বই : দ্য ওয়ান্ডারিং আর্থ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ
লেখক : লিউ সিশিন
অনুবাদক : তৌফিক সরকার, নিশাত শামা, মো. ওমর খৈয়াম মুরাদ ও সজল চৌধুরী
প্রচ্ছদ : সজল চৌধুরী
জনরা : সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার
মলাট মূল্য : ২৪০ টাকা
.
কাহিনি সংক্ষেপ :
ওয়ান্ডারিং আর্থ—সূর্য এখন ধ্বংসের পথে। কমে এসেছে উত্তাপ। একে একে গ্রাস করে নেবে সৌরজগতের গ্রহগুলোকে। নিজেদের সেরা আবিষ্কার “আর্থ ইঞ্জিন”র সাহায্যে আস্ত পৃথিবীকে নিয়ে পাড়ি দেবে কোটি কোটি মাইল দূরে প্রক্সিমা সেন্টাউরিতে, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে নতুন সূর্য। পারবে তো?
ডেভাউরার—দূর মহাকাশ থেকে আগত মহাশূন্যে ভাসমান একটি স্বচ্ছ কাঠামো ধ্বংসের খবর বহন করে আনে : “ভক্ষকরা আসছে!” ভক্ষকদের অগুনতি রজ্জু, গোটা বিশ্বকে মাকড়শার জালে আটকা পড়া পোকার মতো ফাঁদে ফেলেছে। কেড়ে নেবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্র।
টেকিং কেয়ার অব গড—লম্বা সাদা দাড়ি এবং চুলওয়ালা প্রায় দুই বিলিয়ন বৃদ্ধলোক পৃথিবীতে অবতরণ করে জানায় তারাই মানুষের সৃষ্টিকর্তা। এখন তাদের দেখাশুনা করার দায়িত্ব পৃথিবীর মানুষদের। একদিন এক ঈশ্বর প্রকাশ করে এমনকিছু গোপন সত্য যা এতদিন পৃথিবীর মানুষের অগোচরে ছিল। কী ছিল সেই গোপন সত্য?
দ্য ওয়েট অব মেমোরিজ—মৌচাক বানানোর প্রক্রিয়া মৌমাছি তার মস্তিষ্কে থাকা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া স্মৃতি থেকে জানতে পারে। মানুষের মস্তিষ্কেও এ অংশটা সুপ্ত থাকে। কী হবে যদি এটিকে জাগ্রত করা যায়? যন্ত্রের মাধ্যমে মা ও তার জেনেটিক মডিফাইড ভ্রূণের মধ্যকার কথোপকথনে উঠে এসেছে তার উত্তর।
পাঠ্য প্রতিক্রিয়া :
বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে এখন কি চলে? জাপানিজ, চায়নিজ সাইফাই, থ্রিলার, হরর অনুবাদের জোয়ার চলে। সেই জোয়ারে গা ভাসাতেই ভূমি প্রকাশ নিয়ে এল জনপ্রিয় চাইনিজ সাইফাই লেখক লিউ সিশিন এর ওয়ান্ডারিং আর্থ এন্ড আদার স্টোরিজ৷ বইটিতে তিনটি নভেলা ও একটি ছোট গল্প আছে৷ বইটি পড়ে আমার যে ক্ষুদ্র পাঠ্যনূভুতি জমা হয়েছে তা না হয় শেয়ার করা যাক।
ওয়ান্ডারিং আর্থ
বইয়ের শুরু হয়েছে এই নভেলা দিয়ে৷ গল্পে তাড়াহুড়ো, চরিত্রায়নের ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে দিবে মহাশূণ্যের কাব্যের ছলে৷ মাদার আর্থ এখানে যে নিজেই কেন্দ্রীয় চরিত্র৷ বিজ্ঞানের সেরা সৃষ্টি আর্থ ইঞ্জিন দিয়ে আস্ত পৃথিবী নিয়ে পাড়ি দিতে হবে ভবঘুরের ভ্রমণ৷ সূর্যের ধংসলীলা থেকে রক্ষা করতে পৃথিবী পরিণত হল দানবীয় স্পেসশীপে৷ নিজের সোলার সিস্টেম থেকে কোটি কোটি মাইল পাড়ি দিয়ে যেতে হবে প্রক্সিমা সেন্টাউরিতে৷ সেখানে অপেক্ষায় আছে নতুন সূর্য৷
লেখকের বর্ণনা কে অনুবাদক যথাসাধ্যভাবে মূলভাব বজায় রেখে লেখার চেষ্টা করেছে৷ তবে কিছু জড়তা পরিলক্ষিত করা যায়। অনেক বৈজ্ঞানিক টার্ম গুলো কিছুটা কনফিউশন তৈরি করবে৷ তবে এ ধরনের সায়েন্স ফিকশন সাই ফাই প্রেমীরা যে গোগ্রাসে গিলবে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই৷ পুরো গল্পটিই তো ইউনিক৷ তবে মনে হল শেষটা আরও ভাল হতে পারতো৷
তবে যারা নভেলাটা পড়ার পর সিনেমাটা দেখবেন তাদের কাছে গল্পটা আবার অন্য রকম স্বাদে পরিবেশিত হবে৷ মুভি আর নভেলা দুইটাই আমার কাছে ভাল লেগেছে৷
ডেভাউরার
ভক্ষক আসছে!! ভক্ষক আসছে!! সত্যি কথা বলতে অনেক দিন পর চমৎকার একটি সাইফাই গল্প পড়লাম। গল্পটাতে যেমন ফেলোসফিক্যাল কথাবার্তা আছে তেমনেই সুযোগ আছে স্কুল জীবনে ফিরে যাবার। হ্যা বেসিক ফিজিক্স এর তত্ত্ব গুলো যারা ভুলে গেছেন তারা আবার নতুন করে ঝালাই করে নিতে পারবেন৷ মেসজোয়িক যুগের শেষ পর্বের সাথে মানব সভ্যতার অদ্ভূত ব্লেডিং গল্পটা কে করে তুলেছে ইউনিক। দুইটা ভিন্ন সভ্যতার ভিতর মহাজাগতিক যুদ্ধ শেষে জায়গা করে নেয় নতুন এক সভ্যতা৷ বেশি বললে স্পয়লার হয়ে যাবে৷ পাঠক না হয়ে চিন্তার ভুবনে ডুবে বের করূণ মেসজোয়িক যুগে কাদের আধিপত্য বিরাজ করতো৷ এই গল্পের অনুবাদক ওপার বাংলার মানুষ। বলতে হবে বেশ ভাল কাজ দেখিয়েছেন এই গল্পে।
টেকিং কেয়ার অফ গড
কল্পনা করুন হঠাৎ ধরণির বুকে নেমে এল ২ বিলিয়ন ঈশ্বর৷ ঈশ্বরের সভ্যতা ধ্বংসের কাছাকাছি৷ তার আশ্রয় চায় তাদের সৃষ্টির কাছে৷ লেখকের কল্প জগৎতের ক্ষুরধার কল্পনার বুননে এমন একটি প্লট দাঁড়া করিয়েছেন দিন শেষে পড়ার পর মনে হল এভাবেও কি লেখা সম্ভব। কি নেই এই গল্পে? মহাবিশ্বের রহস্য, বির্বতন, মানব সভ্যতা, কল্প বিশ্ব ও বিজ্ঞান। এর সাথে গল্পের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গল্পটিকে শুধু সায়েন্স ফিকশন জনরায় ফেললে পাপ হয়ে যাবে। ঈশ্বর বুড়ো বেশে এসে আমাদের অবহেলা পেয়ে গেলেন৷ গল্পের মেটাফোর এতটাই সাংঘাতিক পাঠকের ভাবনা জগৎ কে কড়া নেড়ে যাবে। আপনি কি নিজের ঈশ্বরের যত্ম নিতে প্রস্তুত?
দ্য ওয়েট অব মেমোরিজ
কেমন হবে যদি মায়ের পেটে থাকা ভ্রুণ সংরক্ষণ করে মায়ের স্মৃতি৷ খুবই ছোট একটি গল্প জীবন ও বিজ্ঞান নিয়ে ভাবার৷ প্রকৃতি আমাদের পূর্বজের স্মৃতি ধারণ করতে দিতে চায় না। যদি ভ্রুণ ধারন করে মায়ের স্মৃতি তার কাছে এই ধরণির সৌন্দর্য কি সদ্য ফোটা ফুলের মত হবে নাকি পুরানের সেই নার্সিসাস ফুলের মত হবে৷ যে নিজেকে ভালোবেসে দিবে আত্মহুতি৷ খুবই দার্শনিক টাইপের বিজ্ঞানের গল্প৷
অবশেষে ৪টা গল্প নিয়ে পর্যালোচনা করে আমার কাছে সব থেকে বেশি ভাল লেগেছে ২য়,৩য় গল্পটি৷ অথচ প্রথম গল্পটি নিয়ে সবার এত জল্পনা কল্পনা৷ লিউ সিশিন এর সাই ফাই গল্প আরও বেশি অনুবাদ হওয়া উচিত৷ না হয় পাঠক সাইফাই গল্পের মজার ভান্ডার থেকে বঞ্চিত হবে
এবার আসি অনুবাদকের ব্যাপারে৷ চারজন অনুবাদকই খুব ভাল কাজ দেখিয়েছেন৷ আলাদা করে কারও নাম নিব না৷ তবে অনুবাদে জড়তা ছিল কিছু।পরিশেষে বলা যায় ভূমি প্রকাশ আবার তাদের প্রোডাকশন দিয়ে পাঠকদের ভাল বইয়ের সাথে সাথে ভাল প্রোডাক্ট নিয়ে ধারন��� দেবার চেষ্টা করেছে৷ বানান ভুলের মত দৃষ্টিকটু ব্যাপার খুব কম পরিলক্ষিত হয়েছে৷ বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে কাগজের মান, বাঁধাই সবই ভাল হয়েছে৷ তবে বই ছোট হক বা বড় বই একটি চিকন সুতার বুকমার্ক হলে মন্দ হত না৷
©বইপিডিয়া