“এক রবিবার দুপুরে গাঢ় ঘুমের পর ছাদে বেরিয়ে এসে শিথিলভাবে পাঁচিলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে প্রিয়ব্রত ভাবছিলো। আকাশ থেকে ধীর শান্ত আলো নেমে এসে উঁচুনিচু বাড়িগুলোর শ্যাওলা ধরা, পলেস্তরা খসে পড়া দেয়ালে জমে থাকে। টবের গাছ, ফুল, জানলার ফ্যাকাসে, পর্দা, অ্যান্টেনায় কাক, ভাঙা পাইপের পাশে অশ্বত্থ চারা, তারে ঝোলানো কাপড়, কার্নিশে ঘুমন্ত বেড়াল, সবকিছুর মধ্যে আশ্চর্য এক সমাহিত মন্থর ভাব! সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখতে দেখতে ধাঁধায় পড়ে। তার প্রতিদিনের জীবনকেই তখন অবাস্তব মনে হয়।” অতি সাধারণ একজন মানুষের চোখে ছাদ থেকে দেখা এই দৃশ্যগুলো স্বাভাবিকভাবে অসাধারণ নয় কী? তাহলে প্রিয়ব্রতের জীবন কেনো তার কাছে অবাস্তব মনে হয়? সেটা জানার আগে উপন্যাসের ঘটনা থেকে একবার ঘুরে আসা যাক।
এই উপন্যাসের শুরু প্রিয়ব্রত নাগ নামের একজন সরকারি চাকুরের ঘটনা দিয়ে যে ২৬ বছর ধরে জালি সার্টিফিকেটে চাকরি করে যাচ্ছে অতুল চন্দ্র ঘোষ নামে। জাল সার্টিফিকেট বানিয়ে দেয়া ফণী পাল প্রত্যেক মাসের মাইনের দিনে ঠিক সাড়ে চারটায় আসে তার বখরা নিতে। অফিসের সবাই জানে মাইনের দিনে এই লোকটা আসে একটা সাদা খাম নেবার জন্য। কুড়ি বছর ধরে একই মাপের খাম প্রিয়ব্রত দিচ্ছে আর একই মাপের পকেটওলা পাঞ্জাবিতে ফণী পাল খামগুলো ভরছে। একইভাবে বাঁ হাতের দুটো আঙুল দিয়ে বোতামগুলো লাগিয়ে নিয়েই বলবে, ''এবার এক গ্লাস জল খাওয়াও।'' প্রিয়ব্রত কি ফনীপাল কে এবারও জল খাওয়াবে? আবারো সাদা খাম এগিয়ে দেবে? একটা ধূসর ছায়ার মতো সে ছাব্বিশ বছর এই অফিসে থেকেছে, রিটায়ার করা পর্যন্ত সে মানসম্মান নিয়ে থেকে যেতে চায়। আপাতদৃষ্টিতে নিজের চাকরি বাঁচানোর জন্য প্রিয়ব্রতের সিদ্ধান্ত কি হবে বলা মুশকিল। আমরা বরং প্রিয়ব্রতকে রেখে কাহিনির সাথে আরেকটু সামনে আগাই।
একদিন ফনী পাল তার সময়মতো বখরা নিতে এলো না আর সেদিন প্রিয়ব্রতের জীবনের মোড়টাও ঘুরে গেলো। রোজ অফিস থেকে ফেরার সময় অতুল চরিত্রকে ড্রয়ারে তালা মেরে রেখে যায়, বাসায় ফিরে খোসল বদলে পরিণত হয় প্রিয়ব্রত নাগে। একজন সাধারণ ক্লার্কের জীবনসংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য কত বিচিত্র, নীরব দ্বৈরথ। কিন্তু সেদিন ফেরার পথে তার দেখা হলো ছোটবেলার বন্ধু খুদিকেলো আর তার মেয়ে নিরুপমার সাথে। কথাপ্রসঙ্গে প্রিয়ব্রত জানতে পারে নিরুপমা ৮ মাস আগে রেপড হয়েছে। হঠাৎ বিষয়টা শোনার পর প্রিয়ব্রতের মানসিকতায় পরিবর্তন আসে_ “মুখে চোখে 'রে*পড হয়েছি' বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে কেউ কি বাইরে বেরোয়?”.....এত মেয়ে থাকতে ওকে কেন? পুরুষদের তপ্ত করার মতো কোনো গুণই তো ওর শরীরে নেই!”। অতি সাধারণ একটা মেয়ের গণধর্ষণের ঘটনা মধ্যবয়সী এক কাপুরুষ প্রিয়ব্রতের চরিত্রে দ্বিমুখিতা নিয়ে আসে। এ সেই প্রিয়ব্রত যে নিজেকে ২৬ বছর ধরে কচ্ছপের মতো খোলসে আটকে রেখেছিল বাইরের দুনিয়া থেকে; নিজের একটা শীতল জগৎ বানিয়ে ফেলেছিল যাতে কেউ জানতে না পারে তার বসবাসের ঠিকানা, তার আসল পরিচয়। অন্ধকার খোলসটার সঙ্গে চমৎকার মানিয়ে সেই কচ্ছপ তার নিজস্ব জগতে ঢুলু ঢুলু চোখে কখনো জেগে কখনো বা ঘুমিয়ে কাটাচ্ছিল।
মতি নন্দী লেখেন কম। ছোট্ট একটা উপন্যাস কিন্তু তার কথাগুলোর মর্মার্থ অনেক গভীর। সহজ গদ্যে নির্মোহভাবে তিনি একেঁছেন জটিল জীবনের রূপকল্প। জীবনের বেশির ভাগ সময় খেলাধুলা নিয়ে লেখা এই লেখক তার নিজস্ব গন্ডির বাইরে গিয়ে নগর জীবনে মধ্যবিত্ত সমাজের এই করুণ বৃত্তান্ত কিভাবে লিখতে পারলেন? প্রশ্নটার উত্তর তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন। তার প্রথম গল্প “ছাদ” লেখার সময় তিনি ছাদে বসে উত্তর কলকাতাকে দেখতেন। “সাদা খামে” মতি নন্দী নিজেকে ছাড়িয়েছেন, মুগ্ধতা বাড়িয়েছেন শতগুনে। মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের অসহায় অবস্থা এমনভাবে ফুটে উঠেছে, আপনার মনে হবে প্রিয়ব্রত চরিত্রের সাথে তার বাসার আশে পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, ওই সব ঘটনা নিজেই দেখতে পাচ্ছেন। মধ্যবয়সী বিপত্নীক প্রিয়ব্রত দ্বিতীয়বার কেন বিয়ে করেননি? কারণ খোলসে মোড়া তার চরিত্রের বিপরীত দিকটা সে শুধুমাত্র তার মৃত স্ত্রী মঙ্গলাকে বলতে পারতো।মঙ্গলার মৃত্যুতে সে জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিসটা হারিয়েছে। নিজের অতি গোপন কথা সিন্দুকে তুলে রাখার মত কোন মানুষ তার নেই। এত বছর পর প্রিয়ব্রতের মনের পরিবর্তনের কারণ নিরুপমার মধ্যে সে মঙ্গলাকে দেখতে পেয়েছিল। একজন অসহায় নারী নিরুপমা যে ধ*র্ষিতা হয়ে ভিন্ন আরেকটা খোলসে মুড়িয়েছে নিজের জীবনকে।
মতী নন্দীর লেখায় বাড়তি কোনো চাকচিক্য নেই, কৃত্রিমতা এনে কোনো মাধুর্য আঁকা হয়নি। মতী নন্দীর লেখায় আছে সাধারণ মানুষকে অসাধারণভাবে পর্যবেক্ষণ করার অন্তর্নিহিত শক্তি, শহরের মানুষের দুঃখ-কষ্ট আর ছা-পোষা জীবনের জটিলতা তার গদ্যের ধারকে করেছে শক্ত। সাদামাটা কাহিনিতে প্রত্যেকটা চরিত্রের অস্তিত্বের সংকট উপন্যাসে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। এই উপন্যাস নাগরিক জীবনের প্রতিটা মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। মতী নন্দী একদিকে আমাদের মত সাধার�� মানুষের সূক্ষ্ম মনোবিশ্লেষণ করেছেন নিপুন দক্ষতায়, অন্যদিকে এক সাদা খামের ভয়ে আত্মমর্যাদা খোয়াতে বসা মানুষের জীবনের গল্প বলেছেন। সাদাখামে লুকিয়ে থাকা কালো ময়লা কাগজ যেনো আমাদের রঙিন দুনিয়া আর তার আড়ালে থাকা সাদা-কালো নাগরিক জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। যে জীবন কখনো তার রঙ পাল্টায় না, শুধু মাঝে মাঝে ধূসর হয়ে পড়ে। এই সব ধূসর রঙের গল্প ঢাকা-কলকাতার মতো ব্যস্ত সব শহরের গলিতেই আছে, সব ছাদ থেকেই এই গল্প দেখা যায়। শুধু পার্থক্য হলো সবাই এই গল্পগুলা দেখার চোখ নিয়ে জন্মায় না। প্রিয়ব্রতও তার জীবনের ছাব্বিশ বছর চোখ বন্ধ করে শুধু ছাইগাদার দিকেই হেঁটেছিল। আপনি কত বছর হাঁটতে চান?
4.5/5.0