ভ্রমণ সাহিত্য ও ভ্রমণ কাহিনী; দুয়ের মাঝে বিদ্যমান ফারাকটুকু কবুল করে নিয়ে বর্তমান বইটিকে ঠিক কি বলে অভিহিত করা যায়, সে ভার পাঠকের উপর রইলো। কিছু মানুষ আছে শুধু এই বিপুলা পৃথিবী অপার সৌন্দর্য্যের নেশাতে ঘুরে বেড়ান কিংবা বেড়াতে চান - এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। আবার কিছু ভ্রমণপিয়াসু আছেন, যারা সৌন্দর্য্যের উপভোগের পাশাপাশি জ্ঞানার্জনের তীব্র নেশা বয়ে বেড়ান। নতুন জ্ঞান আবিষ্কারের উচ্ছ্বাস এবং ভ্রমণের আনন্দ-দুই-ই তারা খুজেন। এই বইটিতে ঠিক এ রকমই একটি প্রাপ্তি অপেক্ষা করে আছে পাঠকের জন্য। বাংলাদেশের পুরান ঢাকার এক ব্যস্ত জনপদ "আরমানিটোলা" থেকে যাত্রা করে পাঠক ধীরে ধীরে পৌছে যাবেন সুদূর ইউরোপের দেশ আর্মেনিয়ায়। আরমানিটোলা নামে বাংলাদেশের রাজধানির বুকে যে ব্যস্ত জনপদ সহস্র বছরের ইতিহাস ধারণ করে টিকে আছে, তেমনি পাঠক আর্মেনিয়ায় গিয়ে অবাক বিষ্ময়ে আবিষ্কার করবেন আরেকটি ব্যস্ত জনপদ; "বাংলাদেশ" যার নাম। বইটিতে অত্যন্ত সাবলিল ভাষায় ফুটে উঠেছে এই দুই দেশের ঐতিহাসিক প্রাচীন সর্ম্পকের রসায়ন। আর্মেনিয়ার হাজার বছরের ইতিহাস, দেশটির আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, নারীদের সমূহ অবস্থা, শিল্প সাহিত্য কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য - একদমই আলাপি ঢঙে দেশটির সম্ভাব্য সমূহ চিত্র পাঠক বইটিতে পাবেন।
কেউ কথা রাখে না, কথা রাখে বই৷ আশু দাদা আজকেও লেট। অপেক্ষায় ছিলাম তার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রের বাতিঘরে। কি আর করা৷ তাদের ভ্রমণ বিষয়ক বই গুলোতে চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাৎ চোখ জমে গেল এই বইটির উপর৷ আর্মেনিয়ার বাংলাদেশ এই চমৎকার বন্ধুটির সাথে এক ঘন্টা খারাপ কাটলো না৷ ৫০ পেজ এক টানে কখন যে পড়া হয়ে গেল৷ ইতিহাস নির্ভর চমৎকার একটা বই হবে৷ বই এ রকম বন্ধু যার সাথে কখনও ঝগড়া হয় না। সেই পুরান ঢাকা থেকে কলকাতা পারি দিয়ে দিল্লি কত দূর৷ সেই দিল্লি থেকেই না লেখক পেয়েছিলেন আর্মেনিয়ার ভিসা৷ এর আগে বাংলাদেশের পেক্ষাপটে আর্মেনিয়ান চার্চ থেকে শুরু করে সেই আরারাত পর্বত পারি দিয়ে পয়গম্বর নূহ নবীর ব্যাবিলনের রাজা বেলের সাথে যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়ে গেল। সেই তিন হাজার বছর পূর্বের সুমেরু-ব্যবলীনিয় সভ্যতার ধারক বাহক আর্মেনিয়ানদের আদি ইতিহাস সময়ের পরিভ্রমণে যে ভাবে খুড়ে বের করলেন সত্যিই চমৎকার৷ এবার দু একটা ইদুর মারা হবে না৷ তবে এই বই পুরাটা পড়া হবে৷
দিল্লি থেকে বাংলাদেশে ফিরত এসে আবার আর্মেনিয়ার উদ্দ্যেশে দুবাই যাত্রা বিরতি দিয়ে উড়াল দিল সপ্নেত উড়োজাহাজ সেই কত কাছে থেকে দূরের আর্মেনিয়ার উদ্দ্যেশে৷ রাজধানি ইয়ারভেনে জভার্সন্টস এয়ারপোর্টে যখন প্লেন ল্যান্ড করলো লেখক যেন ফিরে পেলেন পায়ের তলায় শর্ষে। ইমিগ্রেশন পার করার সময় বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখে অফিসারদের অবাক হবার পালা। অবাক হবেই না কেন আর্মেনিয়াও যে আছে ছোট এক্টা বাংলাদেশ৷ এলাকাটির অফিসিয়াল নাম ‘মালাতিয়া সেবাস্তিয়া’। স্থানীয়দের কাছে ‘বাংলাদেশ’ হিসেবেই পরিচিত জায়গাটি। এরপর দুই পর্যটকের আর্মেনিয়া ঘুরার পালা। লেখকের সাথে আমিও যেন হাঁটছি ইয়ারভানে। কত শিল্প, কত সাহিত্য, কত হাজার বছর সংস্কৃতি লুকিয়ে আছে আর্মেনিয়ায়৷ ইতিহাস বরাবর আমাকে টানে৷ আর এই ইতিহাসের সাথে সময়ের পরিভ্রমণে ফিরে যাই সেই চেঙ্গিস, তৈমুর লং এর সময়৷ এই ছোট জনপথ ও বাঁচেনি বর্বর ইতিহাসের দুই নিষ্টুর হত্যাকারির হাত থেকে৷
আর্মেনিয়ার বাংলাদেশ ঘুরতে গিয়েও তো দেখে হয়েছিল ৮০ বছরের তাগড়া জোয়ান আমাভিরের সাথে৷ আমাভির যে আমাদের বড় আপন৷ এক জায়গায় বড্ড মিল এই দুই দেশের মধ্যে। দুই দেশেই দেখেছে নিষ্টুর গণহত্যা। বিশ্বে যখন বাজছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা তখন অটোম্যানদের অধীনে ছিল আর্মেনিয়া। ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ মানুষ মারা যায় অটোম্যানদের হাতে৷ আমাভির জানে বাংলাদেশের ইতিহাস। সেই ইতিহাস তাকে বিষ্মিত করে৷ তাই তো বলেছিলেন, "আচ্ছা বুঝলাম আমরা বা আর্মেনিয়রা খ্রিস্টান। আর অটোম্যানরা মুসলিম হয়ে তারা এভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে আমাদের ওপর৷ কিন্তু পাকিস্তান এবং তোমরা বাঙালিরা তো বেশির ভাগই মুসলিম। এরপরও পাকিস্তানিরা কেন তোমাদের উপর গণহত্যা চালাল?",
ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূকাভিনয় আর্মেনিয়ার সৌন্দর্য্যের সাথে এক সুন্দর পরিভ্রমণ করতে চাইলে অবশ্যই পড়তে হবে এই বইটি৷