মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচিত প্রবন্ধ পাঠ শেষে পাঠক হিসেবে আমার একটাই উপলব্ধি; লেখক আমাদের সভ্যতার সূক্ষ্ম সৌন্দর্য, নৈতিক মূল্যবোধ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মননশীলতার দিকে নিয়ে যেতে চান। বইয়ের প্রতিটি প্রবন্ধেই তিনি যেন উচ্চারণ করেন, মানুষের জীবন কেবল অর্থ, বৈষয়িক প্রাপ্তি কিংবা প্রযুক্তির চূড়ান্ত উৎকর্ষের জন্য নয়; বরং প্রকৃত জীবনের উদ্দেশ্য হলো আনন্দ, সৌন্দর্য, এবং আত্মিক উন্নয়নের সন্ধান।
বিশেষ করে "মূল্যবোধ ও যুক্তিবিচার" প্রবন্ধে লেখক স্পষ্ট করেছেন, সভ্যতার প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো নৈতিকতা এবং যুক্তিবাদ। কেবল আবেগ বা স্থূল ভোগবাদে নয়, তিনি জীবনকে দেখতে শিখিয়েছেন যুক্তির আলোয়। আধুনিক সমাজের ভোগবাদী প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি আমাদের সতর্ক করেছেন। বস্তুগত আরামের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা যেন আত্মার আরাধনা ভুলে না যাই।
লেখার ভঙ্গি কখনো কখনো অতিমাত্রায় রোমান্টিক ও উচ্চমার্গীয় মনে হতে পারে। পাঠক হিসেবে অনুভব হয়, লেখক যেন জীবনের সমস্ত আনন্দ, প্রেম, এবং সূক্ষ্ম রসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। বিজ্ঞান, অর্থনীতি বা রাজনীতির মতো বিষয়গুলিকে তিনি তুলনামূলকভাবে স্থূল বলে এড়িয়ে গেছেন। তবে এটুকু মানতেই হয়, লেখকের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্নকিছু, তিনি পাঠককে স্থূলতা থেকে ছাড়িয়ে সূক্ষ্মতার দিকে আহ্বান জানান।
আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো, এই প্রবন্ধগুলিতে ব্যক্তিগত অনুভব ও সাহিত্যিক নান্দনিকতা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। লেখক বারবার জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার কথা বলেছেন। জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার বাইরেও যে গভীর আনন্দ ও সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যেমন তিনি লেখেন, প্রয়োজনীয় আর অপ্রয়োজনীয় জিনিসের পার্থক্য বোঝা যেমন জরুরি, তেমনি জীবনের সার্থকতা বোঝার জন্যও দরকার সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই প্রবন্ধগুলো নান্দনিকতা ও নৈতিকতার এক আন্তরিক অন্বেষণ। বইটি আমাদের শেখায়, সভ্যতার প্রকৃত সাফল্য কেবল প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; বরং মানুষকে মানুষ করে তোলার ভিতরে যে আত্মিক উৎকর্ষ, নৈতিক শক্তি এবং আনন্দ রয়েছে সেইটাই মহান। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর এই উচ্চমার্গীয় ভাবনা আমাদের চিন্তার পরিধিকে প্রসারিত করে। যদিও কখনো কখনো তা বাস্তব জীবনের কঠোর বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে না-ও হতে পারে। তবুও, তার চিন্তা-ভাবনার যে সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্য, তা যেকোনো পাঠক মনকে ছুঁয়ে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।