সংসারে মানুষ চায় এক, হয় আর এক, চিরকাল এমনি দেখে আসছি ডাক্তারবাবু। পুতুল বৈ তো নই আমরা, একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন।
আড়ালে বসে মানুষের জীবনকে কেউ একজন খেলাচ্ছেন বলেই আমাদের অনেকের বিশ্বাস। মানুষ তার জীবনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে না, তাই মানুষের জীবন এতটা অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। সময়ের সাথে সাথে মানুষের পছন্দ-অপছন্দ, চাওয়া-পাওয়া নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। কখনও নিজের কাছেই নিজেকে দুর্বোধ্য মনে হয়। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস তো আর এমনি এমনি বলেননি - নিজেকে জানো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজেকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা সাধারণের থেকে অনেক বেশি ছিল, তাই অন্যেদের রহস্যময় চরিত্র পড়তে এবং বিশ্লেষণ করতে পারার বিরল ক্ষমতা তাঁর ছিল। যাকে একজন গুণী লেখকের সহজাত ক্ষমতা বলা যায়। এবং তাঁর গুণের উৎকৃষ্ট উদাহরণ পুতুলনাচের ইতিকথা। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক ফিকশনাল রচনা "পুতুলনাচের ইতিকথা" তিনি যখন লিখেছিলেন, তার বয়স তখন মাত্র সাতাশ কি আঠাশ।
"খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন।"
জমকালো ভাষায় পুতুলনাচের ইতিকথার শুরুটা প্রায় সব পাঠককেই চমকে দেয়। উপমার চমকে এটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত দেরি হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, বজ্রপাতে হারু ঘোষের মৃত্যু হয়েছে।
আরেকটা চমকের কথা, সাধু ভাষায় লেখা উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চলিত রীতির সর্বনাম ব্যবহার করেছেন। উপন্যাসটা যখন পাঠকমহলে সাদরে গৃহীত হয়েছিল, মৌলবাদি ব্যাকরণবিদের দল কি তখন কাঁদিয়া কাটিয়া একাকার করিয়াছিল? জানিতে ইচ্ছা হয়!
যাইহোক, ভাষার অলঙ্কার পুতুলনাচের ইতিকথার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তাহলে উপন্যাসটিকে কেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্মের একটি বিবেচনা করা হয়? কোথায় তার বিশেষত্ব?
পুতুলনাচের ইতিকথাকে মহান করেছে তার কাহিনীর বাস্তবতা। বাস্তবতাকে অনুধাবন করা যেমন সহজ নয়, বাস্তবতার গল্প সহজভাবে বলাও তেমন সহজ কাজ নয়। যেমন সত্যজিৎ রায়ের ছবি পথের পাঁচালী, সাধারণ গ্রামীণ বাস্তবতার ছবি, কিন্তু সবাই অবাক হয়ে দেখে।
স্থান, কাল, পাত্রের প্রভাবে মানুষের সাইকোলজিকাল পরিবর্তন হয়; এটা খুব সহজ সত্য, তবে ক্ষেত্রবিশেষে তা বিস্ময়কর মনে হয়। পুতুলনাচের ইতিকথা থেকে একটা উদাহরণ দেওয়া যাক; গ্রামের অবুঝ বালিকা মতিকে বিয়ে করে কুমুদ। আর্টকালচার কুমুদের নখদর্পনে, সে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসার হাসির ব্যাখ্যা করতে পারে, যাযাবরবৃত্তি তার জীবনদর্শন; সেই কুমুদের ঘরে বালিকা নিজেকে খাঁচায় আটকা পড়া বনের পাখির মত মনে করে। পরবর্তীতে আমরা আবিষ্কার করি কালের পরিক্রমায় সেই বালিকা মতি মনে মনে যাযাবরদের মত সাহসী হয়ে গেছে। মানিকের ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট এত চমৎকার যে, মতির চরিত্রের এই অচিন্ত্যপূর্ব পরিবর্তন একটুও খাপছাড়া মনে হয় না। এমন পরিবর্তন পুতুলনাচের সব মূল চরিত্রের ক্ষেত্রেই আমরা কমবেশি ঘটতে দেখি।
শশী আধুনিক বিজ্ঞানমনষ্ক তরুণ। ডাক্তারি পাস করে নিজ গ্রামে ফিরে এসে মানুষকে সেবা দিচ্ছে। গ্রামে একটা লাইব্রেরি পর্যন্ত নেই। চারিদিকে অশিক্ষিত, কুসংস্কারগ্রস্ত মানুষ। গ্রামের জীবনে হাঁপিয়ে ওঠে সে, গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার কথা তার বারবার মনে হলেও এক তরুণীর দ্ব্যর্থক ইশারা তাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে রাখে। ইন্টেলেকচুয়াল রোমান্সের স্বপ্ন দেখা যুবক গ্রামের এক চপলা তরুণীর ফ্লার্টিংয়ে কুপোকাত হয়ে যায়। যদিও কুসুমকে গ্রাম বা শহরের সাধারণ আর দশটা তরুণীর সাথে তুলনা করলে অন্যায় করা হবে,কুসুম অনন্যা। সে অকপট মিথ্যা কথা বলে, ধরা পড়লে দুষ্টু হাসিতে মেনে নেয়; নিষিদ্ধ কথা বলতে পারে অবিচলিতভাবে, কথোপকথনের সুর সেই ঠিক করে দেয়, সেই নিয়ন্ত্রণ তার আশেপ��শের হাওয়া, তার আত্মবিশ্বাসকে সবাই সমীহ করে, ভয় করে।বুঝতেই পারছেন ছলাকলায় পটিয়সী কুসুমের মুখের কথা যেকোনো তরুণ পাঠককেও রোমান্সের মেঘের উপর ভাসিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে।
'হাসব?' - কুসুম জিজ্ঞাসা করিল।
'কেন, হাসবে কেন?'
কুসুম হাসিয়া বলিল, 'আমার হাসি দেখলে আপনার মন নাকি জুড়িয়ে যায়? তাই শুধোচ্ছি।'
স্থান কাল বিবেচনা করলে ধারণা করা যায় কুসুম কেমন ভয়ানক আকর্ষণীয় নারী।নিষিদ্ধ বস্তুর মত আকর্ষণ ক্ষমতা দিয়ে কুসুমকে সৃষ্টি করেছেন মানিক। সে ভীষণ রহস্যময়ী, তার রসিকতা হতে পারে নিছক কৌতুক, হতে পারে অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত; সেই রহস্য ভেদ করতে কখনো কখনো বেপরোয়া হতে হয়, সম্মানহানির ঝুঁকি নিতে হয়। পরিণত মস্তিষ্কের মানুষ কাঁচা বয়সীদের মত সহজে ঝুঁকি নিতে পারে না। আবেগের আতিশয্যে মাথা খারাপ হয়ে গেলে অবশ্য পারে। তবে ঝুঁকি না নিলেও জীবন কিন্তু থেমে থাকে না। জীবনানন্দের যেমন লিখেছেন,
প্রেম ধীরে মুছে যায়,
নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়,
হয় নাকি?
পুতুলনাচের ইতিকথা যখন আমি প্রথমবার পড়েছি তখন আমার মনের বয়স অল্প, Life should be lived to the point of tears.- আলবেয়ার কামুর এই কথাটা আমি তখন হৃদয়ে ধারণ করতাম। বিশ্বাস করতাম উন্মাতাল প্রেমে। আমার দৃষ্টিতে উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল প্রেম, এবং অবশ্যই কুসুমের সুড়সুড়ি দেওয়া সংলাপগুলি; তারপর মানিকের সাইকোলজিকাল বিশ্লেষণ ক্ষমতা, ঝরঝরে ভাষায় তার প্রকাশ।
দ্বিতীয়বার যখন পুতুলনাচের ইতিকথা পড়লাম, মানে ত্রিশোর্ধ হবার পরে; আমার কাছে প্রেম-ভালোবাসা-বিপ্লব সব ওভাররেটেড হয়ে গেছে। নাটকীয়তাবিহীন সরল জীবন এখন আমার পছন্দ।
দ্বিতীয় পাঠে আমার মনে গভীর রেখাপাত করলেন গোপাল, শশীর বাবা। মানুষটা আংশিক ভিলেন টাইপের। গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি কর্তব্যবোধ যদিও তার আছে, কিন্তু হিংসা বিদ্বেষের মত নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রে প্রকট, টাকা-পয়সা-সম্পত্তির প্রতি লোভও আছে। নিজ কন্যার প্রতি গোপালের অবহেলাও চোখে পড়ে, পুরুষপ্রধান সমাজ বলে কথা। কিন্তু একটা মহান বৈশিষ্ট্য সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় - পুত্র শশীর প্রতি তার ভালোবাসা। আর দশটা বাবার মতই সন্তানকে নিজের চাইতে বেশি ভালোবাসেন গোপাল। গোপাল ছেলের জন্য সব করতে পারেন; অথচ ছেলের সাথে তার ব্যক্তিত্বের বিরোধ মেটাতে পারেন না। পুত্র শশী সুশিক্ষিত, সহানুভূতিশীল, মহানুভব, উদার প্রকৃতির মানুষ - সে সংকীর্ণমনা পিতার স্নেহের টান অনুভব করে না। হৃদয়বিদারক হলেও সত্যি, গোপালের সাথে শশীর মানসিক দূরত্ব হয়ত ঘোচার নয়। তারপরও পুত্রের জন্য পিতার যে ঐশ্বরিক পক্ষপাতিত্ব আমরা পুতুলনাচে দেখি, যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা অনুভব করি- সেটা কি আমাদের নিজ পিতার কথা মনে করিয়ে দেয় না? এইখানে লেখক মানিকের সার্থকতা, তাঁর ক্ষমতা; কী মমতা দিয়ে মানিক বাবা চরিত্রটি গড়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না! আপনার যদি বাবা থেকে থাকেন, আপনি বুঝতে পারবেন; আপনি যদি বাবা হারিয়ে থাকেন, তাহলে আরও বেশি করে বুঝতে পারবেন। আমার দৃষ্টিতে পুতুলনাচের ইতিকথার সবচেয়ে সুন্দর, মহান, ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে সন্তানের প্রতি পিতার নিঃশর্ত ভালোবাসা।
শিল্প-সাহিত্যের সমঝদার অনেক মানুষ যৌবনে একরকম চাপা অহংকার অনুভব করে (অনেকে সারাজীবনই অহংকারী থেকে যায়)। মনে করে বই পড়ে, ছবি এঁকে, গান গেয়ে বা শুনে, নিজ আদর্শের জন্য ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে একটা কঠোর ভাবমূর্তি তৈরি করে তারা নিজেদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলছে, তারা Larger than life. বাকিরা অশিক্ষিত, ক্ষ্যাত, বস্তুগত আকর্ষণের বেড়াজালে বন্দী, জীবনকে যাপন করতে জানেনা। এই অশিক্ষিত শ্রেণীর প্রতি শিল্প সমঝদাররা বরাদ্দ করে করুণা আর অবজ্ঞার হাসি। এই দর্শনের আলোয় উদ্ভাসিত একজন নারী জয়া। কোন গ্রাম্য অশিক্ষিত বালিকা যে সত্যিকার ভালোবাসার খোঁজ পেতে পারে, তার জীবনেরও গভীরতা থাকতে পারে, এমনটা জয়া একসময় বিশ্বাস করতো না। তারপর একটা "গেঁয়ো" মেয়ের সাথে মেলামেশার অভিজ্ঞতা জয়ার বিশ্বাসে ফাটল ধরায়। এখানে ভাবনার খোরাক হচ্ছে, গেঁয়ো বা শহুরে, সবার জীবনই নদীর মত, কোথাও গভীর কোথাও অগভীর, কিন্তু জীবন সবসময় প্রবহমান। কারও জীবনই তুচ্ছ নয়, আবার খুব দামিও হয়ত নয়।
জীবনকে শ্রদ্ধা না করিলে জীবন আনন্দ দেয় না। শ্রদ্ধার সঙ্গে আনন্দের বিনিময়, জীবনদেবতার এই রীতি।
শশী তাই প্রাণপণে জীবনকে শ্রদ্ধা করে। সঙ্কীর্ণ জীবন, মলিন জীবন, দুর্বল পঙ্গু জীবন - সমস্ত জীবনকে।
পুতুলনাচের ইতিকথা নানা রকম জীবনের গল্প বলে। জীবনের গতিময় ছবি এঁকে পরিবর্তনকে উপলব্ধি করায়। জীবনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায়। এটা মূলত গ্রামের মানুষের জীবনের গল্প, কিন্তু গ্রাম এবং শহরের মানুষের জীবন আমরা কোথাও কোথাও এক বিন্দুতে মিলিত হতে দেখি। কারণ সবাই মানুষ। সবাইকেই পুতুলের মত খেলাচ্ছেন কোন অদৃশ্য হাত।
ছোট বোন সিন্ধু পুতুল খেলছে। অবুঝ শিশুর সেই খেলা মনোযোগ দিয়ে দেখছে শশী।
'খুকি, বড় হয়ে তুই কি করবি?'
'পুতুল খেলব।'