।। এর আগেও Rima Das বলেছিলেন। আজ সঞ্জীব নিয়োগী বললেন। 'পর্ণমোচী'-র বিজ্ঞাপন দিতে গিয়ে কেন আমি উপন্যাসটির ক্ষেত্রে শ্লেষের আশ্রয় নিচ্ছি, নোংরা বলছি, অশ্লীল বলছি। মনে হচ্ছে ভুল করছি। প্রথম প্রকাশের পরে আক্রান্ত হতে হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই ব্যঙ্গ ফিরিয়ে দিতে গেলে আমার সৎ পাঠক আহত ও ব্যথিত হচ্ছেন। সকালের বিজ্ঞাপন ডিলিট করলাম। মালদা লিটিল ম্যাগাজিন মেলা ১৬ এবং ১৭ তারিখে হচ্ছে। 'তবুও প্রয়াস'-এর টেবিল থেকে সংগ্রহ করুন।।
অনুপম মুখোপাধ্যায় প্রণীত 'পর্ণমোচী' উপন্যাস পাঠ, এক ব্যতিক্রমী এবং দুরন্ত অভিজ্ঞতা। বইয়ের প্রচ্ছদপট এবং লেখকের নামের পর ব্যবহৃত 'প্রণীত' শব্দটি থেকে শুরু করে কাহিনির শুরুতে 'চোদনপারের আলো এবং অন্ধকার' শীর্ষক শব্দবন্ধের মাধ্যমে সূচনা যেমন চমকে দেয় তেমনি প্রতিটি অধ্যায়ে সংলাপের এবং গদ্যের ব্যবহারে চমক এবং মুহুর্মুহু বাঁকবদল — আরো বিপজ্জনক, বেহিসাবী, নিষিদ্ধ (সমাজের চোখে!?) কিছু ঘটার হাতছানি পাঠককে টেনে নিয়ে চলে শেষ পর্যন্ত।
কাহিনি প্রেমের হতে পারত, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা নিয়ে ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনি হতে পারত। হয়েছে কি আদৌ হয়নি? সফ্টপর্ণ নাকি চটি? - সেই সিদ্ধান্তেও আসতে পারছি না আপাততঃ কারণ মাথা হালকা ভারী হয়ে আছে, জোরদার ঝাঁকুনি পড়েছে। সমাজের যা কিছু আপাতভাবে চিরাচরিত, সেই প্রথাগুলিকেই যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। জাত, যৌনতা,রাজনৈতিক মতাদর্শজনিত সমস্যাগুলিকে উপন্যাসে অদ্ভুতভাবে লেখক তার নিজস্ব রীতিতে তুলে ধরেছেন। এই কাহিনির চালক তিনিই, তিনি যেমনভাবে, যে কাহিনি শোনাতে চান, পাঠককে সেইভাবে তা শুনতে হবে। 'পর্ণমোচী' উপন্যাসে আদতেই যৌনতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং নারী সেই যৌনতার শীর্ষে অবস্থান করছে। প্রাপ্তবয়স্ক এবং একইসঙ্গে প্রাপ্তমনস্ক পাঠ এই উপন্যাস দাবী করে।দুর্বলচিত্তের, সালোকসংশ্লেষে বিশ্বাসী, 'যৌনতা-সেক্স, ফ্যান্টাসি, ফেটিশ, অর্গ্যাজম এবং ইত্যাদি ইত্যাদি' শব্দের সঙ্গে দুরদুরান্তেও যেসব কচি-কোমল পাঠকমনের সম্পর্ক নেই বা নাক সিঁটকে, ভুরু কুঁচকে তফাত যান যারা, তারা এই পাঠ থেকে নিজেদের বিরত রাখবেন।
এক কথায় বলতে গেলে, এই বইটি যেন আধুনিক সাহিত্যের মোড়কে পরিবেশিত এক নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক ভাঁড়ামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এটিকে একটি চটি সংস্করণের নতুন রূপ হিসেবেও চিহ্নিত করা যেতে পারে। যৌনতা এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর ও শৈল্পিকভাবে লেখা সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই বিশেষ বইটিতে যৌনতাকে উপস্থাপন করা হয়েছে নিছকই কিছু অমার্জিত এবং স্থূল শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে, যা পাঠকমনে কোনো উন্নত অনুভূতি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ। বইটি পড়তে গিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে রোদ্দুর রায়ের কথা বারবার মনে পড়ছিল।
এর অন্তর্নিহিত মাহাত্ম্য বা সাহিত্যিক মূল্য আমার মতো মূর্খ পাঠকের কাছে অধরা রয়ে গেছে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর এর লেখক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে একরকম ন্যাকা কান্না জুড়ে দেন। কিন্তু আমি পাঠক সমাজকে বিনীত অনুরোধ করব, এই ধরনের বিপণন কৌশল বা "marketing gimmick"-এর ফাঁদে পা না দিয়ে, বইটি কেনার আগে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে। নিজের মূল্যবান অর্থ ও সময় নষ্ট করার আগে এর বিষয়বস্তু এবং সাহিত্যিক মান সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এই ৮০ পৃষ্ঠার তথাকথিত আধুনিক চটি বইটির মূল্য ২০০ টাকা। তবে, একটি বিষয় অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। "তবুও প্রয়াস" প্রকাশনী সংস্থা থেকে প্রকাশিত এই বইটির মুদ্রণ এবং কাগজের গুণগত মান সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
কিন্তু শুধুমাত্র ভালো মুদ্রণ এবং কাগজ একটি বইকে মহৎ করে তোলে না; এর মূল বিষয়বস্তু এবং সাহিত্যিক গুণই একটি বইয়ের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে। দুঃখের বিষয়, এই বইটির ক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্য থাকলেও এর অভ্যন্তরীণ মূল্য শূন্যের কাছাকাছি আমার কাছে।
নতুন বই নিয়ে বা নতুন লেখকদের নিয়ে এসব লিখতে কুন্ঠা হয় বেশ কিছুটা। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, 'পর্ণমোচী' বাংলা সাহিত্যের এক অপ্রয়োজনীয় প্রলেপ — এটি বই নয়, বরং ভাষার উপর চালানো এক ভয়ানক অত্যাচার। এটা পড়ে যেমন অস্বস্তি হয়, তেমনই একধরনের লজ্জাও জন্মায় — না, যৌনতাকে নিয়ে নয়, বরং এতদিন ধরে যে ভাষাটাকে আমরা পরিশীলিত করে এসেছি, তার এহেন অবনমন দেখে।
এই বইয়ের উদ্দেশ্য যদি হয়ে থাকে নারী পুরুষের যৌনতা, সামাজিক কাঠামো ও শরীর রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করার — তাহলে বলতেই হয়, সেই প্রচেষ্টা স্রেফ মাঠে মারা পড়েছে। ভাষা এখানে যেন গুমগুমে — উচ্চারণযোগ্য নয়, অর্থপূর্ণ তো নয়ই। বারবার “আঃ”, “উঃ”, “উফফ”, “প্যাঁচপ্যাঁচে” — এসব সাউন্ড ইফেক্ট দিয়ে তৈরি হয়েছে এক এমন জগৎ, যেটা যৌনতার নয়, সাহিত্যিক ব্যর্থতার।
এটা ‘ইরোটিকা’ নয়, এটা একধরনের আত্মঘাতী স্প্ল্যাশ ফিকশন—যেখানে যৌনতা নেই, আছে কেবল অবসেসিভ ন্যারেটিভস আর গুগলি মার্কার দিয়ে দাগানো সংলাপ।
লেখক হয়তো ভেবেছিলেন, নিজেকে “transgressive” বলে চালিয়ে দেবেন—কিন্তু লেখার মধ্যে এতটুকুও শিল্প নেই, নেই অন্তর্নিহিত তলদেশ, নেই character development, নেই সামাজিক বোধ।
চলুন দেখে নেওয়া যাক কিছু বই যেগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে erotic বা transgressive লেখা ভুল পথে চলে যেতে পারে, পর্ণমোচী এক্কেবারে সেই বইগুলির তালিকায় গিয়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছে:
১) "The 120 Days of Sodom" (Marquis de Sade): যতটা না কামনা, তার চেয়ে অনেক বেশি নির্যাতনের পংক্তিমালা। পর্ণমোচী-র মতই, এখানে যৌনতাকে ক্ষমতা ও বিকারের ছায়াতলে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
২) "My Secret Life" (Walter): ক্লান্তিকর, একঘেয়ে, আর সামাজিকভাবে বীভৎস। পর্ণমোচী-তেও এক রকম আত্মগরিমা আছে, যেখানে পাঠকের অনুভব গুরুত্বহীন।
৩) "Fifty Shades of Grey" (E.L. James): যৌনতাকে রোমান্সের নামে অপব্যবহার করার উদাহরণ। কিন্তু অন্তত গদ্যটা টানতে পারত। পর্ণমোচী সেখানে পুরোপুরি চ্যুত—যেমন এক টিকটিকি মঞ্চে এসে হ্যামলেট পারফর্ম করতে চায়।
৪) "Wetlands" (Charlotte Roche): উদ্দেশ্য ছিল বডি-পজিটিভিটি, কিন্তু ঘেন্না আর বমির মাঝখানে হারিয়ে যায় যে কোনও মানবিক অনুভব। পর্ণমোচী-ও সেই পথেই হাঁটে—অত্যধিক দেহমুখী অথচ শূন্য হৃদয়হীনতা নিয়ে।
৫) "Story of the Eye" (Bataille): দর্শনের মুখোশ পরে বিকৃতিকে ঢাকার চেষ্টা। পর্ণমোচী-ও তেমনি কিছু শব্দ জোগাড় করেছে—“লিঙ্গ রাজনীতি”, “স্ত্রীসত্তা”—যার একটিও প্রসঙ্গত নয়, কেবল নামমাত্র বুদ্ধিজীবিতা।
আর এখনকার viral ও bizarre উদাহরণগুলোর কথা বললেই পর্ণমোচী যেন "Taken by the T-Rex" বা "House of Holes"-এর মতোই—কোনও narrative coherence ছাড়াই যৌনতা নিয়ে ঘোঁট পাকানো এক ক্লাউন শো। পাঠের অভিজ্ঞতা যেন ভুল করে ভিনগ্রহে teleport হয়ে যাওয়ার মতো—কোথাও যৌনতাও নেই, কোথাও শিল্পও নেই—শুধু ব্যর্থতা আর শূন্যতা।
এমন বই পড়ে শেষে মনে হয়— সাহিত্যে সত্যিই কি erotica লেখা সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব। উদাহরণ চাই? কটা লাগবে?
রবি বাবুর চোখের বালি
শরৎ বাবুর পরিণীতা
সামরেশ বসুর বিবর
বুদ্ধদেব বসুর রাতভরে বৃষ্টি
জয় গোস্বামীর কবিতা, যেখানে কামনা আর করুণার সীমা মুছে যায় এক অপূর্ব সংবেদে।
আরও উদাহরণ দেবো ? বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে রাত ফুরিয়ে যাবে।
তার চেয়ে ভারতীয় সাহিত্যে ইরোটিকার কিছু সাহসী, বিতর্কিত ও ব্যতিক্রমধর্মী প্রয়াস দেখা যাক:
১) রোজালিন ডি’মেলো – A Handbook For My Lover: নিজের বাস্তব প্রেমের গল্প লিখে সাহস দেখিয়েছেন রোজালিন। তাঁর থেকে ৩০ বছর বড় এক ফটোগ্রাফারের সঙ্গে সম্পর্কের বিবরণ দিয়ে, শরীর নয়, তিনি তুলে ধরেছেন "আকাঙ্ক্ষা"র ভাষা। মাস্টারবেশন, ঋতুচক্র নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করেছেন, যা ভারতের সমাজে আজও ট্যাবু। স্নিগ্ধ অথচ নিঃসংশয় কণ্ঠস্বর—এই আত্মজৈবনিক সাহিত্যে ইরোটিকা মিশেছে সমাজ-সংস্কারের প্রশ্নে।
২) আরণ্যাণী – A Pleasant Kind of Heavy: নারী যৌনতা নিয়ে লেখা ৯টি ছোটগল্প। গর্ভবতী নারীর কামনার পুনর্জাগরণ থেকে শুরু করে সমকামী আকাঙ্ক্ষা পর্যন্ত, গল্পগুলোতে নারীরা একাধিক বয়স, শ্রেণি ও অভিজ্ঞতার প্রতিনিধি। লেখক নিজের পরিচয় লুকিয়েছেন, কারণ “পরিবার ও পেশাজগতের রক্ষণশীলতা”। গল্পগুলোর মধ্যে কখনো অদ্ভুততা, কখনো অতিশয়তা থাকলেও নারীর আকাঙ্ক্ষার অনাবৃত ভাষা যেন এক বিপ্লব।
৩) রুথ বনিতা – Gender, Sex and the City: Urdu Rekhti Poetry: উর্দু রেখ্তি কবিতা বিশ্লেষণ করে ১৮-১৯ শতকের লখনউর নারীকেন্দ্রিক যৌনতা ও সমকামিতা তুলে ধরেছেন। কবিতায় দেখা যায় নারী-নারী প্রেম, পুরুষ-কবি ও যৌনকর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক, এবং এক প্রাক-ঔপনিবেশিক মুক্ত চেতনার পরিচয়। ইতিহাসের পাতা থেকে যৌনতার অচর্চিত সংস্কৃতিকে খুঁড়ে এনেছেন তিনি।
৪) ইসমত চুঘতাই – লিহাফ (কম্বল): ১৯৪২ সালে লেখা এই ছোটগল্পে, গৃহপরিচারিকার সঙ্গে এক গৃহবধূর শারীরিক সম্পর্ক ফুটিয়ে তুলেছেন চুঘতাই। উপনিবেশিক ভারতের গোঁড়ামি আর লিঙ্গ রাজনীতির বিরুদ্ধে এক রীতিমতো বিদ্রোহ এই গল্প। সাহসী লেখার জন্য তাঁকে আদালতে যেতে হয়, কিন্তু তাঁর কলম থামে না। উর্দু সাহিত্যের সাহসী কণ্ঠ হিসেবে তিনি আজও অনন্য।
৫) সংগীতা বন্দ্যোপাধ্যায় – Panty: কলকাতার এক ফাঁকা ফ্ল্যাটে থাকা নারী এক জঙ্গলি প্রিন্টের অন্তর্বাস খুঁজে পেয়ে অনুভব করে আগুনের শিখা। শারীরিক চেতনা ও যৌনতার জাগরণকে কেন্দ্র করে গল্পটি আধুনিক বাঙালি সাহিত্যে এক প্রলয়নাচন। অনুবাদ করেছেন অরুণাভ সিনহা। এটি একটি অন্তর্জাগতিক, নারীসুলভ ও অনাস্বাদিত কামনার আখ্যান।
৬) অনন্ত পদ্মনাভন – Play With Me: ভারতের এক মহানগরের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে আধুনিক যুগের প্রেম, কামনা, বাইসেক্সুয়ালিটি ও থ্রিসাম তুলে ধরেছেন লেখক। তিনি বলেন, “যেহেতু আমি পুরুষ, আমার নারী চরিত্রগুলোকে স্বাধীন, আত্মনির্ভর হতে হতো।” সাহিত্যে শারীরিকতার পাশাপাশি সম্পর্কের আন্তরিকতা রয়ে গেছে।
৭) স্রেময়ী পিউ কুন্ডু – Sita’s Curse: এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত গৃহবধূর কামনার উন্মোচন, আত্মজাগরণ ও স্বাধীনতা খোঁজার গল্প। মীরা প্যাটেলের জীবনে যৌনতা কেবল শারীরিক চাহিদা নয়, বরং এক মানসিক মুক্তির যাত্রা। কুন্ডু নিজেই বলেন, “এটা কোনো ভারতীয় ‘ফিফটি শেডস’ নয়। এটি নারীর নিজের সঙ্গে কথোপকথন।”
৮) সুধীর কাকার – The Devil Take Love: সপ্তম শতকের কবি ভর্তৃহরির জীবনের রূপায়ণে কামনা ও আত্মার দ্বন্দ্ব। যৌনতা, ইতিহাস ও কাব্যকে মিলিয়ে এক মনস্তাত্ত্বিক ও কাব্যিক নৃত্য তুলে ধরেছেন। ‘স্তন যেন হাতির কপালে মুক্তার আধার’—এইরকম সাহসী উপমা দিয়ে কামনার সৌন্দর্য প্রকাশ করেছেন। কাকার ২০টির বেশি বইয়ের অনেকটাই জুড়ে রয়েছে যৌনতার মনস্তত্ত্ব।
৯) সারোজিনী সাহু – উপনিবেশ ও গম্ভীরি ঘর: ওড়িয়া সাহিত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ লেখিকা নারীর যৌনতা, স্বকীয়তা ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব নিয়ে লিখেছেন। ‘উপনিবেশ’ উপন্যাসে বোহেমিয়ান নায়িকা মেধা বিশ্বাস করেন, একঘেয়ে দাম্পত্য সম্পর্ক মানেই মৃত্যু। ‘গম্ভীরি ঘর’-এ হিন্দু নারী ও মুসলিম শিল্পীর সম্পর্ক একাধিক ট্যাবু ভাঙে। সমকামীতা, ধর্ষণ, গর্ভপাত, ঋতু, নারী-মেনোপজ—সব উঠে আসে সাহুর সাহসী কলমে। নিজেই বলেন, “পুরুষ কখনো নারীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা পুরোপুরি বুঝবে না। কেউ তো এগিয়ে আসতে হবে এসব বলার জন্য।”
বলতে বাধ্য হচ্ছি যে যখন ইরোটিক সাহিত্য সত্যি করে কামনাকে উপলব্ধির ভাষায় রূপান্তর করে, তখন তা হয়ে ওঠে আত্ম-আবিষ্কারের আয়না। কিন্তু যখন তা পড়ে যায় নিছক উত্তেজনা তৈরির ফাঁদে বা বৈষম্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সে সাহিত্য শুধুই কুৎসিত।
ভারতীয় লেখকরা যে সাহসে, সংবেদনশীলতায় এবং বিপদ মাথায় নিয়েও যৌনতার আলাপ শুরু করেছেন, তা কেবল সাহিত্যের পরিসরই বাড়ায় না—বরং আমাদের সমাজের ভেতরের জড়তাগুলোকেও কাঁপিয়ে তোলে। এই সাহসী কণ্ঠগুলোই ভবিষ্যতের নীরবতাকে শব্দ দেবে।
সাহিত্য যদি আমাদের শরীর, মন, এবং সমাজের জটিলতা বুঝতে সাহায্য করে, তবে পর্ণমোচী এই অভিপ্রায়কে কলুষিত করে। একে সাহসী বললে সাহসের অপমান হয়। একে ট্রান্সগ্রেসিভ বললে boundary কাঁদে।
ওপরের যে উদাহরণগুলো দিলাম সেই বইসকল পড়ে যৌনতা নয়, বরং "যৌনগন্ধী সাহিত্যে কী না লিখতে হয়"—তা শিখে নেওয়া যায়।
এই বই ছিল বাংলা সাহিত্যের এক দুঃস্বপ্নের ফাস্ট ফুড—চটজলদি পড়া যায়, কিন্তু পেটে গিয়ে বদহজমের মতো পাক খায়। পাঠক, সাবধান। এতে শরীর নেই, আত্মা তো নয়ই। কেবল একটা গালভরা ভোঁতা আওয়াজ—“উফফ আঃ ইসস!”
দুঃসাহসী। চমকদার। তবে চটকদারও বটে! আমার ব্যক্তিগত মতামত: উপন্যাস হিসাবে কিছুটা Over-hyped. বরং লেখকের ‘ঘাসের উপর মধ্যাহ্নভোজ’, ‘খ্রিস্ট’ এবং ‘শেক্সপিয়ার’ বহুগুণে অত্যুৎকৃষ্ট। যাঁরা একবিংশ শতাব্দীর পক্ষে উপযুক্ত বাংলা উপন্যাস পড়তে চান, শেষের তিনটি উপেক্ষা করবেন না।
✪✪ পাঠ প্রতিক্রিয়া ✪✪ ---------------------------------- ✪ যে কোনো লেখকের যেমন যা ইচ্ছে লেখার অধিকার আছে, ঠিক তেমনই কোনো পাঠকের সেই লেখা পড়ে স্বচ্ছ মতামত জানাবারও অধিকার আছে। এখন আমি যে উপন্যাসটিকে নিয়ে লিখছি সেটিকে আদৌ উপন্যাস বলা যায় কিনা আমার সেই সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। বইয়ের ব্লার্বে লেখা আছে উপন্যাস! তাই আমিও এটিকে উপন্যাস হিসেবেই ধরছি, যদিও আমার কাছে এটা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের সৃষ্ট 'মাকড়সার রস' কাহিনীর নন্দদুলালবাবুর লিখিত সেই অতি উৎকৃষ্ট পর্যায়ের সাহিত্য বলেই মনে হয়েছে!
★ উপন্যাস : পর্ণমোচী ★ লেখক : অনুপম মুখোপাধ্যায় ★ প্রকাশক : তবুও প্রয়াস ★ মুদ্রিত মূল্য : ২০০/- টাকা (দ্বিতীয় মুদ্রণ - জানুয়ারি, ২০২২খ্রীষ্টাব্দ) ★ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৮০টি
✪ ছোটবেলায় বেশিরভাগ শিশুর মনেই যে কোনো নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি একটা আগ্রহ জন্মায়, তারপর তাঁরা যখন ধীরে ধীরে বড় হ'তে থাকে শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন এবং সবশেষে বার্দ্ধক্য, ততদিনে তাঁদের ঐ নিষিদ্ধ জিনিস অথবা বস্তুগুলোর বেশীরভাগের সঙ্গেই পরিচয় হয়ে যায়। আর আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে যে পৃথিবীর কোনো প্রাণীকেই ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর যৌনতা এই তিনটি বিষয় হাত ধরে শিখিয়ে দেওয়ার দরকার হয়না। একটি শিশু যখন নিজের ক্ষমতায় খাবার গ্রহণ ক'রতে পারেনা, তখনও কিন্তু তার মুখের কাছে খাবার অথবা দুগ্ধ আনলে সে হাঁ করে! ঠিক সেইরকম বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁরমধ্যে যৌনতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
★ ছোটবেলায় যেসব বটতলার চটি বইগুলো আমরা বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়েছি, সেগুলোতেও বোধহয় এই বইটির মতো ঢাকঢোল এবং বাদ্যযন্ত্র (যথা - উঃ, আঃ, আউচ এ�� টাইপের শব্দ সহযোগে) এবং বস্তির কলতলায় ব্যবহৃত কিছু শব্দ সহযোগে যৌনতার পাঠ দেওয়া হয়নি! স্বয়ং মহর্ষি বাৎস্যায়নও বোধহয় এই বইটির ভাষা পড়লে লজ্জা পেতেন! বাৎস্যায়নের কামসূত্রে শীৎকার অবশ্যই স্বীকৃত, কিন্তু এইভাবে? এইরকম ফাটা বাঁশের মতো শুধু কিছু কাঁচা কাঁচা খিস্তি দিয়ে বই লিখে সেটাকে সাহিত্য বলা, এবং সেই সাহিত্যকে নাকি আবার শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন বলে দাবি করা আমার খুব অদ্ভুত লেগেছে! আজকে এই জেড-জেনের যুগে দাঁড়িয়ে যেখানে গৃহবধূকে 'গৃহবধূ' বলা যায়না ব'লতে হয় 'হোম মেকার', মস্তিষ্কে অথবা শরীরে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকলে তাঁকে ব'লতে হয় 'বিশেষ ভাবে সক্ষম', সেইখানে দাঁড়িয়ে এইরকম ভাষায় বই লিখে সেটাকে সাহিত্য বলে চালিয়ে দেওয়ার এই পদ্ধতিটি আমার ব্যক্তিগতভাবে একদমই ভালো লাগেনি। ভাষার ক্ষেত্রে অন্তত সংযত হওয়া উচিৎ ছিল, মনে রাখা দরকার লেখ্য ভাষা এবং কথ্য ভাষার মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা বটতলার চটি বইয়ের আধুনিক সংস্করণ বলে আমার মনে হয়েছে। এবং আজ পর্যন্ত আমি যতগুলো ইরোটিকা পড়েছি এ'টি তারমধ্যে জঘন্য থেকে জঘন্যতম বই বলেই আমার মনে হয়েছে।
★ 'সেক্স' শব্দটি অবশ্যই আমাদের সমাজে একটি ট্যাবু, কিন্তু সেই ট্যাবু ভাঙার জন্য এইধরনের বইকে আমি মন থেকে গ্রহণ করতে পারলাম না, সরি। --------------------------
বাংলা ভাষায় ইরোটিকা লেখার সাহস করে ওঠার জন্যই চার তারা। নইলে প্রিটেনশাস গদ্য, মেয়েদের যৌনতার ঈষৎ স্টিরিওটিপিকাল বর্ণনা সহ আরো বেশ কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করার জায়গা আছে।