শেয়ালদা মেইনের হুইলারের সামনে সুরঞ্জনা একটু আগেই পৌঁছে যায়—কলকাতায় কোথাও যথাসময়ে পৌঁছুতে হলে হাতে সময় নিয়ে বেরিয়ে, শেষে অনেক সময় বিঘ্নহীন পথ পেরিয়ে আগেভাগেই হাজির হতে হয় যেমন। সুরঞ্জনার একটু দেরি হলে মহাভারত অশুদ্ধ হতো না, আলোকময় আগে এসে গেলে তার জন্যে এখানে, এই হুইলারের সামনেই অপেক্ষা করত, আর তেমন একটু বিশ্রামের মন নিয়েই তো সুরঞ্জনার আশা উচিত ছিল। আগে যখন পৌঁছেই গেছে, সে শেয়ালদা স্টেশনটায় একটু ঘুরপাক খেতেও পারত। তেমন কিছুও না করে একেবারে সরাসরি এসে হুইলারের এই ঘুপচিটার মধ্যে ঢুকে গেল, এমনকি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পত্র-পত্রিকাগুলোর ওপর চোখও বোলাল না। যেন আলোকের সঙ্গে তার আজ এমনই দরকার যে তার অন্য কোনো দিকে মন দেয়ার মতো কোনো অবসর নেই।
অথচ সুরঞ্জনা জানে যে আলোক এলে সে আর তার অস্থিরতার কারণটা আলোককে বলতে পারবে না। এমন হতে পারে, আলোক এসে পড়লে সে আর অস্থির বোধ করবে না। আবার, এমনও তো আজকাল যে-কোনো দিন ঘটে যাচ্ছে যে সে না-পারল আলোককে তার অস্থিরতার কারণ বোঝাতে, অথচ না-পারল আলোকের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতে, শেষে আজকের দেখা হওয়াটা অর্থহীন হয়ে গেল এমন একটা বোধ নিয়ে দুজনের ছাড়াছাড়ি হলো।
আলোক আজ সেই চিঠিটা টাইপ করে খামে পুরে নিয়ে আসবে, কাল সেই চিঠিটা সুরঞ্জনার অফিসে জমা দেবে—এখন পর্যন্ত এ রকমই ব্যবস্থা, মানে কথা হয়ে আছে। চিঠিটা কি আর সুরঞ্জনা তার অফিসে টাইপ করে নিতে পারত না? অফিসে যদি না-পারত তাহলে বাইরে কোথাও থেকে টাইপ করে নিত। আলোককে ইছাপুরের অফিস থেকে চিঠি টাইপ করে এনে সুরঞ্জনাকে দিতে হবে আর সুরঞ্জনা সেটা সই করে অফিসে জমা দেবে, তাও আবার কালই, ঘটনাটা এমন না-হতেও তো পারত। এমন না-হওয়ারই তো কথা ছিল গত ছ-মাস। বা এক বছর। বা দুই বছর। আলোক তো ওদের ইছাপুর অফিসে বদলি নিয়েছে দুই বছরের বেশি, বদলি নেবারও কয়েক মাস পর, ক-মাস পর, ছ-মাস আট মাস, এক বছরের আগে কি কোয়ার্টার পাওয়া যায়? তা হলে এতদিন ধরেই এই চিঠি দেয়ার ব্যাপারটিকে পিছিয়ে দিয়েছে সুরঞ্জনা?
দেবেশ রায়ের জন্ম ১৯৩৬ সালে অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পাবনা জেলার বাগমারা গ্রামে। ১৯৪৩ সালে তাঁর পরিবার জলপাইগুড়ি চলে আসেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময় প্রত্যক্ষ বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতির সূত্রে শিখেছিলেন রাজবংশী ভাষা। কলকাতা শহরেও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সে একজন গবেষণা সহকর্মী ছিলেন। তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে জলার্ক পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস ‘যযাতি’। ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি এক দশক পরিচয় পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৯০ সালে ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসের জন্যে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ২০২০ সালে কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে দেবেশ রায়ের জীবনাবসান হয়।