জিন, শয়তান—এই দুটো বিষয় নিয়ে আমাদের আগ্রহ আর ফ্যান্টাসির অন্ত নেই। জিন-ভূতের কাহিনী শুনে ভয়ে তটস্থ হয়নি—এমন মানুষ মেলা ভার। সময় পাল্টেছে, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির জয়জয়কার চারিদিকে। তাই আমাদের মাঝেই একটি প্রজন্ম তৈরি হয়ে গেছে, যারা জিন-শয়তানের জগতটাকে হলিউডের ফ্যান্টাসি ছাড়া কিছু মনে করে না, কিংবা সহজভাবে বললে বিশ্বাস করে না। অনেকে আবার দোটানায় ভোগে। জিন! তারা কি মানুষ না ফেরেশতা? জিন আর শয়তান কি একই? তারা কোথায় থাকে? কী খায়? তাদের কী কী ক্ষমতা আছে? তারা কি মানুষের ওপর আছর করতে পারে? ইত্যাদি প্রশ্ন কাজ করে।জিন, শয়তান সম্পর্কিত যাবতীয় সংশয়, সন্দেহ, নানা প্যারানরমাল একটিভিটির সাথে জিনের সম্পর্ক, জিনের ক্ষমতা, দুর্বলতা, বাঁচার উপায়, সর্বোপরি ইসলামি আকিদাহর মানদণ্ডে জিন-শয়তান জাতির আদ্যপ্যান্ত নিয়ে এক অতুলনীয় বই বলা চলে শাইখ ড. উমার সুলায়মান আল আশকার (রহঃ) রচিত এই বইটিকে।
পৃথিবীতে একটি মানুষও নেই, কিলবিল করছে জীনের রাজত্ব। হানাহানি, মারামারি, রক্তপাত। প্রথম মানুষ আদম (আঃ) সৃষ্টি হল, ইবলিস প্রাণহীন আদম (আঃ) দেহ দেখে বেজায় কৌতূহল, কি এই সৃষ্টি? কেন তাকে সৃষ্টি করা হচ্ছে...? আর এই ইবলিস জীনেদের একজন।
জীন সৃষ্টির বহুকাল পরের কথা মানুষের অনেক প্রজন্ম গত হয়ে গেছে এমন কোন এক দিনে আকাশের বিভিন্ন স্থানে যেখানে জীনদের প্রবেশাধিকার ছিল বন্ধ হয়ে গেল। জীন জাতিরা হতবাক হয়ে গেল, এমনতো হয়নি আগে! কি এমন ঘটছে মহাবিশ্বে?
বহুকাল মুসা (আঃ) এর জুগ শেষ হয়েছে । নবী (সাল্লেল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর নবুওয়তের কোন এক রাতে জীনদের একটি দল নবী (সাল্লেল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) কে নিয়ে সাহাবী (রাঃ) দের থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। দলটি নবী (সাল্লেল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর মুখে কুরআন শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
উবাই বিন কা'ব (রাঃ) এর খেজুর বাগান থেকে খেজুর উধাও হয়ে যাচ্ছিল। এক রাতে পাহারায় বসে তিনি দেখতে পেলেন তাকে। তার হাত ছিল কুকুরের পায়ের মত, শরীরও কুকুরের লোমের মত ঢাকা। তিনি প্রশ্ন করলেন 'জীনের সৃষ্টিগত আকৃতি কি এটটাই?...তোমাদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায় কি?' একবার ভাবুন এ অবস্থায় আপনি পরলে কি করতেন?
জীনদের শ্রেনী বিভাগ রয়েছে, রয়েছে স্বভাবগত পার্থক্য, থাকার স্থান এমন কি খাদ্য এবং তাদের প্রানী পর্যন্ত। কি খায় এরা?
আবু হুরাইরা (রাঃ) আয়াতুল কুরসি শিখলেন জীন শয়তানের কাছে? কি ভাবে? জীনেরা মানুষের প্রেমে পরে, শত্রুতাও গড়ে, উপকারও করে, ঈমান নষ্ট করে কাফের বানিয়েও ছাড়ে। কখন, কেন, কি ভাবে?
কত ভাবে জীন আপনার সাথে থাকতে পারে বা পিছু লাগতে পারে? অনেক ভাবে, কখনও পানির পাত্র থেকে, কখনও টয়লেট রুম থেকে, কখনও খোলা কপাট পেলে, কখনও খাবার খাওয়ার ফাঁকে, কখনও নামাজ অবস্থায়, শ্মশান-গোরস্থান থেকে শুরু করে গনক/জাদুমন্ত্রকারীর হাতে এবং আরও হরেক রকম অবস্থা থেকে।
কি ভাবে নিরাপত্তা জীনদের থেকে? সমাধান কিন্তু রয়েছে বইতে। কিছু সমাধান কিন্তু সঙ্গে ঈমানও নষ্ট করে, কিছু আবার আল্লাহর সন্তুষ্টি সহ কাজ করে।
জীন নিয়ে আরও অসংখ্য অজানাকে জানতে চোখ রাখুন এ বইতে।
ওয়াল্লাহি, এই অদৃশ্য জগৎ নিয়ে পড়া আমার সেরা বই এইটা। স্রেফ জিন ও শয়তানের জগৎ নিয়ে আলোচনাই করা হয়নি, আমাদেরকে আমাদের করণীয় সম্বন্ধেও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বইটাতে পয়েন্ট ধরে ধরে আলোচনা করা হয়েছে শয়তানের একেকটা কার্যক্রম এবং তা কীভাবে আমাদেরকে আক্রান্ত করে সেসব।
শয়তানকে সৃষ্টি করা কেন প্রয়োজন ছিলো এবং তা কতটা হেকমতপূর্ণ তাও বুঝা গেছে এই বইটাতে। একটা অবশ্যপাঠ্য বই বিশ্বাসীদের জন্য। এই বইটাকে আত্মোন্নয়নমূলক বই বললেও ভুল বলা হবেনা৷ কারণ, এটা আত্মার ভ্রান্তি এবং ব্যাধি সারাতে ভালো সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।
জীবনের একটি অধ্যায় আছে, যার নাম অন্ধকার দেয়া যায়। এই অন্ধকার হতে পারে বন জঙ্গলের, বিশ্বাসের বা কুসংস্কারের, ভয় ভীতির। এর থেকে আমরা সবসময় রক্ষা পেতে চাই। কেউবা নিজেকে নিক্ষেপ করে তার গহীনে।
আমরা এখন যে সন্ধিক্ষণে আছি তা ফেতনার কোন স্টেজ বলতে পারি? আমার বোধহয় ফাইনাল স্টেজের আগের স্টেজে আছি। এই স্টেজের যে ফেতনা আমাকে ঘিরে ধরছে তা আমরা খুব অল্পই আচঁ করতে পারছি! কারণ আমরা জানি না ফেতনা কেমন কেমন হতে পারে। যে ফেতনার কলকাঠি নাড়াচ্ছে তার গতিপথ আমাদের জ্ঞানের বাইরে। সেই ফেতনা থেকে নিজেকে, পরিবারকে, নিজের বন্ধুবান্ধবকে, আত্মীয়স্বজনকে রক্ষা করতে হলে; প্রথম প্রয়োজন তার সম্পর্কে জানা। সে কে? কী তার পরিচয়, তার সক্ষমতা, তার গতি, এবং সে কী চায় ও কীভাবে আগায়।
উপরের দুইটা প্যারার সাথে জিন এবং শয়তানের ভালো সম্পর্ক। এই দুইটি জাতি নিয়ে আমাদের মাঝে নানা জানা অজানা কুসংস্কার বা সত্য ঘটনা রয়েছে। কেউ নিয়ে থাকে মিথ হিসেবে কেউ বা গল্প কাহিনি হিসেবে কেউবা ভয় ভীতি। এই নিয়ে হলিউডে - বলিউডে নানা সিনেমা, নাটক, হরর মুভি, টিভি সিরিজ তৈরী হচ্ছে। লেখা হচ্ছে নানা আঙ্গিকে বই। এই সব আমাদের মন মস্তিষ্কে নানা ভাবে নানা দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে আমরা ভুল তথ্য পেয়ে যাচ্ছি।
মুসলিম হিসেবে বিশ্বাসে একটি অংশ ভুল দিকে নিচ্ছে। যার ফলে ইসলামের গণ্ডি থেকে কেউ কেউ বের হয়ে যাচ্ছে। এই ফেতনার জগৎ থেকে বাচার জন্য সবচেয়ে বেশি জানা দরকার পড়ে শয়তান ও তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপার ব্যাপকভাবে জানা। তার মূল উদ্দেশ্য, কীভাবে আমাদের শিরায় শিরায় তার গতি পথ থাকে।
এই ফেতনা এবং কুসংস্কার থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য জিন ও শয়তানের জগৎ সম্পর্কে জানা দরকার। জিন ও শয়তান ইসলামের মৌলিক আকিদার অংশ, যা ভুল বিশ্বাসে ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতে পারে যে কেউ। তাই এই সম্পর্কের ইসলামে যতটুকু জানা প্রয়োজন তা জানা দরকার। শাইখ ড. উমার সুলায়মান আল আশকার এর লেখা "জিন ও শয়তানের জগৎ" বইটি পড়ে অনেক ভুল-কুসংস্কার দূর হয়ে যাবে। এই বইটি আমি খুব প্রয়োজনীয় মনে করি প্রত্যেকে পড়ার জন্য।
বইটি সীরাত পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত। ২২২ পৃষ্ঠার বই।
এক কথায় বইটা অসাধারণ, সব থেকে ভালো লেগেছে অযথা কথা না বাড়িয়ে Points ধরে ধরে আলোচনা করার বিষয়টা। জ্বীন জাতি সম্পর্কে যতোটা জানতাম তা হয়তো অল্পস্বল্প তবে এই বইয়ের চেষ্টায় অনেকটা জানতে পারলাম। মুসলিমদের দিকনির্দেশনার জন্যেও চমৎকার লেগেছে বইটা, বইটা পছন্দের তালিকায় রয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ।