জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KM5 এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা' (২০১৮),মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯),নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০) ও নীবারসপ্তক (২০২১) এই সব দিনরাত্রি (২০২২), ধন্য কলকেতা সহর (২০২২), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪), আরও একটি প্রবন্ধ সংকলন (২০২৫) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ম্যাসন সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ (২০২২, ২৩), মৃত্যুস্বপ্ন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪) । সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০) সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষে একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত(২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪) এবং কলিকাতার নুকোচুরি (২০২৫)
বাংলায় ইনফোটেইনমেন্ট বা তথ্যপূর্ণ বিনোদনের ইতিহাস ঠিক কতটা পুরোনো? বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, তারও আগে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত মহাজনেরা— এঁরা সবাই চাইতেন শুষ্ক তথ্য ও তত্ত্বের সঙ্গে হাসি-কান্না মিশিয়ে পাঠকদের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের নাগাল পেতে। বিংশ শতাব্দীর ধাবমান কালে পাঠককে আকর্ষণ করার জন্য ক্রমেই আরও বেশি সংখ্যক লেখক এই ধারার অনুসারী হন। রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শন— এইসব আপাত দুরূহ বিষয়েও তার্কিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি এই ধরনের লেখা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়৷ মুজতবা আলী থেকে শ্রীপান্থ, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত থেকে ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়— এমন মানুষদের লেখায় সমৃদ্ধ হয় বাংলা প্রবন্ধচর্চা। কিন্তু আন্তর্জালের ব্যাপক প্রসারের ফলে এই ধারাটি ধাক্কা খায়। একদিকে মূলধারার সাহিত্যপত্রগুলোর বিক্রি হু-হু করে কমে যাওয়া, অন্যদিকে 'গুগল বা উইকিপিডিয়ায় তো সবই আছে'— এমন একটা ধারণার যৌথ প্রভাব পড়ে বাংলা প্রবন্ধচর্চায়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই একটা 'হোয়াট ইফ' প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে যাই আমরা। প্রশ্নটা হল, ফেলুদা যদি ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করার সুযোগ পেতেন, তাহলেও কি তাঁর সিধুজ্যাঠা'র সাহায্য প্রয়োজন হত? হত। নেট থেকে শুরু করে সহজলভ্য অজস্র দেশি-বিদেশি বই— এই তথ্যসমুদ্র মন্থন করে ঠিক যা চাইছি সেটুকুই তুলে আনার জন্য দরকার হত একটি সুপার-কম্পিউটারের, যে আমাদের প্রয়োজন বুঝে আসল জিনিসটি বলে দিতে পারবে। কিন্তু সেই সুপার-কম্পিউটারের পক্ষেও দরকারি তথ্যটাকে টেবিল বা চার্টের থেকে বেশি কিছু করে তোলা যাবে না। তার জন্য দ্বারস্থ হতে হবে এমন কারও, যিনি নিজের অধ্যয়ন ও আলোচনার মাধ্যমে ছেঁকে নিতে পারবেন কাজের কথাটুকু। তারপর সেটা তিনি পরিবেশন করবেন হৃদয় দিয়ে— যাতে হাসি-কান্নার হিরে-পান্নাও ঝলমল করে। তাই ফেলুদা'র সিধুজ্যাঠাকে দরকার হত। আমাদের দরকার হয় কৌশিক মজুমদার-কে।
নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এমন পঞ্চাশটি ইনফোটেইনমেন্ট বা তথ্যপূর্ণ বিনোদনে ঠাসা লেখা স্থান পেয়েছে এই বইয়ে। সঙ্গে রয়েছে প্রতিটি প্রবন্ধের সঙ্গে প্রকাশিত ছবি, তথ্যসূত্র, প্রথম প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্য ইত্যাদি। লেখাগুলোকে এই ক'টা অংশে ভাগ করা হয়েছে: ১) সিনেমা: ছ'টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে এই অংশে, যাতে আছেন চলচ্চিত্রের ইতিহাস থেকে মুছে যাওয়া হীরালাল সেন থেকে কাননদেবী, আছেন কলকাতা নিয়ে সত্যজিৎ আর সিটি লাইটস-এ চ্যাপলিন! ২) অলংকরণ ও কমিক্স: এই বিভাগের সাতটি প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে নতুন করে 'কমিক্স ও গ্রাফিক্স'-এর অসামান্য লেখাগুলোর জন্য বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল। গ্রাফিকস থেকে শুরু করে 'বাংলা অলংকরণে বাঘ'— ছবিতে ঠাসা এইরকম লেখায় একেবারে টইটম্বুর ওই সিরিজটা অদূর ভবিষ্যতে ফিরে আসবে, এমন আশা রাখি। ৩) সুকুমার সত্যজিৎ: মাত্র তিনটি প্রবন্ধ— তাতেই এই অংশটিকে গোল্ড-মাইন বলতে হচ্ছে। ৪) বিজ্ঞান: 'দেশ'-এ উজ্জ্বল পথিক গুহের প্রবন্ধগুলোর সঙ্গে তুলনা আসবেই। বিশুদ্ধবাদীরা ঠ্যাঙা নিয়ে তেড়ে এলেও আমার কিন্তু এই সাতটি লেখা অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও ঠাসবুনট লাগল। ৫) বিজ্ঞাপন: এই বিভাগের মাত্র তিনটি প্রবন্ধেও বাঙালির বিজ্ঞাপন-যাপন তথা ইতিহাসের একটি মনোলোভা ছবি ধরা পড়েছে৷ ৬) ইতিহাস: আটটি প্রবন্ধ— কিন্তু কী বিপুল তাদের ব্যাপ্তি! হায়রোগ্লিফিক লিপি পড়ার ইতিহাস থেকে ক্রিপ্টোগ্রাফি, টেনিদা'র গুল্প থেকে লিন্ডবার্গের সন্তান অপহরণ— সবই এসেছে লেখাগুলোতে। ৭) সাহিত্য: এই অংশের তেরোটি প্রবন্ধের সঙ্গে আমরা হয়তো কিছুটা পরিচিত৷ অ্যালিসীয় ভাবনার পেছনে বিজ্ঞান আর দর্শনের গোপন তত্ত্ব, পাল্প কালচার থেকে পেংগুইন পেপারব্যাকের জন্ম— এই লেখাগুলো নেটে প্রায়ই উঠে আসে লেখকের নামে বা 'সংগৃহীত' আকারে। সেগুলো একসঙ্গে পাওয়া আর পড়ার মজা যে আলাদা লেভেলের— এটা নিশ্চয় মানবেন। ৮) সেকালের কলকাতা: দুর্গাপুজো, বড়োদিন আর সিরিয়াল কিলার (ত্রৈলোক্য)— এই নিয়ে লেখা তিনটি প্রবন্ধ পড়ার পর আপনার 'অন্তরে অতৃপ্তি রবে' অবস্থা হতে বাধ্য। তবে এতেই বোঝা যায়, সহানুভূতি ও যুক্তি দিয়ে ইতিহাসকে পরিবেশন করাতেও লেখকের দক্ষতা প্রশ্নাতীত।
পঞ্চাশটা লেখার মাধ্যমে এ আসকে এক গ্লোব-ট্রটিং— শুধু ভিনদেশের পাশাপাশি নিজের ইতিহাস আর সংস্কৃতিকেও চেনার সুযোগ করে দেয় এই বই। আপনি যদি ইনফোটেইনমেন্ট ভালোবাসেন, চায়ের আড্ডায় বক্তিয়ার খিলজিদের বেলুন ফাটানো বা নিজের জন্যই অবাক-করা সত্যিকে জানা— এর কোনোটা যদি আপনার পছন্দ হয়, তাহলে এই বইটি আপনার ভালো লাগবে।
সকল জ্ঞানী মানুষই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেন যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হলো পুরোনো জ্ঞানের বিচার-বিশ্লেষণ এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি। এও অনস্বীকার্য যে এক্ষেত্রে একাডেমিক চর্চার যেকোনো বিষয়, তা ইতিহাস, দর্শন, বা সমাজবিজ্ঞান, হোক, কিংবা রাজনীতি, তত্ত্বীয় বিজ্ঞান অথবা অর্থনীতি হোক, মননশীল নন-ফিকশন গ্রন্থের অনন্য, সহায়ক অবদান থেকেই যায়। কোন ভাষা কতটা উন্নত ও সমৃদ্ধ এবং জ্ঞানচর্চার জন্য কতটা উপযুক্ত, তা তার নন-ফিকশন সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ তা দেখেই বিচার্য। কিন্তু দুঃখের বিষয় এইটাই যে বিশ্বের সর্বকালের সেরা বইয়ের তালিকায় মননশীল নন-ফিকশন জায়গা পায় না। বাংলা ভাষার গত দেড়শ বছরের নন-ফিকশন সাহিত্য যেমন একাধারে খুবই উন্নত ঠিক তেমনই বাংলা ভাষায় নন-ফিকশন লেখক কম।
বর্তমান প্রজন্মের সেরা পাঁচজন বাঙালি নন-ফিকশন লেখকের নাম করতে হলে অবশ্যই সে তালিকায় থাকবেন কৌশিক মজুমদার। আলোচনার বিষয়বস্তু কৌশিকের সর্বশেষ সংকলন ‘কুড়িয়ে বাড়িয়ে’।
তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটিয়েও তথ্যের ভারে ক্লান্ত করেনা এই বই । মোট আট ভাগে বিভক্ত এই সংকলনে কৌশিক পঞ্চাশটি অভিনব প্রবন্ধে পাঠককে ভ্রমণ করিয়েছেন বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। প্রত্যেকটি বিষয়ে নিরুপম গবেষণা, শব্দের সার্থক নির্বাচন , ইতিহাস কথনের ইঙ্গিতময় ব্যবহার, ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণের সঞ্চয়কে পরিবেশন করেছেন প্রবন্ধের আকারে। কৌশিকের পড়াশোনা ও জিজ্ঞাসার বৈচিত্রময় বিস্তার সম্পর্কে পাঠক এই সংকলনের যে কোনো একটি প্রবন্ধ randomly পড়লেই বুঝতে সক্ষম হবেন। যে আটটি ভাগে এই সংকলকে ভাগ করেছেন লেখক সেগুলি হলো , যথাক্রমে: ১) সিনেমা , ২) অলংকরণ ও কমিক্স , ৩) সুকুমার সত্যজিৎ , ৪) বিজ্ঞান , ৫) বিজ্ঞাপন, ৬) ইতিহাস, ৭) সাহিত্য , ৮) সেকালের কলকাতা।
প্রতিটি বিষয়ে শুধুমাত্র গ্রন্থনার কৌশল বা আঙ্গিকের চমক দিয়ে তাক লাগান নি লেখক -- সরল , সতেজ ও স্বত উৎসারিত বলেই তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধে ফুটেছে আশ্চর্য একটি স্বাভাবিকতার দ্যুতি। কোনো বিশেষ ধারা কিংবা মননের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব থাকলে সাহিত্য কিছুটা হলেও মতবাদের খপ্পরে পড়তে বাধ্য। ঠিক যেমন দান্তের কল্পনার ছত্রে ছত্রে টমাস আকুইনাসের প্রভাব বিশ্ববিদিত , কৌশিক মজুমদারও সুকুমার-সত্যজিতের মনন-বৈচিত্র্য ও লেখনীর প্রভাব থেকে ��ুক্ত নন। প্রেরণার অবচেতন দিক বলা যেতে পারে এটিকে। ঠিক যেমনটি কবি পিন্ডার বলে গেছেন।
প্রত্যেকটি প্রবন্ধ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র লেখা দেওয়াই যায়। কিন্তু আমার মতে তার ফলে পাঠকমনে সমালোচকের অকারণ ও বলপূর্বক মতবাদ স্থাপনের কুপ্রচেষ্টা করা হবে। একজন নগন্য, সামান্য পাঠক হিসেবে বলতে পারি শুষ্ক তথ্য কিংবা কুইজের উপাদান সংগ্রহ করার জন্যই শুধু নয়, একটি ঘটনাবহুল যাত্রার আনন্দ উপভোগ করার জন্যই পড়ুন এই বই।
তথ্যের অদৃশ্য অন্তর্জগৎকে ব্যঞ্জিত শব্দপ্রয়োগে এবং অভিনব বাকপ্রতিমায় পাঠকের গোচরে নিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ কৌশিককে।
নন-ফিকশন সম্পর্কে যে কথাটি দিয়ে এই আলোচনা শুরু করেছিলাম , তা শেষ করতে চাইবো রবি ঠাকুরের অন্য প্রসঙ্গে করা একটি উক্তির সাহায্য নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ বলছেন : বুদ্ধির ভাষা মান্য করা যদি বহুদিন থেকে দেশের অভ্যাসবিরুদ্ধ হয় , তবে আর সব ছেড়ে দিয়ে ঐ অনভ্যাসের সঙ্গেই লড়াই করতে হবে।
পাঠক হিসেবে অপেক্ষায় রইবো কৌশিকের পরবর্তী লেখার জন্য।
সহজ কথায় এটা একটা গবেষণাগ্রন্থ। কী আসে নি এতে? সিনেমা থেকে সাহিত্য, কমিক্স থেকে বিজ্ঞাপন, বিজ্ঞান থেকে ইতিহাস আর পুরনো কলকাতা, সবই এসেছে এই ৩০৭ পৃষ্ঠার কলেবরে। কিন্তু চর্বিত চর্বণের সারাংশ ভাবলে ভুল ভাবা হবে। বইটি এর বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে অনেকখানি আলাদা। লেখকের লেখনশৈলীর সাথে প্রথম পরিচয় তোপসের নোটবুক এর মাধ্যমে। পাঠককে যেকোন ধরনের লেখায় তাঁর আটকে রাখার যে মুন্সীয়ানা, সেটা অনুভব করি 'নোলা' এর মাধ্যমে। এর পর থেকেই কৌশিক মজুমদার আমার অন্যতম প্রিয় সমসাময়িক লেখক। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে যেন আমি আমার আরেক প্রিয় লেখক শ্রীপান্থকে কিছুটা খুঁজে পাই। এই বইটিতে সিনেমার সেই শুরুর দিকের প্রথম সিনেমাটোগ্রাফ নামক যন্ত্র থেকে কালে কালে উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের আগমন এবং প্রসার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। চমৎকার আলোচনা রয়েছে তৎকালীন প্রখ্যাত নায়িকাদের নিয়ে, যাঁদের নিয়ে খুব অল্পই জানতাম আমি। বিশ্বের প্রথম ছবি আঁকা বইয়ের গল্প থেকে অ্যালিসের অভিযান রচনার পেছনের কাহিনী, কোনটা থেকে কোনটা কম রোমাঞ্চকর নয়। সত্যজিৎ, সুকুমারের অলংকরণ আর সত্যজিৎ এর অনুবাদ নিয়ে রয়েছে চমৎকার কিছু প্রবন্ধ। কমিকসের ইতিবৃত্ত বইয়ের পেছনের কাহিনীতে লেখকের ব্যক্তিগত কিছু গল্পও ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে নারায়ণ দেবনাথ এর আঁকা প্রচ্ছদে স্বপনকুমারের লেখা সিরিজ আর আমেরিকান পাল্প ফিকশনের ইতিহাস পড়ে। এই বইয়েরই একটা প্রবন্ধ থেকে বর্গমূল বের করার চমৎকার একটা সহজ উপায় পেয়ে গেছি! বিজ্ঞান আর ইতিহাস সম্পর্কিত প্রতিটি প্রবন্ধই মুগ্ধ করেছে। লেখকের বইয়ের গল্পের সাথে একাত্ম হবেন সকল বইপ্রেমী এবং সংগ্রাহক পাঠকেরা। বিভূতিভূষণ-জীবনানন্দের প্রকৃতির প্রেক্ষণে- একটি চমৎকার প্রবন্ধ, যেটি পড়তে গিয়ে পুনরায় দুজনের প্রকৃতিপ্রেম এবং সাহিত্যসৃষ্টিতে মুগ্ধ হলাম৷ একদম শেষ প্রবন্ধটি চমকে দিয়েছে। জানতাম না যে পুরনো কলকাতার প্রথম সিরিয়াল কিলার ছিলেন একজন মহিলা! কৌশিক মজুমদার বইটির নামও দিয়েছেন বেড়ে। কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা পাঠকের পাতে তুলে দিয়েছেন, দীর্ঘদিন একজন সত্যিকার পাঠকহৃদয়কে তৃপ্ত করবার জন্য যথেষ্ট।
আমার পড়া লেখকের চতুর্থ বই এটি। ছোটবেলায় যখন আনন্দমেলা পড়তাম তখন ওখানে প্রায় বিভিন্ন বিষয়ে তিন চার পাতার প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো। এই বইটি পরে অনেকটা সেই সময়কার কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু এই বই আরও বেশি তথ্যপূর্ণ। কোনো বিষয় এই বইতে বাদ নেই। সিনেমা থেকে বিজ্ঞান , কমিকস থেকে শুরু করে পুরোনো কলকাতা। স্কুলজীবনে অনেক কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম। তখন এরকম একটি বই পেলে সত্যি বলতে অনেক সুবিধা হতো। লেখকের তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা যারা এনার লেখা পড়েছেন তারা জানেন। বাড়ির ছোটদের উপহারের জন্য একদম যথার্থ। তার মানে এই না বড়রা এই বইয়ে আগ্রহ পাবে না। আট থেকে আশি সবার জন্য এই বই। কেননা জানার কোনো শেষ নেই এবং জানার কোনো বয়স হয় না।
কয়েক জায়গায় বানান ভুল আছে। আশা করবো পরবর্তী মুদ্রণে সেগুলো শুধরে দেওয়া হবে। লেখকের পরের বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম।
লেখক : কৌশিক মজুমদার ( নামেই যথেষ্ট ) প্রকাশক : সৃষ্টি সুখ মুদ্রিত মূল্য : ৩৭৫ বিপণন মূল্য : ২৯৯ ( খুচরো ছিলোনা বলে ১টাকা ফেরত পাইনি , পরের বার পুষিয়ে দেওয়া হবে বলে কথা দেওয়া আছে ) প্রকার : প্রবন্ধ সংকলন বই : সফ্ট বাইন্ড
একটা ‘চপ’র গল্প দিয়ে শুরু করি । ‘চপ’ শব্দটি তো এখন বহুল অর্থে ব্যবহৃত হয় আমি তাই বাপু লেখা শুরুর আগেই হাত তুলে নিচ্ছি যে আমি মোটেও সেই দিকে নির্দেশ করছিনা যে দিকে এখন বাঙ্গালী চপ শব্দটি শুনলেই নির্দেশ করে। আর হ্যাঁ, মাননীয় লেখক মহাশয়, আপনাকেও অনুরোধ করছি ক্ষমা ঘেন্না করে এই অধমকে মার্জনা করবেন, ঝাঁটাপেটা করতে আসবেন না। আমি শুধু আমার এক পাঠক বন্ধুর ভাষায় আপনার সাহিত্য কীর্তিকে একটু অন্যভাবে বর্ণিত করছি।
কৌশিক বাবুর লেখা হল অনেকটা গরম চপের মতো। গরম গরম ফুঁ দিয়ে খাবার মজাই আলাদা । তবে সব থেকে বেশি মজা হল এই যে গরম হয়তো অনন্তকাল থাকেনা এই চপ তবে বাসি কখনো হয়না । তাই স্বাদটা সবসময় প্রায় সমান ভাবেই পাওয়া যায়।
লেখকের লেখনীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ‘হোমসনামা ’ দিয়ে । তাতেই এমন মজে গেছি যে তারপর থেকে একদম পারলে কড়াই থেকে ছো মেরে গরম চপ খাচ্ছি তাড়িয়ে তাড়িয়ে । গেলো শনিবার সৃষ্টি সুখের সাহিত্য উৎসবে গিয়ে একদম ফ্রেশ ফার্স্ট কপিটা সংগ্রহ করেছিলাম ‘কুড়িয়ে বাড়িয়ে’র উপরি পাওনা ছিল লেখকের সাক্ষর । রবিবার থেকে পড়া শুরু করে আজ এই ঘন্টাখানেক আগে শেষ করলুম । সাধের লেখকের সাধের বই পড়ে বৈরাগী হয়ে তাই সদ্য সদ্য পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে বসেছি ।
প্রথমে ভালো দিয়ে শুরু করা যাক ।
১) গবেষণা ধর্মী ৫০ টি প্রবন্ধ রয়েছে এই বইতে যেগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তী কোনও সম্পর্ক নেই (আক্ষরিক অর্থেই কুড়িয়ে বাড়িয়ে ) তাই এ বই শেষ থেকে শুরু করে প্রথম অবধিও পড়া যেতে পারে । পাঠক ইচ্ছে করলে শিবরামের মতন মাঝখান থেকে শুরু করে সমান্তরাল ভাবে শুরু ও শেষের দিকে এগোতে পারেন, কোনও অসুবিধে নেই ।
২) পঞ্চাশটি ভিন্ন প্রবন্ধ পরে পাঠক বন্ধুরা বিষয় বস্তুর স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন তবে বিশেষ কোনও বিষয়ে পণ্ডিত হওয়ার জন্য এই বই নয় । এ বই সবার জন্য । সীমিত সংখ্যক তথ্য সুচারু ভাবে পরিবেশন করেছেন লেখক ।
৩) বইটির অনবদ্য প্রচ্ছদ বানিয়েছেন প্রখ্যাত শিল্পী দেবাশীষ দেব , প্রচ্ছদটিই যথেষ্ট যেন পাঠকের পাঠ পূর্বক অ্যাড্রিনালিন রাশ ঘটানোর জন্য। আর হ্যাঁ, বইটি যে বয়েস নির্বিশেষে সকলের পাঠ যোগ্য তারও যেন আভাষ পাওয়া যায় প্রচ্ছদ দেখেই।
৪) লেখকের লেখনীর গুনে তথ্য সমৃদ্ধ লেখাও যে সুখপাঠ্য হতে পারে সে পরিচয় আমি আগেও পেয়েছি কৌশিক বাবুর লেখা পরে । এ বই তার ব্যতিক্রম নয় । কলমের গুণে তথ্য নির্ভর ছোট ছোট প্রবন্ধ গুলি যেন জীবন্ত হয়ে এ বইকে আনপুটডাউনেবেল করে তুলেছে ।
৫) বইয়ের নাম যতই কুড়িয়ে বাড়িয়ে হোক প্রবন্ধের সংকলন কিন্তু লেখক করেছেন অত্যন্ত যত্ন নিয়ে। প্রতিটি প্রবন্ধই মন ছুঁয়ে যায়। আরও বেশি জানার খিদেটা বাড়িয়ে তোলে। ৬) লেখার সাথে সাথে রয়েছি ছবি ও তথ্য সূত্র যাতে পাঠকের বিষয় সম্বন্ধে আরও গভীরে জ্ঞানার্জনের ইচ্ছে হলে নিদেনপক্ষে শুরুটা কোথা থেকে করবেন সে ব্যাপারে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয় ।
৭) ছোটবেলায় যারা আনন্দমেলা পড়তেন তাদের মনে থাকা উচিত আনন্দমেলায় ছোট ছোট অনুচ্ছেদে একসময় দেশবিদেশের নানা অজানা নতুন খবর থাকতো । মার্জিত ভাষার গুণে এ বই পরে অনেক দিনের হারানো সেই স্বাদটা আস্বাদনের মজা পেলাম ।
এবার খারাপ বলার প্রসঙ্গে একটি কথাই শুধু বলতে চাই । পাঠকগণ বিশ্বাস করুন আমি বই বেশ যত্ন নিয়ে পড়ি । পাতা মোড়া তো দূরে থাক বইতে দাগ দেওয়াও আমার বিলকুল নাপসন্দ। এই বইটা আকারে বেশ বড়, এবং সফ্ট বাইন্ড হওয়াতে এক হাতে পড়ার সময় একটু মুড়িয়ে পড়েছিলাম। তাতে মাত্র তিন দিনেই বইটির ৪ টে পেজ বাঁধন থেকে খুলে এসেছে। হতে পারে যে আমারই ভাগ্যে খারাপ বাঁধনের বই জুটেছে কিন্তু প্রকাশক মহাশয় যদি একটু চেক করে নেন অন্যান্য বইগুলো তাহলে বাধিত হব।
পাঠক বন্ধুদের জন্য একটা ছোটো তথ্য সবশেষে দিয়ে রাখি , এই বইতে একটি প্রবন্ধ রয়েছে আইনস্টাইন এবং এডিংটন কে নিয়ে । এই বিষয়ে একটি ডকুমেন্টারি গোছের সিনেমা দেখেছিলুম ইউটিউবে । উৎসাহী পাঠকগণ লেখাটি পড়ার পর অনবদ্য তথ্য চিত্রটিও দেখতে পারেন ‘Einstein and Eddington’ নাম দিয়ে সার্চ করলেই পাবেন ।