Kamal Kumar Majumdar (Bengali: কমলকুমার মজুমদার) (17 November 1914 – 9 February 1979) was a major fiction-writer of the Bengali language. The novel Antarjali Jatra is considered his most notable work.
কমলকুমার মজুমদার বাংলা ভাষার অন্যতম দুরূহ লেখক। একজন লেখকের নিজস্ব ভাষারীতি সৃষ্টি করার ঘটনা সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই বিরল। কমলকুমারের ' গোলাপ সুন্দরী'র সৌন্দর্যের স্বাদ আস্বাদন করতে আমার বেশ বেগ পেতে হয়েছে। চার-পাঁচবার শুরু করেও রেখে দিতে হয়েছে। কিন্তু যখন শেষ করেছি তখন এক অনাস্বাদিত মুগ্ধতা আর সৌন্দর্যে আবিষ্ট হয়ে গেছি। সুনীলের অতি চমৎকার ভূমিকাখান সহায়তা করেছে যথেষ্ট।
' গোলাপ সুন্দরী'র ঘটনা খুব আহামরি কিছুনা। এক যক্ষায় আক্রান্ত রোগীর জীবন সায়াহ্নে ঘটে যাওয়া এক রাতের আকস্মিক কিন্তু অতি রোমান্টিক মুহুর্ত যাপনের মাধ্যমে মৃত্যু,সৌন্দর্য, রূপ আর গভীর জীবনবোধের উপলব্ধি প্রাপ্তি। এসব বই বারবার পড়তে হয়। আবার হয়তো কোন নিশি রাতে অন্ধকারে মোম জ্বালিয়ে ' গোলাপ সুন্দরী'র মুখোমুখি হবো।
প্রথম তাঁর কথা জেনেছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য' গ্রন্থ থেকে। দুর্বোধ্য ভাষা শুনে পিছিয়েই ছিলাম এতদিন। আজ হঠাৎ মনে হল, না, কমলকুমারকে জানা দরকার আমার। যিনি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র লেখার ধারার জনক ছিলেন, যিনি একাই বাংলা ভাষাকে এক অনন্য রূপদান করেছেন, একজন সাহিত্যপ্রেমী হিসেবে তাঁকে না জানাটা আমারই দীনতা হয়ে থাকবে। তাই তাঁর অপেক্ষাকৃত সহজ উপন্যাস 'গোলাপ সুন্দরী' ই আগে পড়লাম। জীবনানন্দের কবিতা পড়ে যেমন একটা ঘোরে ছিলাম, এই লেখাটা পড়েও আমার মনে হল এক সুবৃহৎ কাব্যই পড়লাম। এক রাতের এক প্রেমের কাহিনী, গোলাপ ফুটবার এবং সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক প্রেমের আখ্যান এত কাব্যিক এত অন্যরকম যে প্রথমটায় ঠাহর করা কষ্ট, কাহিনী যাচ্ছে কোনদিকে। অন্তর্জলী যাত্রা পড়ার হোমওয়ার্ক হিসেবে পড়তে গিয়ে নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্য এবং কমলকুমার উভয়েরই সেরা রচনার একটি পড়ে নিলাম। ভালো লাগছে এক সম্পূর্ণ অজানা স্রোতে গা ভাসাতে পেরে। ভালো লাগছে গদ্যে কবিতাকে অনুধাবন করতে পেরে। খুব ভালো লাগছে।
'গোলাপ সুন্দরী' কমলকুমার মজুমদারের দ্বিতীয় উপন্যাস। প্রথম 'অন্তর্জলী যাত্রা'। কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসে পাঠক মূলত 'গোলাপ সুন্দরী' দিয়ে প্রবেশ করে। অন্ততঃ তেমনই একটা ইঙ্গিত কথামুখে রেখে গেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ১৩৫৪ সালের বৈশাখে 'এক্ষণ' পত্রিকায় প্রকাশিত এই উপন্যাসটির সূচনা স্যানাটোরিয়াম থেকে বিলাসের ছুটির প্রসঙ্গ দিয়ে। এখানে বলে রাখা দরকার শুরুর দুটি পাতা পাঠক ও ভাষার এক প্রবল লড়াই যে লড়াইয়ে বিজয়ী হলে তবেই প্রবেশ অনুমতি। বিলাসকে নিতে এসেছে তার দিদি, জামাইবাবু। বিলাসের এতদিনের রোগযাত্রার সঙ্গীরা , তাদের মধ্যে আত্মারামের মতো কেউ কেউ নেই ও আর ,যারা আদৌ ফিরবে কিনা জানা নেই তাদের আচরণের অস্বাভাবিকতায় কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে জায়গাটি অ্যাসাইলাম।তারপরেই ফিরে আসে রক্তাক্ত সম্ভাবনাগুলির মর্মান্তিক ইশারা মরণাপন্ন এই তরুণ যুবকদের রক্তশূন্যতায়...গোটা উপন্যাসেই এই ইঙ্গিত...যা নেই, যা থাকবে না তাইই প্রকট হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ বর্ণনায়। কে না জানে গোলাপ আর তার লালিমা 'প্যাশনেট লাভ' এর সমার্থক...অথচ এক মারণ রোগে তাদের শ্বাসের সংখ্যা সীমিত... যৌবনের সুস্থির স্বাভাবিক ভালোবাসা বিমুখ করেছে বলেই কি সমকাম? এমন অনেক উত্তরের সন্ধানে একবার নয় বারবার আসতে হবে এই লেখার কাছে। হাতে গোনা কয়েকটি চরিত্র কিন্তু জীবনের বহু দিকের আশ্চর্য সংকেতে তা ভাস্বর... নিম্ন বর্ণের এক নারীর মৃত্যু একই রোগে যার ঘোষণা বিলাসের কন্ঠে "ওদের কাঁদতে বল, তোরা ব্যবস্থা কর'' সে ব্যবস্থার অন্যতম কান্ডারী হয় বিলাসও।তাকেই পিন্ডদানের মন্ত্র পড়তে হয়। তার মনে হয় 'চিতায় শুইলে মানুষকে কত সুন্দর দেখায়...' এ সবই নিপুণভাবে ক্ষেত্র তৈরি করে যেখানে একদিনের গোলাপের মতো একটি রাতেই ভালোবাসা আসে...চলেও যায় রক্তের চিহ্ন রেখে... একসময়ের রাজরোগ যক্ষ্মা কেমন করে হয়ে ওঠে মহৎ সাহিত্যের বিষয় তা এই অতিমারীর বিষণ্ণ সময়ে অন্য এক আশ্রয়ের সন্ধান দেয় । তাছাড়া সাম্প্রতিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে যুবসমাজের এক গহীন অবসাদকেও যেন প্রত্যক্ষ করে পাঠক এক ভিন্ন আঙ্গিকে। ফরাসী ভাষা ও সাহিত্যের পন্ডিত মানুষটি বাংলা সাহিত্যে যে সৃজন রেখে গেলেন তা শতবর্ষ পরেও বাঙালির বুদ্ধি ও মেধাকে আরো আরো শানিত করার অগ্নিফলক। নিজেকে ঋদ্ধ করার এই আহ্বানটুকুকে কেবল গ্রহণ করতে হবে সযত্নে...
কমলকুমার মজুমদার বাংলা সাহিত্যের সেই দুর্লভ প্রতিভা, যিনি নিজ ভাষার শরীরে নির্মাণ করেছিলেন এক সম্পূর্ণ নতুন গদ্যপ্রকৃতি—দুরূহ, ধোঁয়াটে, কিন্তু গভীরভাবে আত্মানুসন্ধানী। তাঁর উপন্যাস গোলাপ সুন্দরী প্রথমেই পাঠককে স্পষ্ট করে দেয়: এটি কেবল এক প্রেমকাহিনি নয়, বরং এক বহুমাত্রিক কাব্যিক অভিজ্ঞতা—যেখানে “language is not merely a tool of communication, but a tissue of dreams” (Barthes)। পাঠককে একাধিকবার থেমে থেমে পড়তে হয়; কিন্তু একবার পাঠ শেষ করলেই এই পাঠ অনিবার্যভাবে এক মোহে বেঁধে ফেলে, যাকে ছেড়ে আসা যায় না।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘গোলাপ সুন্দরী’ যেন কমলকুমার পাঠের প্রথম সিঁড়ি। উপন্যাসের কাঠামো সরল—এক যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত যুবক, বিলাস, স্যানাটোরিয়ামে কাটাচ্ছে জীবনের শেষ সময়। এই অন্তিম প্রহরে হঠাৎ তার জীবনে উপস্থিত হয় এক রহস্যময়ী নারী, এক অপ্রত্যাশিত রাত্রির অভিজ্ঞতা, আর সেই রাতেই উদ্ভাসিত হয় প্রেম, মৃত্যু, সৌন্দর্য ও মানব-চেতনার বহুস্তরীয় উপলব্ধি। উপন্যাসের শুরুতেই ‘বুদ্বুদ’ প্রসঙ্গ—যেটি একদিকে বিলাসের চেতনার প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়িত্বের রূপক। যেন জীবনের মানে খুঁজতে খুঁজতেই সে বলে ওঠে, “We are such stuff as dreams are made on, and our little life is rounded with a sleep” (Shakespeare, The Tempest)।
কমলকুমারের গদ্য কুয়াশার মতো ধোঁয়াটে—জানালার কাচে জমে থাকা শীতের শিশিরের মতো, ধরা যায় না তবু অনুভব করা যায়। এই ভাষা পাঠককে কেবল পড়ে যেতে বলে না, তাকে ‘ধার্য’ করতে বাধ্য করে। চরিত্রেরা হাতে গোনা, কিন্তু এক-একটি যেন দার্শনিক চিহ্ন: দিদি, জামাইবাবু মোহিত—যাঁরা নাগরিক বাস্তবতার প্রতিনিধি, আর স্বর্ণলতা—নিম্নবর্ণ, রোগগ্রস্ত, তবু বিলাসের অবচেতনে এক অলৌকিক প্রজ্ঞার প্রতীক। প্রেম এখানে লিনিয়ার নয়, বরং একাধিক মাত্রার—সমকামিতার সংকেত, রূপাত্মক প্রেম, প্রায় একধরনের প্লেটোনিক আকাঙ্ক্ষা। গোলাপ, যে প্রেমের প্রতীক, এখানে তার রং রক্তিম, কিন্তু তা কাঁটাযুক্ত, সংক্ষিপ্ত ও অনিবার্য পতনের দিকে ধাবমান। যেন সেই Keats-এর পঙ্ক্তি: “She dwells with Beauty — Beauty that must die.”("Ode on Melancholy")
বিলাস এক আধুনিক ট্র্যা��িক চরিত্র—সে কবি হতে চায়, কিন্তু কবিতা হতে পারে না। সে প্রেমে পড়ে, কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। সে বিশ্বাস করতে চায়, কিন্তু সেই নির্ভরতা তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। তার প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা আত্ম-চেতনার মধ্যেই বিপর্যস্ত। তার চেতনায় ধরা পড়ে এক পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা—মৃত্যুর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা জীবনের স্পন্দন। যেন T. S. Eliot-এর ছায়ায় বলা যায়: “Between the idea / And the reality / Between the motion / And the act / Falls the Shadow.”
এই উপন্যাস কাহিনি নয়, এক শিল্পকর্ম। তাকে পাঠ করতে হয় চোখে নয়, অন্তঃকরণ দিয়ে। ‘গোলাপ সুন্দরী’ যেন একটি মাত্র রাতের কাহিনিকে আশ্রয় করে গড়ে তোলে এক মহাকাব্যিক ভাষা-জগৎ, যেখানে “the real voyage of discovery consists not in seeking new landscapes, but in having new eyes” (Proust)। বাংলা গদ্যের শরীরে কমলকুমার যে নতুন ধমনির জন্ম দেন, তা আজও বয়ে নিয়ে যায় গভীরতম রক্তস্রোত। যৌবনের ক্লান্ত, মৃতপ্রায় আকাঙ্ক্ষা, ভাষার সীমানাহীনতা, আর এক গভীরভাবে অশ্রুত বিষাদ—সব মিলিয়ে ‘গোলাপ সুন্দরী’ এক অনন্য কাব্যিক উপন্যাস, যা বারবার পড়তে হয় যেন নিজের আত্মার প্রতিধ্বনি খুঁজে পেতে।
গোলাপ ঝরে যায়—তবু তার ঘ্রাণ মিশে থাকে পাঠকের গভীরতম অনুভবের মধ্যে। কমলকুমারের এই উপন্যাসও তেমনই—চোখের পাতার ভাঁজ থেকে হারিয়ে যায়, কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে যায় দীর্ঘতম অনুরণনে।