পাঠক পাঠিকাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁদের বাসস্থান, জন্মস্থান অথবা বাবা-মার জন্মস্থান গ্রামে। তবে সবাই হয়তো যোগাযোগ রাখতে পারেন না গ্রামের সেই মামাবাড়ি, দেশের বাড়ির সঙ্গে। যাঁরা এখনও গ্রামের নাড়ির টান অনুভব করেন, আশা করি তাঁরা প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন যে গ্রামের মিষ্টি খেতে খুব ভালো হয়। শহরজীবনের ব্যস্ততায় প্রিজার্ভেটিভ দেওয়া মিষ্টি খেতে আমরা যতই অভ্যস্ত হই, গ্রামের মিষ্টির দোকানের রসগোল্লায় যেন আলাদা একটা স্বাদ, একটা আমেজ থাকে। কিন্তু গ্রামে গিয়ে মিষ্টি খাওয়ার প্রসঙ্গ কেন টেনে আনলাম সেকথা একটু পরে বলছি। আগে বলি, গ্রামে গিয়েই আমাদের শহুরে অখুশী মুখ প্রথম যেটা খোঁজে সেটা হল রসগোল্লা। সে স্বাদ অমৃততুল্য! কিন্তু রসগোল্লা, পান্তুয়া বা কালোজামের স্বাদ বহুলচর্চিত ও রসসম্পৃক্ত হলেও, কি যেন একটা মিষ্টি মনে পড়ে যায়। দাদু হয়তো বাড়ি ফেরার সময় হাতে করে নিয়ে আসতো, আর হ্যারিকেন বা লন্ঠনের আলোয় সেই মিষ্টিটুকু মুখে দিতে দিতে শুনতাম দিদার বলা সুন্দর, আশ্চর্য সব গল্প। বা হয়তো খুব ছোটবেলায় আমরাই টুক করে গিয়ে কিনে এনেছি, খেয়েছি সেই মিষ্টিটা। না, রসগোল্লা, পান্তুয়ার মত জনপ্রিয় নয়। কিন্তু ছিল মিষ্টিটা। আজও খুঁজে পাওয়া যায় মাঝে মাঝে, এদিক ওদিকে। সবার প্রিয় নয়। কিন্তু যাঁদের প্রিয়, তাঁরা কোনোদিনও ভুলবেন না, সেই মিষ্টিটাকে।
ছানার মুড়কি। যা সুবিখ্যাত হয়তো হলো না, কিন্তু একটা পুরো ছোটবেলা বা সুন্দর বিকেলবেলাগুলো জুড়ে রইল।
..শৈলেন ঘোষের গল্প হল সেই ছানার মুড়কি।
বইটিতে দুটি বড়গল্প আছে। প্রথমটি হলো “হো-বুড়োর খুদে বন্ধু”, যেটিতে মুখ্য চরিত্র এক ভবঘুরে হতদরিদ্র বাদ্যকার বুড়োমানুষ, যাঁর নাম “হো”। তার ঝকঝকে ব্যাঞ্জোর তারে হাত বুলিয়ে সে সুর বাঁধত। আর সেই মিষ্টি সুর বাজলেই চারপাশে ভীড় করা মানুষগুলো মুগ্ধ হয়ে গেয়ে উঠত-
“ফুল-টুকটুক ফুলবাগানে মৌটুসকি পাখি; পালক-ডানায় রঙের ছবি করছে আঁকাআঁকি।”
শৈলেন বাবু লিখেছেন-
“হো’র কেউ ছিল না। একা। একটি মানুষ। শহরের শেষে, যেখান দিয়ে ছোট্ট নদী একলাটি বয়ে গেছে, যেখানে নদীর এধারে ওধারে কিছু গাছ, কিছু ঝোপ, কিছু ফুল, কিছু বাঘ-খুপচুপ ঘাস হাওয়ায় দোলে, তারই পাশে হো’র একখানি ঘর। হো’র মত সেই ঘরখানারও বোধহয় অনেক বয়েস। কোনদিন না ভেঙে পড়ে! হো ঘরখানা যে সারাবে, সে- পয়সা তো তার নেই। এই ব্যাঞ্জো শুনে, খুশি হয়ে, কেউ দুটো পয়সা দিলে, তবে তার দিন চলে।”
এই হো’র জীবনে নতুন এক মুখ উঁকি দেয়। একটি বাচ্চা ছেলে। তার নাম “মন”। হো’র ব্যাঞ্জোর সুর মনের খুব ভালো লেগে যায়, তাই হো’র বাড়িতে গিয়ে ওঠে একেবারে। কিন্তু হো বারবার শেখাতে চাইলেও কিছুতেই মন হো’র কাছে বাজনাটা শিখতে চায়না। তার কারণ হিসেবে নিজের একটা লুকনো দুঃখের স্মৃতি বুকে আগলে বেড়ায় মন। ওই ব্যঞ্জোর সুরের সাথে মনের মার স্মৃতি, বাবার স্মৃতি... সব জড়িয়ে আছে যে। কষ্টের এক স্মৃতি বুকে নিয়ে থাকতে থাকতেই একদিন শরীর খারাপ হয়ে হো-বুড়ো মারা যায়। মন তখন আবার একলা।
দুঃখের স্মৃতি বুকে আগলে রেখেও কটা দিন যে হো-বুড়োর সাথে আনন্দে সুরের এক পৃথিবীতে দিন কেটে যাচ্ছিল মনের, সেই হো-বুড়ো... আর নেই।
“কথা রেখেছিল মন। হো’র সেই ব্যাঞ্জোটা বুকে নিয়ে হারিয়ে গেল, অন্য আর এক অজানা দেশে। যেন কেউ না খুঁজে পায় তাকে। নির্জন এক বনের গভীরে ঘুরে বেড়ায়। যেন কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়। যেখানে অনেক পাখি গান গায় কিংবা হাওয়ার দোলায় গাছের পাতারা যেখানে ঝিলমিলিয়ে নাচে.....”
গল্প এখানেই শেষ নয়। কি ছিল সেই দুঃখ, যার জন্য হো-বুড়োর অনুরোধ সত্ত্বেও মন কিছুতেই ব্যাঞ্জো বাজানো শিখতে চায়নি? হো-বুড়ো মারা যাওয়ার পর ব্যাঞ্জো হাতে নিয়ে হারিয়ে গেছিল মন। সেই মন কে তারপরে কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল? কোন আনন্দময় অশ্রুময় পরিণতি পেল পালিয়ে যাওয়া মন?
সবটুকু আছে প্রথম গল্পটিতে।
দ্বিতীয় গল্পটি হল “তুসি যাদু জানে”। এই গল্পে মুখ্য চরিত্র হল হাসিখুশী ও নরম স্বভাবের মেয়ে তুসি। মামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে তুসি আবিষ্কার করে যে তার মামা ভীষণ রাগী মানুষ। হইচই একেবারেই পছন্দ করেন না। তাছাড়া নিজের সন্তানদেরও খুব ভয় দেখিয়ে শাসন করে রাখেন। ছেলে মেয়ে গুলোও প্রথমে তুসির সঙ্গে খুব রুক্ষ ভাবে কথা বললেও তুসির মনে কিছুতেই রাগ বা ক্ষোভ কিছুই জন্মায় না। কারণ তুসি নিজের কাজ কর্ম নিয়েই খুশি। মামাবাড়ির সন্ত্রস্ত পরিবেশ যেন তুসি গিয়ে একেবারে পাল্টে দেয়। মামার ছেলে মেয়েরা যে নিজের বাবাকে কতটা ভয় পায় সেটা তুসি তার ভাইবোনদের একটা খাতা পড়েই বুঝতে পারে-
“তুসি খাতাটা নিয়ে পাতা ওলটাল। ওমা! পাতা ভর্তি করে বড় বড় করে এসব কি লিখেছে খাতায়! একপাতায় লেখা: বাবা আমাদের ভালবাসে না। পরের পাতায়: বাবা আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না। তারপরে পর পর: আমরা খেলা করতে পাই না। সবাই সার্কাস যায়, আমাদের কেউ নিয়ে যায় না। পড়তে-পড়তে ঘুম পেলে হাই তোলা বারণ। হাসলে বকা খাই। গল্প করলে কানমলা খাই।...”
এর ঠিক পরেই একটি ঘটনা-
“তুসি মামার কাছে এগিয়ে গেল। আপিসের জামাটা হাতে নিয়ে পাট করতে করতে বলল, জানেন মামা, টুলুর কি সুন্দর গানের গলা। আর দোলাও তেমনি নাচে। মামা যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। রেগে গাঁক-গাঁক করে চেঁচিয়ে বললেন, আমি তোমায় আগেই বলেছি, আমি এ-সব পছন্দ করি না। এ-বাড়িতে থাকতে হলে, এ-বাড়ির নিয়ম মেনে চলতে হবে! কিন্তু জানেন মামা, আমাদের স্কুলের দিদি বলেছেন, খেলবে, গাইবে, নাচবে— সুস্থ দেহে বাঁচবে। মামা তেমনি তিরিক্ষি মেজাজেই বললেন, তোমার স্কুলের দিদি কি বললেন, সে নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না। আমার বাড়িতে আমি যা বলব, তা-ই হবে।...”
এরকম পরিবেশের মধ্যেও কিন্তু তুসি সুন্দরভাবে ভাইবোনদের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নেয়। পুরো বাড়িটা যেন তুসি আসার পর আনন্দে, গানে, হইচইতে সরগরম হয়ে থাকে সারাটা দিন। কিন্তু মামা কেন রাগ করে বসে থাকেন? মামা কি কখনো বুঝতে পারবেন যে তিনি যে নিয়মের বেড়াজাল দিয়ে নিজেকে, ছেলে মেয়েকে জোর করে বাঁধতে চাইছেন, সেই বেড়াজাল ভেঙ্গে দেবে তুসির মিষ্টি ভালোবাসা আর আনন্দ? এতটাই কি সেই আনন্দের জোর, যে মামার রাগী হৃদয়ও কি শান্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে যাবে শেষ অবধি? খুব সুন্দর এক স্বাধীন মনের বার্তা যে গুরুগম্ভীর ভাবে বহন না করেও মিষ্টি একটা গল্পের মধ্যে দিয়ে বলা যায়, সেটা এই গল্পটা না পড়লে জানা যাবে না। আর অধৈর্য ও নিজেদের ব্যস্ততায় নিমগ্ন মেজাজ-হারানো বাবা-মাদের জন্য তো অবশ্যপাঠ্য এই গল্পটি।
এই হল শৈলেন ঘোষের ৩০ টাকার একটি পুরনো প্রিন্টের বই। খুব ছোটবেলায় অন্যান্য গল্পের মধ্যে দিয়ে পরিচয় হয়েছিল শৈলেনবাবুর লেখনীর সঙ্গে। পরে বড় হয়ে যতদিনে ইন্টারনেটে খোঁজ করার কথা মনে পড়েছে, জানতে পেরেছি, নিজের লেখা গল্পগুলোর মতই কালের স্মৃতিতে দুচোখ বুজে এ জগৎ ছেড়ে চলে গেছেন লেখক। শিশু ও কিশোরদের জন্য অন্যান্য লেখকদের লেখনীকে ছোট না করেই বলছি, শৈলেন ঘোষকে আজও অনেকে চেনেন না। আনন্দ ও দে’জ থেকে শৈলেন বাবুর অনেক বড়গল্পের ছোট ছোট বই প্রকাশিত হয়েছে (আজব ভেড়ার গল্প, বন সবুজের দ্বীপে .. ইত্যাদি)। রুপকথা-সমগ্রও প্রকাশিত হয়েছে। আগে পুরনো শারদীয়া আনন্দমেলাতে ওনার উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনের অভ্যন্তরে অনেকটা জায়গা ও স্মৃতিজুড়ে আছেন লেখক। স্বাদটা যে কিছুতেই ভোলার নয়। হারাতে গিয়েও হারায় না। এমনই ওনার লেখনী। খুব মনকেমন করা, অথচ সুরেলা, মিষ্টি... কোনো বাদ্যযন্ত্রের সুরের মতন।