মিলন দত্ত ‘পটকথা’য় জানিয়েছেন, তাঁর ‘বইটিতে মৌলিক চিন্তা বা গবেষণার কোনও দাবি নেই। বরং বাঙালির খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাসকে সামগ্রিকভাবে দেখার প্রয়াস রয়েছে। রান্নার প্রণালী নেই বরং তার ইতিহাস বা মূল খোঁজার চেষ্টা হয়েছে।’ যে কোনও কোষগ্রন্থই সামগ্রিক পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করে। সে দিক থেকে বইটি কাজের। হাতে নিলে বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতির মোদ্দা-কাঠামোটি নানা কারুকার্য সহ চোখে ভাসে। বিশেষ করে মিলন অনেক দিন ধরেই সচেতন ভাবে জরুরি একটি কাজে নিবেদিত। বাঙালি হিন্দুরা যেন বাঙালি মুসলমানদের চিনতে পারেন এই তাঁর বাসনা। না হলে দুই বাঙালির দূরত্ব গভীর হবে। গল্প সংকলক, চলিত ইসলামি শব্দকোষ প্রণেতা মিলন তাঁর খাদ্যাখাদ্য বিচারের বইতেও মুসলমান বাঙালির ঘর-বাহির, উৎসব-আনন্দকে খাবার-দাবারের সূত্রে আমবাঙালির চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের খাবারের কথা ও বাঙালি ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত খাওয়াদাওয়ার পরিচয় তুলে ধরেছে বইটি। খুসকা যে ঘি দিয়ে রান্না করা ভাত, ক’জন বাঙালি হিন্দু একথা জানেন ! এলোঝেলো পূর্ববঙ্গের উৎসবে ময়দা দিয়ে বানানো ভাজা মিষ্টি এও বোধকরি এদিককার বাঙালির অজানা। প্রাগাধুনিক বাংলা ও বাঙালির কথা এসেছে। কুটনো, তৈজসপত্র, উনুন এসবও বাদ পড়েনি। রান্নার সংস্কৃতির বর্ণ-গন্ধ-স্বাদ বেশ টাটকাই পাওয়া যাবে ।
মাছে-ভাতে বাঙালির রসনায় মাছের এমন নানান পদের বাহার না থাকলে হয়তো কবি ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গল' খানা বৃথা হতো!
ভোজনরসিক বাঙালির পেটপূজোর নানান রসদের সাথে পরিচিত হয়ে মুগ্ধ হয়েছি। দারুণ কিছু বই সম্পর্কে জানতে পেরেছি। তবে সবথেকে ভালো লেগেছে আমাদের ভাষার শব্দমাধূর্য! কী সুন্দর সব নাম! কী মিষ্টি শোনায় সেগুলো! ক্ষীরেলি, ক্ষীরমোহন, সরপুরিয়া, কলাকাঁদ, কলাচাঁদ, সরতক্তি, রসাসর, মানিকমালাই, সরভাজা, অমৃতি এমন আরো কত সুন্দর নাম একেকটা মিষ্টান্নের! উচ্চারণ করলেই মনে হয় মুখ মিষ্টির রসে ভরে ওঠে! আবার এক ঋগ্বেদেই অন্নের প্রতিশব্দ আছে চৌদ্দটি! বইটা নিয়ে লিখতে গেলে হয়তো শব্দসংখ্যায় ধরবে না।
ভাষাপ্রীতি আর শব্দ-আসক্ত মানুষ হিসেবে বইটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। বাঙালি এবং ভোজনরসিক মানুষের জন্য বইটা সময়ে-অসময়ে এক-দুপাতা করে পড়ার জন্য বেশ।
খাবারের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়, যার প্রথম অক্ষরের ভিত্তিতে বর্নণা করে দিয়েছেন লেখক বিমল দত্ত " বাঙালির খাদ্যকোষ" বইটাতে। রান্না ও খাবারের এক ডিকশনারি বলা যেতে পারে। যেমন-- অমৃতি, আচার, ইঁচড়, উনুন, একাদশী, ওমলেট, কচু, খামি ইত্যাদি। স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের সবগুলো বর্ণের উপস্থিতিতে রান্না সম্পর্কের সব উপাদান খাবারের বর্নণা এখানে আছে, একই সাথে কিছু খাবারের রেসিপি, জন্মস্থান ও প্রথম কোন গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়। চমৎকার এক ব্যতিক্রমি বই।