পশু পাখির চরিত্র অবলম্বন করে যেসব লোককাহিনী গড়ে ওঠে তাকে পশু কাহিনী বলা হয়। বাংলা লোকসাহিত্যে এসব কাহিনীকে উপকথা নামেও অবহিত করা হয়। কাহিনী গুলোর ধরন সরল ও এক রৈখিক হয়ে থাকে। বাংলা পশু কাহিনীতে মানুষের আর পশুপাখির মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। পশু পাখির আচরণ এখানে একান্তই মানবিক রূপকের আড়ালে মানবীয় আচরণ করে। কিন্তু টুনটুনির বইয়ের পশু কাহিনীর অবতারণা কেন করছি? কারন 'টুনটুনির বই' পশু কাহিনীর অন্তর্ভুক্ত আর এই সমস্ত পশু কাহিনীর মূল উৎস লোক মানস।মূলত এই গল্পগুলোর মধ্যে দিয়ে লোক মানসের আনন্দ-বেদনা, বীরত্ব,আশা- নিরাশা জীবনের সমস্ত রূপ -রস মিশিয়ে এগুলোর সৃষ্টি।
টুনটুনির গল্প প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১০ সালে। মাঝখানে কেটে যায় ১০০ বছরের বেশি সময়। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এই বইয়ের গল্পগুলোর আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
বইটিতে মোট ২৭টি গল্প স্থান পেয়েছে। এসব গল্পের কয়েকটি হচ্ছে ‘টুনটুনি ও নাপিতের কথা’, ‘টুনটুনি ও বিড়ালের কথা’, ‘টুনটুনি ও রাজার কথা’, ‘শিয়াল পণ্ডিত’, ‘পান্তাবুড়ির কথা’, ‘বোকা জোলা আর শিয়ালের কথা’ উল্লেখযোগ্য।
টুনটুনি ও নাপিতের গল্পে আমরা দেখলাম টুনটুনির ফোঁড়া হলে সে নাপিতের কাছে গেল ফোঁড়া কাটতে নাপিত তাকে হেয় করে বললো সে রাজাকে কামায় সে কেনো টুনটুনিকে কামাবে।টুনি তখন তখন ঠিক করলো নাপিত কে সে শাস্তি দিবে!তখন সে রাজার কাছে গেলো নালিশ দিতে কিন্তু রাজাও বিচার করলো না!তখন টুনি নিজেই বুদ্ধি করলো কিভাবে নাপিতকে শাস্তি দেবে!একে একে সে হাতি, সাগর, আগুন, লাঠি, বিড়াল এবং ইঁদুরের কাছে গেল কিন্তু কেউ ই তাকে সাহায্য করতে চাইলো না।শেষমেশ টুনি গেলো মশার কাছে।অমনি পীন্-পীন্-পীন্-পীন্ করে যত রাজ্যের মশা, বাপ বেটা ভাই বন্ধু মিলে হাতিকে কামড়াতে চলল। মশায় আকাশ ছেয়ে গেল, সূর্য ঢেকে গেল। তাদের পাখার হাওয়ায় ঝড় বইতে লাগল। পীন্-পীন্-পীন্-পীন্ ভয়ানক শব্দ শুনে সকলের প্রাণ কেঁপে উঠল। তখন—
হাতি বলে, সাগর শুষি!
সাগর বলে, আগুন নেবাই!
আগুন বলে, লাঠি পোড়াই!
লাঠি বলে, বিড়াল ঠেঙাই!
বিড়াল বলে, ইঁদুর মারি!
ইঁদুর বলে, রাজার ভুঁড়ি কাটি!
রাজা বলে, নাপতে বেটার মাথা কাটি!
নাপিত হাত জোড় করে কাঁপতে-কাঁপতে বললে, ‘রক্ষে কর, টুনিদাদা! এস তোমার ফোড় কাটি।’
আচ্ছা আপনাদের কি কখনো মনে হয়েছে গল্পগুলো কোন লোকসমাজ কিংবা মানুষের জীবনকে প্রতিনিধিত্ব করছে? এই ধরুন টুনটুনি ও নাপিতের কথা গল্পে টুনটুনিকে কি নিম্ন শ্রেণীর মানুষ প্রতিনিধি মনে হয়েছে?মানুষ জন্ম নিয়েই দেখছে পৃথিবীটা যার শক্তি আছে তার পদানত।ক্ষমতাধর রা সব সময়ই দূর্বলের উপর তার শক্তির প্রদর্শন করছে!আর টুনটুনি এখানে দুর্বলদের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং রাজা কিংবা নাপিত এখানে ক্ষমতাধরদের প্রতীক। তারা প্রথমে টুনটুনি কে ছোট ও দুর্বল ভেবে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। কিন্তু পশু কাহিনীর সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো গল্পে ক্ষুদ্র প্রাণী তার বুদ্ধির জোরে জয় লাভ করে। বুদ্ধির জোরেই সে ক্ষমতাধর দের মোকাবেলা করে।শাসক শ্রেণী বা ক্ষমতাধর সমাজের তুলনায় লোকসমাজ সবসময় সমাজের দুর্বল ও অসহায়। তারা শক্তিমানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। পশু পাখির রূপকে ব্যবহার করে তারা তাদের দমিত ইচ্ছায় প্রকাশ ঘটায়। কাহিনীতে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ এর বিরোধে লোক মনস্তত্ত্ব সক্রিয়।যারই বহিঃপ্রকাশ দেখি আমারা টুনটুনি ও নাপিতের গল্পে!প্রতিটি গল্পই যদি একটু সুক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষন করা যায় তাহলে টুনটুনির বইয়ের অন্য একটি রুপ আমরা দেখতে পাবো! হ্যাপি রিডিং!