তি! তখন কি নেহাত জাতিগত কারণে আপনাকে আপ্যায়ন করবে তিনি?
গল্পটা নিয়ে চলে বক্র পথ ধরে চিরায়ত আমেরিকায়! কোকাকোলার শহর আর কোকাকোলার ইতিহাসে, কখনো গাড়ির প্রতি টান আর জীবনের প্রথম কম্পিউটার স্পর্শের অভিজ্ঞতায়! কখনোবা লম্বা রোড জার্নি আর ফলের বাগানে ঘুরতে যাওয়া আর কখনো দেশের জন্য স্মৃতিতাড়িত হওয়া!
সর্বোপরি বইটার একটা বিশেষ অংশ জুড়ে ফোর্ট বেনিং এর বর্ণনা, তার রীতিনীতি, প্রশিক্ষণের ধরণ আর হ্যাঁ কথকের স্পন্সরদের বর্ণনা! একজন আমেরিকান মা কতটা আপন করে নিতে পারে কাউকে? আর আমেরিকার কিছু নিয়ম কানুন যা মেনে নেয়া নেহাতই কষ্টের! একটা অংশে বনে হারিয়ে যাবার কথা আর স্মৃতিরোমন্থন! তবে বইটার একটা বিশেষ অংশে আছে নিখাদ স্নেহরসের রোমন্থন আর অপারগতার সীমাহীন কস্ট! সর্বোপরি, লেখকের জীবনের ছমাসের একটা দর্পন "আমেরিকা, আমেরিকা"!
গেলাম, দেখলাম, চলে এলাম! ভ্রমণটাকে এই তিন শব্দে বাধা যায়, কিন্তু তারমাঝে থাকে ইন্দ্রিয়াতীত কিছু অনুভূতি, ভালো খারাপ বা একদম পানসে! তবে সব মিলিয়ে যে জিনিসটা উৎকর্ষ সাধিত হয় তা হলো দৃষ্টিভঙ্গি আর মানস। গল্পটা এমনই এক ভ্রমণের যেটার ডিউরেশন কেবল ছমাস, কিন্তু সময়ের ব্যবধানটা কি নেহাত কম? গল্পটা ট্রেনিং একাডেমির, গল্পটা নিজেকে ভিন্নভাবে জানার, গল্পটা নতুন বন্ধুদের, গল্পটা প্রিয়জন থেকে দুরে থাকার! সর্বোপরি, গল্পটা একজন আর্মি পারসনের আর তার দৃষ্টিতে আমেরিকার!
বইটার শুরুটা বেশ অদ্ভুতভাবে! আর ধুম করেই যেন ট্র্যাকে উঠে গেল! কোনো ভূমিকা, অতিবর্ণনা না দিয়েই বইটা শুরু হয়ে গেল আর ধীরে ধীরে প্রেক্ষাপটগুলোও এসেছে। তো বলা যায় একটা পার্ফেক্ট শুরু বইটার। তারপর ধীরে ধীরে বইটাতে বিবৃত হয়েছে বেশ মজার কিছু স্মৃতি আর তার সাথে একটা ভিন্ন আঙ্গিক। বইটার ন্যারেটিভ স্টাইলটা বেশ চিত্তাকর্ষক, পড়ার সময় মনে হবে লেখক সামনে বসে আছেন আর নিজের মত করে গল্প বলে যাচ্ছেন। একটা বই এর পুরো কায়া পাল্টে যেতে পারে যদি বইটার বলার সিকুয়েন্সটা একটু এদিক ওদিক করা যায়! বইটার অন্যতম একটা দিক ছিল শুরুতে গল্পের আকর্ষনীয় কিছু বলে পরে প্রেক্ষাপট টানা, যেটা নিঃসন্দেহে বেশ উপভোগ্য ছিল। বইটার মাঝে কিছু কিছু জায়গাতে ব্রাকেটে কিছু ছোটখাট ব্যাখ্যা বা কোনো জায়গায় সংশ্লিষ্ট তথ্য দেয়া ছিল, যা পাঠককে বেশ অনেককিছু বুঝতে সাহায্য করে। বইটার আঙ্গিকগত দিক থেকে বেশ অভিনবত্ব আছে মানতেই হবে আর বলার ধরনটাও বেশ ছিল! সবমিলিয়ে ভালো লাগার মতোই!
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক, ভ্রমণকাহিনী বলতে আমাদের ধারণটা কতটুকু? কি কি থাকা দরকার ভ্রমণকাহিণীতে? আর এর সাথে মেমোইর বা স্মৃতিকথার সাদৃশ্য বা বিসাদৃশ্য কতটুকু? আর এই বইটা কোন জনারায় পড়ে? প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক কিছুটা!
বইটা পড়া শুরু করেছিলাম ফ্ল্যাপের লেখা দিয়ে যেখানে লেখক বইটাকে বিশেষ ধরনের ভ্রমনকাহিনী বলেছেন অবশ্যই এটা যেকোনো পাঠকের জন্য বিস্ময়কর, বিশেষ ধরনটা আসলে কি? সাধারণ ভ্রমনগল্পগুলোতে মুল ফোকাসে থাকে স্থান ও তার সভ্যতা, লোকাচারের বর্ণনা যেটা পর্যটকের মনে আবেগের সঞ্চার করেছে আর পর্যটকের সেই আবেগ বিবৃত ভাষামাধ্যমে! খুব সাধারণের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম কিছু দৃষ্টিভঙ্গি পাঠক হিসেবে আমি খুঁজি ভ্রমণগল্পগুলোতে! আর ভ্রমনণকাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্ববহ দিক নিজের সেফ জোন এবং সেই বর্ণিত জায়গার মাঝে তফাতসমুহ তোলে ধরা এবং পাঠককে এটা কনভিন্স করা যে ভ্রমনটা তার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলেছে!
এদিক বিবেচনায় বইটা পাঠক হিসেবে আমাকে বেশ তৃপ্ত করেছে প্রথমত বইটার বর্ণনাগুলো মিলিটারি ক্যাম্পকেন্দ্রিক হলেও সেটা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকার লোকাচার, সংস্কৃতিসসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পর্যন্ত অর্থাৎ বহুমুখী একটা বর্ণনা দিয়েছেন লেখক পুরো বই জুড়ে পাশাপাশি বর্ণনার ভাষাও বেশ সহজ সরল এবং উপভোগ্য! কিন্তু তবে কেন ওই বিশেষ ধরনের শব্দটা যোগ করা?
এ প্রশ্নের জবাবে টানব স্মৃতিকথা বা মেমোইর এর কিছু বৈশিষ্ট্য! একটি সার্থক মেমোইর হতে গেলে প্রাথমিক কিছু গুণ দরকার পরে, যেমন : একটা ভিন্নধর্মী গল্প, বর্ণনার ক্ষেত্রে নিজের পজিটিভ নেগেটিভ দুটি দিকই ফুটিয়ে তোলার মানসিকতা, স্পষ্ট এবং সরল বাচনভঙ্গি! লক্ষ্যণীয় যে মেমোইরের লেখার স্টাইলটা অনেকটা ডাইরি লেখার মত হয়ে থাকে! কিন্তু একদম নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ব্যাপারে অনেক লেখকের ঘাটতি থাকে যেকারণে লেখাটা প্রায়শই সার্থক মেমোইর থেকে বিচ্যুত হয়। যাহোক এবার বলা যাক বইটা নিয়ে! বইটাতে মেমোইরের কিছু গুণ দেখা যাচ্ছে! কিন্তু সেটা পুরোপুরিভাবে প্রকটিত হয়নি বলে একে মেমোইর বলা যাচ্ছে না!
হালকথা "আমেরিকা আমেরিকা" বইটাতে ভ্রমণকাহিনীর সাথে সাথে মেমোইর এর গুণও কিছুটা দেখা যাচ্ছে, তবে এটাকে চিরায়ত নিয়মে এই দুই জনারার কোনোটাতেই ফেলা যাবে না, দুই জনারার ফিউশনে নতুন কিছু একটা গড়ে ওঠেছে বইটাতে, যেমনটা আগে আমার নজরে পড়েনি! তাই পাঠকরা ভিন্নস্বাদের এই বইটা অন্তত একবার পড়ে দেখতেই পারেন!
এই বইটা অনেকদিন ধরে সংগ্রহে থাকা সত্বেও পড়া হয়ে উঠছিল না। দু'দিন আগে আনমনে বইটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলাম। উৎসর্গপত্র পড়েই আমি 'হুক' হয়ে গেলাম। তারপর এক এক করে আঠারোটি অধ্যায়!
বইটা পড়ে কখনো আমি একা ঘরে পাগলের মতো হাসতে হাসতে পেট ব্যথা ধরিয়েছি। কখনো বা সেই সময়কার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে অবাক হয়েছি। লেখকের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জেনে মূল্যবান কিছু শিক্ষা যেমন পেয়েছি, একই সাথে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এসবের ভিড়ে মাঝপ-মাঝেই চুপিচুপি চোখের জলে গালও ভিজিয়েছি।
লেখকের প্রথম বিমান যাত্রায় যখন বিড়ম্বনা ঘটল, তা-ও আবার ভিন্ন একটা দেশে, তিনি হাতে সাত ঘন্টা সময় নিয়ে আবারো চেক-ইন, ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করার জন্য দৌড়াচ্ছেন। আমি যেন তার ভিতরের অস্থিরতাটা নিজের ভেতরে অনুভব করছিলাম। লেখক বই-তে তার আমেরিকান মা, বো, বো-এর স্ত্রী চ্যাংলি, শাহেদ সবার চরিত্রের এত নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন যে পড়তে গিয়ে সবার একটা একটা কাল্পনিক চেহারা আমার মনে ভেসে উঠেছে। তাদের ভালো মানসিকতা আমাকে বারবার বিস্মিত করেছে। ছোটবেলার দাঁতে ব্যথা কিংবা 'কেচি' সাইকেল চালানোর গল্প থেকে শুরু করে পাকিস্তানি বন্ধু জাফরের কৌতুক, সবই যেন কল্পনায় একটা বড��� পর্দায় দেখছিলাম। 'ত্যাগ' কী জিনিস তা 'দন্ত বিড়ম্বনা' অধ্যায়ে জেনেছি। উল্লেখ্য যে, এই অধ্যায়টা পড়ে বেশ অনেকক্ষণ সময় আমি বইটা বন্ধ করে চোখ বুজে থেকেছিলাম।
লেখকের যত গল্প/উপন্যাস পড়েছি, বেশিরভাগ লেখা-ই তিনি ইতিবাচক ঘটনার মাধ্যমেই শেষ করেছেন এবং তিনি শেষটায় নেতিবাচক কোনো ঘটনা টানতে অপছন্দ করেন বলেও জানি। কিন্তু এই বইটার শেষটা ব্যতিক্রম। তিনি যেমন কেঁদেছেন, তার কান্না দেখে শাহেদ যেমন কেঁদেছে, আমিও তেমন কান্না আটকে রাখতে পারিনি। কোনো পাঠকই পারবেন না, বিশেষ করে লেখককে যারা ব্যক্তিগতভাবে চিনেন তারা তো না-ই। কারণ, কাঁদা তো দূরে থাক, লেখক খুব সহজে কখনো সামান্য মন খারাপ পর্যন্ত করেন না।
মূল কথা, পাঠক হিসেবে আমি বইয়ের প্রতিটা পৃষ্ঠায় আবেগাপ্লুত হয়েছি এবং ভাবনায় তখনকার সেই বাস্তব জগতে বারবার হারিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছি। সবশেষে মনে হলো, বইটা শুধুই একটা ভ্রমণকাহিনী না। এই বইয়ের ভিতরে এমন কিছু মন্ত্র রয়েছে, যা জীবন যুদ্ধে হার মানার আগে পাঠককে একবার হলেও ভাবতে সাহায্য করবে। লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
[বি: দ্র: এটা কোনো রিভিউ না, পাঠকের সাধারণ অনুভূতি প্রকাশ মাত্র। এই বইটা এত অসাধারণ যে, এই বইয়ের পূর্ণাঙ্গ রিভিউ লিখতে ব্যর্থ হলাম।]
বই : আমেরিকা আমেরিকা লেখক : বদরুল মিল্লাত ধরন : ভ্রমণকাহিনী প্রকাশনী : নহলী প্রচ্ছদ মূল্য : ২৫০৳ 💙