পলাশীর যু'দ্ধ বাংলার ইতিহাসেরই একটি অংশ। এ গল্প বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার। এ গল্প বিশ্বাসঘাতক ঘসেটি বেগম ও মির জাফরের। কিন্তু এ গল্পেরই আরো একটি দিক রয়েছে। ইতিহাসের বইয়ে বরাবরই যু'দ্ধের ঘটনাগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু এর আরেক পিঠে যে খানিকটা প্রেম, ভালোবাসা ও সহমর্মিতাও থেকে যায়, তা কারো চোখেই পড়ে না। ‘আমি সিরাজের বেগম’ বইটিতে ঠিক সেদিকটিই ফুটে উঠেছে। এখানে উত্তম পুরুষের ভূমিকায় রয়েছেন বাংলার স্বাধীন নবাবের দুঃসময়ের পরম আকাঙ্ক্ষিত স্ত্রী। যে কিনা একসময় প্রাসাদের জারিয়া বা দাসী ছিল। পরবর্তীতে সিরাজউদ্দৌলা ভালোবেসে তার নাম রাখেন লুৎফা।
অতীত মানেই এক খন্ড ইতিহাস। আজ এই বর্তমান সময় তৈরির পেছনে যত গল্প রয়েছে, সবই ইতিহাস হয়ে গিয়েছে সময়ের পরিক্রমায়। ইতিহাস কখনো আনন্দের, কখনো বা অজস্র কষ্টের। একসময় ইতিহাস বই পড়ে পলাশীর যু'দ্ধ সম্পর্কে বেশ ভালোই জানতে পেরেছিলাম। সে সময় ঘসেটি বেগম ও মির জাফরকে সামনে পেলে হয়তো তাদের টুঁটি চেপে ধরতেও দ্বিধা করতাম না। তবে ইতিহাসের সেই বই পড়ে পলাশীর যু'দ্ধ সম্পর্কে যেমন সম্যক ধারণা না পেলেও কিছুটা অবগত হয়েছি, এই বইটি পড়েও একই ইতিহাসের ভিন্ন আরেকটা দিক সম্পর্কে জানতে পারলাম। এতে দুইয়ে দুইয়ে চার করতে খুব বেশি কষ্ট হয়নি অবশ্য।
নবাব আলিবর্দি খাঁর শাসনামলে লুৎফা শুধুই ছিলেন এক দাসী-বাঁদী। যে কিনা সবার হুকুম তালিম করতেই সদাপ্রস্তুত। সেসময় লুৎফা তার মা কিংবা বাবা সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখতেন না। শয়নেস্বপনে একটি দুঃস্বপ্নই ছিল তার শেষ ভরসা। তবুও কিভাবে কিভাবে যেন তিনি বাংলার বেগমসায়েবার প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়ে গেলেন। সবার জন্য যেটা কঠোর শাস্তি, লুৎফার জন্য সেটা ক্ষমা। লুৎফা নিজেও বাংলার নবাব ও তার বেগমকে অসীম শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত তিনি নিজের ভবিতব্য সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। জানতেন না, একটি মাত্র সাক্ষাৎই তার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে চলেছে।
ঘসেটি বেগমের চরিত্র কখনই ধুঁয়া তুলসি পাতা ছিল না। উগ্র মেজাজী, চারিত্রিক খর্বতা, লোভী, বিশ্বাসঘাতক সবরকমের তকমাই তার সাথে যায়। এই সেই মহিলা, যে কিনা একজন সহজ, সরল, নির্বিবাদী লোককে বিয়ে করেও সিংহাসনের লোভে দিনের পর দিন অন্য লোকদের নিজের কাছে ঘেঁষতে দিয়েছেন। নিজেকে দ্রব্যসামগ্রীতে পরিণত করে ফেলেছিলেন যথারীতি। সিংহাসনের লোভে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রমহিলা। নবাবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও দ্বিধাবোধ করেননি তিনি। যদিও পরবর্তীতে নবাবের পথ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এতো বছরে যে বীজ তিনি রোপণ করে গিয়েছেন, তা থেকে গাছ হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে পলাশীর যু'দ্ধে রূপ নিয়েছে ইতোমধ্যেই। আর পরাজয় ঘটিয়েছে বাংলার শেষ নবাবের।
অপরিচিত কখনো শ'ত্রু হয় না। শ'ত্রু সবসময় নিজের খুব কাছের লোকেরাই হয়। সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হয় তারা। আর চিরদিনের মতন পঙ্গু করে দিয়ে যায় অপর পাশের মানুষটিকে। নবাব তার শাসনামলে পদে পদে বিপদে পড়েছেন। অপদস্ত হয়েছেন অহরহ। একসময় গিয়ে হতাশায় নিমজ্জিতও হয়েছেন। যার কারণ ছিল তার পরিচিত পরিবেশ, পরিস্থিতির ভোলবদল। নিজের প্রিয় মানুষদেরকে প্রতিনিয়ত বদলে যেতে দেখে শক্ত-সামর্থ্য নবাবেরও হৃদয় ভেঙেছিল। গদি ছেড়ে দিয়ে একটু শান্তিতে বাঁচতে ইচ্ছে করেছিল। একসময় তো স্ত্রীকে বলেও ফেললেন, ‘যদি আমি কৃষক হতাম, তুমি হতে কৃষক পত্নী। আমাদের ছোট্ট একটা সংসার হতো।’ কিন্তু তা আর হলো না। নবাব হওয়া যেইসেই কথা নয়। এখানে পরাজয় মানেই মৃ'ত্যু। আর বেঁচে থাকা মানে মৃ'ত্যুই শ্রেয়।
‘আমি সিরাজের বেগম’ বইটিতে নবাব আলিবর্দি খাঁর প্রতাপ, তার বেগমের কঠোরতা ও দৃঢ়তা, তাদের দুজনের মধ্যকার আন্তরিকতা, ঘসেটি বেগমের নিকৃষ্টতা ও কোমলতা, তার লোভ ও সেই লোভের আগুনের ধুপ করেই নিভে যাওয়া, ঘসেটি বেগম ও তার বোন আমেনা বিবির (সিরাজউদ্দৌলার মা) চরিত্রহীনতাসহ বহু বহু অজানা তথ্য জানা যায়। তবে যেটা না বললেই নয়। এখানে আমরা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার এক অন্য রূপ দেখতে পাবো। যেমনটা আমি আগে ভাবতাম। লুৎফাই নবাবের একমাত্র স্ত্রী। এটা যেমন সত্যি নয়, তেমনই শুদ্ধ নয় লুৎফার সিরাজের স্ত্রী হিসেবে পদার্পণ করার পদ্ধতি। যদিওবা এক্ষেত্রে সিরাজের ভূমিকাও কম নয়। লুৎফাকে যেমন সিরাজের অন্য বিবিরা মুখ বুঁজে মেনে নিয়েছে, লুৎফারও তো তেমনই অন্য কাউকে মেনে নেওয়া উচিত, তাই না? আচ্ছা, নবাব হতে হলে কি একাধিক বেগম থাকাটা খুব জরুরি? তাহলে নবাব আলিবর্দি খাঁ কেন মৃ'ত্যুশয্যায়ও নিজের একমাত্র স্ত্রীকে স্বান্তনার বাণী শোনাতে শোনাতে মৃ'ত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন? জটিল প্রশ্ন!
এই বইটার ইতিহাস কতটা সত্য বা মিথ্যা, তা জানা নেই। তবে মোদ্দাকথা হলো, বইটা পড়ে ভালোলাগা কাজ করছে আমার । অনেকদিন পর মেদহীন একটা লেখা পড়লাম। সবার হয়তো বইটা ভালো লাগবে না। কেননা এখানে যু’দ্ধের পদ্ধতি দেখানো হয়নি, যু'দ্ধক্ষেত্র দেখানো হয়নি, দেখানো হয়নি শত্রুদের গোপন মিটিংয়ের অংশবিশেষও। কেবল দেখানো হয়েছে লুৎফার চোখে তার নবাব, নবাবের রাজত্ব, ক্ষনিকের বিচ্ছেদ, খানিকটা ষ'ড়য'ন্ত্র ও সবশেষে ইতিহাসের সমাপ্তি। আমার ধারণা, এই বইটা পড়তে হলে আগে পলাশীর যু'দ্ধ ও সিরাজউদ্দৌলার নবাব হওয়ার ইতিহাস ক��ছুটা হলেও জানা জরুরি। কারণ, এই গল্প কেবল লুৎফার নজর অবধিই সীমাবদ্ধ। পলাশীর য'দ্ধ, সেই যু'দ্ধের মাঠ, ঘসেটির হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ, শ'ত্রুদের একটু একটু করে বেড়ে ওঠা কিছুই দেখানো হইনি এখানে। কেবল যু'দ্ধ করা, বিজয়ী হওয়া বা জয়ী হওয়া এতোটুকুই উল্লেখ করে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই আমি সাজেস্ট করবো পলাশীর যু'দ্ধ সম্পর্কে হালকা পাতলা ধারণা নিয়ে গল্পের আদলে এই বইটিকে উপভোগ করুন। তাহলে হয়তো এর রস খুব ভালো করে আস্বাদন করতে পারবেন।
বই- আমি সিরাজের বেগম
লেখক- শ্রী পারাবত
পৃষ্ঠা সংখ্যা- ২০০
মুদ্রিত মূল্য- ৩০০ টাকা