ছোটোবেলায় শেখা বহু বিদেশি প্রবাদের অধিকাংশই আজ ভুলে গেছি। তবে তাদের একটা মনে পড়ে গেল আলোচ্য বইটি পড়তে গিয়ে। সেটি কী বলুন তো? ‘ফিজিশিয়ান, হিল দাইসেলফ!’ পদার্থবিজ্ঞানী পলাশ বরণ পাল দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষার উচ্চারণ, বানান ও লিখন নিয়ে লেখালেখি করছেন। তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধের সংকলন এই বইটি পড়তে গিয়ে আমার বারবার চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের বক্তৃতাগুলোর কথা মনে পড়ছিল – যাতে চিৎকার থাকে, চমৎকার থাকে না। কেন? তাহলে আগে লিখি এই বইয়ে কী-কী আছে। ভূমিকা, প্রকাশতথ্য, ইনডেক্স বাদে এই বইয়ে আছে নিম্নলিখিত প্রবন্ধগুলো~ 1. বাংলা কথা বনাম বাংলা লেখা 2. বাংলা ভাষার ধ্বনি-প্রবণতা 3. চন্দ্রবিন্দু 4. ও বনাম ও 5. কি বনাম কী 6. তৎসম শব্দের বানান 7. ভাষাশিক্ষণ ও প্রযুক্তি 8. পরশুরামের পরিভাষাচিন্তা 9. হ্রস্ব-দীর্ঘ 10. শব্দের কারিগর রবীন্দ্রনাথ লেখাগুলোতে ভাবনার খোরাক আছে বিস্তর। কিন্তু এগুলো পড়তে গিয়ে মাথা গরম হল যে-সব কারণে তারা হল: - এই বইয়ের নানা প্রবন্ধে লেখক নিজস্ব ফন্ট ব্যবহার করেছেন, যাতে ‘এ’ আর ‘অ্যা’ উচ্চারণের পার্থক্য বোঝানোর মতো করে শব্দগুলো লেখা যায়। বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত বইয়ের ক্ষেত্রে এটা বোঝানোর একটা স্বীকৃত রীতি আছে। লেখক অবশ্য যে রীতিটি ব্যবহার করেছেন তা পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি অনেক আলোচনার পরেও গ্রহণ করতে পারেনি (মৌলিক বাংলা স্বরবর্ণ হিসেবে এ এবং তার সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ে লিখে তার মাঝখান দিয়ে দাগ টেনে দেওয়া)। কিন্তু তাঁর আবিষ্কৃত এই ফন্টের মতো কুদর্শন জিনিস আমি বাংলা বইয়ে কমই দেখেছি। - তৎসম থেকে তদ্ভব, দেশি থেকে বিদেশি যাবতীয় শব্দেরই নিজস্ব বানান তৈরি করে এই প্রবন্ধগুলোয় যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন লেখক। কখনও উচ্চারণানুগ বানানের খাতিরে লিখেছেন ‘বদোল’, ‘শাদা’; আবার দীর্ঘ ঈ-র উচ্চারণ না থাকা সত্বেও লিখেছেন ‘হিন্দী’, ‘সরকারী’। এমনকি তৎসম শব্দের ক্ষেত্রেও লেখক নিজস্ব বানানে ‘ইদানিং’ লিখেছেন। আবার কোনো বানানরীতিতে ‘করবো, হলো’ জাতীয় বানান অনুমোদিত না হওয়া সত্বেও লেখক গা-জোয়ারি ভঙ্গিতে শুধু তাদের পক্ষে সওয়ালই করেননি, বরং গোটা বইয়ে ওই বানানই ব্যবহার করেছেন! - কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনন্দবাজার, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে সংসদ – সবার মুণ্ডপাত করেছেন লেখক বানানের নানা রীতি নিয়ে। কিন্তু এই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায়, সরাসরি পাণ্ডুলিপি থেকে বই হওয়া লেখায় এবং আরও নানা মাধ্যমে বানানের ক্ষেত্রে একটা ভয়াবহ নৈরাজ্য চলছে। এই পরিস্থিতিতে “কেন অমুক বানান মান্যতা পেল আর কেন তমুক পেল না?” – এই বলে না চেঁচিয়ে যেকোনো একটা রীতিকে প্রমিত বলে ধরে নেওয়াই যৌক্তিক। রবীন্দ্রনাথ ঠিক এইজন্যই দেবপ্রসাদ ঘোষের সঙ্গে একটা স্তরের পর আর আলোচনা চালাননি। সংসদ এবং/অথবা আকাদেমি-র বানানরীতি সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত মেনে প্রণীত। সেটা কীভাবে আরও বেশি করে প্রয়োগ করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনার বদলে শৌখিন তত্ত্বালাপ আমাকে বেশ হতাশ করল। - পরিভাষা উদ্ভাবনের প্রসঙ্গে রাজশেখর বসু তো বটেই, রবীন্দ্রনাথেরও বেশ কিছু প্রয়াস তথা উদ্ভাবন লেখকের লাল কার্ড দেখেছে। কিন্তু বিকল্প হিসেবে এই সময়ে, যখন ইন্টারনেটের সুবাদে দৈনন্দিন জীবনে ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ ও প্রভাব দুইই ঊর্ধ্বগামী, তখন পরিভাষার ব্যাপারটা কীভাবে সামলানো যায় এই প্রসঙ্গে লেখক নীরব। দুঃখের বিষয়, এমন আরও নানা কারণে, বিশেষত প্রাবন্ধিকের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যবহারিক প্রয়োগের দিকটি ভয়ানক অনাদৃত থাকায় প্রবন্ধগুলো শখের ভাষাচর্চা হয়েই থেকে গেল। ভাষার সরলীকরণের জন্যও তিনি যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছেন, সেগুলো ইতিমধ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্য স্তরে চর্চিত ও বর্জিত। বরং, পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে অভ্র ও রিদমিক-এ কীভাবে মৌলিক স্বরবর্ণ 'অ্যা' সহজে লেখা যায়, বা z উচ্চারণ (আরবি ও রাশিয়ান/পূর্ব ইউরোপীয় শব্দে যা অহরহ আসে)-এর জন্য জ় লেখা সহজসাধ্য করা যায় সেটা নিয়ে কিছু সুচিন্তিত ইনপুট দিলে কৃতজ্ঞ হতাম। আপাতত এই প্রবন্ধগুলো পড়ে একটাও কাজের জিনিস শিখলাম না! এবার পড়া বা না-পড়ার সিদ্ধান্ত আপনার।