“এখনো সেই রাতের তারা, ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে ফাঁকে জ্বলে— তোমরা কি দেখেছো?”—
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘ইতিহাসের দিকে ফিরে ছেচল্লিশের দাঙ্গা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ যা ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এই বই শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়কালের বর্ণনা নয়, বরং উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। লেখক তথ্যনিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে এই সময়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন, যা পাঠককে ইতিহাসের এক জ্বলন্ত অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
“ওরে ও নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,...............
বইটি মূলত কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অংশে লেখক দাঙ্গার মূল কারণ বিশ্লেষণ করেছেন, যেখানে ব্রিটিশ নীতির প্রভাব, মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের ভূমিকা এবং হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের টানাপোড়েন বিশদে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে কলকাতা ও অন্যান্য অঞ্চলের দাঙ্গার ঘটনাপ্রবাহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন সংকলিত হয়েছে। তৃতীয় অংশে দাঙ্গার ফলাফল ও তার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। লেখক বইটিকে ইতিহাসের উপস্থাপনার পাশাপাশি একধরনের মানবিক আখ্যানের রূপ দিয়েছেন, যা পাঠককে ভাবায় ও প্রশ্ন করতে শেখায়।
১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ছিল উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অন্ধকার দিক। পাকিস্তান দাবির প্রেক্ষিতে জিন্নাহ ঘোষিত ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ কলকাতাকে রক্তাক্ত করে তোলে। সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিপত্তি অর্জনের লড়াই সাধারণ জনগণকে বলির পাঠা বানিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসকের উদাসীনতা, স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন অবস্থান দাঙ্গার আগুনকে আরও উসকে দেয়।
“এদেশ আমার, জনতার এ দেশ আমার, রক্তে কেনা।”— গৌতম চট্টোপাধ্যায়
বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো লেখকের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় আটকে যাননি, বরং দাঙ্গার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা, তাদের হারানো পরিবার, ছিন্নমূল হয়ে পড়ার কষ্ট গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি এই সামাজিক উপস্থাপনা বইটিকে বিশিষ্ট করে তোলে।
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?”— আবদুল গাফফার চৌধুরী
যদিও দাঙ্গাটি সংঘটিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালে, সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি, ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট—এসব বিষয় আজও বর্তমান। লেখক স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, ইতিহাস থেকে আমরা কতটুকু শিক্ষা গ্রহণ করেছি আর কোথায় আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়, ইতিহাস যেন আজও পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।
“যে ইতিহাস জানে না, সে ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।”— অজ্ঞাত
‘ইতিহাসের দিকে ফিরে ছেচল্লিশের দাঙ্গা’ শুধু অতীতের এক দলিল নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য এক সতর্কবাণী। সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় নিছক ঘটনার ধারাবিবরণীতে আটকে না থেকে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন আলোয় দেখতে শিখিয়েছেন। যে-কোনো পাঠক, যিনি উপমহাদেশের ইতিহাস ও তার বর্তমান প্রভাব নিয়ে ভাবেন, তার জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।
“ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে, ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাও।”— জর্জ স্যান্টায়ানা
Some books left you shattered when it's over and makes you question every political moves in your country. A very logical approach to a difficult subject.
দাঙ্গা নিয়ে তথ্যবহুল একটি বই।অনেক রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন লেখক।তবে ঘটনাগুলো ক্রমান্বয়ে নয় বরং ঘটনার এলোমেলো বর্ণনা ছিলো।তারপরও অনেক কিছু জানতে পেরেছি।