Jump to ratings and reviews
Rate this book

বাঙালির মস্তিস্ক ও তাহার অপব্যবহার

Rate this book
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অনেক নিবন্ধ-প্রবন্ধ এবং কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী ছাত্র-পাঠ্য বইপত্র লিথেছেন। তারমধ্যে ‘নব্যরসায়নী বিদ্যা ও তাহার উৎপত্তি' (১৯০৬), ‘বাঙালীর মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার' (১৯১০), ‘চা পান ও দেশের সর্বনাশ' (১৯৩২) ইত্যাদি। তিনি তাঁর সুবিখ্যাত ‘দ্য হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল কেমিস্ট্রি' (১৯০২ ও ১৯০৯) বইটিতেই প্রমাণ করে দেখান যে ভারতের রসায়নচর্চার ইতিহাস বহু প্রাচীন। সেই চরক-সুশ্রুতের সময় থেকে ভারতের রসায়নচর্চার মাহাত্ম্য তিনি এই বইতে দেখান। তাঁর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হল – 'জাতি গঠনে বাধা - ভিতরের ও বাহিরের' এবং জাতীয় সম্পদের মূলে বিজ্ঞানের শক্তি' ।

48 pages, Paperback

First published January 1, 1910

9 people are currently reading
165 people want to read

About the author

Prafulla Chandra Ray

22 books11 followers
1861-1944

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
16 (42%)
4 stars
17 (44%)
3 stars
2 (5%)
2 stars
3 (7%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 10 of 10 reviews
Profile Image for Yeasin Reza.
512 reviews87 followers
July 17, 2023
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় উক্ত রচনা লিখেন ১৯১০ সালে, যাতে বাঙালিরা নিজেদের কূপমণ্ডূকতা সম্পর্কে অবহিত হয়ে বাঙালি থেকে পরিপূর্ণ মানুষে রুপান্তরিত হয়। কিন্তু ১১২ বছর গড়িয়ে ২০২২ সালে এসে ও বাঙালি তাে আদি অবস্থান খুব বেশি এগোতে পারেনি। নিজেদের শম্বুক প্রজাতির জ্ঞাতিকুল বললে স্বয়ং শম্বুকেরা বোধহয় অপমানিত হয়ে মারতে তেড়ে আসবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাড় বিদ্যার্জন, চাকুরীর পেছনে অহেতুক ছোটা, ব্যবসায় অনীহা, চিন্তার সংকীর্ণতা ইত্যাদি গুণাবলী আমরা শতবছর ধরে যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছি। আচার্য সাহেব আমাদের মূর্খতার কথা বলবার সময় বিরক্তি চেপে রাখতে পারেননি। আমাদের এহেন দুর্দশা থেকে উদ্ধার করতে, চোখে আঙুল দিয়ে সব সমস্যা ধরিয়ে দিয়ে তার সমাধানের উপায় ও নিজ জীবনে প্র্যাকটিক্যালি দেখিয়ে গিয়েছেন। অসম্ভব গুণী এই বিজ্ঞানী মানুষ আবিষ্কারকের পাশাপাশি ছিলেন সফল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। সেই সাথে সারা জীবন মুক্তচিন্তা চর্চা করেছেন। শ্রীযুক্ত আচার্য প্রফুল্ল রায় বাঙালির রোল মডেল হওয়া উচিত। জ্ঞানের প্রায়োগিক ব্যবহার, আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং মুক্তচিন্তা চর্চা ব্যতীত আমাদের জাতিগত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
Profile Image for Pritom Mojumder.
36 reviews25 followers
October 30, 2020
বইটা সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি "বইয়ের হাট" গ্রুপে। কেউ একজন বইয়ের কভার পোস্ট করেছিল আর বহু মানুষ সেখানে কমেন্ট করে লিংক চাচ্ছিল। বুঝলাম বহু বাঙালি নিজেদের মস্তিষ্কের অপব্যবহার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। আমিও আগ্রহী হলাম।

বইটা মূলত ৪০ পৃষ্ঠার থিসিস, যেটা করা হয়েছে বাঙালি জাতি কিভাবে মস্তিষ্কের সঠিক ব্যবহারে ব্যর্থ হয়ে উন্নত বিশ্বে পিছিয়ে আছে। বইটা ১৯১০ সালে লেখা। মূলত বিংশ শতাব্দীর বাঙালিদের উপর পর্যবেক্ষণের ফসল। ১০০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে বইটা এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক তা বিবেচনা করতে গেলে হয়তো আরেকটা থিসিস করতে হবে।

টাইটেল থেকেই তো বোঝা যায় যে তিনি সরাসরিই অভিযোগ করছেন যে বিংশ শতাব্দীর বাঙালিরা মস্তিষ্কের অপব্যবহার করত এবং এতটাই করত যা তাকে এই বৃহৎ প্রবন্ধ লিখতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এমন অভিযোগ আমলে নেয়ার আগে একজন সচেতন পাঠকের দেখতে হয় লেখকের বিশ্বাসযোগ্যতা। লেখক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। তার মৌলিক আবিষ্কার যেমন আছে, তেমনি ভারতে রসায়ন চর্চা প্রসারে অবদানও আছে। সেই সাথে আবার ব্যবসায়ীও ছিলন। অনেকটা আজকের দিনে আমরা Bill Gates, Zuckerberg এর মত যেমন উদ্যোক্তাদের দেখি, তিনিও তার চেয়ে কম ছিল না। আজকের দিনে সবাই যেমন বিল গেটস বা এলন মাস্কের মোটিভেশনাল ভিডিও দেখে Entrepreneur হওয়ার স্বপ্ন দেখে সেই হিসেবে এই বইটা আসলে বহুল পঠিত হয়ার কথা ছিল, কারণ বাঙালি হওয়ার প্রেক্ষিতে এখানে আরও বেশি মোটিভেশন আছে। কিন্তু সেরকমটা দেখা যায় না। এর একটা অন্যতম কারণ ভাষা। ১০০ বছরে বাঙালির বাঙলা ভাষার ধরণ যথেষ্টই পরিবর্তন হয়েছে। সেই দিক বিবেচনায় আচার্যের লেখা এই বই অনেকের কাছেই দূর্বোধ্য ঠেকতে পারে, যেটা আমি প্রথম দেখেছি তারাশঙ্করের বই পড়তে গিয়ে অনেকেই এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়।

আরেকটা সমস্যা হচ্ছে ১০০ বছরে বাঙালির পারিপার্শ্বিক অবস্থাও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাঙালিরা এখন বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলায় বিভক্ত। তাই প্রশ্ন আসতেই পারে কোন বাঙালিদের জন্য এটা এখন বেশি প্রযোজ্য হবে।

এই প্রবন্ধে আচর্য যে ব্যপারটা বিশেষভাবে প্রচার করতে চেয়েছেন তা হল - স্বাধীন চিন্তা, যা আজকের দিনে মুক্তচিন্তা (freethinking) নামে বেশি পরিচিত। যদিও তিনি মুক্তচিন্তার কোনো বিশদ ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞায়নের দিকে যান নি, তবুও এটা বোঝা যায় তিনি তৎকালীন হিন্দু সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, কুপ্রথার বিপরীতে চিন্তার ডাক দিয়ে ছিলেন। যখন সদা পরিবর্তনশীল জগতে পরিবর্তনের সাথে সাথে সামাজিক প্রথা ও ব্যবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে তখন ভারতবাসী তাদের পুরাতন শাস্ত্র অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। এই অবস্থা থেকে তাদের টলানও কঠিন ছিল তখন। আচার্য এই অবস্থাটাকে এভাবে বলেছেন -

"তখন কী এক মোহিনী শক্তি আসিয়া হৃদয়দ্বার চাবি বন্ধ করিয়া চলিয়া যায়, সত্যের ও বিচারের কুঠারঘাতেও তাহা ভাঙে না। যখন মানবসমাজ এই প্রকার তমসাচ্ছন্ন হয়, তখন শাস্ত্র অভ্রান্ত বলিয়া স্বীকৃত হয়-- পথ দেখিবার আলোকের অভাবে ঋষিবাক্য বর্তিকাস্বরূপ গৃহীত হয়। আমাদেরও তাহাই ঘটিল। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত, জন্ম হইতে মৃত্যু পর্যন্ত হিন্দু নিজেকে এমন দৃঢ় নিগড়ে বন্ধন করিলেন যে, জীবনের যাহা কিছু কর্তব্য, নিজের স্বাধীনতা অম্লানবদনে বিসর্জন দিয়া, তাহা শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে করিতেই হইবে ইহাই স্থির করিলেন। কিন্তু কেন করিব, এ কথাটি ভুলিয়াও মনে উদয় হইল না।"

তবে ভারতবর্ষের অবস্থা চিরকাল এমন ছিল না এবং সুদূর অতীতে মুক্তচিন্তার অস্তিত্ব ভালভাবেই ছিল তা তিনি কিছু ইতিহাস উল্লেখ করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। বিংশ শতাব্দী বা তার কিছু আগের বাঙালিরা মূলত অতীতের গৌরবের দম্ভ আর কিছু পন্ডিতের পুরাতন শাস্ত্রের উপর করা টীকা-টিপ্পনির উপর জোর দিয়েই তাদের জ্ঞান চর্চা চালিয়ে যাচ্ছিল। এর জন্য বাঙালির মধ্যে মৌলিকতা আর কৌতুহল প্রবনতার ভাটা পড়তে শুরু করেছিল।

কিন্তু ভারতবর্ষে যখন বাঙালির মধ্যে মুক্তচিন্তার ঘাটতি স্বরূপ মৌলিকতা আর কৌতুহল প্রবনতা হারিয়ে গেল, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে তখন জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উন্নতি ঘটতে থাকল। এই জন্য বিপদের পড়ল বাঙালিরাই। কারণ শিল্পবিপ্লব ঘটল ইউরোপে। আর তখনও আমরা বুঝে পারি নি ক্রমশ পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় ব্যবসা করে কিভাবে টিকে থাকা যায়। এক সময় ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্টরা ঢাকা, শান্তিপুর, ফরাসডাঙা প্রভৃতি স্থানের মিহি সূতার কোটি কোটি টাকার কাপড় এখান থেকে সংগ্রহ করে ইউরোপে বিক্রি করত। কিন্তু বাষ্প শক্তির ব্যবহার তারা শিখে যাওয়ার পর এই ঘটনা উলটো ঘটা শুরু করল। তারা এখান থেকে পাট, কার্পাস নিয়ে নিজেদের দেশে কাপড় বোনা শুরু করল এবং তারপর এখানে বিক্রি করা শুরু করল। এই ব্যাপারটা আচার্য এভাবে বলেছেন -

"আমাদের দূরদৃষ্ট, তাই কার্পাস ও পাট অপরের দ্বারা বুনাইয়া শতগুণ মূল্যে কিনিয়া লজ্জা নিবারণ করিতে লাগিলাম। ম্যানচেষ্টর বৈদেশিক লক্ষ্মী আপনার গৃহে আবদ্ধ করিলেন, আর আমরা ভিখারি সাজিয়া রাস্তায় নামিতে বাধ্য হইলাম।"

এরপরে ইংরেজ বণিকদের কৃপায় বাঙালিদের মধ্যে এক নতুন শ্রেণির জন্ম নেয় - কেরানী। প্রথম দিকে ইংরেজরা বাঙালিদের সাহায্য ছাড়া ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারত না। ক্রয়-বিক্রয়, আদান-প্রদান সব হত কেরানির হাত ধরেই। এই সুযোগে অনেক কেরানী কোটিপতিও হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এই অশিক্ষিত, অল্পবুদ্ধির কেরানিদের জন্যই আরেক নতুন সমস্যার তৈরি হল। আস্তে আস্তে বাঙালিরা স্বাধীন ব্যবসার দ্বারা স্বাধীন জীবিকা অর্জনে অক্ষম হয়ে পড়ল। কারণ ওইসময়ে বাঙালির জ্ঞানচর্চা ছিল কেরানিগিরি লক্ষ করে। এই সময়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দম্ভ করা অনেক বাঙালিই ২০-২৫ টাকার কেরানির চাকরিই চরম সফলতা হিসেবে দেখত। বাঙালিরা যখন তাদের মস্তিষ্কের পুরোটাই চাকরির পেছনে ব্যয় করতে শুরু করল তখন দেখা গেল আস্তে আস্তে তাদের মস্তিষ্ক ব্যবসা করার জন্য অক্ষম হয়ে পড়ল। তাই পরে দেখা গেল বাংলা দেশে ���০ টি পাটকলের একটিরও মালিক বাঙালি নয়।

মিথ্যা বলব না, বইটা আমি পড়ার তালিকায় রেখেছিলাম নাম দেখেই। পড়ে নামের স্বার্থকতাও খুঁজে পেয়েছি। এই বইটি ক্ষুদ্র হলেও যথেষ্ট তথ্যবহুল। যে সময়ে লেখা সেই সময়ের প্রেক্ষিতে এটা কত মানুষকে নাড়া দিতে পেরেছিল তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে এরকম থিসিস প্রতি প্রজন্মেই থাকা দরকার বলে মনে করি। সেই ক্ষেত্রে এই বইটি সহায়ক হতে পারে।
Profile Image for ANGSHUMAN.
229 reviews7 followers
June 20, 2020
বাঙালী চিরকালই অলস কর্মবিমুখ,দুটাকার কেরানিগিরিতেই তার জীবনচক্র শুরু ও শেষ হয়। বাঙালির এই অপবাদ গত একশো বছরেও খন্ডন করা গেলো না। মাত্র আটচল্লিশ পাতার এই প্রবন্ধটিতে আচার্য্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ঠিক কোনখানে ভুলটা হচ্ছে। মধ্যযুগীয় গোঁড়ামি আর কুসংস্কারের ব্যাপক প্রভাবে প্রাচীন যুগের উন্নত চিন্তাভাবনার দ্বার ধর্মীয় গোঁড়ামির জন্য ক্রমেই রুদ্ধ হয়েছে। শুধু বাতেলাবাজ নন,আচার্য্য ছিলেন বাস্তবিক জগতের মানুষ। কলমপেষার চেয়ে ব্যবসা করে নিজেদেরকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়ায় ব্যাপারেই তিনি বেশি উৎসাহী ছিলেন। একশো বছর আগে লেখা হলেও লেখাটি এখনও অব্দি যুগোপযোগী একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
Profile Image for Dibyendu Singha Roy.
76 reviews4 followers
September 26, 2019
১৯১০ সালে বসে এমন প্রতিবাদী লেখা ভাবা যায়না।
খুবই প্রয়োজনীয় ও অবশ্যপাঠ্য।
Profile Image for Munem Shahriar Borno.
203 reviews11 followers
August 4, 2024

"বাস্তবিক বাঙালির ন্যায় অর্থোপাসক জাতি আর কুত্রাপি নাই। ইংলন্ড, জার্মানি, ফ্রান্স আজ ঐশ্বর্যশালিনী সন্দেহ নাই, বাণিজ্য শতধারে ওই সকল দেশে সম্পদরাশি ঢালিতেছে বটে, কিন্তু এই অর্থাগম সত্ত্বেও জ্ঞানস্পৃহার কিঞ্চিৎ মাত্র হ্রাস পরিলক্ষিত হয় না। বস্তুত ইহারাই সরস্বতীর প্রকৃত উপাসনা করিতেছেন। অনন্যমনে জ্ঞানান্বেষণই যেন উহাদের অর্থলাভের হেতু বলিয়া অনুমিত হয়। এই জ্ঞানান্বেষণের ফলে নূতন নূতন তত্ত্ব উদ্ঘাটিত করিয়া, প্রকৃতির শক্তির সাহায্যে পাশ্চাত্যদেশবাসিগণ পার্থিব জগতে যুগান্তর উপস্থিতকরণে সক্ষম হইয়াছেন। আর আমাদের মৃতকল্প স্বাস্থ্যবিহীন যুবকগণ- কেবল এক্সামিনের পর এক্সামিন পাশ করিয়া যাইতেছে- বাস্তবিক এক্সামিন পাশ করিবার নিমিত্ত এমন হাস্যোদ্দীপক উন্মত্ততা পৃথিবীর কুত্রাপি দেখিতে পাওয়া যায় না। পাশ করিয়া সরস্বতীর নিকট চিরবিদায় গ্রহণ- শিক্ষিতের এরূপ জঘন্য প্রবৃত্তিও আর কোনো দেশেই নাই। আমরা এদেশে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করিয়া জ্ঞানী ও গুণী হইয়াছি বলিয়া আত্মাদরে স্ফীত হই, অপরাপর দেশে সেই সময়েই প্রকৃত জ্ঞানচর্চার কাল আরম্ভ হয়; কারণ সে সকল দেশের লোকের জ্ঞানের প্রতি যথার্থ অনুরাগ আছে; তাঁহারা একথা সম্যক উপলব্ধি করিয়াছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার হইতে বাহির হইয়াই জ্ঞানসমুদ্র মন্থনের প্রশস্ত সময়। আমরা দ্বারকেই গৃহ বলিয়া মনে করিয়াছি, সুতরাং জ্ঞানমন্দিরের দ্বারেই অবস্থান করি, অভ্যন্তরস্থ রত্নরাজি দৃষ্টিগোচর না করিয়াই ক্ষুণ্ণমনে প্রত্যাবর্তন করি।"

"যিনি সাহিত্যের শিক্ষক তিনি কথার প্রতিশব্দ, ব্যাকরণের কচকচি এবং Allusion প্রভৃতির দ্বারা ছেলেদের এমনই প্রপীড়িত করিয়া তুলেন যে ছেলেরা ভাবিবার অবসরই পায় না যে সাহিত্যে একটা রস বলিয়া জিনিস আছে। অনেকস্থলে দেখা যায়, যাঁহার হস্তে গণিত শিক্ষাদানের ভার ন্যস্ত হয় তিনি বোধ হয় ভাবেন গণিত শাস্ত্রের উপর ছেলেদের একটা বিজাতীয় বিভীষিকা জন্মাইয়া দেওয়াই তাঁহার প্রধান কর্তব্য, নহিলে তিনি সাধারণ ছাত্রগণকে অনর্থক জটিল সমস্যাসমূহ পূরণ করিতে দিয়া তাহাদের জীবন অত্যন্ত দুর্বিসহ করিয়া তুলেন কেন? এইরূপ শিক্ষাদানের ফল যাহা হইবার তাহাই হয়। ছেলেরা যে দিন পরীক্ষাসমূহ উত্তীর্ণ হয় সেই দিন হইতেই মা সরস্বতীর নিকট বিদায় গ্রহণ করে। জ্ঞান চর্চায় যে কীরূপ অতুলনীয় আনন্দলাভ হইয়া থাকে তাহা তো সে কোনো কালে শিখে নাই।"

"কুল্লুকভট্ট ও রঘুনন্দনের অপূর্ব পাণ্ডিত্যের প্রশংসা শুনিয়াই যাঁহারা দেশে সেই প্রাচীন টোলের শিক্ষাপ্রণালী সংস্থাপন করিতে চাহেন, নূতনকে একেবারে তাড়াইয়া পুরাতনকে তাহার স্থানে আনিতে চাহেন, তাঁহাদিগের সহিত আমি কখনও একমত হইতে পারি না। ভাবের দাসত্ব ও শারীরিক দাসত্ব উভয়ই জাতীয় উন্নতির সমান অন্তরায়।
নূতন ভারতবর্ষীয় জাতি, নূতন ও পুরাতন উভয়ের সম্মিলনে গঠিত হইবে। অন্ধবিশ্বাস জাতীয় উন্নতির মূল হইতে পারে না। প্রাচীন হিন্দু জাতির মহান আদর্শ ভুলিলে আমাদের চলিবে না, কিন্তু সেই সঙ্গে বর্তমান সময়ে উক্ত আদর্শের অনুকরণ কতটা সম্ভব তাহাও আমাদিগকে ভাবিতে হইবে।"

"একজন পাকা ব্যবসাদারকে শিক্ষিত লোক বলিতে হইবে। সম্ভবত তিনি সাহিত্যের নামজাদা পুস্তক সম্বন্ধে বা দর্শন শাস্ত্রের কূটতর্ক সম্বন্ধে কিছুই জানেন না কিন্তু তাঁহার 'সহজ বুদ্ধি' (Common sense) আছে, সেই বুদ্ধিই বাস্তবিক আসল কার্যকরী ন্যায়শাস্ত্রের জ্ঞান। তিনি হিসাব বুঝেন। তিনি যাহাকে হিসাব বলেন তাহাই হইতেছে গণিতশাস্ত্র। তাঁহার যেটুকু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আছে তাহাতে দেখা যায় তিনি রসায়নবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সম্বন্ধে অনেক কথা বুঝেন। তিনি সামান্যভাবে বলেন তাঁহার পাঁচটা বিষয় জানাশুনা আছে, আমরা কিন্তু দেখি নানা লোক ও নানা বিষয় সম্বন্ধে, কৃষি, বাণিজ্য এবং সমাজ সম্বন্ধে তাঁহার কেজো ধরনের বিস্তৃত জ্ঞান আছে। তাঁহাকে পরীক্ষা করিলে দেখা যাইবে যে তাঁহার নিজের দরকারি বিষয় সম্বন্ধে তাঁহার যেরূপ গভীর, পূর্ণ এবং বিস্তৃত জ্ঞান আছে, একজন সাধারণ বি.এ বা এম.এ-র তাহা নাই। তবে প্রভেদ এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিধারীগণ যেমন নামের পিছনে বি.এ প্রভৃতি কতকগুলি বর্ণ যোজনা করিয়া নিজের কার্যসিদ্ধির জন্য নীরবে বিদ্যার ব্যবহার করেন। সেই জন্য লোকে অনেক ব্যবসাদারকে অশিক্ষিত বলিয়া থাকে।"


আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কথাগুলি বলেছেন আজ থেকে ১১৫ বছর আগে, অথচ কথাগুলি আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
Profile Image for Asim Nondon.
Author 1 book10 followers
November 6, 2025
বাঙালির কর্ম-তৎপরতা বিষয়ে এবং জ্ঞানার্জন ও প্রায়োগিক দক্ষতার বিষয়ে লেখক তাঁর প্রবন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন। বাঙালির মাঝে বর্তমানে এই যে 'চাকর হবার' প্রবণতা সেই বিষয়েও লেখক আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। বাঙালির মুখে মুখে যে কথা প্রচলিত হয়ে গেছে, "পড়ালেখা করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে"। অর্থাৎ জ্ঞানার্জন কেবল অর্থসম্পদের সাথেই সম্পর্কিত, এমন এক ধারণা বাঙালির জাতিগত মননে স্থায়ী কুসংস্কারে পরিণত হয়েছে। অর্থলিপ্সা মানে টাকাকড়ির জন্যই যেন পড়ালেখা করা, সার্টিফিকেট অর্জন করা এবং ভালো চাকরি ও ১টি অবস্থাসম্পন্ন ঘরে বিয়ের মতন প্রাপ্তি অর্জন ; এই সকল কিছুর পরিমাপক কেবল টাকা-ই। জ্ঞান নয়। বর্তমান বাজারের চিত্র এমনই।

বাঙালির যত রকমের সংস্কার আছে, যা অধিক চর্চিত হয়ে এখন কুসংস্কারে পরিণত হয়েছে। সেসব বিষয় সম্পর্কে লেখক কলম ধরেছেন। আর সেই সব সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি চার্বাকদর্শনসহ আরো বিভিন্ন দার্শনিক মতামতকে উপস্থাপন করেছেন, এবং এখানে তিনি নিজের মতামতও ব্যক্ত করেছেন।

যেমন স্বামী বিবেকান���্দ'কে কোট করে বলেছেন, " যে ধর্ম গরিবের দুঃখ দেখে না, মানুষকে দেবতা করে না, তা কি আবার ধর্ম?"

আবার লেখক প্রফুল্ল চন্দ্র রায় চার্বাকদর্শনের কথা উল্লেখ করে হিন্দুদের যজ্ঞ-পূজা ইত্যাদি সংস্কারের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যদি যজ্ঞ কিংবা পূজায় নিরীহ পশুর বলিদান করা হলে সেই পশুর এবং বলিদানকারী উভয়ের স্বর্গলাভ হয়, তবে হিন্দুরা কেন নিজেদের পিতা-মাতা পুত্র-কন্যাকে ঈশ্বরের সামনে বলিদান করে না? তা করলেই তো তাদের স্বর্গপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত! যেহেতু স্বর্গপ্রাপ্তিই এইসব কুসংস্কারের মূল লক্ষ্য!

এই প্রশ্ন কিন্তু বহু শতাব্দী আগে চার্বাক নিজেই তৎকালীন সমজের সামনে রেখেছিলন।

যা এখনও প্রাসঙ্গিক।

এই লেখাটা যেন আধুনিক চিন্তার মাধ্যমে সকল প্রাচীনতাকে চপেটাঘাত করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। লেখক প্রফুল্ল চন্দ্র রায়'র হয়তো উদ্দেশ্য ছিল, এই লেখার মাধ্যমে বাঙালি মননের সকল অমানবিক প্রাচীন চিন্তাকে ঝেড়ে ফেলে যুগের সাথে নতুন চিন্তাকে গ্রহণ করার মতন মানসিক সক্ষমতা অর্জনে উৎসাহ বৃদ্ধি করা।

ঐতিহ্যগত সকল সংস্কারই যে সুফল বয়ে আনে, তা তো নয়। কখনো কখনো তা ঘোর কুসংস্কারও হয়ে উঠতে পারে।

Profile Image for Raihan Ferdous  Bappy.
230 reviews13 followers
December 26, 2024
বৃহস্পতিবার,২৬ ডিসেম্বর
সকাল ৬:২৪।

আমাদের যে দন্ডবিধি আইন তা লিখা হয়েছিলো ১৮৬০ সালে, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ সালে, দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ সালে। আইন পড়ার সময় আমি অবাক হয়ে ভাবতাম এতো এতো বছর আগের আইন দ্বারাই কি সুন্দর আর সুনিপুণভাবে এখনো বিচার, দন্ড, জরিমানা চলছে। এতো বছর আগে থেকেও এক হিসাবে এই আইনগুলার মাধ্যমেই ব্রিটিশরা আমাদের দেশের মোটাদাগে অপরাধগুলো প্রেডিক্ট করে গেছিলেন। এই কথাগুলা বলার বিশেষ কারণ হচ্ছে, এই বইটা আমাকে উপোরোক্ত কথাগুলো আবারো মনে করিয়ে দিলো।

এই প্রবন্ধটি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় লিখেছিলেন ১৯১০ সালে। অথচ লেখাটি এখনও কতোটা যুগোপোযোগী তা আপনি না পড়লে বুঝবেন না। বাঙালীর কর্মের প্রতি অনীহা, নতুন কিছু করার প্রতি অনীহা এরকম বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রবন্ধটিতে আলোচনা করা হয়েছে। ছোট একটা প্রবন্ধে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় চেষ্টা করেছেন, বাঙালীর প্রধান ভুলগুলা তুলে ধরার। মধ্যযুগীয় গোঁড়ামি আর কুসংস্কারের দিকটাও তিনি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। কিভাবে চাকরি বাদ দিয়ে ব্যবসার মাধ্যমে (যা আমাদের বাঙালিদের প্রধান কর্মের উৎস) নিজেদের উন্নতিসাধন করা যায়। সেই বিষয়েও তিনি প্রবন্ধটিতে আলোচনা করেছেন।

সবমিলিয়ে বলবো, ছোট্ট একটা প্রবন্ধ। তবে, গুরুত্ব অনেক। শেখার আছে অনেককিছু। বাঙালীর কোন অবস্থানে থাকার কথা আর আজ কোন অবস্থানে আছে এই বিষয়টা একদম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন লেখক। মুক্তচর্চা ব্যতীত যে আমাদের মুক্তির উপায় নাই সেটা আরো একবার অনুধাবন করিয়ে দিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। যদিও কাজটা ঠিক বেড়ালের গলায় ঘন্টি পরানোর মতোই শক্ত। চলি। বিদায়!
Profile Image for Mashiur Rahman Rayeed.
17 reviews5 followers
October 12, 2024
বাঙালির জাতিগত আচরণ চিন্তাশীল ব্যক্তিদের নিকট অনেক দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। স্বল্প কলেবরের এই বইয়ে প্রফুল্লচন্দ্র রায় বেশ কিছু বিষয়ে আলোকপাত করলেও মূলত তিনি হিন্দু সমাজের পশ্চাৎপদতার বিষয়টি দেখিয়েছেন। প্রাচীনকালে হিন্দুরা যথেষ্ট উদার চিত্ত ছিলেন কিন্তু পরবর্তী সময়ে হিন্দু সমাজে পরিবর্তন দেখা দেয় যেটাকে লেখক তুলে আনতে চেয়েছেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি যে পশ্চাৎপদতার কারণ এবং বাঙ্গালির স্পৃহাকে তা দুর্বল করে তুলতে বড় অবদান রেখেছে সে কথাও বলা হয়েছে। বাঙালিদের ব্যবসার প্রতি অনীহা এবং সরকারি চাকরির (তখনকার দিনে কেরানিগিরি) প্রতি আকর্ষণকে তীব্রভাবে তিরস্কার করেছেন। বলেছেন শিক্ষা নিয়ে ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কথা। এক্সামিনেশন পাশ করাই যে শিক্ষা নয় এবং পাশের সাথে সাথে সরস্বতীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া যে বিদ্যানুরাগের বিপরীত সেটা তিনি এখানে ইউরোপীয়দের সাথে তুলনা করে উল্লেখ করতে চেয়েছেন। প্রায় একশ বছরেরও বেশি আগের সমাজের দর্পণে লেখা হলেও অবস্থার যে পরিবর্তন হয়নি তা সুচিন্তা সম্পন্ন ব্যক্তির সহজেই বোধগম্য হবে।
Profile Image for Mushfiqur Rahman.
8 reviews
January 20, 2024
এই ৪৮ পৃষ্ঠার বইটা পড়ে বেশ মজা পাইছি কারণ ১৯১০ এইটা বাইর হইলে অই হিসেবে এইটার বয়স প্রায় ১০০ বছর পুরানো । সেই হিসেবে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১০০ বছরের আগে করা এই থিসিস এর অবসারভেশন বেশ ইন্টারেস্টিং । তার দেওয়া অপবাদ যে আমরা কতটুকু ঘুচাইতে পারছি সেটা আমরা প্রত্যেকেই জানি ।

বইটার ভাষা একটু কটেকটে । noob অথবা নবীশ পাঠকের দাত খুলে আসারও একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা উরায় দেওয়া যাইতেছে না বাট গুড বুক ওভারঅল ।
Displaying 1 - 10 of 10 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.