অল্প কিছু গান আছে যার সুর প্রথমবার শুনলে তা কানের সাথে লেগে থাকে সারাটা দিন , তখন এমন হয় যে , আশেপাশে প্রত্যেকটা নড়াচড়ার মাঝে ঐ গানের তাল অনুভব করতে থাকি , শুধুকি তাই নিজেকে অর্থব জড় বস্তুর নীরবতা এবং সুরের সাথে মিশিয়ে নৃত্যে নৃত্যে পুরোটা দিন কাটিয়ে দেই স্বপ্নের মাঝে ও ।
অল্প কিছু গানের কথা আছে যা লেপ্টে থাকে মাথার মাঝে , দুই , তিন … … সাতদিন যায় মাথায় ল্যাপ্টানো কথাটিকে ভর্তা করে মাখিয়ে ফেলি নিত্যদিনের কাজ কর্মের সঙ্গে ,
অল্প কিছু মুভি আছে যা প্রথমবার দেখার পর মনে হয় , এক ঘেয়ে ব্যাপারগুলোর মাঝে এ ধরনের ডার্ক হিউমারের ছিটেফোটা লক্ষন ও কেন আগে কখনো আবিষ্কার করে চমৎকৃত হতে পারিনি , এক ঘেয়ে কাজগুলোকে নিখুঁত দৃঢ় ব্যাপার ভেবে কেন তার গভীরে ঢোকার প্রয়োজন অনুভব করিনি ,
আমার মনে আছে প্রথম যখন Lars von Trierএর Dogvile দেখি তখন মুভিটা চোখে লেগে থাকে টানা দুইটা দিন ।তাই তো এরকম চিন্তায় অসঙ্গতি , সমাজ, গভীর বাস্তবতা নিয়ে পুরোটা স্টেইজে তৈরি চলচিত্র আগে কখনো দেখা হয় নি ।
প্রথমবারের মত যখন Krzysztof Kieslowski এর Dekalog দেখলাম, তখন কিছু কিছু পর্ব দেখার সময় মনে হয়েছিল জীবনের প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত এত জটিল কেন ? জীবনটাকে সর্বোচ্চ কত ঘাতের সমীকরনে প্রকাশ করা যায় , নাকি তা কেবল অসমতার রূপে সাজানো যায় , ঐ জীবনের অপ্টিমাম সমাধানগুলো কি জীবনের কালো দৃষ্টিভঙ্গীগুলো সাথে খিচুড়ি পাকিয়ে চালের মাঝে হারিয়ে যায় নাকি নিজেই ছোট্ট এক পরিসরে কালো কৌতুক হয়ে তালগাছের মাথায় উঠে হাসতে থাকে …
কিছু কিছু বই পড়ার পর কমপক্ষে তিনদিন পর্যন্ত দাঁতে লেগে থাকে , মাথায় ঢুকে বসে থাকে - গল্পের ভিতরে ছোট্ট মাথাটি দিয়ে খুড়তে খুড়তে অন্ধকার কুয়োতলে যাওয়া প্রত্যেকটি চরিত্রের গভীরতা, হয়তো সেখান থেকে কোন নির্দিষ্ট চরিত্রে হাত লাগালেই ঢোকা যায় অজানা কোন অতল গহ্বরে যেখানে কিনা জানা অজানা সকল চরিত্র এক সাথে বুদ হয়ে থেকে চেশ্যায়ার বিড়াল হয়ে হাসতে থাকে আমার দিকে চেয়ে …
One Hundread years of solitude পড়ার পর মনে হয় , ‘হাজার বছর ধরে’ এর পর এই প্রথম আরেকটা উপন্যাস পড়লাম যা মস্তিষ্কে বেঁধে গেল …
এরপর , প্রথম যখন কুন্ডেরাকে পড়ি , তখন মনে হয় এ ব্যাটার লেখার ধরন এত অন্যরকম আর অদ্ভুত কেন … জীবনের সকল উপাদানের সাথে গল্প, চরিত্র, বাস্তব ,অবাস্তব, স্বপ্ন , পরাবাস্তব সে কিভাবে এরকম মিশিয়ে দেখাতে পারে … নাহ কুন্ডেরা অন্য আরেক ক্যাটাগরি, হয়ত কুন্ডেরা ক্যাটাগরি …
সালমান রুশদির Midnight Children পড়ার পর মনে হল , এ লোকটা ও কি অদ্ভুতভাবে গল্প বলতে পারে … না সে ও অন্যরকম একটা ক্যাটেগরি … রুশদি ক্যাটেগরি
অনেকদিন পর বাংলা উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’ কে প্রথমবারের মত পড়লাম , যা শুধু ঘ্রানের সাথে আমার গালে,নাকেই লাগেনি বরং … তা লেখক আখতারুজ্জমান ইলিয়াসের উপর এক অদ্ভুত ভাল লাগার খোয়াবী চিত্র এঁকে দিয়ে গেছে মানসপটে …
আমার পড়া আখতারুজ্জামানের প্রথম উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’।
ইহা খোয়াব দেখা মানুষের গল্প কি , মানুষগুলোর খোয়াবের গল্প তা বলা মুশকিল কারন ঘোরলাগা খোয়াবের মধ্যেই ছিল পুরো উপন্যাস , পূর্ববাংলার ঘুমন্ত এক অখ্যাত গ্রাম , কাৎলাহার বিলকে ঘিরে চলা মাঝি পাড়া , কামার পাড়া, বর্গা চাষীরা , লেখকের মাথায় সাঁতরানো আমি ।
এখানে ছিল, আধ-ঘুম, আধ স্বপ্নের মধ্যে কয়েকশত বছর অচল ভাবে পার করে দেওয়া সামন্ততন্ত্রের কড়া শাসন আর ইতিহাস উদ্ভূত নানা প্রাচীন জনপ্রিয় প্রবাদ নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেওয়া তমিজদের গল্প ।
১৯৪৭ এর ভারত উপমহাদেশ ভাগ , জোতদারের শাসনের পরিবর্তনের সুর , তেভাগা আন্দোলনের সম্ভাবনার কথা, হিন্দু - মুসলমানদের সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্পের প্রভাবে খুনোখুনি আবার সেই খুনোখুনির মধ্যেও একে অন্যকে সাহায্য করার ছোট্ট ইচ্ছে , ক্ষুধাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানো ভাতের স্বপ্ন দেখা মানুষ … সবই পাওয়া যাবে এ উপন্যাসে ।
জমিদার শ্রেনী চায় বিশৃঙ্খল প্রজাদের শাসন করে পূর্বেকার মত পোষ মানিয়ে ফেলতে , এদিকে জোতদারদের সাথে চাষীদের নিত্য লড়াই বেঁধেই আছে জমি, ফসল, বিল , মাছ কিংবা জাত নিয়ে ।
‘হামার আম খাবার পারো , আর এটি পানি খালে তোমার জাত যায় কিসক ‘ – শিশু কুলসুমের উক্তি যেন তর্জনী উঁচু করে প্রতিবাদ করে বসে শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে আসা মৌলবাদী, জাতীয়তাবাদী চেতনার মানুষগুলোকে।
ব্রিটিশরা এক সময় এই ভূখন্ড থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় , তাদের শূণ্যস্থান পূর্ণ করার জন্য চারিদিক থেকে ছুটে আসে তাদের ছাঁচে গড়া কিছু মানুষ …
কংগ্রেস চাইছে পুরো ভারত-ভুখন্ডের শাসন। মুস্লিম লীগ আর হিন্দু মহাসভা ঘোষণা করে দিয়েছে যে হিন্দু আর মুসলমান সম্প্রদায় এক সাথে বাস করতে পারে না ।
এদিকে কলকাতায় ঘটা দাঙ্গার খবর গ্রামের ধর্মীয় ভঙ্গুর সম্প্রীতিতে উগ্রভাবে আঘাত করে এক সময় । পাকিস্তানের দাবিতে আয়োজিত মিছিল সভাগুলো গ্রামের সোজা সাপটা ধানের স্বপ্ন দেখা মুসলমানদের মাঝে প্রকৃত-অপ্রকৃত সচেতনতা সৃষ্টি করতে থাকে । হিন্দুদের জাত নিয়ে উপহাস করা ঘুমন্ত মুসলমানেরাই এক সময় দাগী জাতপ্রিয় জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড হয়ে একে অন্যের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।ওদিকে মোষের দিঘির পাড়ে শুকনা খটখটে মাঠের মাটিতে দাঁড়িয়ে কাৎলাহার বিলের উত্তরে সখিনারা দেখতে থাকে জ্বলন্ত হেসেলে বলকানো ভাত!!
মাঝি পাড়া, কামার পাড়া, বর্গাচাষীদের ব্যাক্তিগত স্তরের ক্রমবিকাশ , শ্রেনী পর্যায়ের বিবর্তন , গ্রামীণ সমাজকে অতল পাতলা খোয়াবের জালে আটকে , সেই জালের তলার গভীর অন্ধকারে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর সূক্ষ্ম ,গভীর , বিদ্রূপ, বিষাদ, কালো কৌতুকের এক ডিস্টোপিয়ান ছবি ফুঁটে উঠেছে খোয়াবে খোয়াবে ভেসে বেড়ানো শোলক, গান এবং লেখকের আধ-বাস্তব রচনাভঙ্গীতে, যা এক কথায় চমৎকার :)