আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি, যেখানে তুমুল ঘূর্ণিঝড় চলছে ইসলাম ধ্বংসের I আমাদের দীন ও আকিদা নির্মূলে চলছে চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র I ইতিহাসের এমনই এক অভিশপ্ত দল খারেজি ৷ ইসলামের আকিদা হতে প্রথম বিচ্যুত দলও এটি I তাদের ছিল স্বতন্ত্র চিন্তাধারা এবং বিশেষ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি; যা যথারীতি একটি আকিদা হিসেবে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর দিকে দিকে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছড়িয়ে রেখেছে ৷ দলছুট এসব খারেজিদের নিন্দায় রাসূল ﷺ হতে বহু হাদিস বর্ণিত রয়েছে I তাদের অনিষ্টতার প্রতি ইঙ্গিতবাহী হাদিসের সংখ্যাও কম নয়।
আলোচ্য গ্রন্থটি খারেজিদের বিষয়ে একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিয়ে রচিত। এতে খারেজি সম্প্রদায়ের প্রকৃতি ও ইতিহাস, তাদের সাথে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি ইবনে আবি তালিব রা.-এর আচরণ, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নেপথ্য কারণ উঠে এসেছে। পশোপাশি যুগে যুগে তাদের কুকীর্তি; যেমন : ধর্মে বাড়াবাড়ি, র্দীন সম্পর্কে উদাসীনতা, তাকফিরের অযথা অপব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ও বিবৃত হয়েছে প্রখ্যাত আরব স্কলার ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবির কলমে। ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় তিনি পাঠকদের সামনে উন্মোচন করেছেন - যেখান থেকে আমরা পাব অসংখ্য শিক্ষার খােরাক I
ইরাক ও সিরিয়ায় ISIS-এর উত্থানের পর থেকেই গত কয়েক বছরে মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে 'খারেজি' ইস্যু। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এখন কেউ কারও সাথে দ্বিমত পোষণ করলে অবস্থা বিবেচনা না করেই একজন আরেকজনকে 'খারেজি' বলে ফেলছেন। অনেকে হক্বপন্থী দল এবং খারেজিদের মধ্যে গুলিয়ে ফেলছেন। পশ্চিমাদের সাথে যুদ্ধরত সবাইকেই খারেজি বলে লেকচার ঝেড়ে দিচ্ছেন। পশ্চিমারাও এ সুযোগে তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সবাইকে ঢালাওভাবে খারেজি হিসেবে প্রচার করছে। আমরা সাধারণ মুসলিমরাও পশ্চিমাদের অন্ধ অনুসরণ করছি এবং বিশ্বজুড়ে ময়দানে জানবাজ মুসলিমদের খারেজি মনে করে তাদের বিরোধিতা করছি।
. কিন্তু আসলেই কি ময়দানে জানবাজ মুসলিমদের সকলেই খারেজি? খারেজিদের প্রকৃত ইতিহাস কী? কীভাবে তাদের প্রচারিত ভ্রান্ত মতবাদ পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল? কালে কালে কীভাবে বিশ্বজুড়ে তাদের ক্রমবিকাশ ঘটল? কী-ই-বা খারেজিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনাবলি। কীভাবে আমরা বুঝব কোন দলের ভেতর খারেজিদের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান? কোন জায়গায়ই-বা খারেজিরা হক্বপন্থী দল থেকে আলাদা? আর খারেজিদের সাথে হক্বপন্থীদেরই বা কীরূপ আচরণ করা উচিত এবং এরূপ আচরণের ভিত্তিই বা কী? বর্তমান বিশ্বে খারেজিদের ভ্রান্তি ও বিকৃতির স্বরূপই-বা কেমন?
. বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি তাঁর 'খারেজি : উৎপত্তি, চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ' গ্রন্থে বহুল আলোচিত খারেজিদের নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কীভাবে তাদের উৎপত্তি হলো, তাদের চিন্তাধারাই-বা কেমন এবং কালে কালে তাদের উত্থানই বা কীভাবে হলো—সবকিছুই নিয়ে উপযুক্ত রেফারেন্সের মাধ্যমে সুন্দর আলোচনা করা হয়েছে এ বইয়ে।
. যদিও উক্ত বিষয়ে লেখকের সিরাহ সিরিজের হজরত আলি রা.-এর জীবনীতেও আলোচনা করা হয়েছে; কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনা করে লেখক খারেজিদের নিয়ে ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে আলাদা একটি বই প্রকাশ করেছেন, যার নাম 'আল খাওয়ারিজ নাশাতুহুম ওয়া সিফাতুহুম ওয়া আকায়িদুহুম ওয়া আফকারুহুম'। ছবির এ বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি তারই বঙ্গানুবাদ।
. খুব অল্পকথায় বলতে গেলে খারেজি বিষয়ে বাংলা ভাষায় এ গ্রন্থটি একটি মাইলফলক। কুরআন, হাদিস ও অতীতের বিভিন্ন ঐতিহাসিকগণের গ্রন্থের রেফারেন্সের উপর ভিত্তি করে এ বিষয়ে বাংলা ভাষায় উত্তম কোনো গ্রন্থ আর আছে বলে আমার জানা নেই। আর সবচেয়ে সুখের বিষয় বইটি এক বসাতেই পড়ে ফেলা যায়। অনুবাদক তার লেখনীর সাবলীলতা বজায়ের ক্ষেত্রে খুব মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁকে সাধুবাদ।
. বইটির সবচেয়ে যা ভালো লেগেছে, বর্তমান বিশ্বে খারেজিদের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে লেখক নিজস্ব কোনো মতামত জাহির করেননি। নির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি কোনো প্রকার ইঙ্গিত দেননি। তিনি রেফারেন্সের উপর ভিত্তি করে খারেজিদের নিদর্শনগুলোই শুধু আলোচনা করেছেন। বুদ্ধিমান পাঠকমাত্রই নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে খারেজিদের চিনে নিতে সক্ষম হবেন।
. আরও যা ভালো লেগেছে, ইতিহাস বর্ণনার পাশাপাশি খারেজিদের ব্যাপারে ফিকহি আলোচনা। খারেজিদের সাথে ইসলামের চতুর্থ খলিফা ও রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম) বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আলি রা.-এর বিভিন্ন আচরণ ও সিদ্ধান্তের রেফারেন্স দিয়ে লেখক বর্তমান পরিস্থিতিতে হকপন্থী মুসলিমদের ভ্রান্ত খারেজিদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনের বিভিন্ন ঘটনা আলোচনার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন, মুসলিমদের দুই দলের ভেতর যুদ্ধ হলে তাদের পরস্পরের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত। এ সকল যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা লেখক পয়েন্ট আকারে আলোচনা করেছেন, যা যেকোনো তালিবে ইলম ও সাধারণ মুসলিমের জন্য রেফারেন্সস্বরূপ কাজ করবে।
. পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মুসলিমদের ভেতর হক ও ভ্রান্তির মধ্যে পার্থক্য বোঝার লক্ষ্যে এ গ্রন্থ সকলের জন্য অবশ্যপাঠ্য। আশা করি আগ্রহীরা এ বই পাঠে অশেষ উপকার লাভ করবেন ইনশাআল্লাহ।
খারেজিদের বিষয়ে স্বতন্ত্র কোনও বই আগে পড়ি নি, যা পড়েছি তা মূলত আকিদার বইতে অংশ হিসেবে। তাই এই বইটি পেয়ে দ্রুতই সংগ্রহ করি। উস্তাদ সাল্লাবি ঐতিহাসিক হিসেবে আরব জাহানে সমাদ্রিত, রেফারেন্স হিসেবে বিবেচ্য। সহজ ভাষায় খারেজিদের উৎপত্তি, তাদের বৈশিষ্ট্য, সাইয়েদিনা আলি রা. এর সাথে তাদের সংঘাত, সংঘাতের পরিণাম, আলি রা. মৃত্যু ইত্যাদি বিষয় আলোচনায় এনেছেন। মাঝে সাহাবাদের মাঝে হওয়া যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাও আলোচনায় এসেছে। অনুবাদও বেশ সাবলিল।
তবে যে জিনিসটার অভাব বোধ করেছি তাহল, ক্লাসিক্যাল খারেজিদের পর থেকে আজ পর্যন্ত যত খারেজিদল আবির্ভূত হয়েছে তাদের তালিকা ও তুলনা থাকা দরকার ছিলো। এর দ্বারা বর্তমানে খারেজিদল চিনা ও তাদের থেকে সতর্ক থাকার খোরাক পাওয়া যেত।
হযরত আলি রা. খেলাফত, তার পরবর্তী হযরত মুয়াবিয়া রা. ও উমাইয়াদের উত্থান এবং এর পরবর্তী রাজনীতি সম্পর্কে জানতে হলে খারেজিদের সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি। এদের সম্পর্কে রাসুল সা. তার জীবদ্দশায় ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং এদের হত্যা করার নির্দেশনা দেন। ৩৮ হিজরীতে হযরত আলী রা. খারেজীদের পরাস্ত করলেও পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। পরবর্তী সময়ে মরক্কো ও আন্দালুসিয়ায় খারেজিরা আমাজিগদের সাথে মিলে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো তার প্রমাণ। বইটিতে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ১. খারেজি পরিচিতি ; ২. সেই সময়ে তাদের কর্মকাণ্ড ; ৩. তাদের প্রতি প্রশাসনের আচরণ; মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও Due Process ; ৪. খারেজি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা। ৫. একটি শিক্ষা।
১. খারেজি পরিচিতি :
খারেজিরা ইহুদি, খ্রিষ্টান বা মুশরিক নয়। মুসলিমদের একাংশ যখন ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায় তাদের খারেজি নামে আখ্যায়িত করা হয়। এদের সাথে 'মুরতাদ'দের পার্থক্য হচ্ছে, মুরতাদ ইসলামকে পুরোপুরি অস্বীকার করে কিন্ত খারেজীরা আল্লাহকে মানে, কোরআন পাঠ করে, নামাজ পড়ে। রাসুল সা. বলেছেন, 'তাদের নামাজের তুলনায় তোমাদের (সাহাবীদের) নামাজ মনে হবে যেন কিছুই না।'
হযরত আলী রা. ও মুয়াবিয়া রা. এর মাঝে সিফফিনের যুদ্ধে সমঝোতা হলে মুসলিমদের কিছু অংশ এই ফায়সালা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের মতে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নির্দেশনা মানা যাবে না। আলী রা. নিজে মিমাংসা করার অধিকার রাখেন না। এ সমঝোতা করে তিনি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছেন তাই তিনি কাফের। খারেজীরা হযরত আলী রা., হযরত উসমান রা., মুয়াবিয়া রা. সহ অ���েক সাহাবিকে কাফের আখ্যা দেয়।
২. সেই সময়ে তাদের কর্মকাণ্ড :
শুধুমাত্র মতের অমিল হবার কারণে অন্য পক্ষকে কাফের বলেই খারেজিরা নিরস্ত হয়নি। তাদের মতে কাফেরদের হত্যা করতে হবে। তাই তারা যাদেরই পেয়েছে তাদের মতবিরুদ্ধ তাদেরকেই হত্যা করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ড। যিনি প্রখ্যাত সাহাবী খাব্বাব রা. এর ছেলে। তাকে জবাই করে আর তার গর্ভবতী স্ত্রীর পেট চিরে সন্তান বের করে ফেলে এই খারেজীরা। এভাবে সর্বত্র হত্যাকাণ্ড ত্রাসের রাজত্ব শুরু করে খারেজীরা।
৩. তাদের প্রতি প্রশাসনের আচরণ; মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও Due Process :
হযরত আলী রা. খারেজীদের বিরুদ্ধে দমন নিপীড়ন প্রক্রিয়া চালাননি। যদিও খারেজী নির্মম বিভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সবাইকে কাফের আখ্যা দিয়ে হত্যা করা শুরু করে। আলি রা. এখানেও due process অবলম্বন করেছেন। প্রথমে খারেজীদের মতপ্রকাশে স্বাধীনতা দেন। যদিও খারেজীরা ভ্রান্ত কিছু মতবাদ ছড়াচ্ছিল। যেমন উসমান, আলী মুয়াবিয়া রা. সহ এরা সবাই কাফের। কেউ কবীরা গুনাহ করলেই সে হয়ে যাবে কাফের। এসব ইসলামের মূল কথার বিরুদ্ধাচরণ। রাসুল সা. বলেছেন, যে আল্লাহ ও তার রাসুলকে মানে তাকে কাফের বলা যাবে না। কিন্ত খারেজীরা যাকে ইচ্ছা কফের আখ্যায়িত করছিল। আলী রা. এর হাতে ক্ষমতা থাকলেও তিনি বলেন, খারেজীরা এসব বলতে পারবে। তিনি আলাপ আলোচনার জন্য তাদের নিকট আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. কে পাঠান। আলাপ আলোচনার পূর্বেই সিদ্ধান্ত হয়, যে পক্ষ আলোচনায় পরাস্ত হবে তারা অপর পক্ষের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। ইবনে আব্বাস ছিলেন কোরআনের ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী। আর খারেজীরা কোন সাহাবীর চেয়েও অনেক বেশি কোরআন পড়ত। আলোচনায় তার ইবনে আব্বাস রা. এর মত মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবুও তারা বিদ্রোহ থেকে ফিরে না আসার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও অনেকে আলোচনার পর ফিরে আসে।
এরপর হযরত আলী রা. সবাইকে সাধারণ ক্ষমার ঘোষনা দেন। তবে এই শর্তে হত্যাকারীদের তিনি প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করতে হবে। খারেজীরা তাও অস্বীকার করে। আলী রা. এর কাছে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন তারা কি কাফের? আলী রা. কখনোই সরাসরি তাদের কাফের বলেন নি। এ থেকে কিছু বিষয় স্পষ্ট হয় : ১. ইসলামী আইন without due process কাউকে শাস্তি দেবার পক্ষপাতী নয়। ২. মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইসলামে স্বীকৃত। অথচ ইউরোপিয়রা আজ আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা শেখাতে উঠেপড়ে লেগেছে। ৩. যতই খারাপ কাজ করুক আল্লাহ ও তার রাসুলকে অস্বীকার না করলে সরাসরি কাউকে কাফের বলা যাবে না।
মীমাংসার সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৩৮ হিজরীতে আলী রা. খারেজীদের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন। যুদ্ধেও আলী রা. due process কে প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রথমে তিনি সবাইকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। পরে তিনি একটি নিশান স্থাপন করে বলেন যারা যারা এই পতাকার নিচে এসে দাঁড়াবে তারা নিরাপদ। এরপরেও যারা বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছেন তাদের সাথে তিনি যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের পর তার কঠোর নির্দেশ ছিল যারা পালিয়ে গেছে তাদের আর ধাওয়া করা যাবে না এবং জীবিতদের সম্পদ যুদ্ধলদ্ধ সম্পদ হিসেবে কেড়ে নিতেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। অথচ যুদ্ধে প্রাপ্ত কাফেরদের সম্পদ গনিমাত হিসেবে নেয়ার বৈধতা আছে। আলী রা. হয়ত খারেজীদের কাফের হিসেবে গণ্য করেন নি। আল্লাহ আলী রা. এর উপর রহম করুন। তিনি এ পরিস্থিতিতে অনেক প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার সিদ্ধান্তগুলো কতটা যৌক্তিক সেটা জানতে বইটি অবশ্যপাঠ্য।
৪. খারেজি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা :
খারেজীদের উত্থান রাসুল সা. নবুয়তের সত্যতার আরেকটি প্রমাণ। কারণ রাসুল সা. অনেক হাদীসে একেবারে নিখুঁত ভাবে খারেজীদের সম্পর্কে বলে গেছেন। যা পরবর্তী সময়ে খারেজীদের উত্থানের মাধ্যমে অভ্রান্ত প্রতীয়মান হয়েছে। সাধারণ বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন এভাবে নিখুঁতভাবে ভবিষ্যতের বর্ণনা দেয়া একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কেউ যদি বলেন, রাসুল সা. অনুমান করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে।বলেছিলেন তাহলে আপনাকে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে। ধরুন, আপনাকে বলা হল, দশ বছর পরে হলিউড থেকে একটি মুভি রিলিজ হবে। আপনি অনুমান করে এ সম্পর্কে কিছু বলেন। এ মুভির সাথে আপনার কোন সম্পর্কই নেই আপনি এর ডিরেক্টর ভা এ্যাক্টর কোন কিছুই নন। আপনি কতখানি বলতে পারবেন? যদি আপনি মুভির আগাগোড়া সব কাহিনী পুঙ্খানুপুঙ্খ বলে যান, অথচ আপনার এ সম্পর্কে জানার কথাই নয় তবেই সেটা অলৌকিকত্ব। খারেজীদের সম্পর্কে অভ্রান্ত বর্ণনা দয়ে রাসুল সা. তেমনই একটি অলৌকিকত্ব দেখিয়েছেন।
খারেজিদের সম্পর্কে অনেকগুলো হাদিসে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমে এএ হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে। 'আবু সাইদ খুদরি রা. বলেন, আমি রাসুল সা. বলতে শুনেছি, এ উম্মাতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের যাদের নামাজের তুলনায় তোমরা তোমাদের নিজেদের নামাজকে কিছুই মনে করবে না। তারা কোরআন তেলাওয়াত করবে। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনি তীর ছুড়লে বেরিয়ে যায় ... ' (মুসলিম ২/৭৪৩- ৭৪৪)। আরেক হাদিসে রাসুল সা. খারেজিদের সম্পর্কে বলেন, 'তারা কোরআন পড়বে। তাদের পড়ার তুলনায় তোমাদের পড়া এবং তাদের রোজার তুলনায় তোমাদের রোজা কিছুই না'। (সহিহ মুসলিম)
রাসুল সা. বলেছেন তারা অধিকতর নামাজ, রোজা ও কোরআন তেলাওয়াতে ব্যাপ্ত থাকবে। এমনকি তা সাহাবাদের তুলনায় কিছুই না বলে মনে হবে। তার এ কথা অভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. যখন খারেজিদের সাথে বিতর্ক করতে যান তিনি বলেন, 'আমি এমন লোকদের দেখা পেলাম, যাদের থেকে অধিক ইবাদতকারী আমি আর কাউকে দেখিনি। অধিক সেজদার কারণে তাদের কপালে দাগ পড়ে গিয়েছিল। ... রাত জেগে ইবাদতের ফলে তাদের চেহারা শুষ্ক হয়ে যায়'। (তালবিসু ইবলিস)
রাসুল সা. খারেজি সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে গেছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে, রাসুল সা. বলেন, এ সম্প্রদায়কে চেনার উপায় হল এদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তির যার এক বাহুতে মহিলাদের স্তনের ন্যায় একটি অতিরিক্ত মাংসপেশি থাকবে এবং তা থলথল করতে থাকবে। মানুষের মধ্যে বিরোধকালে তার আবির্ভাব ঘটবে।'
আবু সাইদ রা. বলেন আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি একথা আমি রাসুল সা. এর কাছে শুনেছি এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি আলি বিন আবি তালিব রা. তাদের সাথে যখন যুদ্ধ করেছিলেন আমি স্বয়ং তার সাথে ছিলাম। অতঃপর তিনি উক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিলেন। তাকে আলি রা. এর সামনে উপস্থাপন করা হল। আমি তাকে প্রত্যক্ষ করলাম। তার মধ্যে সব চিহ্ন বিদ্যমান যা রাসুল সা. তার সম্পর্কে বলেছেন। (সহিহ মুসলিম) বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন লোক মাত্রই স্বীকার করবেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত এরকম নিখুঁত বর্ণনা একটি অলৌকত্ব।
৫. একটি শিক্ষা :খারেজিদের থেকে আমরা জানতে পারলাম তারা ইবাদতে এত বেশি আত্মনিষ্ঠ ছিল যে তা সাহাবিদেরও ছাড়িয়ে যায়। নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত ও তাহাজ্জুদেই তাদের সময় অতিবাহিত হত। ফলে তাদের চেহারা মলিন, কাপড় উষ্কখুষ্ক হয়ে গেলেও সে সম্পর্কে তাদের ভ্রুক্ষেপ ছিল না। অথচ তারা ছিল ভ্রান্ত। আমাদের সমাজে এক ধরণের ধারণা প্রচলিত আছে কেউ যদি পাঞ্জাবি টুপি পড়ে দাঁড়ি রাখে সব ব্যপারে আমরা তার মতামত মেনে নিই। খারেজিদের থেকে এ শিক্ষা আমরা পাই, বহিরাবরণ দেখে কারও আত্মিক দিক নির্ণয় করা যাবে না। (এ অংশটি বইয়ে নেই)