বাংলা ছিল মুসলিম প্রধান ও তপশিলিজন অধ্যুষিত। কংগ্রেসের হিন্দুওয়ালা নেতারা সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস থেকে তাড়ালেন। মুসলিম লিগের অবাঙালি নেতারা ফজলুল হককে লিগ থেকে তাড়ালেন। ব্রিটিশ যুদ্ধনীতি পূর্ব পরিকল্পনামত সিঙ্গাপুর , মালয় , ব্রহ্মদেশ ও থাইল্যান্ড থেকে পশ্চাদপসরণ করে বাংলাকে যুদ্ধের পূর্ব রণাঙ্গন করে তোলে। ফলে , নিম্নবঙ্গকে ধ্বংস করে দেওয়া হল ও যুদ্ধের রেশন চালাতে বাংলায় ঘটল ৪৩ - এর দুর্ভিক্ষ। ৪৫ - এ ম্যালেরিয়া মহামারী। ১৯৪০ পর্যন্ত ও ১৯৪৫ - এর পর হিন্দু - মুসলমান দাঙ্গা ছিল বাংলার নিজস্ব রাজনীতি। ভারতের অন্য কোনো প্রদেশ থেকে বাংলা কোনো প্রকার সাহায্য পায়নি। এমনকী সর্বাধিক সংখ্যক রাজবন্দীদের জন্যও তারা জেলখানায় জায়গা দেয়নি। এই নতুন সময়ে বাংলার তপশিলি নেতা বরিশালের যোগন্দ্রনাথ মণ্ডল ছিলেন অবিসংবাদী শূদ্রনেতা। তিনিই প্রথম বলেন , উচ্চবর্ণ হিন্দুদের রক্ষা করা শূদ্রদের কাজ নয় ও মুসলমানদের সঙ্গে শূদ্রদের শ্রেণীগত মিল অনেক বেশি। এই শূদ্র যোগেন মণ্ডলই একমাত্র ভারতীয় যিনি পাকিস্তানকে তাঁর স্বদেশ বলেছিলেন ও সেই কালবেলায় ভারতবর্ষ - ধ্যানটিকে রক্ষা করেছিলেন।
দেবেশ রায়ের জন্ম ১৯৩৬ সালে অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পাবনা জেলার বাগমারা গ্রামে। ১৯৪৩ সালে তাঁর পরিবার জলপাইগুড়ি চলে আসেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময় প্রত্যক্ষ বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতির সূত্রে শিখেছিলেন রাজবংশী ভাষা। কলকাতা শহরেও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সে একজন গবেষণা সহকর্মী ছিলেন। তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে জলার্ক পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস ‘যযাতি’। ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি এক দশক পরিচয় পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৯০ সালে ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসের জন্যে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ২০২০ সালে কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে দেবেশ রায়ের জীবনাবসান হয়।
এমন বড় আকারের উপন্যাস পড়ার ক্ষেত্রে যে জিনিসটা আমার মাথায় সবচেয়ে আগে আসে তা হলো গল্পের বিস্তারটা আসলেই এত বড় হওয়ার মতো কি না! কাটছাঁট করে আরো ছোট করা যেত কি না, অতিকথন বা পুনরাবৃত্তি আছে কি না! রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে অতিনাটকীয়তা আছে কি না এটাও বিবেচনায় রাখি।
প্রায় ১১০০ পৃষ্ঠার মধ্যেও দেবেশ রায় যোগেন মন্ডলকে পুরোটা তুলে ধরতে পারলেন না, এটাই সবচেয়ে বড় আফসোস আমার কাছে। এত সময় নিয়ে, এত পরিশ্রম করেও যোগেনের সাথে পাকিস্তানের বিচ্ছেদ, যেটা কিনা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটাই পেলাম না! নৌকায় চড়ে বা পায়ে হেটে যোগেন কোথায় কোথায় গেছেন, বুদ্ধিদীপ্ত ভাষণ দিয়েছেন তা জানার চেয়ে জরুরী ছিল পাকিস্তানের রাজনীতি তথা মূলধারার রাজনীতি থেকে তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা জানা।
দলিত সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে গোড়া হিন্দুদের কাছে যোগেনের "যোগেন মোল্লা" হয়ে যাওয়া এবং পাকিস্তান থেকে হতাশা নিয়ে ভারতে ফিরে গিয়ে "ভারতের চর" আখ্যা পাওয়া, উভয় দিকের শত্রু ও অবিশ্বাসের পাত্রে বনে যাওয়ার করুণ পরিণতির গল্পটা এত বড় কলেবরের বই থেকে আশা করাটা দোষের কিছু না। কারো উত্থানের রোমাঞ্চকর গল্প শোনানো যেমন জরুরী, পতনের হতাশাজনক গল্প বলাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ না।
দেশভাগ পূর্ববর্তী বাংলার অস্থির রাজনীতি, মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস দ্বন্দ্ব, তফশিলি সম্প্রদায়ের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এসব বিষয়ে আগেই বেশ ভালো করে জানাশোনা থাকায় এই বইটা থেকে আমার মূল আকর্ষণ ছিল যোগেন মন্ডলের উত্থান ও তার রাজনীতি থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনাপ্রবাহ। বিশেষ করে দেশভাগ পরবর্তী সময়ে যোগেন কীভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন বা নিতে বাধ্য হলেন সেই কারণগুলোর বিস্তারিত অনুসন্ধান। কিন্তু সেক্ষেত্রে হতাশ হতে হয়েছে বলা যায়।
বাংলার রাজনীতি অধ্যয়নে যোগেন মন্ডল বিস্মৃত ও প্রায় অচেনা এক নাম। তাকে নিয়ে আলোচনা, গবেষণার প্রয়োজন আছে, অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। তবে দেবেশ রায়ের মসৃণ ঝরঝরে গদ্যে তাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছুটা মহিমান্বিত করে দেখানো হয়েছে কি না সেটাও প্রশ্ন করার মতো বিষয়।
আরেকটা ব্যাপার হলো যোগেন ও তার সমসাময়িক বাংলার রাজনৈতিক দোলাচালের খুঁটিনাটি নিয়ে যাদের একনিষ্ঠ আগ্রহ আছে তাদের বইটা ভালো লাগবে। অন্যথায় বইটা থেকে প্রচুর একঘেয়ে সময় পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর স্বল্প পরিসরে যোগেন মন্ডলকে জানতে আলতাফ পারভেজের বইটা বেশ ভালো একটা মাধ্যম হতে পারে বলে মনে করি।
কমিউনাল আওয়ার্ড পরবর্তী বাংলা। হিন্দু মুসলমান দুই ধর্মের টালাপোড়েনের বাংলা। সেই পটভূমিকায় উঠে এলেন একজন ভূমিজ সন্তান। নমঃশূদ্র পরিবারের থেকে। যিনি ভাবতে পেরেছিলেন, নিচ জাতের সব সমস্যা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কারণে। তাহলে সেই উচ্চবর্ণের সমান হতে পারাই কেন নিম্নবর্ণ জীবনের মোক্ষ বলে ধরবে। কেন সে নিজের আলাদা আইডেন্টিটি তৈরি করবে না? প্রচলিত দর্শনের বিপ্রতীপে এই ভাবনা ভেবে ওঠা সেদিনের সামাজিক প্রেক্ষিতে কতখানি কঠিন ছিল? বিশেষত সেদিনের আইকনিক নেতা মহাত্মা গান্ধী এবং সব হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল যখন হিন্দু সমাজের সংখ্যা কমে যাওয়ার ভয়ে সেই নিম্নবর্গদের হিন্দু ছাতার তলায় আনতে মরিয়া? কতটা সহজ বা কতটা কঠিন সেটা বোধহয় আজকে আমরা ভেবেও উঠতে পারব না। দেবেশবাবু ধরেছেন যোগেন মন্ডলের প্রথম এম এল এ হওয়ার সময় থেকে স্বাধীনতার কাল অবধি। নিপুণ ভাবে সেই সময়ের পটভুমিকায় এই কাস্ট বেসড আইডেন্টিটি পলিটিক্সের জন্মের ছবি এঁকেছেন। আর পরতে পরতে আমাদের জাতীয়তাবাদের কাপড় খুলে উচ্চবর্ণের হিন্দুত্ববাদের কাঠামো বের করে এনেছেন। আর এই সঙ্গে দেখিয়েছেন দাঙ্গা কিভাবে তৈরি করা হয়, নগ্ন করেছেন মিডিয়ার রূপ। আজকে আমরা মিডিয়াকে দোষ দেই দাঙ্গায় প্ররোচনা দেওয়ার জন্য, মিডিয়ার ভুমিকা কি সেদিনও অন্য কিছু ছিল? এ আসলে তোমার -আমার উত্তরাধিকার।
বই এর আকার বিপুল, কিন্তু একবারের জন্যও গতি শ্লথ হয়না। ইতিহাস ছেনে লেখা। তবে ইতিহাসের কোন তথ্যের ভুল রিপ্রেজেন্টেশন হয়েছে কিনা তা বলা আমার মত অনৈতিহাসিক পাঠকের সাধ্যের বাইরে। তবে পড়তে পড়তে কটা কথা মনে হয়েছে। প্রথমত যোগেনের পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে তেমন গভীরে বিশেষ কিছু না বলা থাকায় যেটা ধরা যায় না তা হল এই জীবন দর্শনের পিছনে ব্যক্তিগত Lived Experience কতটা আর তার এই ব্যতিক্রমী ভাবনা কিভাবে তাদের পাশের জনদের ইমপ্যাক্ট করছে। অর্থাৎ দর্শনের তৈরি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আমাদের অধরা থাকে। আর একটা জিনিস জানার লোভ থাকে - যোগেন সামান্য হলেও তখনকার কমিউনিস্ট দলের সংস্পর্শে এসেছেন। কিন্তু ক্লাস এবং কাস্টের দ্বন্ধে কেন ক্লাসই এদেশে প্যারামিটার হয়ে দাঁড়াল, অন্তত একটা দীর্ঘ সময়ের জন্য যোগেনের কাস্ট আইডেন্টিটি পলিটিক্স কেন একেবারে হারিয়ে গেল সেই নিয়ে কোন কথা পেলাম না।
আমার ব্যক্তিগত বৃত্তে এই বইটি সম্পর্কে উৎসাহী মানুষজন ছিলেন প্রচুর। সুতরাং উপন্যাসের ভূমিকা পর্যন্ত পাঠ করার আগেই এই বইয়ের বিষয়বস্তু ও মূল ভাবনা সম্পর্কে অবগত ছিলাম আমি।
বইয়ে মূলত তিনটি ভাবনার সমন্বয় ঘটেছে:
১. রাজনীতি ও ইতিহাসের সমন্বয়: উপন্যাসটি স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দলিত রাজনীতির দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। ব্রিটিশ আমলে দলিতদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক চেতনা এবং স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে তাদের অবস্থান কী হবে, সেটি এখানে বিশদভাবে উঠে এসেছে।
২. যোগেন মণ্ডলের মানসিক দ্বন্দ্ব: ভারত বা পাকিস্তান—কোথায় দলিতরা ভালো থাকবে? এই প্রশ্ন তাকে সারাজীবন তাড়া করেছে। তিনি যখন বুঝতে পারেন যে, পাকিস্তানেও তাদের অবস্থা ভালো হবে না, তখন তিনি রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
৩. বিভাজনের দুঃসহ বাস্তবতা: ১৯৪৭-এর দেশভাগ শুধুমাত্র ধর্মীয় ছিল না, বরং শ্রেণি ও জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গিও এর গুরুত্বপূর্ণ দিক। দেবেশ রায় দেখিয়েছেন, দলিতদের জন্য ভারতেও সুশাসনের নিশ্চয়তা ছিল না, ফলে তারা পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানে গিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
এই অসামান্য রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গল্পকথনে ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর বিভাজনের পটভূমিতে দলিত নেতা যোগেন মণ্ডল-এর জীবন ও সংগ্রাম চিত্রিত হয়েছে। এই উপন্যাসে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের সংমিশ্রণ ঘটেছে, যা এক অনন্য রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পাঠপ্রবাহ তৈরি করে।
যোগেন মণ্ডল ছিলেন ভারতবর্ষের বঞ্চিত ও অবহেলিত নিম্নবর্গীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম কণ্ঠস্বর। ব্রিটিশ শাসনকালে তিনি দলিত রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানের পক্ষ নেন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন—হিন্দু উচ্চবর্ণের আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দলিতদের নতুন রাষ্ট্রে সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সেখানে দলিতদের অবস্থাও আশানুরূপ হবে না। একসময় তিনি বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন।
দেবেশ রায়ের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও কাব্যিক গদ্যের সংমিশ্রণ। ভাষায় গভীর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আছে, যা ইতিহাস-সচেতন পাঠকের জন্য আকর্ষণীয়। বর্ণনারীতিতে আছে প্রবন্ধধর্মিতা, যা উপন্যাসকে উপন্যাসের পাশাপাশি গবেষণাধর্মী রূপ দিয়েছে। এটি শুধু যোগেন মণ্ডলের জীবনী নয়, বরং ভারতের দলিত রাজনীতির জটিল ইতিহাস বিশ্লেষণ করে। উপন্যাসটি পড়ে বোঝা যায়, স্বাধীনতা অর্জনের পরেও দলিতদের প্রকৃত মুক্তি আসেনি।
অনেক পাঠক মনে করতে পারেন, এটি যোগেন মণ্ডলের পাকিস্তান-প্রীতিকে ন্যায়সঙ্গত দেখানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু লেখক আসলে তার দোটানাকেই তুলে ধরেছেন। এতে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজকাঠামোর কড়া সমালোচনা আছে, যা পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অনন্য সাহিত্যিক প্রতিবাদ দেবেশ রায় দেখিয়েছেন, নিম্নবর্ণের মানুষের পক্ষে কোনো রাষ্ট্রই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। উপন্যাসটি আধুনিক সময়ে দলিত রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতেও প্রাসঙ্গিক।
পরিশেষে এটুকুই বলার যে এই বই শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, এটি ভারতের জাতিভিত্তিক রাজনীতি, দলিত আন্দোলনের অসংগতিগুলো এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটি সাহিত্যিক বিশ্লেষণ। ইতিহাস ও রাজনীতি-সচেতন পাঠকদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য।