রহস্যভেদীর শাণিত মস্তিষ্ক, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ, আর বন্দুকের সামনে ভীত অপরাধী'র "কোতো টাকা চাই আপনার, মিস্টার মিত্তির?" - মোটামুটি এই দেখেই অপরাধ জগতের সম্বন্ধে আমাদের ধারণাটা তৈরি হয়। পরে, খবরের কাগজ, কানাকানি, মিডিয়ায় ফেটে পড়া কোনো ঘটনা - এদের মাধ্যমে আমরা বুঝতে শুরু করি, সত্যিকারের অপরাধ কাকে বলে। তবে বোঝাটা সম্পূর্ণ হয়, যখন আমাদের হারানোর মতো কিছু, বা কেউ আসে - বন্ধু, জীবনসঙ্গী, সন্তান! তখন আমরা অপরাধের নিকষ কালো চেহারাটা দেখতে পাই। বাংলা সাহিত্যে এই চেহারাটা দেখাতে চাওয়া মানুষ খুব বেশি আসেননি। অথচ এই নবীন লেখক নিজের প্রথম বইয়ের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এমন কুড়িটি সত্যিকারের অপরাধমালা, যাদের নিয়ে ফিকশন লিখতেই আমরা সাহস পাব না! কুড়িটি সিরিয়াল কিলারের আখ্যান বর্ণিত হয়েছে এই বইয়ে। এই চরিত্রদের মধ্যে কেউ পেডোফাইল, কেউ সিরিয়াল রেপিস্ট, কেউ ক্ষমতালোভী, আবার কেউ স্রেফ ডাকাত। কিন্তু প্রাণের মূল্য যে এদের কাছে কানাকড়িও নয় - এটাই প্রমাণ হয়েছে এই বইয়ের পাতায়-পাতায়। একবারে নয়, ধাপে-ধাপে পড়া উচিত এই লেখাগুলো। একটানা পড়তে গেলে ক্রাইম ফিকশনের তন্নিষ্ঠ পাঠকেরও গা গুলিয়ে উঠতে পারে। চলে যেতে পারে বাঁচার আগ্রহ। প্রচুর পড়াশোনা করে, নিহত ও নির্যাতিত মানুষগুলোকে প্রাপ্য সহানুভূতি দিয়ে, সযত্নে এই লেখাগুলো দাঁড় করিয়েছেন লেখক। নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ সামলাতে না পেরে মাঝেমধ্যে লেখা গতি হারিয়েছে ঠিকই। তবু, মোটের উপর লেখক বিষয় ও কাঠামোর ওপর যে নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছেন তা প্রশংসনীয়। শুধু, এই নরকের কীটদের তথাকথিত ট্রমাটাইটজড অতীতের বর্ণনা দিয়ে তাদের হিউম্যানাইজ করার চেষ্টাটা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। ওটার জন্য এক তারা খসাতে বাধ্য হলাম। তবে ওটুকু বাদ দিলে এই বই পড়া দরকার। নিজেদের স্বার্থে, সন্ততি ও প্রিয়জনেদের স্বার্থে, পৃথিবীর স্বার্থে আমাদের বুঝে নেওয়া দরকার, ঠিক কী ধরনের অ্যাপেক্স প্রিডেটরের রাজত্বে বাস করি আমরা। 'ট্রু ক্রাইম' সেই নির্মোহ দৃষ্টি লাভের পথে একটা বড়ো ধাপ হতে পারে।
বাংলায় ট্রু ক্রাইম নিয়ে কাজ বড়োই কম। তাই সুপ্রতিম সরকারের "গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার"-ই হোক কিংবা দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের "হারিয়ে যাওয়া খুনিরা"... বইগুলি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই সংগ্রহ করে সেগুলি পড়েছি এবং যারা এই সত্য অথচ নৃশংস ঘটনাগুলো জানতে ইচ্ছুক তাদের পড়তেও বলেছি। যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরি... ২০১৮ তে "কুহক" নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে "ট্রু ক্রাইম" নিয়ে একটি সিরিজ শুরু করেন তমোঘ্ন নস্কর। সুখপাঠ্য গদ্যে হাড় হিম করা সত্যঘটনা গুলো পড়তে পড়তে কখনও শিউড়ে উঠেছি, কখনও বা চারপাশটা ঝাপসা হয়ে উঠেছে.. কিন্তু সিরিজের প্রতিটি লেখাই একের পর এক পড়ে গেছি বা বলতে পারেন পড়িয়ে নিয়েছে। তারপর হুট করেই সিরিজটি বন্ধ হয়ে যায়। পরের এপিসোডের অপেক্ষায় দিন গুনতে গুনতে আর লেখককে "কবে পাব?" টাইপ খোঁচা দিতে দিতে জানতে পারি সিরিজের গল্পগুলিকে দু'মলাটের মধ্যে আনা হচ্ছে। তারপর শুরু হল অপেক্ষা.. একসময় বইটি প্রকাশিত হলো.. সংগ্রহও করলাম। পড়াও শুরু করলাম.. কিন্তু একটানা পড়া গেল না। কেন জানেন? ওই বিভৎসতা কে একসাথে নেওয়ার মতো মানসিকতা আমার নেই। আকারের দিক দিয়ে গল্পগুলো ছোট হলেও তার ইমপ্যাক্ট কী পরিমাণ ভয়ঙ্কর হতে পারে তা আপনি গল্পগুলো শুরু না করলে বুঝবেন না। ভেবে দেখুন, ছোট্ট শিশু থেকে বয়স্ক মানুষ যেই হোক না কেন, এদের কাছে তাদের প্রাণের মূল্য কিচ্ছু না। জাস্ট কিচ্ছু না। যাদের নিয়ে ভাবতে গেলেও গা গুলিয়ে ওঠে সেইসব মানুষ(আদৌ কী?) ও তাদের পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের কথা লেখক যে লিখতে পেরেছেন এটার জন্যই হ্যাটস অফ। প্রশ্ন আসতেই পারে এদের কথা লিখে লাভ কী? দেখুন, সাবধানের মার নেই। আমাদের আশেপাশে কী ধরণের কেউটে-রা থাকে.. তা জানা দরকার বলেই আমি মনে করি। শুধু একটাই অভিযোগ, যারা মানুষই না.. তাদের মনুষ্যত্ব কে জাস্টিফাই করতে অহেতুক কালি খরচ আমার পচ্ছন্দ নয়। বইটি অবশ্যই পড়ুন। নমস্কার।
ঘৃণা, প্রতিহিংসা, রাগ, ক্ষোভ, মানসিক বিকৃতি ইত্যাদি কোন পর্যায়ে পৌঁছালে মানুষ ভয়ানক নৃশংস হয়ে উঠতে পারে! এদের আচরণকে পাশবিক বললে হয়তো পশুরা আপত্তি জানাবে। এর আগে সুপ্রতিম সরকারের লেখা 'গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার(১)' পড়েছিলাম। মানুষের নৃশংসতায় আঁতকে উঠেছিলাম বারবার। এই বই তার থেকে কোনো অংশে কম নয়। এই বইতে দেশ - বিদেশ মিলিয়ে মোট ২০টি কুখ্যাত কাহিনী আছে। যার মধ্যে আমার বেশি নজর কেড়েছে "কেমন আছেন আন্টি?", "মাম্মাম", "ও ডাক্তার", "রানি"," সাবান" এগুলো। তবে আমি বলবো শুধু এগুলোই নয়, আসলে প্রত্যেকটি কাহিনীই ভয়াবহ,যা পড়ে স্নায়ুতে চাপ পড়বেই। আর এদের পাশবিক নৃশংসতায় ভয় পেতে বাধ্য হতে হবে। অবশ্য লেখক নিজেই বলেছেন "ভয়ে থাকুন। ভয়ই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। "
লেখক খুব স্বল্প পরিসরের মধ্যে প্রত্যেকটি কাহিনী লিখেছেন। যা থেকে অপরাধী কে, অপরাধীর মোটিভ কী, অপরাধের পদ্ধতি এবং সবশেষে অপরাধীর পরিণাম কী হলো, তা ভালোভাবেই জানা যায়। বইটাকে অবশ্যই ভালোই বলবো। তবে যেহেতু আমি খুবই দুর্বল স্নায়ুর তাই হয়তো এই ধরণের বই আর ভবিষ্যতে কেনার সাহস হবে না। তবে যারা আমার মতো দুর্বল স্নায়ুর না, তারা পড়ে দেখতে পারেন, আশা করি ভালোই লাগবে।
কুড়িটি রুদ্ধশ্বাস অপরাধের সত্যি কাহিনী। কাহিনীগুলো সত্যিই দুর্বল চিত্তের পাঠকদের জন্য নয়। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনুষ্যত্বের উপর থেকে বিশ্বাসও হারিয়ে ফেলতে পারেন। বর্তমান সময়ে সত্যি অপরাধের ননফিকশন সাহিত্য বেশ জনপ্রিয় একটি ধারা। এই বইটিও সেই একই ধারার যথাযথ অনুসারী। লেখকের মুন্সিয়ানা পাঠকে ভয় পাওয়াতে বাধ্য। লেখকের কথায় 'ভয়ই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।' সুপ্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত কুড়িটি ঘটনাকে অতি সন্তর্পনে বাছাই করে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। আমার বিশেষ করে নজর কেড়েছে 'রানী' গল্পটি। শ্রীলঙ্কার দুই হাজার বছর প্রাচীন এক ব্যভিচারী রাণীর আখ্যান তুলে ধরা ধরছে। এই গল্পটা সত্যিই অবাক করে রাখে। সত্যিকারের অপরাধ ননফিকশন গল্পে মূলত তিনটি ভাগ থাকে। এক, ঘটনা বা অপরাধ কিভাবে সংঘটিত হচ্ছে;দুই, তদন্ত প্রক্রিয়া; তিন, অপরাধীর অতীত বা অপরাধ প্রবণ মানসিকতার বিশ্লেষণ। আর শেষেরদিকে অনেক ক্ষেত্রেই বিচার পদ্ধতিতে ন্যাস্ত শাস্তির উল্লেখ থাকে। এরমধ্যে তদন্ত পদ্ধতি কাহিনী বিশেষে অনেক সময় অনুপস্থিত থাকতে পারে। একই ভাবে তদন্ত পদ্ধতি বর্ণনার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও কর্ম পদ্ধতি নিয়ে সম্যক ধারণা থাকা চাই। ঠিক যে কারণে সুপ্রতিম সরকারের লেখা লালবাজার সিরিজের প্রত্যেকটা ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্ত অংশটা অনেক বেশি বিস্তারিত থাকে। আমাদের আলোচ্য বইয়ে কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে এই খাম��িটা চোখে পড়ে। তবুও প্রত্যেকটা ঘটনার যতটা বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে কিন্তু লেখকের পরিশ্রমকে অস্বীকার করা যায় না। শেষে কতগুলো ছোট ছোট সমস্যার কথা বলি। শেষের দিকে বেশ কিছু ঘটনার শুরুতে সিনেম্যাটিক ফ্রেম ওয়াইজ বর্ণনা করতে গিয়ে আসলে লেখা বেশ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। ফলে কে কোনটা বলছে, আর যে করছে সে আসলে কে (আগের লাইনের ব্যক্তি আর পরের লাইনের ব্যক্তি একই না আলাদা) এগুলো বুঝতে কিন্তু একটু বেগ পেতে হয়। আমি বার কয়েক পড়ার পরে বুঝতে পেরেছি কে কোনটা আর কি করছে। বিশেষ করে- 'জোকার' আর 'পেড্রো' গল্পে এই সমস্যা বেশি চোখে পড়ে। বইয়ের ঘটনাগুলোর কোনো নির্দিষ্ট ক্রনোলজি নেই বলেই মনে হলো। যদিও আমি ভুল হতেই পারি। সেই সূত্রেই বলি, বইয়ের প্রথম দুটি গল্পের নাব্যতা কিন্তু বেশ কম। আমার ব্যক্তিগত মত হল, এই দুটিকে বইয়ের মাঝে কোথাও রাখলে ভালো হত। তবে আবারও বলবো, লেখক সরাসরি কোনো অপরাধ দমন বিভাগের সাথে যুক্ত না থেকেও যে বিস্তর পরিশ্রম করে পাঠকদের জন্য বইটি লিখেছেন, তারজন্য লেখকের কুর্ণিশ প্রাপ্য। যারা সত্যি অপরাধের ননফিকশন কাহিনী পড়তে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এই বইটি লিস্টে থাকুক। পাঠক আশাহত হবেন না। শব্দ প্রকাশনার বাঁধাই বেশ ভালো, বইয়ের পাতাগুলোও উৎকৃষ্ট মানেই। তবে গল্পের টাইটেলগুলো অনেক সময়ই মূল লেখার প্রায় গায়ে গায়ে মনে হয়। টাইটেল আর মূল লেখার মধ্যে আরো কিছুটা জায়গা ছাড়লে বোধহয় ভালো হত, আর যদি টাইটেলগুলোকে একটু বোল্ড করা যেত। না হলে এক মনে অবাক হয়ে পড়তে পড়তে কিছু কিছু জায়গায় আমি যে অন্য গল্পে ঢুকে গেছি বুঝতেই পারিনি। যখন কিছু মিলছে না, তখন উপরে তাকিয়ে দেখলাম, ও আচ্ছা নতুন গল্প! শব্দ প্রকাশন ভালো ভালো নন ফিকশন নিয়ে আসছে সাম্প্রতিক সময়ে। শব্দ প্রকাশনা থেকে আরো ভালো ভালো নন ফিকশন পাওয়ার আশা থাকবে ভবিষ্যতে।
২০ জন অপরাধী, তাদের অপরাধ আর সেইসবের পিছনের জটিল মনস্তত্ত্ব – লেখক যেভাবে বর্ণনা করেছেন, সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রতিটা গল্পই ভিন্নভাবে ভয়ংকর, পাশবিক… কিছুটা অস্বস্তিকরও হতে পারে, তবে সেই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে উপভোগ্য।
দূর্বল চিত্তের না হলে একবার পড়ে দেখতে বলবই। আমার ব্যক্তিগতভাবে “জোকার” আর “রানি” সবচেয়ে মনে লেগেছে – হয়তো আমার নারী অপরাধীদের প্রতি কৌতূহল আর জোকার-ভীতি কাজ করেছে, তবে সবচেয়ে টেনেছে এদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। বাকি গল্পগুলোও অনবদ্য, ভিন্ন স্বাদে রক্তগরম করা। 🖤