২০১৮-র কলকাতা বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েই বেস্টসেলার হয়ে উঠেছিল এই বইটি। কিন্তু কেন? এ কি শিক্ষিত বাঙালির তরফে বিস্মৃতির পর্দা সরিয়ে অতীতকে দেখার চেষ্টা? নাকি এ নিতান্তই আদিরসাত্মক দ্রব্যাদি অন্বেষণের পরিমার্জিত প্রবণতা? এই জটিল বিতর্কের মীমাংসা করার সাধ্য বা সাধ আমার নেই। বরং বইটি পড়ে আমার কেমন লেগেছে তাই জানাই। আমি বইটি পড়ে তিনটি জিনিস বুঝতে চেয়েছিলাম। এগুলো হল~ ১) কোম্পানির শাসনে কলকাতার সমাজ কি সেই সময়ের নবাবি বাংলা তথা ভারতের অন্যান্য এলাকার থেকে আলাদা ছিল? হলে কেন? না হলে কেন নয়? ২) সেই সমাজে যৌনাচারে কী এমন বিশেষত্ব ছিল যা সমকালীন ভারতীয়, বা বিশ্বের অন্যত্র কলোনিয়াল সমাজের থেকে আলাদা? ৩) সেই বিশেষত্ব, তথা অন্যান্য সমাজের যৌনাচারের থেকে কলকাতার যৌনাচারের পার্থক্যের কারণ কী-কী ছিল? দুর্ভাগ্যের বিষয়, বইটা পড়তে গিয়ে ভয়ানক হতাশ হলাম। কেন? কারণগুলো হল: ১. বইটাকে উদ্ধৃতি-সংকলন বলা উচিত। লেখক নিজের তরফে বিশেষ কিছু না লিখে স্রেফ কোটেশনে বই ভরিয়ে দিয়েছেন। হ্যাঁ, এ-কথা অনস্বীকার্য যে এই উদ্ধৃতিগুলো যে-সব বই থেকে নেওয়া হয়েছে সেগুলো দুর্লভ এবং সেই সময়ের কলকাতা তথা বাংলার সমাজজীবনের অনেক কিছুই তুলে ধরে। কিন্তু বই হিসেবে শুধু এই কোটেশন-সমগ্র পড়া বড়োই বেদনাদায়ক। ২. একটা সমাজে ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাইয়ের সূত্র মেনে অনেক কিছু হয়, হত, হবে। সেই বাংলায় পতিতা বা বেশ্যাদের সাপ্লাইয়ের ক্ষেত্রে বালবিধবাদের বিপুল সংখ্যা তথা তাদের আশ্রয় দিতে সমাজের ঔদাসীন্যকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু ঠিক কেন সেই সময়, আপাতভাবে কোম্পানির 'শাসন' থাকা সত্বেও সমাজ ও অর্থনীতির কাঠামো এতটা ভেঙে পড়েছিল যাতে গোটা সমাজটাই একটা বৃহৎ বাজারে পরিণত হয়েছিল, সেই নিয়ে লেখকের নিজস্ব নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল। তা পাইনি। একইভাবে 'হোয়াইট স্লেভ ট্র্যাফিক' হিসেবে ইংল্যান্ড তথা ইউরোপ থেকে যে বিপুল সংখ্যক মহিলাকে সেই সময় ভারতে নিয়ে আসা হত, তাদের কোনো বিবরণ বা বিশ্লেষণও পাইনি। ৩. সমকালীন লখনউ, হায়দরাবাদ, দিল্লি এবং ঢাকা থেকে এই ধরনের যৌনাচার কীভাবে ও কেন আলাদা হল, সেই নিয়ে কিচ্ছু লেখা নেই এই বইয়ে। অথচ শুধু ভারতের নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তী ইতিহাস বুঝতে গেলে এই জায়গাগুলোর সমাজজীবন তথা যৌনাচারের থেকে কলকাতার পার্থক্যটা বোঝা একান্তই জরুরি। হোয়াইট মেন'স বার্ডেন তত্ত্বে বিশ্বাসী লর্ড কার্জন নির্ভুলভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এই পার্থক্যটা। আর সেজন্যই তাঁর সময়ে ডিভাইড অ্যান্ড রুল নামক খাঁড়াটি নেমে আসে বাংলা তথা কলকাতার ওপর। এটা নিয়ে লেখক কেন একটু আভাসও দিলেন না, ভেবে ব্যথিত হচ্ছি। ৪. বেশ্যাদের গান, সেই গানের সূত্রে তৈরি হয়ে ধীরে-ধীরে কলকাতা তথা বাংলার সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ও উচ্চবর্গের নাগরিকদের মধ্যেও সমাদৃত হওয়া নানা ঘরানা, এগুলো নিয়ে লেখক অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক কিছু তথ্য দিয়েছেন। অ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গেলে এগুলো অমূল্য। কিন্তু জিনিসটা হয়েওছে ডিসার্টেশন বা থিসিসের মতো। বই হিসেবে এগুলো পড়া মানে ইসবগুল গেলার মতো ব্যাপার। যদি পুরোনো কলকাতা নিয়ে আপনার গবেষণা করার, অথবা 'সেই সময়' বা 'পূর্ব পশ্চিম'-এর মতো কিছু লেখার বাসনা জাগে, তা হলে এই বইটি অবশ্যই পড়ুন। কিন্তু আমার মতো এক সাধারণ পাঠক হিসেবে ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের আলোয় এই শহরের জীবনকে বুঝতে চাইলে এই বই আপনার জন্য নয়।
#পাঠকের_চোখে বই ~ ♦#সেকালের_কলিকাতার_যৌনাচার♦ লেখক ~ #মানস ভাণ্ডারী প্রকাশক ~ খড়ি প্রকাশনী
কলকাতা শহরের সূচনাপর্ব থেকে বাবু কালচারের সময় পর্যন্ত যৌনাচারের বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে এই বইতে। তথ্যসূত্রে প্রায় আটান্নটা বইয়ের নাম আছে, যা দেখে বোঝা যায় লেখক কী অপরিসীম পরিশ্রম করেছেন এই বিষয়ে রিসার্চ করতে। লেখক পেশায় সাংবাদিক, তবে বর্তমানে তিনি একটি সুখ্যাত প্রকাশনা সংস্থার বিখ্যাত দুটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। লেখা মূলত প্রবন্ধমূলক, তবে কোনও বিশ্রাম বা পর্ব ছাড়াই টানা পড়ে যেতে হয়। এতে প্রথমাংশের হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা যেন দ্বিতীয়াংশে গিয়ে স্কুল কলেজের টেক্সট বইয়ের মতো হয়ে যায়। বিভিন্ন বই থেকে উদ্ধৃত অংশের প্রাচুর্য আছে এই বইতে। তবে লেখক দক্ষভাবে সব ঘটনাকেই সময়ের ক্রমানুসারে সাজিয়েছেন। বেশ কিছু ঘটনা পড়ে শিউরে উঠতে হয়। এই কলকাতার বুকেই যে এমন সব ঘটনা ঘটে গেছে আমাদের অতীতে, তা জেনে অবাক হলাম৷
হার্ডকভার বইয়ের বাইন্ডিং খুব সুন্দর আর ওজনও বেশ হালকা। শুভ্রনীল ঘোষের আঁকা প্রচ্ছদ দেখেই বইটা কিনতে ইচ্ছে করে, সাথে নামকরণের আকর্ষণ তো আছেই। তবে বইয়ের ভিতরে বিভিন্ন গান বা কবিতার সব লাইনকে পাতা বাঁচানোর জন্য পাশাপাশি ছাপানো হয়েছে, আর পরের লাইন বোঝাতে "/" চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে সেগুলো পড়তে অনেকের অসুবিধা হতে পারে। প্রিন্টেড মূল্য ২০০ টাকা আমার যথাযথ মনে হয়েছে।
বিষয়ের মধ্যে পুরনো কলকাতার পতিতালয়, যৌন অপরাধ, ভ্রষ্টামি, রতিজরোগ, বাবু-বিলাস, যৌনতা সম্পৃক্ত সাহিত্য সংস্কৃতি, সমকামিতা, অজাচার, বাইজি, সঙ্গীত এবং অভিনয়ে পতিতাদের অবদান - এই সবই স্থান পেয়েছে। ধর্ম ও পূজার আড়ালে কুমারীদের সাথে বর্বরোচিত আচরণ সম্বন্ধে জানলে মনে হয় আজকের কলকাতা হয়তো সেকালেই রয়ে গেছে। ফুটে উঠেছে তখনকার বিলাসী জীবনযাপন, মদ্যপান ও অনৈতিক যৌনাচারের ছবি। তবে এইসব বিষয়ের আশ্রয় কিন্তু শুধুই নষ্টামি নয়। তাতে ফুটে উঠেছে সেকালের কলকাতার সুন্দর এক ছবি, যা লেখক সুনিপুণ হস্তে চিত্রায়িত করেছেন।
দ্বিতীয়ার্ধে এসেছে মজলিশি গানের আসর ও তার নামজাদা শিল্পীদের কথা। সেই গানের কথা আজকের দিনের সেন্সরবোর্ড যে কিভাবে নিত, তা জানতে ইচ্ছে করে। উদাহরণ দিই একটা। ১৯৫০ দশকের প্রথমার্ধে সোনাগাছির একটি বাড়িতে একজন দিদিমা-স্থানীয় বৃদ্ধার কণ্ঠে সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম শুনেছিলেন এই গানটা।
"সাধে কি হইনু দিদি, ছোকরা নাঙের বশীভূত। টাকা পয়সা দেয় না বটে, ঠাপগুলি দেয় মনের মতো।"
সব মিলিয়ে এই বই থেকে একটা অন্যরকমের কলকাতাকে চিনতে পারলাম। প্রবন্ধ আকারে লেখা বই আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা পছন্দের নয়। তবে তথ্যসমৃদ্ধ হতে চাইলে এটা পড়ে দেখতে পারেন।