স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় ফ্রীতে খাটুনি খেটেছেন? বা রক্তদান শিবির? বা কোনো ছাতার ইন্টার্নশিপে পার্মানেন্ট চাকরির আশায় ছয়-মাসের ম্যানুয়াল লেবার? এই বই পড়বার অভিজ্ঞতা অনেকটা ওরকমই। সারাদিন খেটেখুটে ক্লাবের দাদার কাছে বিরিয়ানির প্যাকেট চাইতে গিয়ে, মর্তমান কলা ও দুটো পেল্লাই ডিম-সেদ্ধ হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার সমান। এমন একখানি ইন্টার্নশিপ যেথায় স্টাইপেন্ড তো দুরস্ত, চাকরিটুকুও পার্মানেন্ট হয় না। মোটের ওপর সি.ভি-খানা পোক্ত হয়, এই আরকি।
বইপড়ুয়া হিসেবে আমারও লিংকডইন প্রোফাইলে আজ থেকে অধিরাজের সুদর্শন মুখের একটা ছবি টাঙিয়ে রাখবো। যতই হোক, দলে নাম লেখালাম অ্যাদ্দিনে। বিশাল ব্যাপার। সেলিব্রেট করতে পেলে আরো খুশি হতাম। তবে এই বইটি সেই সুযোগ দিলো না। দুটো তারা ব্যায় করছি, কারণ লেখিকার লেখনী আমার ভালো লাগে। এর আগে, সামাজিকের বাইরে থ্রিলার ঘরানায় ওনার বেশ কিছু ছোট-গল্প পড়েছি। দিব্যি লেখেন।
এই বইয়ের হাজার দুর্বলতার মাঝে, চোখে পড়ে, পুলিশি কার্যকলাপ, ফরেনসিক সায়েন্স ও যাবতীয় তথ্যাদির প্রতি নিষ্ঠার ছাপ। আর যাই হোক, গোয়েন্দা আমাদের বট-গাছের কোটরে আতস কাচ ধরে খুনি ধরে না! ভালো লাগে, দ্রুতগতির ন্যারেটিভ ও টানটান কাঠামো, যা শেষ-পাতা অবধি টেনে নিয়ে যায় পাঠককে। ভালো লাগুক কি খারাপ, পড়ে আপনাকে যেতেই হয়। ৩৫০ পৃষ্ঠা পেরিয়েও এ জিনিস সাক্ষাৎ পেজটার্নার! এবং এখানেই বুঝি সিরিজের আসল গ্রহণযোগ্যতা।
তবে খামতি প্রচুর। বইটি সম্বন্ধে হার্ডবয়েল্ড থ্রিলার তথা পুলিশ প্রসেডিউরাল জাতীয় বিশেষণের অহরহ প্রয়োগে, মনে অনেকটাই আশা পুষে রেখেছিলাম। তবে কে জানত, রহস্যের সন্ধানে 'ট্রু ডিটেকটিভ'এর বদলে মিলবে সোনি টিভির 'সিআইডি' সিরিয়ালের দেখা? খোদ ফরেনসিক এক্সপার্ট ড:চ্যাটার্জি, কোথাও গিয়ে সিরিয়ালের ডক্টর সালুখের কথা মনে করিয়ে দেন যেন। লেখিকা হাস্যরসের অবতারণা ঘটাতে গিয়ে চরিত্রদের দিয়ে ভাড়ামো করিয়েছেন স্রেফ। ব্যাপারটা বিরক্তিকর। এ লাগছে এর পেছনে, তো এ হচ্ছে রেগে লাল। সবটাই লেখা হয়েছে আশ্চর্য লঘুতা সহিত। রক্তমাংসের চরিত্রের বদলে, বইজুড়ে দেখা মেলে একঝাঁক কার্টুনের!
ভাবতে বাধ্য করে, শেষমেষ সিরিয়াল কিলিংয়েও ক্যাপ্টেন হ্যাডকের অনুপ্রবেশ?
এছাড়াও আছে অধিরাজের সহকারী অর্ণব সেনের কার্টুন-মার্কা আতাক্যালানে সব রেসপন্স। কোনো বিশেষ চরিত্রকে বুদ্ধিমান প্রতিপন্ন করতে গিয়ে, তার চারপাশের চরিত্রদের বোকাটে বানানো সাহিত্য জগতে নতুন কোনো ট্রোপ্ নয়। তবে এই বইতে...
দাড়ান, উদাহরন তুলে দি...
"এবার আর আকাশ নয়, হিমালয়টাই বোধহয় টেথিস সাগরে পরিণত হয়ে অর্ণবের মাথায় ঝুপ্পুস করে পড়ল! মনে হল, একটা কোকিল বুঝি মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগে কাও কাও করে ডাকছে! অথবা একটা জিরাফ হয়তো ঠ্যাং তুলে এক্কা দোক্কা খেলছে। কিংবা সে নিজে একটা ব্ল্যাক হোলে ঢুকে গিয়েছে, সেখানে সোফিয়া লোরেন দোলনায় দুলে দুলে গান গাইছেন, ‘পা-খি পা-খি পরদেসি-ই-ই..."
এক্কেবারে লুনি-টুনস! অতিনাটকীয় ও ফিল্মি। পাল্প ফিকশনের সাথে বঙ্গ-সিরিয়ালের উদ্ভট মেলবন্ধন। খোদ অধিরাজ নিজেই কিরীটি রায় ও ইন্দ্রনাথ রুদ্রের একবিংশ শতাব্দীর আপডেটেড সংস্করণ। অদ্রীশ বর্ধনের রেফারেন্স টানলাম, কারণ কাস্টডিতে বসা দাগী আসামি অবধি আমাদের এই অপরূপ হ্যান্ডসম অফিসারকে দেখে ভেবে ওঠে, "কি পুরুষ!" সিনেমার ভাষায় অধিরাজ আক্ষরিক অর্থেই একজন 'গ্যারি স্যু' - তার যেমন অপার্থিব রূপ, তেমনই অকল্পনীয় গুণ, একজন পার্ফেক্ট সুপারম্যান। তাই সে গুলিবিদ্ধ হলেও পাঠকের মনে সেরম চিন্তা হয়না। আবার অব্যর্থ সব অনুমানভিত্তিক ডিডাকশন করলেও, আশ্চর্য হওয়ার অবকাশ থাকে না।
ফেলুদার গল্পগুলো নাহয় তার বাচ্চা ভাইটি লেখে, একটু বাড়িয়ে-টাড়িয়ে বললেই বা। অধিরাজের অজুহাতটা কি? সে যেন নিতান্তই লেখিকার ইচ্ছাপূরণ-ধর্মী কোনো ফ্যান্টাসি হয়ে দাঁড়ায়। তার বাইরে, গোয়েন্দা হিসেবে... ক্যারিশম্যাটিক, তবে বাস্তবানুগ নয়। এছাড়াও, বইজুড়ে সব্বাই হয় মারকাটারি-ভুবনমোহিনী সুন্দর, নয় বিশ্রী রকমের কুৎসিত। আর-পাঁচজন ছাপোষা, সাধারণ, ধূসর চরিত্রদের এই সাদা-কালো বিভাজনে স্থান মেলে কম। এর সাথে, চোখে লাগে, সংলাপের নামে অতি-আবেগী ডায়ালগের মাত্রাতিরিক্ত ছড়াছড়ি। ফাজলামোর অবকাশে, মনে প্রশ্ন জাগে, সব বিত্তবান সুন্দরী মহিলা মাত্রই বুঝি একটি দৃশ্যমান রঙিন ট্যাটুর মালকিন হন?
অবশ্য, সুন্দরী মহিলাদের নিয়ে কথা হচ্ছে যখন- আমার না জানাটাই স্বাভাবিক :) এর চেয়ে বরং, ফিল্ম নিয়ে কথা হোক। ফিল্মি ফান্ডায় বই থেকে একটা কথোপকথন তুলে দি। আপনারা এটা পড়েই ইতি টানুন। দেখুন অধি-Razz-এর ভানুমতির খেল!
“কিন্তু স্যার! আপনি একটু বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন না? মিসেস জয়সওয়াল কী প্রকৃতির মহিলা বোঝেননি!”
“খুব ভালোই বুঝেছি।" অধিরাজ শেষ টানটা দিয়ে সিগারেটটা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়, "তবে আরও একটু ভালো করে বোঝা দরকার!”
– “উনি আপনাকে বরবাদ করে ছাড়বেন।”
– “ইন দ্যাট কেস...।” সে উষ্ণদৃষ্টিতে কয়েকমুহূর্ত অর্ণবের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু স্বরে বলল,—“আমি বরবাদ হতেই চাই।”
(২/৫ || ২০২৩)