কথাসরিৎসাগর পৌরাণিক কাহিনী বা মাইথোলজির এক বৃহৎ বই। অবশ্য এর উৎস হচ্ছে গুণাঢ্য রচিত বৃহৎকথা যার সৃষ্টি দাক্ষিণাত্যে খৃষ্টিয় প্রথম বা মতান্তরে তৃতীয় শতকে সাতবাহন রাজাদের রাজত্বকালে। এর ভাষাকে বলা হচ্ছে পৈশাচিক যা সম্ভবত প্রাকৃত ভাষারই একটি রূপ। কাশ্মীররাজ অনন্তদেব বা মতান্তরে শ্রীহর্ষদেব এর মহিষী সূর্যমতীর উৎসাহে এর সরল সংস্কৃত অনুবাদ করেছিলেন সোমদেব। এরই নাম কথাসরিৎসাগর। মূলত কৌশাম্বীর অধিপতি বৎসরাজ উদয়ন ও তার পুত্র নরবাহন দত্তের জন্মবৃত্তান্ত ও জীবনচরিতই এই বৃহৎ গন্থের মূল। তবে কাহিনীর ডালপালা গজিয়েছে একটার পর একটা, গল্পের পরে গল্প। পড়তে গেলে খেয়াল থাকে না কোন গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, তারপর সেই গল্পের চরিত্র কোন গল্প বললেন, তার সেই গল্পের চরিত্র আবার কোন গল্প বললেন। এভাবে গল্পের চক্রমালা দিয়ে গড়া এই বৃহৎ গ্রন্থ। একই ধরণের কৌশল খেয়াল করা যায় আরব্য রজনীর গল্প বলার ধরণেও যা সম্ভবত খৃস্টিয় অষ্টম বা নবম শতকের পরে রচিত হয়েছিল। যদিও মূল কাহিনীগুলোর মিল নেই তবে গল্প বলার ধরণে এই মিল দেখে মনে হতেই পারে কথাসরিৎসাগর বা এর উৎস বৃহৎকথা হয়তো প্রভাবিত করেছিল সহস্র এক আরব্য রজনীর গল্প বলার ঢং এ। আরেকটি মিল আছে দুটো গ্রন্থে দুটোই আদি রসাত্মক। অন্য কথায় বলতে গেলে দুটো গ্রন্থই পুরোপুরি প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য।
কথাসরিৎসাগর যেহেতু পৌরাণিক কাহিনী তাই সেখানে মানুষের সাথে আছে বিদ্যাধর, দেবতা, দানব, অসুর, যক্ষ, নাগ, গরূঢ়, গন্ধর্ব, রাক্ষস, দৈত্য এমনকি পশু পাখির চরিত্র। সেসময়ের মানুষের কল্পনা,ধর্মবিশ্বাস ও নৈতিক মূল্যবোধ মিশে আছে গল্পের কাহিনীগুলোতে। তাছাড়া ষড় রিপুর প্রথম রিপু কাম সংক্রান্ত বর্ণনা তো আছেই প্রায় বেশিরভাগ গল্পে। গল্পের ছলে নারীকে বারবার হেয় করার প্রয়াস যেমন আছে, আছে তার মূল সাধনা পতিব্রতা হবার মধ্যেই নিহিত এমন নীতিকথা। নারী যে স্বভাবতই ছলনাময়ী, পুরুষের চেয়ে তার কাম নাকি আটগুণ বেশি এবং সে যখন তখন তার চরিত্র স্খলন করে ফেলে স্বামী সেবা এমন উল্লেখ আছে ঢের ঢের গল্পে। আর তার জীবনের মূল লক্ষ্য বা সাধনা হচ্ছে পতির প্রতি আনুগত্যে এবং সেটাতেই তার সর্বসিদ্ধি এমন উল্লেখই পাই অসংখ্য গল্পে। এসবই হয়তো সেসময়ের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী অথবা একজন পুরুষ লেখকের মনের কথা। পুরুষদের অবশ্য এসব বালাই নেই, বিশেষ করে উদয়ন, নরবাহনদত্ত বা বিক্রমাদিত্যের মতো শক্তিমান রাজপুরুষদের। তাই তাদের অন্তঃপুরে দেখা যায় অসংখ্য নারী। এক বিয়ে করতে গিয়ে তারা প্রেমে পড়ে যান আরও অন্য কোন নারীর। তবে হারান না কাউকেই। বিশেষ করে নরবাহন দত্ত যে কয়টি বিয়ে করলেন সে হিসেব করতে গেলে বোধহয় মাথায় প্যাচ লেগে যাবে। তবে সব গল্পই যে রাজাদের প্রেম অথবা কাম কাহিনী তাও নয়। পঞ্চতন্ত্রের গল্প বা বেতাল পঞ্চবিংশতির গল্পগুলোও তো এই গ্রন্থের অন্র্তভুক্ত যেগুলোর কিশোর সংস্করণ পড়েছিলাম ছোটবেলায়। ভালো লেগেছিল বলেই এই মূল গ্রন্থটির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। অতিরিক্ত নারীলোভি পুরুষের গল্প মাঝেমধ্যে একঘেয়ে এবং বিরক্তিকর ঠেকেছে সত্যি, তবে বিষয়বৈচিত্র্যও তো ছিল তাই বইটি একটানা পড়ে যেতে আগ্রহই পেয়েছি।
গল্পগুলোয় ভারতের মূল ভুখন্ড ছাড়াও কর্পূর দ্বীপ, কটাহ দ্বীপ, সূবর্ণ দ্বীপ, নারিকেল দ্বীপ, সিংহল দ্বীপ এমন দশটি দ্বীপের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে অবশ্য সিংহল দ্বীপ ছাড়া অন্যগুলোর বর্তমান নাম তো জানা যায় না। উল্লেখ আছে তাম্রলিপ্ত বন্দর, পুন্ড্রবর্ধন, রাঢ়, বঙ্গ এমন সব বাংলার নানা স্থানেরও। তবে মূল কাহিনী উত্তর ও মধ্য ভারত জুড়েই। সাথে বারবার এসেছে বিন্ধ্যপর্বত, হিমালয়ের কথাও। হিমালয়কে ভাবা হয়েছে দেবতাদের কিংবা বিদ্যাধরদের আবাসস্থল। এই বিদ্যাধর যে কারা তা জানি না। তবে এদের রূপ অপরূপ, মানুষের চাইতে এরা শ্রেষ্ঠ এবং এমনকি আকাশে ঘুরে বেড়াতে সক্ষম এবং জানে নানা মায়া বিদ্যাও। মায়া বিদ্যা আছে দানব, দেবতা, যক্ষদেরও। কাহিনীগুলোতে কয়েকবার উল্লেখ আছে পারস্য, কৈলাশ, মানস সরোবর অর্থাৎ তিব্বতের এমনকি কৈলাশের ওপারের কথাও। কালকূট বা সমরেশ বসুর একটি লেখায় উল্লেখ পেয়েছিলাম দেবলোক, গন্ধর্বলোক, স্বর্গ, সুমেরু প্রভৃতির কথা যে পৌরাণিক কাহিনীতে পাওয়া যায় সেগুলো আসলে পৃথিবীতেই, ভারতের উত্তর থেকে উত্তর দিকে সম্ভবত যেখান থেকে আর্যরা এসেছিলেন। এই গ্রন্থে তার সাথে বেশ মিল পাওয়া যায়। তাই নরবাহনদত্ত যখন বিদ্যাধরদের রাজা হয়ে হিমালয় জয় করে কৈলাশের ওপারে গিয়েও তার রাজত্ব কায়েম করে আরও উত্তরে সুমেরুতে দেবলোকে অব্দি যাওয়ার পায়তারা করছিলেন তখন তাকে কিন্ত নিরুৎসাহিত করা হলো যে আর সামনে গেলে তাকে পরাজিত হতে হবে। হিন্দু দেবদেবী শিব, পার্বতী, বিষ্ণু, ব্রহ্মা যেমন আছেন এই গ্রন্থের নানা গল্পে তেমনি আছে বৌদ্ধ শ্রমণ বা অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী রাজার কথাও। কাহিনীর সূত্রপাতই দেখানো হয়েছে যে, একদা পার্বতী শিবের কাছে শুনতে চাইলেন নতুন কোন গল্প। তখন শিব পার্বতীকে এই গল্পগুলো শুনিয়েছিলেন। তখন সেই গল্প লুকিয়ে শুনেছিল পুষ্পদত্ত নামে এক গুণাধীপ। সে আবার এসে সেই গল্পগুলো বলেছিল তার স্ত্রী জয়াকে। জয়া আবার সেই গল্প শোনায় গিয়ে পার্বতীকেই। তখন পার্বতী গিয়ে রেগেমেগে বললেন মহাদেবকে গল্পগুলো নিশ্চয়ই বাসী নাহলে অন্যরা জানলো কি করে। মহাদেব তো যোগবলে জেনে নিলেন এই গল্প আড়ি পেতে শুনেছে পুষ্পদত্ত, বলেছে জয়াকে। ব্যস দেবদেবীদের যা রাগ। তৎক্ষনাৎ অভিশাপ দিয়ে বসলেন পুষ্পদত্তকে মর্ত্যলোকে গিয়ে মানুষ হয়ে জন্মাতে। তখন আবার তাদের হয়ে ওকালতি করতে গিয়েছিল মাল্যবান, তাকেও দিয়ে দিলেন অভিশাপ যাও মানুষ হয়ে জন্মাও।
তাদের কাকুতি মিনতি আর জয়ার কান্নাকাটিতে অবশ্য পরে একটু নরম হয়ে কোন একসময় আবার তাদের স্বর্গে ফিরিয়ে আনার কথাও বলেদিলেন। ভাগ্যিস তারা মানুষ হয়ে জন্মেছিল নাহলে এই গল্পগুলো আমরা মানুষেরা পড়তে পারতাম না, কারণ মানুষ হয়ে জন্মেই একসময় নাকি গল্পগুলো লিখে গিয়েছিলেন পুষ্পদত্ত। পরে আবার দেবলোকে ফিরে গেলেও পার্বতীকে বলা শিবের এই গল্পগুলো তো মানুষ পেয়ে গেল। যাই হোক, গল্পগুলোয় সেকালের বর্ণপ্রথার কড়াকড়ির কথা যেমন আছে, আছে অসবর্ণ বিবাহের কথাও। তবে নিচু জাতের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে অনেকসময়, উল্লেখ আছে সহমরণেরও। প্রায় প্রতিটি গল্পের শেষে একটা করে নীতিবাক্যও আছে যার অনেকগুলো একালের মূল্যবোধের সাথে যায় না। তবে সবমিলিয়ে অদ্ভুত, বৈচিত্র্যময় পৌরাণিক কাহিনী পড়তে যদি কারও ভালো লাগে তবে পড়তে পারেন এই বৃহৎ গল্পমালাটি। তবে এটা মাথায় রেখে এটা কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্কও মনস্কদের জন্য।