জুলাই থেকে শুরু করে আগস্টের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত কেটে গেলো ৬ষ্ঠ বইয়ের কনটেন্ট আউটলাইন সাজাতে। ৬ষ্ঠ বইয়ের মূল আলোচ্য বিষয় ‘বিজনেস ফিলোসফি’। ইংরেজি ভাষায় লেখা বিজনেস ফ্যাবল বা ফিকশনের সংখ্যা অগণিত। আমার বইটিকে সেই শ্রেণিতে ফেলা উচিত হবে না। এটা অনেকটাই কন্ট্রোল মেকানিজমের গূঢ় এবং আরোপিত কিছু ধারণাকে ভিত্তি করে মৌলিক হাইপোথিসিস দাঁড় করানোর চেষ্টা।
হিউমার আমার অন্যতম শীর্ষ আগ্রহের জায়গা। বিজনেস ফিলোসফি শুনলে কাঠখোট্টা একটা বইয়ের কল্পনা মনোজগতে চলে আসা সঙ্গত। আমি সিদ্ধান্ত লিখেছি গভীর হাইপোথিসিসগুলো হিউমার টোনে লিখবো। বিজনেসের সাথে হিউমার; কম্বিনেশনটা অপ্রচলিত লাগতে পারে যে কারোর কাছেই। নামহীন বইতে সর্বপ্রকার এডিট এড়িয়ে গিয়েছিলাম, ‘র’ ফ্লেভার বজায় রাখার জন্য এটা দরকার ছিলো। চলতি বইতে অতি অবশ্যই সম্পাদনা করা হবে।
বিজনেস ফিলোসফি সংক্রান্ত আমার হাইপোথিসিসগুলোকে ৪টি মূল অধ্যায়ে বিভক্ত করেছি। প্রতিটির অধীনে থাকবে অনেকগুলো উপঅধ্যায়।
এই বইয়ের পাঠক কারা আসলে? বিজনেস শব্দের উপস্থিতির দরুণ বইয়ের পাঠকশ্রেণি সীমাবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করতে পারে অনেকে। তবে আমি মনে করি ক্রিটিকাল থিংকিংয়ে আগ্রহী যে কোনো আনকনভেনশনাল মানুষের জন্যই এই বইয়ে ভাবনার খোরাক থাকবে পর্যাপ্ত।
ওয়ার্ডপ্রেসভিত্তিক কোম্পানী উইডেভস এর সিওও নিজাম ভাইয়ের সাথে মৌখিক আলোচনা হয়েছে বইটিকে তারা ইংরেজিতে রূপান্তরিত করে গ্লোবাল কমিউনিটির কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিবে। বাংলাদেশের স্টার্ট আপ বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজের উদ্যোক্তাদের পড়ার অভ্যাস না থাকলেও বাইরের দেশের অনেক উদ্যোক্তাই বইটা পড়তে আগ্রহী হবে হয়তোবা। তবে দেশী উদ্যোক্তাদেরও এটা পড়া উচিত। ঔচিত্যবোধ অবশ্য আরোপিত ধারণা। সেদিকে না যাই বরং।
বইয়ের নাম রাখা হয়েছে হিউম্যান ল্যাব, যার উপশিরোনাম ‘মৌন মানুষের মানসে’। ১ মাসের চিন্তা-ভাবনা শেষে বইয়ের প্রাথমিক যে আউটলাইন পেয়েছি সেটা উল্লেখ করছি। আমি ১০৯% নিশ্চিত, লেখা শুরু করার পর এই আউটলাইনের কমপক্ষে ৮৯% পরিবর্তিত হয়ে যাবে। পাপড়ি ক্যারেক্টারকে সাজানোর নিমিত্তে আউটলাইনের খসড়া অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছিলো। লেখা শুরু হলেই চিন্তা স্বীয় সৌকর্যে ছুটে চলবে উৎকর্ষপানে।
কিছুদিন আগে আদর্শ প্রকাশনীর মাহবুব ভাই বাসায় এসেছিলেন। আমার বই ৩০০ কপিও বিক্রি হয় না জেনেও বিজনেস ফিলোসফি বিষয়ক বইটা প্রকাশে তিনি আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। তবে এই বইয়ের কলেবর কতখানি হবে, কিংবা কবে শেষ হবে- কোনো ব্যাপারেই ধারণা নেই এখনো। আমার অনুমান, সর্বনিম্ন ৩১১, সর্বোচ্চ ৫৮৯ পৃষ্ঠা হবে ব্যাপ্তি। প্রেম, পাপড়ি, পরিশুদ্ধি, প্রস্তাব, প্রকাশ, প্রস্থান সবকিছু ঘুরপাক খেতে থাকুক মননের গহীনে……
মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয় তার বিজনেস ফিকশন হিউম্যান ল্যাবে বিজনেস ফিলোসফির আদ্যোপান্ত বলেছেন। সাধারণত বিজনেস ফিকশনগুলিতে দেখা যায় একটি সমস্যা জর্জরিত কোম্পানিতে একজন প্রজ্ঞাবান কর্মকর্তা আসেন, এবং সমস্যার সমাধান করে দেন। প্যাট্রিক লিঞ্চিওনির বইগুলি এই ধারাকে জনপ্রিয় করেছে। তার দেখাদেখি আরো অনেকেই এমন বই বের করেছেন, যেগুলি কর্পোরেট জগতের বিভিন্ন সমস্যার জন্যে টোটকা হিসেবে গ্রহণ করেন অনেকে। টোটকাতে সর্দিজ্বর সারতে পারে, কিন্তু টাইফয়েড কি সারবে? যারা এই ভেবে নড়েচড়ে বসেছেন যে মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয় কর্পোরেট জগতের জটিল রোগের সমাধান দেবে, তাদের জন্যে দুঃসংবাদ। এটি কিছুরই সমাধান দেয় না। সমাধান দেয় না, তবে সম্ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া করে। চিন্তার জগতে ঝাঁকি দেয়। পুরাতন ধ্যানধারণাকে...নাহ পুরাতন ধ্যানধারণাকে ছুড়ে ফেলে সবকিছু নতুন করে করার এ্যাডভাঞ্চারাস রোমান্টিসিজম নেই এটাতে। পুরোনো জিনিস যদি ভালো কাজ করে, তো চালিয়ে যান না, সমস্যা কী! এই বইয়ের মূল চরিত্র দুটি। লেখক নিজে, এবং তার প্রাক্তন প্রেমিকা পাঁপড়ি। পাঁপড়ি ফিনল্যান্ডে রিসার্চ এবং কনসাল্টেন্সি বিষয়ক একটি বিজনেস ফার্ম দিয়েছে থ্রিপিবি ডট কম নামে। আর লেখক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করে হাবুডুবু খাচ্ছেন। পাঁপড়ি দেশে আসার পর দেড় মাসের একটা প্রজেক্ট নেয় লেখককে ব্যবসাবুদ্ধিতে সমৃদ্ধ করে তুলতে। তারা বিভিন্ন জায়গায় যান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সাথে কথা বলেন, নিজেদের মধ্যে ই-মেইল এবং এস এম এস এর মাধ্যমে আলোচনা করেন, এবং সবশেষে একটি রিয়েলিটি শোয়ের মাধ্যমে নতুন কর্পোরেট স্টার খুঁজে বের করেন। বইটিতে চারটি অধ্যায়। এর মধ্যে প্রথম অধ্যায়টি সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এখানে প্রচলিত কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণাকে লেখক মিথ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ডিবাংক করার চেষ্টা করেছেন পাঁপড়ির মাধ্যমে। যেমন সফলতা মিথ, লয়ালিটি মিথি, ব্যস্ততা মিথ, লিডারশিপ মিথ, ইত্যাদি। তবে প্রথাগত বিজনেস ফিবলের মত এখানে কর্পোরেট সুপারহিরো পাঁপড়ি সবখানে গিয়ে সবকিছু জয় করে ফিরে আসতে পারে না। তাকে মুখোমুখি হতে হয় প্রবল বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধীতার। কিছু কিছু জায়গায় রীতিমত পরাভূতও হতে হয়। এই যেমন পাঁপড়ি বলছে মিটিং কখনই ১৫ মিনিটের বেশি হবে না। ১৫ মিনিটের বেশি মিটিং মানে কেউ প্রস্তুতি নিয়ে আসে নি, জানে না, কীজন্যে এখানে আসা, ফলে কেবল র্যান্ডম কথাবার্তা এবং আইডিয়া বিনিময় হবে। কিন্তু পাঁপড়ি বললেই আপনি মানবেন কেন? কিছু কিছু ব্যাপার সমাধান করতে তো দীর্ঘ সময় মিটিংয়ে বসতেই হতে পারে! কিন্তু পাঁপড়ির কথা একদম ফেলে দেয়ার মতও তো না! আপনি যদি মিটিংয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে আগে থেকেই দীর্ঘক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে রাখেন, তাহলে মিটিংয়ে এসে র্যান্ডম কথাবার্তা, অর্থহীন পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন আসলেই কমে যাবার কথা। পাঁপড়ি বলছে, ঘনঘন মিটিং কোম্পানির প্রোডাক্টিভিটি কমে যাওয়ার লক্ষণ। কিন্তু আপনি বলছেন, একজন ম্যানেজারের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সাথে বসতেই হয় বিভিন্ন প্রয়োজনে। এইসব তর্ক বিতর্ক পাঠ করতে গিয়ে হয়তো বা আপনি আপনার কোম্পানির জন্যে উপযুক্ত কোনটা সেটা বুঝতে পারবেন। আরো কিছু মিথ সম্পর্কে বলা যাক। আইডিয়া মিথ- যার মাথায় যত আইডিয়া আসে সে কি তত মেধাবী এবং ক্রিয়েটিভ? নাকি সে আসলে একজন অন্তসারশূন্য Poser? পাঁপড়ির সাথে তার ছোটভাই বিত্তের তর্ক হয় এ নিয়ে। পাঁপড়ির মতে, যে ‘আইডিয়া’ নিয়ে কমপক্ষে তিন সপ্তাহ মাথা খাটানো হয় না, সেটাকে আইডিয়া বলে গ্লোরিফাই করা মানে সিস্টেম লস। আমরা অনেকেই অপেক্ষায় থাকি হুট করে আকাশ থেকে একটা মিলিয়ন ডলারের আইডিয়া চলে আসবে, আর আপনি লুফে নিয়ে মিলিয়নিয়ার হয়ে যাবে। আসলেই কি এভাবে ঘটে ব্যাপারগুলি? আসলেই কি আইডিয়া নিয়ে এত উত্তেজিত হওয়া উচিত? ব্যস্ততা মিথ- আপনি একটি কোম্পানির এমডির সাথে দেখা করতে গেলেন। সে আপনার পরিচিত। কিন্তু রিসিপশনিস্ট আপনাকে চেনে না। সাফ জানিয়ে দিলো, তিনি ব্যস্ত আছেন। বসতে হবে। এক ঘন্টা বসার পর ডাক পড়লো। এমডি সাহেব আপনাকে দেখে হন্তদন্ত হয়ে বললেন, “আরে তুমি! আগে জানাবে না! তাহলে এতক্ষণ বসিয়ে রাখতাম না”। ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? তিনি আসলে সময় দিতে পারতেন। আপনার হাতে সময় প্রচুর। এখন কোনটাকে প্রায়োরিটি দেবেন এটা হচ্ছে কথা।
লয়ালিটি মিথ- একজন আপনার কোম্পানিতে ১০ বছর ধরে চাকুরি করছে। তার ওপর আপনি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারেন। অফিস আর বাসা তার কাছে আলাদা কিছু নয়। গভীর রাত পর্যন্ত প্রায়ই অফিস করে। তার পারফরমেন্স ভালো, সে আপনার কোম্পানির রেভিনিউ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তার সাথে আপনার সম্পর্কও খুব ভালো। এরকম লয়াল লোক তো সব কোম্পানির সম্পদ, তাই না? কিন্তু পাঁপড়ি বলছে এটা আরো গভীর পর্যবেক্ষণের দাবীদার। দশ বছরে সে আপনাকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু এমনও তো হতে পারে, তার দেয়ার যতটুকু, তা আর দিচ্ছে না সে। ফলে আপনার কোম্পানির গ্রোথ ১০% এর জায়গায় ৫% হচ্ছে। এই লয়ালিটি কি আসলেই আপনার দরকার? লিডারশিপ মিথ- একজন ম্যানেজার বা একজন টিম লিডার আসলে কতটুকু লিডার যদি তার অথোরিটি টপ ম্যানেজমেন্টের কাছে বাঁধা পড়ে থাকে? লিডার মানেই কি এক্সট্রোভার্ট আর বাকপটু মানুষজন? লিডারের তরফ থেকে সাময়িক মোটিভেশন পেলে কি আসলেই এক্সিকিউটিভের প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে?
এমন দুর্দান্ত সব তর্ক বিতর্কের মধ্যে দিয়ে প্রথম অধ্যায় শেষ হয়। প্রথম অধ্যায়ে যে আলোচনাগুলি হয়েছে সেটিই বইয়ের জ্বালানি। পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে যে বিষয়গুলি এসেছে তার অনেকগুলিই প্রথম অধ্যায়ের সাথে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কান্ট্রি কালচার, ইউনিকনেস ইলিউশন, ইগো হিলিং ইত্যাদি। কান্ট্রি কালচার সম্পর্কে পাঁপড়ি বলছে, একেক দেশের মার্কেট একেকরকম তাই মার্কেট স্টাডি একেক দেশের জন্যে একেক রকম হতে পারে, কিন্তু এতে আসলেই খুব একটু বিশাল হেরফের হয় না। দেশ যেমনই হোক, দেশের আবহাওয়া যেমনই হোক, ক্ষুধা-তৃষ্ণা-যৌনতার অনুভূতি ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া সবখানেই একইরকম। তাই মানুষকে স্টাডি করলেই আসলে মার্কেট স্টাডি হয়ে যায়। সিভি নিয়ে অভিযোগ গুরুতর। গঁৎবাধা এই জিনিসটা থেকে আসলেই যথাযথ কর্মী বাছাই করা সম্ভব? কিন্তু একটা পোস্টের জন্যে ১০০০ সিভি পড়লে শর্টলিস্ট করবেই বা কীভাবে? হ্যাঁ, শর্টলিস্ট করা যায় অন্যভাবে। এবং এটা অত্যন্ত জরুরী। একটা কোম্পানির প্রোডাক্ট যতই ভালো হোক, হায়ারিং যদি যথাযথ না হয়, একটা সময় সেটা মুখ থুবড়ে পড়বে, নয়তো স্থবির হয়ে যাবে। সবচেয়ে বিতর্ক তৈরি করতে পারে যে মতবাদটি, তা হলো, “স্কিল একটি ওভাররেটেড বিষয়”। কোম্পানিগুলি স্কিলড লোকজন খোঁজে, যেন তার যে কাজ, সেটি ভালোভাবে করতে পারে। কিন্তু স্কিলড লোকটির মধ্যে যদি লিডারশিপ না থাকে, ডিপ থিংকিং না থাকে, দুই বছর পরে সে কতদূর টেনে নিয়ে যেতে পারবে কোম্পানিকে? লেখকের মতে স্কিলড কর্মী গড়ে নেয়া যায়। এর জন্যে হয়তো সময় লাগে, কিন্তু তার অন্যান্য গুণ যদি থেকে থাকে, তাহলে স্কিল বৃদ্ধিতে কোম্পানির ইনভেস্টমেন্ট তাকে খাঁটি সোনায় পরিণত করতে পারে। আচ্ছা, ইনভেস্টমেন্ট বলতে আপনি কী বোঝেন? শুধু টাকা বিনিয়োগ করা? এ নিয়েও বিস্তর কথা আছে, ভাংলাম না। বইয়ের শেষ অধ্যায়টা বেশ বিরক্তিকর। রিয়েলিটি শোয়ে প্রতিযোগী আর বিচারকদের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছে, সেগুলি আ���ের অধ্যায়গুলির মত শক্তিশালী না। কিছু অপ্রোয়জনীয় এবং অহেতুক তর্ক বিতর্ক আছে। এর মধ্যে হঠাৎ করে লেখক এবং পাঁপড়ির প্রেমালাপ, ঠিক জমে নি। বইটির দৈর্ঘ্য ৩৪২ পৃষ্ঠা আমার কাছে অনেক বেশি মনে হয়েছে। তার আগের বইটি ছিলো এর দ্বিগুণ আয়তনের। বই বড় করে তিনি কী আনন্দ পান তা জানি না। বইয়ের শেষে লেখকের কোম্পানি হিউম্যান ল্যাবের দুটি কাজের নমুনা দেয়া হয়েছে। লেখকের আসলেই হিউম্যানল্যাব নামক একটি কোম্পানি আছে। তিনি বিভিন্ন কোম্পানিতে মানুষের প্রোডাক্টিভিটি অপটিমাইজেশনের সার্ভিস দিয়ে থাকেন। অন্যরকম গ্রুপে দীর্ঘ নয় বছর এই কাজটি করেছেন। তিক্ততার মধ্যে দিয়ে বিদায় হলেও এখানকার অনেককে গড়ে তোলাতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন, তা বলতেই হয়। একসময় আমার মেন্টর ছিলেন তিনি, তাই আমার সাক্ষ্য আমলে নিতে পারেন। বইটি টানা পড়তে গিয়ে আমার অস্বস্তি হচ্ছিলো। ডিস্টার্বড বোধ করছিলাম। এত এত ব্যবসা, বিক্রি, গ্রোথ, এর বাইরে কী জীবন নেই? আমি কি ফাঁদে আটকা পড়ে যাচ্ছি? লেখক নিজেও এই বোধে আপ্লুত। পাঁপড়ির সাথে তার খুনসুটি, ব্যক্তিগত জীবনের অপারগতা, ব্যর্থতা, সবকিছু ছেড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে চলে যাবার ইচ্ছা আমাদের জানিয়ে দেয়, মানুষের জন্যে ব্যবসা, ব্যবসার জন্যে মানুষ না। বিজনেস ফিলোসফি ব্যাপারটাকে আমি এভাবেই সংজ্ঞায়িত করি। যারা চায়না থেকে প্রোডাক্ট এনে বিক্রি করছেন, তারা উদ্যোক্তা, তারাও ব্যবসায়ী, তবে এই বইটি তাদের জন্যে না। যারা যুগের পর যুগ বাপ-দাদার সফল ব্যবসার হাল ধরে নিরাপদ লভ্যাংশ পাচ্ছেন নির্বিঘ্নে, তাদের জন্যেও না এই বইটি। যাদের সাহস আছে, যারা চিন্তা করতে ভালোবাসেন, যারা চিন্তার ফলাফল কাগুজে মুদ্রায় দেখতে চান, তাদের জন্যে এই বই। তবে আমি মনে করি ব্যবসার ধারেকাছেও নেই এমন মানুষেরও এই বইটি পড়া উচিত। বিশেষ করে কমবয়সী ছেলে-মেয়েরা, যাদের চিন্তাজগৎ এখনও সিস্টেমের কোপানলে পড়ে অতটা আবদ্ধ হয়ে যায় নি, তাদের চিন্তার জগতে অসাধারণ আলোড়ন নিয়ে আসতে পারে বইটি। বিজনেস ফিকশন না বলে সেলফ হেল্প বা মোটিভেশনাল ক্যাটাগরিতে ফেলতেও তাই আমার আপত্তি নেই এই বইটিকে, লেখক যতই বিরক্ত হোন না কেন এতে!
বইটির ঠিক পাঠ প্রতিক্রিয়া শুধু নয় আসলে বইটি কেন পাঠ করা যেতে পারে সে বিষয়ক একটি প্রস্তাবনা
ক . কেন পড়বেন :
১. “প্রচ্ছদশিল্পীর বক্তব্য” থেকেই শুরু করি “ তাহলে, এই বইয়ের পাঠক কারা ? যারা ব্যবসা করে , তারা বিজনেস ফিকশন পড়েন না আর সাধারনত যারা বিজনেস ফিকশন পড়েন তারা ব্যবসা করেন না ।তবে শেকল ভাংগার সাহস যার ভিতরে বিদ্যমান , এই বই তাকে উৎসাহী করবে বলে আমি ধারনা করি । আপনিই ভাল জানেন আপনার অবস্থান কোথায় ............”
সুতরাং নিজের অবস্থান জানার জন্য পড়তে পারেন
২. পৃষ্ঠা ১৫৮ : “আপনাদের পাঠক-ইগো আহত হলো ? আপনার কি মানুষ আদৌ; আমার দৃষ্টিতে আপনার হলেন ইগোর কারখানা । শার্টের পকেটে , প্যান্টের জিপারে , ওড়নার আড়ালে যত্রতত্র পুষে রাখেন অবিনাশী ইগো;”
কি এমন “গাছের গোটা ” হয়েছেন লেখক সেটা জানতে , কি এমন লিখেছেন সেটা পড়তে এবং একটা দাত ভাংগা জবাব দিতে দুনিয়ার সকল পাঠককূল বইটি পড়তে পারে৩. পৃষ্ঠা ৭০ :
“ প্রায় প্রত্যেক কোম্পানীতেইখাস চাকর প্রকৃতির কিছু মানুষ থাকে বুঝলে। এদের যোগ্যতা খুবই কম, তবু তারা বসের প্রিয়ভাজন, কারণ পারলে তারা রাতেও অফিসে থেকে যায়, রাত ৮টা-৯টা বেজে যাবে, তবু বের হওয়ার লক্ষণ নেই।বেশিরভাগ কোম্পানীতে বস যেহেতু অফিসেই ঢোকে দুপুরের পরে, ইমপ্লোয়ি যখন অফিস টাইম শেষে ঘরে ফিরতে উদ্যত হয়, তার মধ্যে খচখচানি কাজ করে। সে ভাবে, ৬টা বাজামাত্র বাসায় যাওয়ার কী দরকার, কোম্পানীর প্রতি কোনো ফিলিংসই নেই। পক্ষান্তরে, যে ইমপ্লোয়ি সন্ধ্যার পরেও অফিসে থাকে, মালিকপক্ষ মনে করে সে ফ্যামিলি টাইম স্যাক্রিফাইস করে অফিসে রয়ে গেছে। কিন্তু এটা ভাবে না, নির্ধারিত সময়ের পরেও সে অফিসে কেন থেকে যাবে, এতে ইলেকট্রিসিটি বিল এবং এসির অপচয় হচ্ছে এটাও কি মাথায় আসে না? নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাও যে প্রশংসনীয় যোগ্যতা এটা ভুলে যায় বেমালুম। ফলে অফিসটা আর অফিস থাকে রূপান্তরিত হয় ইডিয়টখানায় ।”
আমি জানি বেসরকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই খুশি হবেন নিজেদের মনের কথা লিখেছেন লেখক এই ভেবে , কিন্তু একটু এগিয়ে পৃষ্ঠা ৭১ এ পাবেন :
“ তুমি আসলে কাকে ইডিয়ট বললে; সিস্টেম, নাকি মানুষকে? আমি যেহেতু অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের মার্কেটে কনসালটেন্সি করে টিকে থাকার চেষ্টায় আছি, আমি জানি বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিজনেসই আসলে খুব কষ্টে চলে; পরের মাসে ইমপ্লোয়ি সবার বেতন দিতে পারবে কিনা এই অমানুষিক চাপ নিয়েই উদ্যোক্তাকে দিন পার করতে হয়। তুমি যে বললে, মূল উদ্যোক্তা অফিসে আসে দুপুরের পরে, সে থাকে কোথায়? কোনো না কোনো প্রজেক্টের খোঁজে। তুমি বড়ো কোম্পানী বা সরকারী অফিসে যদি প্রজেক্ট করতে চাও, সেই নবাবফৌজেরা কোম্পানীর মালিক ছাড়া কারো সাথে কথা বলবে না। ফলে উদ্যোক্তাই প্রধান সেলস পারসনের কাজ করে। তারা মনের দিক থেকে অসহায় বোধ করে, কোনো ইমপ্লোয়ি যদি বেশি সময় অফিসে থাকে, তাদের মনে হয় যুদ্ধটাতে সেও অংশ নিচ্ছে বাড়তি লোড নেয়ার মাধ্যমে। এখান থেকে মেন্টাল এটাচমেন্ট এবং ডিপেন্ডেন্সি তৈরি হয়। কেউ যদি ঘড়ি ধরে অফিস করে তার সাথে কমার্শিয়াল রিলেশনের বাইরে মানসিক যোগাযোগটা গড়ে উঠে না ”
পুরো বই জুড়ে এরকম কয়েনের দুপিঠই দেখানো হয়েছে । লেখক অবশ্য কোন সিদ্ধান্ত দেন নি । ডট গুলো দিয়েছেন , ডট কানেক্ট করে হনুমান না ডায়নোসার আকবেন সেটা পাঠ৪. নন প্রফিট সেক্টর এনজিওতে প্রায় ৫ বছর আর ব্যাংকে ৮ বছরের অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে এইচ আর , সিস্টেম , উদ্যোক্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন বিষয় সর্ম্পকে যে সব ইনসাইট তৈরি হয়েছিল এবং যে গুলো পাবলিকলি বললে চাকরী থাকবে না সেরকম অনেক কিছুই লেখক যথাযথ ভাবে তুলে ধরেছেন বইয়ে । সুতরাং উদ্যোক্তা , সি ই ও, এইচ আর , ক্যারিয়ার কাউনিসলার , মার্কেটিয়ার সবাই পড়তে পারেন ।
এর বাইরেও “ সফলতা”, “ জীবনের মানে ” র মতো জটিল বিষয় যারা খুজে বেড়াচ্ছেন , ফিলসফি নিয়ে আগ্রহ আছে পড়তে পারেন । তবে মনে রাখবেন লেখক চামুচে তুলে খাওয়ানোতে বিশ্বাসী না সুতরাং “ইহাকে উহা বলে” টাইপের কিছু পাবেন না , চিন্তার নতুন এংগেল পাবেন ।
খ. কি বিষয়ক বই :
১. বইটা একটা বিজনস ফিকশন । কিন্তু আলোচনা আবর্তিত হয়েছে বিজনেস ফিলসফিকে ঘিরে । উদ্যোক্তা , বিজনেস প্রসেস , মার্কে টিং , রেভেনিউ জেনারেশন , সিভি থেকে হায়ারিং , সবই এ বইয়ে উঠে এসেছে ২. এর পাশাপাশি কিছু নতুন মৌলিক কিংবা প্রায় মৌলিক টার্মস বোনাস । যেমন ফিট আর আন ফিট এ:
লেখকের ভাষায় : “মিসফিট ব্যাপারটা আসলে কী ? এটা এক ধরনের অনুভূতি , যখন একজন তার সমাজ , তার সময়, সিস্টেম , সোশ্যাল কনটেক্সট, গড় মানুষের আচরণ -কোনো কিছুর সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারে না , সবকিছুকে মিনিংলেস ও স্থুলবুদ্ধির মনে পৃষ্ঠা ২২২ তার পাশাপাশি মিসফিটের ৩ টা ধরন ও তুলে ধরেছেন ।
৩. হলিউডি মুভির একটু পরিচিত পরিচালকদের যার দুই একটা মুভি হিট হয়েছে তাদের দেখা যায় নতুন মুভির শুরুতে বা ট্রেলারে লেখতে From the Director of X, Y Z . এটা পার্সেোনাল ব্রানিডং এর একটা কৌশল । পরে যখন পরিচালক বিখ্যাত হয়ে যায় তখণ এটা উল্টা হয় তখন ��বাই বলে কুবরিক এর মুভি , কিংবা স্পিলবার্গের মুভি । লেখকদের ক্ষেত্রে ও তাই নন্দিত নরকের লেখক হুমায়ূন আহমেদ থেকে কিংবা হুমায়ূন আহমেদের বই এর জার্নি টা ও সে রকম । এই আলাপটা তোলার কারন হলে আমার সাথে এই লেখকের পরিচয় তার একটি নামহীন বই আছে , সেটির মাধ্যমে । যে বইটিকে আমার মনে হয়েছে ব্যাক্তি মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয় এর বিজনেস কার্ড , পার্সোনাল ব্যান্ডিং টুলস ( লেখক অবশ্য এটা কোথায় ও বলেন নি ) । সে দিক থেকে তিনি বলেই নিয়হিউম্যান ল্যাব (মৌন মানুষ মানসে) তার উদ্যোগ Human Lab 777 এর ব্রোসিউর , সুতরাং পাঠক বইটি পড়লে বই তো পেলেন তার প্রতিষ্ঠান থেকে কি ধরনের সেবা পেতে পারেন তারও একটি ধারনা পাবেন । এ ক্ষেত্রে পাঠক ভেদে লক্ষ্য ও উপলক্ষ্য (বই পাঠ এবং প্রতিষ্ঠানের সর্ম্পকে জানা ) ভিন্ন হওয়ায়ই স্বাভাবিক ।
গ. হোচট :
জগতের কোন কিছুই আসলে নিখুত নয় । বইটি পড়তে গিয়ে হোচট খাবার মতো বিষয় মনে হয়েছ·
সেলস , মার্কেটিংএর বেসিক কিছু টার্মিনোলজি না জানা থাকলে মাঝে মাঝে একটু হোচট খেতে হতে পারে (অবশ্য গুগল সমাধান )।
কোন , কোন জায়গায় ফিকশনের ক্যারেকটার আর উত্তম পুুরুষ লেখকের বক্তব্যের ট্রানজিশন খেই হারিয়েছে বলে মনে হয়েছে ।
আর কিছু জিনিস আমি নিশ্চিত নই লেখকের আগের নামহীন বই পড়া না থাকলে পাঠক হুট করে রিলেট করতে পারবে কীনা ?
দারুণ কিছু লাইন: সিদ্ধান্ত বা উপসংহারে পৌঁছানো মৃত মানুষের বৈশিষ্ট্য; সিদ্ধান্ত জাজমেন্টাল অবস্থা, অনুসন্ধান এক্সপ্লোরিং মানসিকতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। জগতে পারফরম্য্যান্সই শেষ কথা, স্টাইল হলো কেকের ওপরে থাকা ক্রিমমাত্র, যা থাকলে ভালো, কিন্তু না থাকলেও কেকের চাহিদা কিছু কমে না। যে ব্যক্তি পাঁচ বছর একনাগাড়ে প্রত্যাখ্যান এবং গালিগালাজকে উপেক্ষা করতে পারবে তার পক্ষে ইমেজ গড়ে তোলা একেবারেই অসাধ্য কিছু নয়। ইচ্ছার পার্থক্য আছে বলেই সামাজিক স্তরবিন্যাস লক্ষ কারি আমরা। প্রজ্ঞার প্রধান শর্তই হলো পর্যবেক্ষণ এবং শোনা।
একটা বই এত দাম দিয়ে কেনার পরে সেটা না পড়ে ফেলে রাখাটা পাপ হবে দেখেই কোনরকমে পড়ে শেষ করা। বিজনেস ফিকশনের নামের লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পটাই বেশী তুলে ধরা হয়েছে যেখানে পরকীয়ার প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন সম্মতি জ্ঞাপন ফুটে উঠেছে। মোটের উপর বলা যায় যে বইটা সুখপাঠ্য না হলে ছুড়ে ফেলে দেয়ার মতও না।