বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের মনে 'হিমালয়' ও 'মাউন্ট এভারেস্ট' এই শব্দ দুটির পার্থক্য নিয়ে ভুল ধারণা প্রচলিত। পশ্চিমে পাকিস্তানের নাঙ্গা পর্বত থেকে শুরু করে ভারত, নেপাল, ভুটান হয়ে পুবে চায়নার নামচা বারওয়া পর্যন্ত হিমালয়ের বিস্তৃত। সুবিশাল এই পর্বতমালায় রয়েছে হাজার হাজার পর্বতশৃঙ্গ। মাউন্ট এভারেস্ট সেই অজস্র শৃঙ্গের ভেতর একটি শৃঙ্গ মাত্র। সমগ্র হিমালয়ে এভারেস্ট থেকেও দুর্গম ও শোভাময় অনেক চূড়া থাকলেও এভারেস্টের মহিমা- সে সকল শৃঙ্গের চাইতে উঁচ, পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু ।
'এভারেস্ট' গ্রন্থটি পর্বতারোহণ সম্পর্কে যাদের সম্যক কোন ধারণা নেই তাদের যেমন ভালো লাগবে, আবার পর্বতারোহণ ও এভারেস্ট বিষয়ে যারা ওয়াকিবহাল তাদের জন্যও এতে রয়েছে চিন্তার খোরাক। গ্রন্থটিতে ছয়জন অভিজ্ঞ পর্বতারোহীর সাথে পাঁচজন তরুণ পর্বতপ্রেমী এভারেস্টকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
পাহাড় পর্বতে চড়ার সংস্কৃতি বাংলাদেশে তেমন একটা ছিল না। ১০ বছর আগের কথাই চিন্তা করুন না। কয়জনের কাছে শুনেছেন কেউ শখের বশে বান্দরবানের পাহাড়ের গহীনে গিয়েছে? গত কয়েক বছরে ফেসবুকের কল্যাণে বাংলাদেশে ট্রাভেল জনপ্রিয় হয়েছে, আর তার হাত ধরে জনপ্রিয় হয়েছে পাহাড়। কারণ বাংলাদেশে ঘোরাঘুরির অঞ্চল বলতে পার্বত্য তিনটি জেলাই আছে প্রধানত।
পাহাড়ের প্রতি আগ্রহ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহীদের চোখ যাবে দেশ পেরিয়ে বাইরের দিকে। বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানো উঁচু উঁচু পর্বতের স্পর্ধা দেখে বিস্মিত হবে, আর সেই দুর্দমনীয় স্পর্ধা জয় করে নিজেকে শিখরে কল্পনা করে রোমাঞ্চিত হবে। আর সেই রোমাঞ্চের তালিকায় সবার উপরে আছে মাউন্ট এভারেস্ট। কারণ পৃথিবীর সকল পর্বতের মাঝে এ পর্বতই সবচেয়ে উঁচু।
এতটাই উঁচু যে একটা পর্যায়ে বাতাসের চাপ এতই কমে যায়, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ এতই ফুরিয়ে আসে যে স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস চলে না। বিকল্প অক্সিজেন সিলিন্ডার নিতে হয়। নইলে অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু ঘটে।
শুধু উচ্চতা দিয়েই শেষ নয়। আছে আরো চ্যালেঞ্জ। প্রতি মুহূর্তে উপর থেকে ধেয়ে আসে তুষার ঝড় (এভালাঞ্চ)। শত শত পর্বতারোহী মারা যায় তুষার ঝড়ের কারণে। আরো আছে মাইলের পর মাইল বরফের গ্লেসিয়ার। নিচু ভূমিতে দুটি পর্বতশ্রেণির মাঝে যেমন সকল পানি বহন করে নদী, তেমনই উঁচু ভূমিতে পর্বতশ্রেণির মাঝে সকল বরফ বহন করে গ্লেসিয়ার। খাড়া উঁচু হবার কারণে বরফগুলো মহাকর্ষের টানে প্রতিনিয়ত নিচে নেমে আসে।
বরফের চলার পথে সময়ে সময়ে ফাটল ধরে তৈরি করে বড় বড় খাদ বা ক্রেভাস। এগুলোর এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে যেতে কলিজাটা যেন হাতে নিয়ে যাওয়া লাগে। বরফের বড় বড় চাই যখন উপর থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ে, এর সাথে ইয়া বিশাল বিশাল পাথর খণ্ডের আছড়ে পড়ার কোনো পার্থক্য নেই।
এ ধরনের পর্বত মিশনগুলোতে থাকে পদে পদে মৃত্যুর ঝুঁকি আর শত সহস্র বাধার এক চ্যালেঞ্জ জয় করার এক হাতছানি। আর মানুষ মাত্রই চ্যালেঞ্জের পাগল। চ্যালেঞ্জ যত বড় সেটি জয়ের পর তৃপ্তি ও প্রাপ্তি তত বেশি। শুধুমাত্র পর্বতের উপরে উঠার কারণে একজন ব্যক্তি জনপ্রিয় হয়ে যায় তার পুরো দেশে। এ রকম চ্যালেঞ্জিং পর্বত জয় করা হয়ে যায় একটি জাতির জন্য জাতীয় অহংকার, একটি রাষ্ট্রের জন্য রাষ্ট্রীয় গর্ব।
আর এসব অর্জন, গর্ব, চ্যালেঞ্জ, রোমাঞ্চের সবার সেরা যেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু মাউন্ট এভারেস্ট। স্থানীয় নেপালিরা যাকে সাগর মাথা বলে আর তিব্বতীয়রা যাকে চুমোলুংমা বলে।
মূর্তিমান আশ্চর্য হয়ে শত পর্বতারোহীকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাউন্ট এভারেস্ট
বাংলায় পাহাড়-পর্বত নিয়ে লেখা বই তেমন একটা নেই। পশ্চিমবঙ্গে কম বেশ হয়তো কিছু আছে, কিন্তু তা খুবই অপ্রতুল। বাংলাদেশে তো একদম নেই বললেই চলে। তবে সম্প্রতি পাহাড় পর্বত জনপ্রিয় হচ্ছে। ট্রেকিংয়ের সাথে মাউন্টেনিয়ারিংও মানুষের মনে স্থান করে নিচ্ছে। পাহাড়মনস্ক কিছু মানুষের বিকাশ ঘটছে। তারই ধারাবাহিকতায় পাহাড় পর্বত নিয়ে বের হচ্ছে অল্প স্বল্প বই। এরকমই একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে 'এভারেস্ট' নামের এই বইটি। এটি প্রকাশ করেছে 'অদ্রি'।
পাহাড়-পর্বত নিয়ে বই তো এমনিতেই কম, তার উপর শুধু এভারেস্টকে কেন্দ্র করে আস্ত একটি বই তো একদম নেইই বলা যায়। সে হিসেবে এই বইটি যেন অনেকটা এক এবং একমাত্র বই। সে হিসেবে এটি এক অমূল্য রত্ন।
অনেকদিন ধরে পাহাড়-পর্বত নিয়ে মানসম্মত ও মূল্যবান কন্টেন্ট প্রকাশ করে যাচ্ছে অদ্রি । Audree প্লাটফর্ম। তাদের খুব সুন্দর ও সাজানো গোছানো ওয়েবসাইটে গেলে সেসব কনটেন্টের দেখা পাওয়া যাবে। সেসব কন্টেন্টেরই ধারাবাহিকতায় এসেছে এই বই। বইটা একটু ঘেঁটে দেখলে বোঝা যায় খুব আদর ও যত্নের ছাপ আছে এতে। ধন্যবাদ অদ্রি কর্তৃপক্ষকে এমন দরকারি একটি বই প্রকাশ করার জন্য। ধন্যবাদ কষ্ট করে করে এভারেস্ট নিয়ে নানা বিখ্যাত পর্বতারোহী ও এভারেস্টজয়ীদের কাছ থেকে প্রাসঙ্গিক লেখা সংগ্রহ ও সংকলনের জন্য। ধন্যবাদ বইটি প্রকাশে রুচিশীল ও যত্নবান হবার জন্য।
অদ্রি প্রকাশনের পেছনে যারা কাজ করছে তারা আরো দূর এগিয়ে যাক এই কামনা রইলো। পাহাড়-পর্বত নিয়ে আরো ভালো ভালো বই পাহাড়প্রেমীদের কাছে তুলে দেবেন এই কামনা রইলো।
পাহাড় পর্বত সম্পর্কে যারা আগ্রহী, তারা অবশ্যই এই বই পড়ে দেখবেন। #হ্যাপি_রিডিং
বই: এভারেস্ট- পাহাড় পর্বতের প্যাচাঁলী সম্পাদক: মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম প্রকাশনা: অদ্রি (২০২১-দ্বিতীয় সংস্করণ)(২০১৯-১ম সংস্করণ) রেটিং: ৪.০/৫.০
এভারেস্ট পর্বতারোহীদের অভিজ্ঞতা গুলির সমষ্টি হচ্ছে এই বইটি। এখানে বিভিন্ন দেশের পর্বতারোহীদের ভালো ও মন্দ অভিজ্ঞতার সাথে সাথে মাউন্ট এভারেস্ট এর একটি সামগ্ৰিক পরিচয় দেয়া হয়েছে এবং বলা যায় আমার খুব ভালো লাগার একটা বইতে পরিণত হয়েছে।
বইটি মূলত ১১জন পর্বতারোহীদের বিভিন্ন ধরনের এবং বিভিন্ন সময়ের এভারেস্ট আরোহণ এর কথা নিয়ে সাজানো। শুরুতেই পাবেন এভারেস্ট এর উচ্চতা, নামকরণ নিয়ে রাজনীতি ও বঞ্চনার গল্প। এরপর খুম্বু আইসফলের কাহিনী; কিভাবে শেরপারা এই মৃত্যু পুরীকে পর্বতারোহীদের জন্য নিরাপদ রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে নিরলস। আরো আছে মৃত্যু দুয়ার থেকে ফিরে আসাদের গল্প। ব্যর্থ অভিযাত্রীর অভিজ্ঞতা। শীতকালে এভারেস্ট আরোহণ এর মতো কঠিন কাজটি যারা করেছে সেই পোলিশদের কাহিনী।
সবশেষে রয়েছে যাদের এভারেস্ট নিয়ে আগ্ৰহ তাদের প্রথম উৎসাহ থাকে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্র্যাকিং, তার একটি বিশদ বর্ননা; তাও অভিজ্ঞতা টি স্বয়ং বাংলাদেশীর। সবগুলো গল্পের মধ্যে এটি আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। কারণ আমাদের গত দু'বছর আগে প্ল্যান ছিল যাওয়ার এবং এখনো আছে। আর সবচেয়ে দুর্দান্ত লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা হচ্ছে পোলিশদের শীতকালে এভারেস্ট আরোহণ এর অভিজ্ঞতা। ঐ গল্পের একটা সময়ে মনে হয়েছে মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণী; এতো প্রাণশক্তি পায় কিভাবে!!
যারা পর্বতারোহণ এর স্বপ্নে বিভোর বা যারা পর্বতারোহী হতে চেয়েছিলেন তারা মনে হয় বইটিতে অসাধারণ প্রাণরস খুঁজে পাবেন। #ধূসরকল্পনা
বাংলাদেশ থেকে এভারেষ্ট অভিযানে যারা গিয়েছেন বা যারা এই পথে পরিভ্রমন করছেন তাদের লেখার সংকলন এই বই। লেখকদের ভাষা ঝরঝরে। যারা এই পথে ট্রাভেল করতে চান তারা বইটি পড়লে উপকৃত হবেন।যারা ভ্রমন সাহিত্য পছন্দ করেন তাদের তো পড়তেই হবে। বইটিতে মোট এগারোটি লেখা রয়েছে। এসব লেখার সব যে ভ্রমন কেন্দ্রিক তা নয়। কয়েকটি লেখা আছে এভারেস্ট কেন্দ্রিক ইতিহাস নিয়ে। বাংলাদেশে এভারেস্ট জয়ী এম এ মুহিত ও নিশাত মজুমদারের লেখাও স্থান পেয়েছে এই বইতে।