এই কৌতূহলোদ্দীপক বইটি গড়ে উঠেছে ছ'টি প্রবন্ধ নিয়ে। তাদের বাছাও হয়েছিল নামের মধ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলোর ভিত্তিতে। এই প্রবন্ধরা হল: ১] সবার জন্য *এক* বানান? এই প্রবন্ধটি পড়ে আমার সব ঘেঁটে গেল। যা বুঝলাম তা হল, আলাদা-আলাদা মানুষের কথা বলার ভঙ্গিকে যথাযথভাবে এবং সততার সঙ্গে সাহিত্যে স্থান দিতে গেলে বানানরীতির ব্যাপারে নমনীয়তা প্রয়োজন। কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝলাম না, বানানরীতি এক রেখে আলাদা-আলাদা উচ্চারণ বোঝালে কী ক্ষতি হয়! ২] *দুই* লিপির সংঘাত, যাতে আছে নিম্নলিখিত অধ্যায়মালা~ - লিপির রকমফের - সংঘাতের পটভূমি - একটি বর্ণমালার ব্যবচ্ছেদ - একই বর্ণের অনেক কাজ - রোমক লিপির বিশ্বযাত্রা - রোমক লিপিতে ভারতীয় নাম - বাংলা লিপি থেকে রোমক লিপিতে - অন্যান্য লিপি থেকে বাংলা লিপিতে - যথেচ্ছাচার - শেষের কথা সাম-আপ করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক আবার সব ঘেঁটে দিয়েছেন। ইংরেজি যে লাতিন ও জার্মানিক ভাষাগোষ্ঠীর যুদ্ধক্ষেত্র হয়েও একটিই লিপি দিয়ে কাজ চালাচ্ছে, তা জানতে পারলাম ঠিকই। কিন্তু সুনীতিকুমারের বক্তব্য অনুযায়ী রোমানাইজেশন করে বাংলা লেখার সুবিধে ও অসুবিধেগুলো সরল ও আধুনিক দৃষ্টিতে না বলে প্রাবন্ধিক যে ঠিক কী বলতে চাইলেন, সেটা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। ৩] বাংলা পরিভাষার *তিন* দিগন্ত, যাতে আলোচনা হয়েছে নিম্নোল্লিখিত শীর্ষকে~ - প্রথম দিগন্ত: সংস্কৃত - দ্বিতীয় দিগন্ত: ইংরেজি - তৃতীয় দিগন্ত: হিন্দি - পাঁউরুটি আর ঝোলা গুড়? এই প্রবন্ধটা অত্যন্ত মূল্যবান, কিন্তু, ইংরেজি ধার নিয়ে বলতে হয়, 'সিভিয়ারলি ডেটেড'। আজ পরিভাষা তৈরি হয়ে পরীক্ষিত, বাতিল বা গৃহীত হওয়ার আসল জায়গা হল সোশ্যাল মিডিয়া। রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রবণতাকে একটা সময় সরলীকরণ বলে চালানোর চেষ্টা হলেও সেটা কিন্তু 'মুরাদ টাকলা' অপবাদ কুড়িয়ে ইদানীং খোরাক হয়ে উঠেছে। সেভাবেই পরিভাষার ক্ষেত্রে তৎসম বা অন্য শব্দের বদলে মূল শব্দটিকেই যথাসাধ্য মূলানুগ বানানে লেখার চেষ্টা বরং স্বীকৃতি পাচ্ছে। এই বিতর্কে শেষ কথা সময়ই বলবে। ৪] বাংলা বানানের *চার* যুগ - সংস্কারের আগেকার বানান - মিশনারীদের বানান সংস্কার - রবীন্দ্রনাথের যুগ - প্রকাশক ও আকাদেমির যুগ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত 'বানান বিতর্ক' নামক মহামূল্যবান বইটি পড়লে বোঝা যায়, বাংলা বানান নিয়ে যে পরিমাণ লাঠালাঠি হয়েছে তা প্রায় অচিন্তনীয়। অথচ এত কিছুর পরেও সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই কাপড় পড়া আর বই পরার ব্যাপারটা চোখে ক্যাটক্যাট করে ওঠে। এই প্রবন্ধেও বিস্তর কথা খরচা করে শেষ অবধি কোনো একটি বিধিকে মান্য বলে স্বীকার করা হয়নি, বরং সবার বাপান্ত করা হয়েছে। লেখক নিজেও একটি অদ্ভুত বানানরীতি অনুসরণ করেছেন, যার ফলে প্রবন্ধটি পড়া মাঝেমাঝেই পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। ৫] বাংলা হরফের *পাঁচ* পর্ব - প্রথম পর্ব: ছাপাখানা আসার আগে - দ্বিতীয় পর্ব: প্রথম পঞ্চাশ বছরের ছাপা - তৃতীয় পর্ব: বিদ্যাসাগরী আমল - চতুর্থ পর্ব: লাইনো ছাপা - পঞ্চম পর্ব: কম্পিউটারে ছাপা এই প্রবন্ধটা সলিড। ঠিক কেন ও কীভাবে বাংলা হরফ আজকের চেনাজানা আকার পেল, কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই হরফ ও মুদ্রণ শিল্প এগিয়ে চলেছে - এগুলো দারুণভাবে ধরা পড়েছে এতে। বাংলা লিপি সংস্কারের প্রক্রিয়াটি (বিশেষত মৌলিক স্বরবর্ণ হিসেবে 'অ্যা'-কে কীভাবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়), Z উচ্চারণ বোঝানোর জন্য 'জ'-এর নীচে নুকতা ইউনিকোডেও কীভাবে প্রয়োগ করা যায় - এই ধরনের আলোচনা পেলে আরও খুশি হতাম। ৬] *ছয়* সন্ন্যাসীর গাজন: গোলোকধামের অন্য রহস্য এই প্রবন্ধটি ফেলুদা'র রহস্য কাহিনি 'গোলোকধাম রহস্য'-র তিনটি পৃথক সংস্করণে, এমনকি একই সংস্করণের আলাদা জায়গায় আলাদা বানানের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা। আমার মতে, এটা আনন্দ-র টিপিক্যাল গদাইলশকরি সম্পাদনা চিহ্ন ছাড়া কিছুই নয়। এই নিয়ে একটা আস্ত প্রবন্ধ... যাইহোক, আপনি যদি বাংলা ভাষার বানান ও মুদ্রণ বিষয়ে আগ্রহী হন, তাহলে এই বইটি অবশ্যই পড়ুন। লেখকের বিটকেল বানান ও যাচ্ছেতাই ফন্ট চোখের পক্ষে পীড়াদায়ক। কিন্তু কন্টেন্টের দিক দিয়ে বইটিতে মালমশলা আছে বিস্তর।