শরীফুল হাসানের সাম্ভালা প্রকাশের প্রায় এক দশক হতে চললো। কালের পরিক্রমায় কেমন টিকে আছে পাঠকপ্রিয় উপন্যাস-ত্রয়ী?
একজন নতুন পাঠক ২০২০ সালে এসে যখন সাম্ভালা পড়তে যাবেন, তখন বেশ কয়েকটা ব্যাপার তার চোখে পড়বে। প্রথমে রেটিংস। গুডরিডসে সিরিজের তিনটা বইয়ের গড় রেটিং হলো ৪.০৪/৫। প্রথম প্রকাশ থেকেই ফিডব্যাক খুব পজিটিভ। প্রথম খন্ডের তো আবার ইংরেজি অনুবাদও আছে, কলকাতা থেকে বেরিয়েছে!
"I honestly didn't expect a Bangladeshi writer to have the guts to write a novel of it's (this) unique genre"
গুডরিডস থেকে নেয়া, আমার উক্তি না। পরিতৃপ্ত এক পাঠকের ‘তৃপ্তির ঢেকুর’ বলা যেতে পারে।
এতো কিছু দেখে এক্সপেক্টেশন বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু সাম্ভালা কি আসলেই এতোটা রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা?
সাম্ভালার প্রধান চরিত্র দু'জন। প্রথমজন হলো রাশেদ। অপরজন, ফ্লাপের ভাষায় বলতে গেলে ‘সহস্রাব্দ প্রাচীন রহস্যময় পরিব্রাজক’। আলোচনার সুবিধার্থে পরেরজনকে আমরা ‘পথিক’ বলে ডাকবো।
গল্পের শুরু, একটা বইয়ের জন্য রাশেদের রুমমেট/জিগরি দোস্ত খুন হওযা নিয়ে। কি মনে হয়, পেপারে বন্ধু হত্যার খবর পেয়ে আমাদের রাশেদ কি করবে? অবশ্যই, প্লটের প্রয়োজনে তল্লিতল্পা গুটিয়ে পালাবে! কিন্তু ও তো কিছু করেনি, তাহলে? (হে হে..) নাহলে যে প্রথম কয়েক পাতায় উপন্যাস শেষ হয়ে যায়!
রাশেদ পালায়, পিছনে পুলিশ লাগে। বন্ধু খুনের পরপরই কেউ দৌড়ানো শুরু করলো– সন্দেহ অবশ্যই পাশের বাসার ভাবির ঘাড়ে পড়বে না।
পুলিশ ছাড়া রাশেদকে খুঁজতে দেখা যাবে তার বন্ধু-হন্তরককে।
রাশেদের এই দৌড়াদৌড়ির ফাঁকে আমরা পরিচিত হবো ব্রিটিশ ড. নিকোলাস কারসনের সাথে। মানে ইতিহাস বেজড উপন্যাসে দুয়েকটা নার্ড না থাকলে চলে? পাঠককে ইতিহাস গেলাতে হবে তো!
আর এসবের মধ্যে মাঝে মাঝেই লেখক আমাদেরকে নিয়ে যাবেন ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে, সেই পথিকের সাথে। খুবই গণ্যমান্য লোক সে। যদিও লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে। অবশ্যই, হোয়াই নট?
আর এসব সবকিছু ধীরে ধীরে এগুতে থাকে সাম্ভালার দিকে। সাম্ভালা, পৃথিবীর বুকে স্বর্গ।
প্রথমেই বলবো প্লট নিয়ে। গল্প-উপন্যাসে অমরত্ব নতুন কিছু না। তবে দেশীয় প্রেক্ষাপটে এটা অবশ্যই অন্যকিছু। সেই হিসেবে প্লটটা কমন হয়েও আনকমন থাকে সবসময়। এবং পাঠককে চুম্বকের মতো টেনে রাখে। যদিও প্লট হোলের অভাব নেই পুরো বই জুড়ে। প্রটাগনিস্ট ১০০ তলার উপর থেকে লাফ দিলেও কিছু হয় না তার, কিন্তু আরেকজন দুই তলার উপর থেকে পড়ে মারা যাচ্ছে। (আসলে এক্স্যাক্ট সেইম জিনিস হয় না, তবে কাছাকাছি অনেক কিছুই ঘটে।)
লেখনী। যেকোনো উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথম উপন্যাসের লেখনী খুব একটা স্মুধ না। ক্লিশে টাইপ অ্যাপ্রোচ। প্লটের কারণে পড়ে যাবেন, কিন্তু লেখনী আপনাকে ‘হইহই’ করে আটকে ধরবে, ব্যর্থ হবে যদিও। লেখনী দ্বিতীয় খন্ডে যথেষ্ট উন্নতি হবে, তৃতীয়টাতে গিয়ে লেখকের অভিজ্ঞতার ঝুলি দেখতে পাই আমরা।
ক্যারেক্টারাইজেশন খুবই প্লট কন্ভিনিয়েন্ট। স্পয়লার দিব না বলে বেশি গভীরে যাচ্ছি না, তবে কিছু কিছু জায়গায় চরিত্রের জন্য গল্প নাকি গল্পের জন্য চরিত্র কাজ করছে– বুঝতে অসুবিধা হবে। তাছাড়া, গল্প টেনে বড় করা হয়েছে দ্বিতীয় খন্ডে। দরকার ছিলো না কোনো এটার। গতি স্লথ করা ছাড়া আর খুব একটা কাজে আসেনি। বরং তৃতীয় আর দ্বিতীয় এক করে ফেললে আরো সুপাঠ্য উপন্যাস পাওয়া যেত।
ফিনিশিং টা মনমতো হবে না। এন্টাগনিস্টের সাথে হ্যান্ড-টু-হ্যান্ড কমব্যাট হলো চাইল্ডিশ অ্যাট বেস্ট। বাট, ওয়েল...
২০১২ সালে সালে যখন সাম্ভালা প্রকাশিত হয়, বাঙালি তখন হুমায়ুন আহমেদে মজে ছিল। একদিকে উদ্ভট হিমু, অপরদিকে যুক্তিবাদী মিসির আলি। মাঝখান দিয়ে যখন সাম্ভালার মতো উচ্চাভিলাসী এক ফ্যান্টাসি-অ্যাডভেঞ্চার-থ্রিলার গোছের উপন্যাস হুট করে চলে আসলো, তখন তারা এমন কিছুর জন্য আসলে তৈরি ছিল না। বাংলাদেশ কেন, দুই বাংলাতেই এমন কিছু কেউ আগে দেখেনি। বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া, তিব্বত থেকে প্রাচীন গ্রিস, ফ্রান্স থেকে জর্জটাউন– কোথায় কিংবা কোন সময়ে পদচারণা নেই এই উপন্যাসের? তাই নতুন এই স্বাদ নিতেই হতো তাদের। নিয়েছেও বৈকি।
এই মিডিয়োকোর উপন্যাসের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার পিছনে কারণ বোধহয় সেটাই। আর আমাদের বর্তমান সময়ের চমৎকার উপন্যাসগুলো-ও বোধহয় এজন্যই সাম্ভালার কাছে কৃতজ্ঞ। সাম্ভালা বেস্ট না, কখনোই হবে না। তবে সাম্ভালা দেখিয়েছে, সাহিত্য কি হতে পারে বাংলার।
এখনকার সময়ে প্রকাশিত হলে কি অবস্থা হতো সাম্ভালার? মনে হয় না এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেত।
টু সাম আপ,
হয়তো একসময় অভিনব ছিল, হয়তো অনেকের নস্টালজিয়া-আদরের সাথে স্মরণ করা নাম সাম্ভালা। সত্যিকার অর্থেই এক রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা, তবে আপ-টু-মার্ক সে মোটেও না। এবং সেটা হওয়া লাগবে না আসলে। Because, when it was good it was really good, and it was bad it was often even better.
অরিজিনাল রিভিউ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০