দেব্রীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (English: Debiprasad Chattopadhyaya) ভারতের কলকাতায় ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী দার্শনিক। তিনি প্রাচীন ভারতের দর্শনের বস্তুবাদকে উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁর লেখাগুলো একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়। এছাড়াও তিনি প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পদ্ধতি সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
এই বইয়ের পর্যালোচনার একেবারে গোড়াতেই যেটা বলে নেওয়া ভালো তা হল লেখক এখানে প্রকৃতই ভাববাদী দর্শনের "খণ্ডন" বলতে যা বোঝায় তা করেননি । বরং ভাববাদ দর্শন কীভাবে নির্মূল হওয়া সম্ভব তার নির্দেশ দিয়েছেন বলা শ্রেয় । কারণ একেবারে শুরুতেই লেখক এক চরম দাবি করেছেন যেটা হল ভাববাদকে তর্ক-যুক্তি-বিশ্লেষণ দিয়ে কখনই সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করা সম্ভব নয় । এমন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য । কিন্তু কেন? কারণ যুক্তি-তর্ক মানেই বুদ্ধির দাবি, চেতনার দাবি । আর ভাববাদমাত্রেই যেহেতু চেতনার দাবিকে পরম বলে স্বীকার করে, সেহেতু চেতনার দাবি দিয়ে ভাববাদকে পরাস্ত করা কিছুতেই সম্ভব নয় । সে কারণেই দর্শনের ইতিহাসে বারংবার লক্ষিত হয় ভাববাদকে খণ্ডন করবার এলাহি আয়োজনের পরেও শেষ অবধি ভাববাদের কাছেই আত্মসমর্পণ । উদাহরণ হিসেবে লেখক উল্লেখ করেছেন শঙ্করাচার্য (যিনি যোগাচার বিজ্ঞানবাদকে খণ্ডন করার উদ্দেশ্যে বই লেখেন), কান্ট, মুর, বার্ট্রান্ড রাসেল, ইত্যাদি স্বনামধন্য দার্শনিকদের যারা ভাববাদকে নস্যাৎ করে বস্তুবাদ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগ নিলেও শেষমেশ নিজেরাই ভাববাদে উপনীত হয়েছেন ।
কিন্তু যুক্তি-তর্ক দিয়েই যদি ভাববাদকে খণ্ডন না করা যেতে পারে তবে কীভাবে আর খণ্ডন সম্ভব? লেখক বলেছেন, সমাজ-বিকাশের ইতিহাসের দিকে তাকালে । নির্দিষ্টভাবে বললে, আদিম মানুষের নিঃশ্রেণীক সাম্য-সমাজ থেকে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের আবির্ভাবের দিকে তাকালে । দেবীপ্রসাদের মার্কসীয় বিশ্লেষণে সমাজে শ্রেণীবিভাগের কারণেই ভাববাদ দর্শনের জন্ম । কীরকম শ্রেণীবিভাগ? জ্ঞান ও কর্মের শ্রেণীবিভাগ । মাথা খাটানো ও গতর খাটানো মানুষের শ্রেণীবিভাগ । কিংবা - মার্কসবাদে যা একই কথা - শাসক তথা শোষক ও শোষিত মানুষের শ্রেণীবিভাগ । শোষিত জনগণকে নিয়ন্ত্রণের রাখতে শাসক শ্রেণী সৃষ্টি করেছে দেব-দেবীর ধর্ম, আর এই ধর্মের পরিশোধিত রূপ হল ভাববাদ দর্শন । অতএব ভাববাদকে প্রকৃত অর্থেই নির্মূল করতে হলে উচ্ছেদ করতে হবে শ্রেণীসমাজকে । পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে সাম্যাবস্থার, যেখানে মানুষ আবার সমবেত জীবন ফিরে পাবে; দূর হবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের অসহায়তাবোধ, যার ফলে লোপ পাবে ধর্মের উপর নির্ভরতা । আর অবশ্যই এর জন্য প্রয়োজন এক গণ-বিপ্লবের ।
দেবীপ্রসাদের বিশ্লেষণ চিন্তা-উদ্রেককারী এবং আকর্ষণীয়ও বলা চলে । কিন্তু ওনার পান্ডিত্য স্বীকার করে নিয়েও বলতে হয় নিতান্তই মনে-প্রাণে মার্কসবাদী না হলে এমন বিশ্লেষণকে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করায় একটু বাধা থেকে যায় । বা আমার ক্ষেত্রে রয়ে গিয়েছে ।
প্রথমত- ভাববাদ দর্শনের খণ্ডন কেন এতো জরুরি, তার একমাত্র কারণ হিসেবে বইতে যা পাওয়া যায় তা হল এটা সাধারণ মানুষের উপর শাসক শ্রেণীর চাপিয়ে দেওয়া দর্শন যা মূলত শোষিত মানুষকে আয়ত্তে রাখার একটা কৌশল । যে কারণে বস্তুবাদের প্রতিষ্ঠাতেই মানুষের একমাত্র মুক্তি সম্ভব কারণ বস্তুবাদই মানুষকে জয় করতে শেখায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে - জয় করতে প্রকৃতিকে, নিজের বিপর্যয়কে । ধর্মীয় ভাববাদ সেখানে কেবল মানুষকে শেখায় নিজের পরিস্থিতিকে মেনে নিতে, তাঁর বিপর্যয়বোধকে প্রশমিত করতে । দেবীপ্রসাদ লিখেছেন যে প্রকৃতিকে জয় করার উপায়ই হল প্রকৃতির নিয়ম-কানুনকে জানা । কিন্তু এই নিয়ম-কানুনের উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে যে বস্তুবাদই কেন প্রতিষ্ঠিত হবে সেটার ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো প্রয়াস লেখক করেননি । অথচ এমনটা আশা করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই । পদার্থবিদ্যার দিকে তাকালেই বোঝা যায় । ক্লাসিকাল মেকানিক্সের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বৈপরীত্য ও তার অদ্ভুত নিয়ম-কানুন অনেকের কাছেই ভাববাদের অনুপ্রেরণা হয়েই দেখা দিয়েছে । ইলেক্ট্রনকে পর্যবেক্ষণের আগ পর্যন্ত কণা বা প্রবাহ কিছুই বলা যায় না; পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিই নির্ধারণ করে তার ধর্ম - এমন বক্তব্য বস্তুবাদের চেয়ে ভাববাদের অনুপ্রেরণাই বেশি যোগায় না কি? বিজ্ঞান বস্তুবাদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে বলেই বিজ্ঞান বস্তুবাদকে প্রতিষ্ঠা করবে - এমন কোনো নিশ্চয়তায় উপনীত হওয়ার কোনো কারণ পাওয়া যায় না ।
দ্বিতীয়ত - ভাববাদ শাসক শ্রেণীর ধর্ম হতে পারে কিন্তু শোষিত মানুষকে আয়ত্তে রাখাই তার একমাত্র উপযোগিতা? গৌতম বুদ্ধ যখন তাঁর ধর্মপ্রচারে বেরোন, তখন সাধারণ মানুষও কি তাঁর বাণীতে মুগ্ধ হয়নি? বুদ্ধও কি কেবল শোষিত সমাজকে শান্ত রাখতেই অতগুলো বছর কঠোর তপস্যা করলেন? মানুষের মাঝে দুঃখমুক্তির বাণী প্রচার করলেন সবাইকে শোষক শ্রেণীর অবিচার মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করতে? বড্ড বেশিই কষ্টকল্পনা হয়ে যায় না কি সেটা?
তৃতীয়ত - লেখক বইয়ে লিখেছেন যে "ধুলোমাটির গ্লানিমুক্ত এক চিন্ময় জগতের কথা জনগণের দর্শন হতে পারে না" । কেন? কারণ কৃষকের কাছে তাঁর লাঙ্গল দেওয়া মাটি ও সেই মাটিতে ফলানো ফসল যে কোনো দার্শনিক তত্ত্বের চেয়ে বেশি সত্যি । মাটিকে মনের ধারণা মনে করলে তাঁর খাটুনি কমে যায় না, ক্ষুধাকেও মায়া বলে ভাবলে পেটের জ্বালা জুড়োয় না । খুবই সত্যি কথা । কিন্তু এই যুক্তিতে গলদ আছে দুটো জায়গায় - এক, লেখকের মতে কোনো কিছু "মনের ধারণা" হলেই তার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা বা উড়িয়ে দেওয়াটা সহজ; কিন্তু এমন দাবি ভাববাদ আদৌ করে না । আধুনিক বিজ্ঞানই আমাদের দেখিয়েছে যে যাকে আমরা কঠিন পদার্থ বলি তার অনুভূত কাঠিন্য আসলে দুটি বস্তুর পৃষ্ঠের ইলেক্ট্রনগুলির মধ্যকার বিকর্ষণজনিত । "কাঠিন্য" এই অর্থে একটা মনের ধারণাই । কিন্তু তাই বলে তা অস্বীকার্য একেবারেই নয় । দুই, লেখক ধরে নিয়েছেন যে পরিশ্রমী, খেটে-খাওয়া মানুষের কাছে ভাববাদের কোনো আবেদন থাকতেই পারে না । পেট ভরে খেতে পাওয়ার মতো পার্থিব সুখই সে চায় । অথচ মনোবিজ্ঞানের একটা বক্তব্যই হল যে মানুষের জীবনে যা বড়মাত্রায় অনুপস্থিত, তাঁর প্রতিই তাঁর আকর্ষণ বেশি । পার্থিব জগৎ গ্লানিময়, ভাববাদের চিন্ময় জগৎ দুঃখমুক্ত । কোন মানুষ দুঃখ থেকে মুক্তি চায় না? সেক্ষেত্রে পার্থিব দুঃখ-কষ্টের সাথে যাদের নিত্য ওঠাবসা, তাঁরা দুঃখমুক্তির বাণীতে আকর্ষিত হবেন না এমনটা কীভাবে কল্পনা করা যায়? বিশেষতঃ যেখানে মার্কসবাদ বলে যে ধর্ম হল জনগণের আফিম, সেখানে ভাববাদের প্রতি জনসাধারণের অরুচি কীভাবে কল্পনা করছেন লেখক?
লেখকের বিশ্লেষণে মার্কসীয় পক্ষপাত যে থাকবে সেটা অবশ্য প্রত্যাশিতই, কিন্তু এই পক্ষপাতের কারণে যে যৌক্তিক অন্ধ-বিন্দুগুলো তার একেবারেই চোখে পড়েনি সেগুলো নেহাত উপেক্ষণীয়ও নয় । বইটা থেকে অবশ্যই অনেক কিছু শেখার আছে এবং দেবীপ্রসাদের লেখনী যথেষ্ট উপভোগ্যও সেটা স্বীকার না করে উপায় নেই । কিন্তু লেখকের নিজের যুক্তির ফাঁকগুলোও যাতে চোখ এড়িয়ে না যায় সে বিষয়ে সজাগ থাকা উচিত । নইলে এই বই পড়ে মার্কসবাদের ফ্যান বনে গেলে একটু আক্ষেপেরই ব্যাপার হয়ে যাবে সেটা ।