মুরাদুল ইসলামের কোন বই আগে পড়া ছিল না, এটাই প্রথম। প্রথম বইয়েই আমি মুগ্ধ। তার গল্প বলার ভঙ্গি আমার বেশ লেগেছে। আলাদাভাবে তিনটা গল্পের কথা বলতেই হয়। জবা ফুলগাছ-সংশ্লিষ্ট গল্প, সাত্তার সাহেব ও একটি ঝাঁকড়া আমগাছের নির্দিষ্ট কিছু দুঃখ এবং পিপীলিকার পাখা।
অসাধারণ। মুরাদুল ইসলামের গল্পগুলো অভিনব।হয় বিষয়বস্তুতে,নয় বর্ণনাভঙ্গিতে।একবার পড়া শুরু করলে থামা যায় না।১৮টি গল্পের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে-জবা ফুলগাছ সংশ্লিষ্ট গল্প,পিপীলিকার পাখা,চিড়িয়াখানা,এখানে জাদু শেখানো হয়।অতিরিক্ত নিরীক্ষাপ্রবণ হওয়ার কারণে কিছু গল্পের পরিসমাপ্তি ভালো লাগেনি(যেমন-মসলিন চাষি)।অনেক গল্পেই জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া আছে।বইয়ের গল্পগুলো আবারও পড়বো ভালোভাবে বোঝার জন্য।এমনকি যে গল্পগুলো ভালো লাগেনি সেগুলোও।আর এখানেই বইটার সার্থকতা। (সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ :নিরীক্ষাপ্রবণ, অভিনব গল্প ভালো না লাগলে এই গল্পগ্রন্থ না পড়াই উত্তম)
হঠাৎ একদিন ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল আমার। শীত আসি আসি করছে এরকম একটা সময়কালে। আমার ওইসময় ঘুম ভাঙার কথা নয়। সেদিন আমার বেলা করে উঠবার কথা। এমনকি প্রতিদিনের ক্লেদক্লিষ্ট দিনগুলোতেও আমি এমন সময় উঠলে নিজের মাথায় বালিশ চাপা দিয়ে জোর করে আবার ঘুম দিতাম। কিন্তু সেদিন আমার তাড়া ছিলনা। আমি বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে আবিষ্কার করি পৃথিবীটা অন্যরকম। নামাজ ফেরত বৃদ্ধ মানুষের নুয়ে পড়া চলাফেরা, রাস্তায় দুই একটা গাড়ির টুংটাং, নতুন সবুজে মোড়ানো ঘাস... পৃথিবীটা যেন এরকমই মন্থর থাকবার কথা ছিল। আমার শান্তি শান্তি লাগতে লাগলো। নিয়মের বাইরে গিয়ে হঠাৎ শান্তি আবিষ্কার করলে, অপ্রয়োজনীয় সেসব স্মৃতি মানুষ মনে রাখে।
আমার মনে হয়েছে 'এখানে জাদু শেখানো' হয় নিয়মের বাইরে লেখা কোনো বই। নিঃসন্দেহে লেখক মুরাদুল ইসলামের লেখা অন্যরকম এবং বোধবুদ্ধি সম্পন্ন। চমৎকার আঠারোটি ছোটগল্প রয়েছে বইটিতে। বইয়ের নামে 'জাদু' শব্দটি রয়েছে যে অর্থে, সেই অর্থেই কয়েকটি গল্পে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া রয়েছে। 'জবা-ফুলগাছ সংশ্লিষ্ট গল্প'- নামক গল্পটি আমার অত্যন্ত পছন্দ হয়েছিলো দেখে মার্ক করে রেখেছিলাম। ছোট্ট সাধারণ একটি গল্প, কিন্তু সামাজিক চিন্তাচেতনা, আর্থসামাজিক দৃশ্যপটকে যেন আয়নার মতো দেখলাম গল্পটায়। গুডরিডসে রিভিউ পোস্ট করতে গিয়ে দেখলাম বেশিরভাগেরই এই গল্পটি মনে ধরেছে। অনেকের সাথে একমত হওয়ায় বিষয়টা ভালো লাগলো। শেষের দিককার গল্পগুলো খুব বেশি পছন্দ হয়নি আমার। এর মাঝে 'পিপীলিকার পাখা' গল্পটা মনে আছে কারণ গল্পটা লেখা হুমায়ুন আহমেদীয় ধারায়। মানে ইন এ গুড ওয়ে। হুমায়ুন আহমেদ গল্পে অনেক সাবটেক্সট দিতেন। অনেক অর্থবহ বিষয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখতেন। বেশিরভাগ লেখক এই অংশটুকু ধরতে পারেন না, তারা শুধু উদ্ভট রচনাভঙ্গিটুকুই নকল করেন। ভালো লাগলো মুরাদুল ইসলাম ব্যাপারটা ধরতে পেরেছেন।
কথা আর বেশি বাড়াচ্ছিনা। ভালো লেগেছে বইটি। কিছু গল্পে আরেকটু সিরিয়াস হলে হয়তো আরো ভালো লাগতো। লেখকের রচনাভঙ্গি সুন্দর। গল্পও প্রাসঙ্গিক। তবে মাঝেমধ্যে লেগেছে যে একই সময়কালেরই দৃষ্টপট আঁকতে চাচ্ছেন তিনি বারবার। কিছু কালোত্তীর্ণ গল্প জায়গা পেলে বোধহয় পরীক্ষামূলক লেখাগুলো আরো চার্ম পেতো।