কলকাতা প্রাণোচ্ছল শহর। সে এক রঙে ছোপানো নয়। ইট-কাঠ-পাথরের নগরে দিব্যি বেঁচে আছে নানা রঙের কলকাতা। শঙ্খ ঘোষ কবেই লিখেছেন, এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা। কর্মব্যস্ত মানুষ যা দেখেও দেখে না। সন্ধানীর দৃষ্টিতে কিছু বাদ পড়ে না অবশ্য। সুপ্রিয় চৌধুরী বাউন্ডুলের মেজাজে ঘুরেছেন পথে পথে, ফুটপাতে, অলিতে-গলিতে। বারবার রোমাঞ্চিত হয়েছেন চেনা শহরের অচেনা জীবনে। ‘আরেকটা কলকাতা’ গ্রন্থে সেইসব কথা। কলকাতার মস্তান, পকেটমার, জুয়াড়ি, বারাঙ্গনা, হারিয়ে যাওয়া মেলা, পশুপাখি, রাতের ফুটপাথ, ময়দান প্রভৃতি প্রসঙ্গ এক কথায় বিস্ময়কর। উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার অগুনতি খাদ্যবিপণির হদিশ এই গ্রন্থের বিশেষ আকর্ষণ। ‘আরেকটা কলকাতা’ নগরজীবনের অন্য কথকতা।
সুপ্রিয় চৌধুরীর জন্ম উত্তর কলকাতার সাবেকি পাড়ায়। কৈশোরের অনেকটাই কেটেছে রেললাইন আর উদ্বাস্তু কলোনি ঘেঁষা শহরতলিতে। যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের ঠিকানা মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতার সীমান্তবর্তী সংখ্যালঘু মহল্লা। পুঁথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরোলেও নানাধরনের পাঠে প্রবল আগ্রহ। শখ: ফুটবল, ফিল্ম আর পশুপাখি পোষা।
"সব অমাত্য পাত্রমিত্র এই বিলাপে খুশি শুঁড়িখানাই কেবল সত্য, আর তো সবই ভূষি ছি ছি হায় বেচারা
ছি ছি হায় বেচারা? শুনুন যাঁরা মস্ত পরিত্রাতা এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা হেঁটে দেখতে শিখুন" 'বাবুমশাই' কবিতার এই লাইনগুলো শোনেননি বা পড়েননি, এমন শঙ্খ-প্রেমী পাওয়া যাবে না। কিন্তু সত্যি কি আমরা এই 'আরেকটা কলকাতা'-র খবর রাখি? রাখি না; কারণ আমরা হেঁটে দেখি না। সুপ্রিয় চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে হেঁটে এই শহরকে দেখেছেন। মনে-মনে তিনি সেই শহরটিরই বাসিন্দা— এ-কথা বললে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। এবার, নানা সময়ে নানা জায়গায় প্রকাশিত একগুচ্ছ লেখাকে এই বইয়ে গ্রন্থবদ্ধ করে তিনি আমাদের নিয়ে গেছেন সেই শহরে। তাঁর সঙ্গে হেঁটে দেখতে গিয়ে আমাদের চোখে আর মনে একে-একে ধরা দিয়েছে~ ১. কালো কলকাতা; ২. কোড কলকাতা; ৩. ক্যাসিনো কলকাতা; ৪. ময়দান-ই-কলকাতা; ৫. পেডোফাইল কলকাতা; ৬. সুমন কলকাতা; ৭. না-মানুষি কলকাতা; ৮. কলিকাতা খাইবার পাস-১; ৯. কলিকাতা খাইবার পাস-২; ১০. মোগলাই কলকাতা; ১১. অন্য খাবার: কেয়ার অফ কলকাতা; ১২. এসকর্ট কলকাতা; ১৩. কলকাতার হারিয়ে যাওয়া মেলা; ১৪. কলকাতার বিচিত্র পেশা; ১৫. কলকাতার পকেটাত্মীয়; ১৬. কলকাতা ও শহরতলির বিচিত্র হাট-বাজার-বিপণি; ১৭. ঝি-স্পেশাল; ১৮. তাঁরা বৃদ্ধ হলেন; ১৯. সারারাত ফুটপাত; ২০. এ-শহর চেনে না। শেষে থেকেছে (লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা ছাড়া) অন্যান্য তথ্যসূত্র। যদি অধ্যায়গুলোর শীর্ষক থেকে তাদের কনটেন্ট আন্দাজ করতে পারেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন বিষয়ের দিক দিয়ে কতটা ব্যতিক্রমী এই বই। যদি সেই আন্দাজটুকুও করতে না পারেন, তাহলে সখেদে বলি, এই বইয়ের মধ্যে থাকা নানা আপাত অবিশ্বাস্য অথচ কঠোরভাবে সত্যি কথাকে হজম করা আপনার পক্ষে বড়োই কঠিন হবে। তবে তাই বলে বইটাকে পাশ কাটিয়ে যাবেন না৷ নিয়ন আর হ্যালোজেন, উবার আর মেট্রো, মল আর মাল্টিপ্লেক্সের বাইরে যে বিশাল শহরটা বেঁচে থাকে আমাদের অজান্তেই, তার সম্বন্ধে জানার সূত্রপাত করার জন্য এই বইটি আদর্শ। দুঃখ একটাই~ বইয়ের অনেকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তথাকথিত মূলস্রোতে একেবারেই অনালোচিত প্রসঙ্গ বড্ড কম জায়গা পেল। আর হ্যাঁ, মানছি যে দুনিয়ার অধিকাংশ ভালো জিনিস উত্তর কলকাতাতেই পাওয়া যায়। কিন্তু দক্ষিণকে একেবারেই পাত্তা দেওয়া হল না দেখে কষ্ট পেলাম। আর কিছু না হোক, অন্তত বেহালার সুখাদ্য ও গাইডে না-থাকা দ্রষ্টব্য নিয়ে তো কিছু লেখাই যেত। তবু বলব, ইদানীং বাজারে যতই ফুড-গাইড বা অন্য নির্দেশিকা সহজলভ্য হোক, 'হেঁটে দেখা'-র ফসল এই অনন্য, সুলিখিত, একান্ত ব্যক্তিগত নানা ভাবনায় জারিত বইটি লা-জবাব। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন।
খুব সুন্দর একটা বই পড়লাম কলকাতা নিয়ে। পুরোনো কলকাতা নিয়ে অনেক বই আছে। কিন্তু এই বইতে বর্তমান সময়ের কলকাতার কথা তুলে ধরেছেন লেখক। পড়লেই বোঝা যাবে, লেখক দীর্ঘ দিন ধরে কলকাতার অলিতে-গলিতে ঘুরে ফিরে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। কলকাতার মস্তান থেকে শুরু করে পকেটমার, জুয়াড়ি, পশুপাখি, ময়দান, এসকর্ট, হিজড়া, সেরা খাবারের ঠিকানা প্রভৃতি প্রসঙ্গ তথ্য এক কথায় বিস্ময়কর।
১৯২০-এর দশকে হেনরি মর্টন নামের এক যুবক লন্ডনের পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন, আর আবিষ্কার করতেন তাঁর চেনা শহরের মধ্যে অচেনা শহর লন্ডনকে! উনি তখন সদ্য মিশরের টুটানখামেনের মমির উপরে রিপোর্টিং করে এসে নাম কিনেছেন। আজকের ভ্রমণসাহিত্যের পাঠক অবশ্য ওঁকে মনে রেখেছে ক্লাসিক ইন সার্চ অব্ লন্ডন সিরিজের বইগুলির জন্য, ব্রিটিশ সোসাইটি ফেলোশিপ দিয়েছে ওঁকে। জানি না, আমাদের কলকেতার ভ্রামণিক সুপ্রিয়বাবু পরিচিত আছেন কিনা মর্টনসাহেবের লেখার সঙ্গে, কিন্তু ওঁর লেখায় যে তেমনই বাস! নৈলে, এই বইয়ে ময়দান-মোগলাই-মেলার অধ্যায়গুলি পড়তে পড়তে মর্টনের লেখা মনে পড়ে যাবে কেন?
****
না, লন্ডনের মতো সহস্রাধিক বছরের পুরানো শহর হবার দরকার নেইকো, হোক্ না মাত্তর সওয়া তিনশ’ বছরের শহর, তা বলে কি কলকেতার ‘অন্য-ইতিহাস’, ‘অন্য-ভূগোল’ বা, ‘অন্য-সমাজচিত্র’ থাকতে নেই? এই ‘অন্য’ বা, ‘আরেক’ কলকাতাকে নিয়েই আজকের বইটি। এবং যথেষ্ট সুখপাঠ্য ও উৎসাহ উদ্রেককারী।
যেমন ‘না-মানুষী কলকাতা’ অধ্যায়টিকে ধরা যাক্, যেটিকে বেস্ট বলতে মন চায়। ‘যে জীবন ফড়িঙের দয়েলের’ তাদের সঙ্গেও তো প্রিয় শহর কলকাতার জীবনে জীবন যোগ করে নেওয়া আছে! কী পরম মমতায় সুপ্রিয় দেখেছেন কলকাতায় বসন্তবউরি পাখি, বা খঞ্জন বা লক্ষ্মীপেঁচা বা বেঁজি! ইনিই আবার কলকাতার মোগলাই খানার ঠেক বা অদ্ভুত সব পেশার মানুষ বা ঝি-স্পেশাল ট্রেন দেখেছেন জিজ্ঞাসু চোখ দিয়ে। কলকাতার পকেটমার বা গণিকারাও চোখ এড়ায়নি তাঁর।
একটু পড়িঃ
“…মোড় ঘুরেই এন আর এস মেডিক্যাল কলেজের প্রথম গেটটার দু’ধারে বসতো পশুপাখির হাট। আজকে মনে হবে গুল মারছি, বড় বড় মোটা জালের খাঁচায় ভরে অবাধে বিক্রি হতো ভালুকছানা, বাঁদর, চিতল হরিণের বাচ্চা…থেকে….কচ্ছপ” (‘কলকাতার হারিয়ে যাওয়া মেলা’)
বা,
“ভোরবেলা। কুয়াশাঘেরা ময়দান। কথা বলতে বলতে মেয়ো রোডের মোড় পার হচ্ছিল রোগা রোগা ছেলে দুটো। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে সস্তা জার্সি, বুট, নিক্যাপ। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর মতো দামী বুট পরে মাঠে নামার স্বপ্ন…”
(‘ময়দান-ই-কলকাতা’)
সত্যি, এ’বইয়ের অধ্যায়গুলো পড়তে পড়তে বয়স কমে যায় অনেকটাই, কারণ ফুটবল থেকে আলুকাবলি, লক্কাপায়রা থেকে কাঁচের-বয়ামে-পোষা রঙিন মাছ--এমন অনেক স্মৃতিই ভিড় করে আসে মনে যা আজ আর আমার কলকাতায় নেই, বা প্রায়-নেই।
প্রথম অধ্যায়টি কী তথ্যবহ! ‘কালো কলকাতা’ ! গোপাল পাঁঠা থেকে ভানু বোস থেকে ফাটাকেষ্টা থেকে হেমেন মণ্ডল! মীর মহম্মদ ওমর! একসঙ্গে এত এত জন কলকাত্তাইয়া মস্তানের গল্প আগে কোথাও পড়িনি।
বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে, শহর কলকাতা নিয়ে লেখাও হতে থাকবে ততদিন। এ’বইটি তার মধ্যে একখানি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
কলকাতা চেনেন তো? ওই ভিক্টোরিয়া, নন্দন, ধর্মঘট, বইমেলা, রসগোল্লা, কালীঘাট এসব বাদ দিয়েও একটা কলকাতা আছে... এই কলকাতার মধ্যে যে লুকিয়ে আছে আরো একটা কলকাতা, সেটা আমরা শুনে থাকলেও জানা হয়নি বিশেষ.. সেই অজানা, অচেনা ঝুলি এনে আমাদের সামনে উপুড় করে দিয়েছেন লেখক সুপ্রিয় চৌধুরী... ময়দানের লুকিয়ে থাকা পেশা, হারিয়ে যাওয়া মেলা, নাম না শোনা খাবার, পাশকাটানো ফুটপাথের খবর আমরা প্রায় রাখিই না... কিন্তু সুপ্রিয়বাবু রেখেছেন, আর যত্ন করে আমাদের সামনে এনে রেখেছেন ঠিক যেমন ভাবে বাড়িতে আগত অতিথির সামনে আমরা মিষ্টির প্লেট রাখি.. আর কি নেই সেই প্লেটে.. কালো কলকাতা, মোগলাই কলকাতা, ক্যাসিনো কলকাতা, পেডোফাইল কলকাতা, এসকর্ট কলকাতা... আরো আছে... যা পড়ার পর আপনার মনে হবে আপনি যে শহরকে এতদিন চিনেছেন আর যে শহরের কথা এ বইতে বর্ণনা করা হচ্ছে... তা যেন সম্পূর্ণ আলাদা... পড়ে দেখুন এই বই.. প্রাণের শহর কলকাতার এই রূপ আগে কোথাও সেভাবে ধরা পড়েনি..