নির্মল পরিচ্ছন্ন অকপট ভাষায় এক দুঃসাহসিক কলমের অভিযান হলাে ‘প্রাইভেট লাইফ অব ইয়াহিয়া খান’। ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক দেওয়ান বারীন্দ্রনাথ তার লেখনীর ভিতর দিয়ে একজন প্রাক্তন সামরিক স্বৈরশাসক, যৌনদানব, মাতাল, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অন্দরমহলের অবিশ্বাস্য সব জানালা খুলে দিয়েছেন। সাংবাদিক দেওয়ান বারীন্দ্রনাথ পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে লেখালেখি করতেন। ১৯৭১ এর যুদ্ধকালীন সময় এবং এর পূর্বে ইয়াহিয়া খানের ভূমিকা, তার অন্ধকার জীবনের নানাদিক বিশ্বাসযােগ্য তথ্যের ভিত্তিতে লেখক ‘প্রাইভেট লাইফ অব ইয়াহিয়া খান’ বইটিতে লিখেছেন।
বইটা পড়ে প্রাপ্তির বদলে অপ্রাপ্তি যেন বেশি অনুভূত হলো৷ এ উপমহাদেশে ইয়াহিয়া খান সবসময় একজন বিশেষ চরিত্র হিসেবে উল্লেখিত থাকবেন। তাঁর স্বল্প সময়ের শাসনকালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রটা যে ভেঙে দু’টুকরো হলো, এক্ষেত্রে অনেকেই তাঁর দায় দেখেন।
পেশাদারি জীবনের মতো ইয়াহিয়া খানের ব্যক্তি জীবনটাও নানাবিধ বৈপরীত্যে ভরপুর। প্রাথমিক জীবনের সৎ, সচ্চরিত্রবান একজন মানুষ যেভাবে জীবনের সায়াহ্নে এস মদ্যপ, নারীলিপ্সু হয়ে উঠলেন, তা আসলেই কৌতুহলী হওয়ার মতো। নিশ্চিতভাবে চরিত্রের এ অধঃপতন তাঁর সে সময়টাতে নেয়া সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করেছে।
লেখক বারীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছেন ছোট পরিসরে তাঁর সে সময়কার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরতে। ভালো হতো ইয়াহিয়া খানের সে সময়কার সিদ্ধান্তগুলোতে তাঁর ব্যক্তি জীবনের প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হলে।
তবে বইয়ের শেষভাগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষকালে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। যদিও সেটাতে কোনো সূত্র না থাকায় তা অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে।
ভারতীয় সাংবাদিক দেওয়ান বারীন্দ্রনাথ ইয়াহিয়া খানকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী বই লেখেন। মূলত, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তার নারী কেলেঙ্কারির কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎকালীন পাকিস্তানকে প্রভাবিত করেছিল তারই বৃত্তান্ত নিয়ে 'প্রাইভেট লাইফ অফ ইয়াহিয়া খান'। বইটির অনুবাদ করেছেন রাফিক হারিরি।
মাত্র ৮৫ পাতার একটি বই। অথচ ইয়াহিয়া খান সম্পর্কে জানতে, তার বিকৃত মনোজগৎ ধারণা পেতে হলেও বইটি পড়া উচিত।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয়ের পর ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা দিয়ে পদত্যাগ করেন। পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করতে বিচারপতি হামদুর রহমানের নেতৃত্বে কমিশন গঠিত হয়। তখনই টেলিভিশন, সংবাদপত্রে বেশকিছু রমণীর নাম আসতে থাকে। জনৈক পতিতার মাসী, এক বাঙালি আমলার বাঙালি স্ত্রী যে ব্লাক বিউটি নামে খ্যাত ছিল, একজন বিখ্যাত গায়িকা নুরজাহানসহ অনেকেরই নাম উচ্চারিত হতে থাকে ইয়াহিয়ার সঙ্গে।
চূড়ান্ত মদ্যপ, চরিত্রহীন এবং কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত এক জেনারেলের অন্ধকার জীবনের আখ্যানই হলো 'প্রাইভেট লাইফ অফ ইয়াহিয়া খান '।
মাত্র ৮৫ পাতার বইটি আয়তনে অত্যন্ত ক্ষুদ্র কায়া হয়ে গেছে। অবশ্যই ঘটনাগুলোকে আরো বিশ্লেষণ করতে পারতেন লেখক। তা তিনি করেননি। বরং একই নারীদের নাম বারবার এনেছেন এবং তা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে না পেরে চর্বিতচর্বণ করেছেন নিজের বক্তব্যের। নারীলোভী এবং মদ্যপ ইয়াহিয়া খানের চরিত্রের অধঃপতনকে সূক্ষ্মভাবে সমর্থনের চেষ্টা করেছেন দেওয়ান বারীন্দ্রনাথ। মূলত তিনি চিত্রিত করতে চেয়েছেন ক্ষমতা পাবার আগে জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া মদারু এবং লম্পট শিরোমণি ছিল না। ছিল আপাদমস্তক ভদ্দরলোক! ক্ষমতাই তাকে পাক্কা শয়তান করে তুলেছে। তাই ইয়াহিয়া তার ঘৃণ্য কৃতকর্মের জন্য একটু কম দায়ী। সে অনেকটা পরিস্থিতির শিকার! তার এই অপ্রত্যক্ষ দাবির সপক্ষে যেসব ঘটনা উল্লেখ করেছেন লেখক তা যুক্তির ধোপে টেকে না। উল্টো দেওয়ান বারীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য নিয়ে মনে 'সন্দেহ' তৈরি হলে নিরীহ পাঠককে দোষ দেওয়া চলে না।
সবিশেষ বলব, কুখ্যাত ইয়াহিয়া খানকে অন্যভাবে জানতে পড়া যায় বইটি।
চটকদার শিরোনামের বই, ভেতরকার তথ্যও চটকদার বটে। তবে বিপরীতধর্মী সূত্রের পরস্পরবিরোধী তথ্যে শেষমেশ কোন তথ্যটা পাঠজ হিসেবে বিশ্বাস করব সে খটকা থেকেই যায়। তবে আমাদের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কিছু খন্ডচিত্র ফুটে ওঠে বলে বইটাকে একদম ফেলে দেয়া যাচ্ছে না।