এক সাইকায়াট্রিস্ট, যে বিশ্বাস করে পৃথিবীর সব ঘটনারই ব্যাখ্যা আছে, অপ্রাকৃত বলে এ জগতে কিছুই হয় না। এক আধিদৈবিক চিকিৎসক, যে জানে এ পৃথিবীতে কোন ঘটনাই অবান্তর নয়। সে ঘটনার কোন ব্যাখ্যা থাক বা তা হোক ব্যাখ্যাতীত, কোন কিছুই বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘটে না। প্রতিটি ঘটনার একটি উদ্দেশ্য আছে এবং তা যুক্ত আছে অন্য একটি ঘটনার সাথে। সেই উদ্দেশ্য কখনও বুদ্ধি দিয়ে জানা যায় আর কখনও তা সম্ভব হয় না। সুদীর্ঘ সময় ধরে ঘটে চলা কিছু আপাত বিচ্ছিন্ন অমানুষিক নৃশংস ঘটনা এই বিপরীতধর্মী দুই মানুষকে জড়িয়ে ফেলে একই সুতোয়। তাঁদের চোখে ধরা পড়তে থাকে সর্বনাশের এমন এক সূত্র, যা মানব ইতিহাসে ঘটে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে, যা বলা হয়েছে বারবার অথচ কেউ তা খেয়াল করতে পারছে না। অনাদিকালের বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সংগ্রাম এক নতুন মোড় নেয়, সূচনা হয় ধ্বংস ও মহাসর্বনাশের এক নব অধ্যায়।
Bengal Troika Publication থেকে প্রকাশিত নীলাঞ্জন মুখার্জ্জীর Mythological Horror, "শতী সহস্রাননা"। যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় লুকিয়ে আছে রহস্য, ইতিহাস, হত্যা, মিথ ও মাইথোলজির এক আশ্চর্য বর্ণনা যা পাঠককে শুরু থেকে শেষ অবধি চুম্বকের মতো টেনে রাখবে।
বিশাল পটভূমিতে লেখা, শুরুর আর শেষের অংশটা চমৎকার, মাঝখানে বেশ কিছুটা অংশ খেই হারিয়ে ফেলেছিল। অসুরদের উৎপত্তি, দেবী শক্তির রূপ, সিন্ধু স্বরসতী সভ্যতা সব মিলিয়ে ব্যাপারগুলো যথেষ্ঠ ইন্টারেস্টিং। অসুরদের সাথে গড়ের যুদ্ধ, নেপালে বরফের মধ্যে পরিত্যক্ত কাঠের কেবিনে হাজার বছরের প্রাচীন পিশাচের উপস্থিতি আর ইছামতীর তীরে পর শেষ লড়াই বইয়ের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং অংশ। সব মিলিয়ে রেটিং ৩.৫।
শুরুটা বেশ ভালো ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছুদূর যাওয়ার পরেই খেই হারিয়েছে। তবে হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে একটু ঝলক দেখিয়েছে, পরমুহূর্তেই আবার নিভে গিয়েছে। ভয়ের উপাদান মোটামোটি ব্যবহার করতে পেরেছেন। কিছু জায়গায় অস্বস্তি লেগেছে, এই ক্রেডিট লেখককে দিতে হবে। লেখনশৈলী ভালোই। তবে অতিরিক্ত ইনফো ডাম্পিং বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। কিছু ইনফো তো একেবারে অপ্রয়োজনীয় ছিল। মিথলজির প্রয়োগ আরেকটু ভালোভাবে করা যেত। কাহিনী শেষের দিকে গিয়ে খুবই অগোছালো হয়ে গিয়েছিল, তবে লেখক মেলাতে পেরেছেন কোনোমতে। যাইহোক, গড়পড়তা হরর বলা যায়। প্লটটা সম্ভাবনাময়ী ছিল। একবার পড়ার মত বই, না পড়লেও অসুবিধা নেই।
পুরাণ আর ইতিহাস, অতীত আর বর্তমান, কল্পনা আর বাস্তব— এগুলো কি পরস্পরবিরোধী? যদি আপনি তাই মনে করেন, তাহলে এ-বই আপনার জন্য নয়। আর যদি আপনি ভাবেন যে এই ধারণাগুলো একে অপরের সঙ্গে অক্লেশে মিশতে পারে, এমনকি বইয়ে পড়া 'সত্যি'-ও আসলে এদের সবার সমন্বয়, তাহলে আলোচ্য বইটি আপনার জন্যই লেখা হয়েছে। কী আছে এতে? প্রথমা সেন নামের এক সাইকায়াট্রিস্ট এক পেশেন্টের কাউন্সেলিং করতে গিয়ে এক দুর্জ্ঞেয় রহস্যের সম্মুখীন হলেন। তার সমান্তরালে চলল প্রায় কুড়ি বছর আগের এক ঘটনাক্রম— যেখানে প্রথমা'র স্বামী ইন্ডোলজিস্ট অরুণ সেন রাখিগড়ি-তে খননকার্য চালাতে গিয়ে সরস্বতী সভ্যতার রহস্যভেদ করতে চাইছেন। তারই সঙ্গে আমরা পেলাম অনেক-অনেক পুরোনো এক সময়কাল, যেখানে দেবীকে সর্বজনভোগ্যা করে তুলে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে চাইছে কিছু পুরুষ, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চাইছে এক যোদ্ধা। ক্রমে, অবধারিতভাবে মিশে গেল সবক'টা সূত্র। বই শুরু হয়েছিল যে বিন্দুতে, শেষ হল সেখানেই— শুভের হাতে অশুভের পরাজয় দিয়ে। অকপটে স্বীকার করি, উপরোক্ত সারসংক্ষেপ দিয়ে এই বইয়ের কিছুই বোঝানো গেল না। এতে ইতিহাস, কিংবদন্তি, পুরাণ, কল্পনা, হিংস্রতা, যৌনতা, মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি— সবকিছু আছে। অসরলরৈখিক ন্যারেটিভ এবং চরিত্রদের নিজস্ব মনোজগতের উত্থান-পতনের ফলে বাচনভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে লেখার তাল রাখাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বইটা ছাড়তে পারিনি! একবারে, একেবারে টানা পড়ে এই হৃষ্টপুষ্ট উপন্যাসটি শেষ করতে আমাকে বাধ্য করেছেন লেখক।
কিন্তু বইটার বেশ কিছু সমস্যাও আছে। যেমন~ ১) এমন একটি জটিল বইয়ে, যেখানে এত ইতিহাস ও পুরাণের রেফারেন্স আছে, প্রুফ-চেকিং ও সম্পাদনা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে হওয়া উচিত ছিল। তার কিছুই হয়নি। ফলে এমন সব ভুল এতে রয়ে গেছে যা হাস্যকর। এইসব অসঙ্গতি মনোযোগী পাঠকের কাছে বইটিকে লঘু করে দেবে। প্রকাশক এমন গুরুত্বপূর্ণ বইটিকে এত অপেশাদারি ভঙ্গিতে প্রকাশ না করলেই পারতেন। ২) কাহিনির শেষটা হিন্দি সি-গ্রেড সিনেমার মতো খারাপ। তার আগেও বহু বর্ণনা ও বিবরণ ন্যারেটিভের জন্য প্রাসঙ্গিক না হয়ে বুশের বোমাবাজির মতো পাঠকদের 'শক অ্যান্ড অ' অনুভূতি জাগাতেই নিয়োজিত হয়েছিল। এমন অতিকথন হালফিল তান্ত্রিক হররের বইয়ে রুটিন হয়ে গেছে। এই উপন্যাসে অলৌকিকত্ব আরোপ করার জন্য জাদু ও তন্ত্রকে জোর করে ইতিহাসে মেশাতে চাওয়া হয়েছে বারবার। হয়তো সেজন্যই লেখক এমন কিছু করেছেন। এর ফলে কিন্তু বইয়ের গভীরতর মাহাত্ম্য কমে গেছে। ৩) হাজার-হাজার বছরের ভাবনা ও ইতিহাসের সিন্ধুকে বিন্দুবৎ ধারণ করতে চেয়েছেন লেখক। সেজন্য তাঁর হাতে একটি অমোঘ অস্ত্র ছিল— প্রেম! তাঁর হাতে সেই ভাষা ছিল যা দিয়ে তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন সেই অনুভূতিকে— যা যুগ-যুগান্তের ওপার থেকে ডেকে আনে মনের মানুষকে। তিনিও কিন্তু দেখাতে পারতেন, "জন্মের আগেও জন্ম, পরেও জন্ম, তুমি এমন সুরেরও গভীর সুরে পদাবলির ধরন যেমন!" দেখালেন না। ভজঘট, ভুলে-ভরা একটা পরিসমাপ্তি নিয়ে বই শেষ হল।
তবু বলব, বইটা পড়ুন। সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সঙ্গে অন্যান্য সভ্যতা এবং বৈদিক সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত যৌক্তিক কিছু কথা আছে এই বইয়ে। বিভিন্ন দেশ ও কালের মিথলজির পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশেষত ভারতীয় পুরাণ-ভাবনার সঙ্গে তাদের সাদৃশ্য নিয়ে এমন মনোগ্রাহী অথচ তথ্যনিষ্ঠ আলোচনা বাংলায় কোনো ফিকশনে আগে পেয়েছি বলে মনে হয় না। তারই সঙ্গে এখানে আছে মনস্তত্ত্বের নানা কথা, ব্যাখ্যা ও চিন্তা। সর্বোপরি বইয়ের শেষে আছে বিস্তৃততর পাঠের নির্দেশিকা— যা না-থাকলে বইটি খেলো হয়ে যেত। লেখকের পরবর্তী বইটি পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। আশা রাখি যে সংশ্লিষ্ট প্রকাশক অধিকতর যত্ন ও সময় নিয়ে সেটিকে পরিবেশন করবেন। লেখকের প্রয়াস অন্তত সেটুকু দাবি করে। অলমিতি।
কী বলবো একে? এক কথায় অনন্যসাধারণ। অসাধারণ। অসাধারণ।।
১৯৯২ সাল। বোম্বের বাঙালি সাইক্রিয়াটিস্ট প্রথমা সেনের কাছে সুরমিতা নামের এক রোগী এলো। আপাতদৃষ্টিতে তার প্যারানরমাল সমস্যা আছে মনে হলেও একদিন বেরিয়ে এলো তার বিভৎস এক রূপ, কোন ব্যাখ্যাতেই যাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। শুরু হলো প্রথমার জীবনের আরেক অধ্যায়।
এবার চলে আসি ১৯৭৬ সালে, ঘটনাস্থল হরিয়ানার রাখিগড়ি। প্রথমার স্বামী আর্কিওলজিস্ট অরুণ সেন রাখিগড়িতে পাওয়া সরস্বতী সভ্যতার নিদর্শন খুঁড়তে খুঁড়তে এক ঢিবির মধ্যে পেলেন অজস্র কঙ্কাল। ডায়েরিতে লেখা তার স্মৃতিকথার পাতা যেন পুরাতত্ত্ব আর মিথের এক অমূল্য দলিল। অরুণ সেনের সাথে পাঠকও চলে যায় দেশ দেশান্তরের একই মিথ, একই দেবদেবীর পুনরাবৃত্তিতে। বইয়ের এই অংশটা এককথায় লা জবাব। এত জ্ঞান অথচ পড়তে বোরিং লাগেনি একটুও।
মোদ্দা কথায় শতী সহস্রাননা আসলে দেবী আনুনার গল্প। তার পরম আদরের তিন ডাকিণী যোগিণীর গল্প। তিন অসুর আর ভয়াবহ এক যাদুকরের গল্প। মৃত্যু আর পূণর্জন্মের গল্প। তন্ত্র মন্ত্রের কাহিনী আমাকে তেমন টানে না তারপরেও এই বই পড়ে আনন্দে বিস্ময়ে মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। লেখক নীলাঞ্জন মুখার্জ্জীর জন্ম স্বার্থক। শুধুমাত্র এরকম একটা বই দিয়েই তিনি হাজার বছর বেঁচে থাকবেন পাঠকের মাঝে।
সময়ের হাত ধরে প্রতিবার শুভ শক্তি এবং অশুভ শক্তির লড়াই আমরা এই পৃথিবীতে দেখে আসছি সেই আবহমান কাল থেকে । এই শুভ অশুভের লড়াই নিয়েই অলঙ্কারিত এই উপন্যাস। এই বইয়ের গল্প তিনটে ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
০১।ডাকিনী ০২।যোগিনী ০৩।মহামায়া
বইয়ের তিনটি ভাগে ভাগ করা এই গল্পগুলো আমার প্রতিটাই অসম্ভব ভালো লেগেছে, বিশেষ করে ডাকিনী ও যোগিনী গল্প দুটি । আমি মনে করি, শতী সহস্রাননা হরর এবং থ্রিলারের একটা পারফেক্ট কম্বিনেশন । এই বইয়ের পরতে পরতে রয়েছে একটা গা ছমছমে পরিবেশ যেটা এই বইকে আরও সুন্দর ও গতিময় করে তুলেছে।
এই বইয়ের গল্প অতীত এবং বর্তমানকে মিলিয়ে মিশিয়ে, আমার কাছে এই ব্যাপারটা দারুণ লেগেছে। সত্যি বলতে এই অতীত এবং বর্তমানের মিশেল এই বইয়ের প্রতি ভালোলাগাকে আরো অনেক অনেক গুন বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে ।
সর্বশেষ বলি, আপনারা যারা এখনো পড়ে দেখেননি “শতী সহস্ৰাননা “, অবশ্যই পড়ে ফেলুন সংগ্রহ করে ।
রাখিগড়ি, সভ্যতার নিদর্শনে টইটম্বুর এক সাইট। রাত গভীরে ডায়েরিতে স্ত্রীর উদ্দ্যেশ্যে চিঠি লিখে চলেছেন আর্কিওলজিস্ট অরুণ সেন। নিজের কয়েকটি ভুলের কৈফিয়ত দিতে চাইছেন ইতিহাস সভ্যতার নিদর্শনে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন তথ্যের মেলবন্ধন করে। এক নতুন ইতিহাস রচনা করতে চলেছেন ভারতবর্ষের সভ্যতা গুলোর সৃষ্টি নিয়ে। চিঠি লেখা শেষ হলে ১৯৭৬ সালে অজ্ঞাতকারণে কলকাতায় গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। তার স্ত্রী প্রথমা সেন মুম্বাই নিবাসী মনোবিদ। স্বামীর মৃত্যুর পর কন্যা মিয়াকে হোস্টেলে রেখে মুম্বাইতেই বসবাস। ১৯৯২ এর শুরুর দিকে আইটি কোম্পানির এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মেয়েকে তার কাছে নিয়ে আসেন তার পিতামাতা। ঘুমের উদ্ভট আচরণ করছে তাদের মেয়ে। কিন্তু সুরমিতা পাল বলতে চাইছে অন্য কোন গল্প, অন্য কোন জগতের। বর্তমানের আদলে তুলে আনতে চাইছে শত সহস্র বছর ধরে পৃথিবীর বুকে চলে আসা এক দ্বন্দের। যার সমাপ্তি নিহিত নিজেকে চিনে ওঠার এক মায়ায়....
পাঠ প্রতিক্রিয়া: বইটির নাম টা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এখানে শতী বলতে শতক এবং সহস্রাননা মূলত সহস্র+আনন বা হাজার মস্তক বুঝানো হচ্ছে। মূলত হাজার মস্তক ঠিক না। সনাতন ধর্মমতে তাদের আরাধ্য দেবীর শত সহস্র পরিচয়ের কথা বলা হয়েছে ( এমন টা আমার মনে হয়েছে)। বইয়ের প্রেক্ষাপট চমকপ্রদ হলেও রহস্যের জাল ছড়িয়ে তা আবার নাটাইয়ে বাধতে শেষে এসে বিপাকে পড়ে গিয়েছেন লেখক। আর্কিওলজিক্যাল ব্যাপার গুলো পড়তে ভালই লেগেছে। কিন্তু তারই মাঝে মাঝে ধর্মীয় আবহে একটি মাতৃমূর্তির বারংবার আগমন দৃষ্টিকটু লেগেছে পাশাপাশি বিরক্তির সৃষ্টি করেছে। আরেকটি বিরক্তিকর জিনিস সংলাপের মাঝে তত্ত্বকথার কয়েক বার আগমন। লেখক এখানে দুটো শক্তির এক দ্বন্দের উল্লেখ করেছেন। আলোর পাশে যেমন অন্ধকার থাকে তদ্রুপ শুভশক্তির পাশে প্রকৃতিতে অশুভশক্তিও থাকবে। দুইদলেরই বহু অনুগামী থাকবে। তাদের শক্তি বৃদ্ধিতে তারা বিভিন্ন আচার করে থাকে। তবে এখানে লেখক একটি বড় ভুল করেছেন। ইন্দিরা গান্ধী হত্যা বা মুজিব হত্যাকে তিনি এই অশুভশক্তির আরো নির্দিষ্ট করে বললে হিন্দুধর্মমতে অসুরের আগমনের প্রচেষ্টা বলে চালিয়েছেন। সোজা কথায়, রাজনৈতিক হত্যাকান্ডকে পৌরাণিক এক রুপে আনতে চেয়েছেন। নন ফিকশন হলেও এই অংশটি কোনভাবেই আমার কাছে গ্রাহ্য নয়। কারণ, এটি এককথায় ইতিহাসের বিকৃতি। বইটিতে পৌরাণিক বা সনাতন ধর্মের কোন বিকৃতি হয়েছে কিনা তা অবশ্য আমি জানি না। বইটিতে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশের একটি জেলা দক্ষিণ শ্রীপুর। কিন্তু বাংলাদেশে এ নামে আদৌ কোন জেলা নেই। জ্বীন, শয়তান বা সেমেটিক ধর্ম গুলোকেও লেখনীতে টেনে আনা বইয়ের কলেবরই বৃদ্ধি করেছে মনে হয়েছে। তন্ত্রমন্ত্রের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে শেষে এসে পুনরায় কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন লেখক। পরিশেষে সঠিক কোন সিদ্ধান্ত বা সীমারেখাও টানতে পারেননি। লেখকের লেখনশৈলী অনেক ভাল হলেও এ বিষয় গুলো লেখনীকে নিম্নগামী করেছে। ব্যক্তিগত রেটিংঃ ২.৮/৫।
কাহিনি সংক্ষেপঃ সাইকিয়াট্রিস্ট প্রথমা সেনের কাছে অদ্ভুত স্বভাবের এক রোগী এলো মনোচিকিৎসা নেয়ার জন্য। মেয়েটার নাম সুরমিতা পাল। প্রথমা সেনকে সে অদ্ভুত কিছু গল্প শোনালো। তার মৃত বান্ধবী টিনাকে নাকি সে দেখতে পায়। টিনা নরমাংস খেতে পছন্দ করে। আর সে চায় সুরমিতার শরীর অধিকার করে সবকিছু কন্ট্রোল করতে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম সেন এসব বিশ্বাস করলেন না। কিন্তু এরপরেই এমন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন তিনি হলেন যে চিরাচরিত যুক্তির ওপর তাঁর মনেও জন্মালো সন্দেহ। নারকীয় সেই অভিজ্ঞতাই পাল্টে দিলো তাঁর পুরো জীবন।
১৯৭৬ সালে হরিয়ানার রাখিগড়িতে সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতার বিশাল এক সাইট এক্সপিডিশনে ব্যস্ত ছিলেন আর্কিওলজিস্ট অরুণ সেন। প্রাচীন দুটো ঢিবি খুঁড়তেই তাঁর সামনে ধরা দিলো বহু পুরোনো এক রহস্যের প্রবেশমুখ। একটা স্বপ্ন, হাজার হাজার বছর আগের এক সভ্যতা। যে সভ্যতা অসুরের। তারা উপাসনা করে এক প্রাচীন দেবীর। রাজা রমভস -উর ও তাঁর অত্যাচারী দুই পুত্র বীজাস-উর ও মহাস-উরের অত্যাচারে সমস্ত গড় রাজ্য অতিষ্ঠ। বিশাল এক রিচুয়াল পালন করে তারা পেতে চাইছে দেবতার সম্মান! তাদেরকে সাহায্য করে চলেছে একজন মহাশক্তিশালী জাদুকর পুরোহিত। এসবের সাথে আর্কিওলজিস্ট অরুণ সেনের সম্পর্কই বা কোথায়? যে স্বপ্নটা তাঁকে সারাজীবন ভর তাড়া করে বেড়াচ্ছে, যে স্বপ্নের কারণে স্ত্রীর সাথে এসে গেছে তাঁর দূরত্ব - সেই স্বপ্ন আসলে কিসের ইঙ্গিত বহন করছে?
কলকাতার বিধাননগরের এক আশ্রমে ঘটে গেলো ম্যাস সুইসাইড। প্রায় একশো জনের মতো মানুষ কি এক অজ্ঞাত লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে গণ-আত্মহত্যা করে বসলো। রহস্যময় সৌমিত্র স্যার আসলে কিসের পেছনে পড়ে আছেন? সিকিমে হানিমুনে গিয়ে ভয়াবহ তুষারঝড়ের ভেতরে পড়ে বিজন এক উড কেবিনে আশ্রয় নেয়া দফাদার দম্পতি শুনতে পেলো অপার্থিব ঘড়ঘড় শব্দ। রক্তপিপাসু এক প্রাচীন সত্ত্বা একেবারে কোণঠাসা করে ফেললো তাদেরকে। বনগাঁর এক অখ্যাত গ্রামে যেন ঢুকে পড়েছে সাক্ষাৎ পিশাচ। মারণ-উচাটন চলছে দেদারসে। আপাত বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার মধ্যে সংযোগ কোথায়?
সাইকিয়াট্রিস্ট প্রথমা সেনের সাথে যোগাযোগ হলো তিমুর ওয়ারিস নামের একজন কেমিস্ট্রির শিক্ষকের, যে কি-না নিজেকে জ্বীন-ভূতের ওঝা হিসেবে দাবী করে। এমনকি একের পর প্যারানরমাল ঘটনা শুনিয়ে অবাক করে দেয় সে প্রথমাকে। এই তিমুর ওয়ারিস অনেকটা অযাচিত ভাবেই সাহায্য করতে লাগলো প্রথমাকে সুরমিতা পালের ররহস্যময় কেসটার ব্যাপারে। বেরিয়ে আসতে লাগলো একের পর এক ভয়াবহ সত্য।
যুগের প�� যুগে ধরে ঘটে চলেছে একের পর পৈশাচিক ঘটনা। একই চরিত্র বারবার ফিরে এসেছে এই পৃথিবীর বুকে নানা সময়ে, নানা নামে। কেন? কিসের আশায়? শুভ'র সাথে অশুভ'র চিরায়ত যুদ্ধের আরো কতো নজির স্থাপিত হবে, হয়তো সহস্রবার এই প্রশ্নটা তোলার পরেও পাওয়া যাবে না এর কোন উত্তর।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ কলকাতার লেখক নীলাঞ্জন মুখার্জ্জীর 'শতী সহস্রাননা' কলকাতায় প্রকাশিত হওয়ার ঠিক পরপরই বাংলাদেশে প্রকাশ করার ঘোষণা দিয়েছিলো চিরকুট। কিন্তু করোনা কালীন অস্থিতিশীল সময়ে তা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি৷ স্বাভাবিক ভাবেই বেশ হাইপ ছিলো বইটা নিয়ে। অবশেষে সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রকাশিত হলো অ্যাওয়েইটেড 'শতী সহস্রাননা'। নীলাঞ্জন মুখার্জ্জী তাঁর এই উপন্যাসে সমাবেশ ঘটিয়েছেন মিথোলজি, ইতিহাস, মিথ, ফ্যান্টাসি ও হররের।
তিনটা অংশ নিয়ে গঠিত এই উপন্যাসের পুরোটা। ডাকিনী, যোগিনী ও মহামায়া। এই তিনটা অংশে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে গেছে বেশ কিছু ঘটনা, যেগুলোর প্রেক্ষাপট একই। ধীর লয়ে বলা গল্পের ভেতর দিয়ে লেখক চেষ্টা করেছেন পাঠকের পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে। কিছু জায়গায় আমার মনোযোগ সরে গেলেও বেশিরভাগ অংশই পাড়ি দিয়েছি অনেকটা একটানে। কোথাও পজেশন মিস্ট্রি, তো কোথাও আর্কিওলজি৷ কোথাও মিথ তো কোথাও ফ্যান্টাসি। আবার কোথাও শিহরণ জাগানিয়া আধিভৌতিক আবহ তো কোথাও পেয়েছি রহস্য। এভাবেই নিজ গতিতে এগিয়ে গেছে 'শতী সহস্রাননা', যার শেষের চাইতে শুরুটাকেই আমার কাছে তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী বলে মনে হয়েছে আমার কাছে।
হিউম্যান সাইকোলজি সম্পর্কে বেশ কিছু থিওরির ব্যাপারে একদমই নতুন জানলাম আমি এই উপন্যাস থেকে। সিন্ধু সভ্যতা, মেসোপোটেমিয়া সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা সহ পৃথিবীর প্রাচীন সব সভ্যতা গুলোকে একইসাথে রিলেট করার যে চেষ্টা নীলাঞ্জন মুখার্জ্জী তাঁর এই উপন্যাসে করেছেন তাতে আমি সায় জানাতে না পারলেও প্রসেসটা বেশ অভিনব লেগেছে আমার কাছে। কাহিনির বিল্ড-আপে ব্যাপারটা বেশ ভালো একটা ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। মোটের ওপর বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে আমার কাছে এই প্রাচীন সভ্যতা গুলোর সম্পর্কের থিওরিটা। আধিভৌতিক ব্যাপারস্যাপার গুলোর বর্ণনাও বেশিরভাগই উপভোগ করেছি। যদিও 'শতী সহস্রাননা' কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপযোগী থ্রিলার, কিন্তু কিছু জায়গায় যৌনতা এসেছে বেশ বিকৃত ভাবে যা আমার জন্যেও কিছুটা ডিস্টার্বিং ছিলো। সবার ক্ষেত্রেই যে এমন হবে, তাও না।
টাইপিং মিসটেক ছিলো বেশ ভালো পরিমাণে। বিশেষ করে রমভস-উর নামটাকে অনেক জায়গাতেই রমভাস-উর লেখা হয়েছে৷ মাঝেমাঝে আমিই কনফিউশানে পড়ে যাচ্ছিলাম, নামটা আসলে কি সেটা নিয়ে। বেশ কিছু জায়গায় উল্টো করে বলা ডায়লগে পেয়েছি অসঙ্গতি। আমার মতে 'শতী সহস্রননা'-এর একটা ভালো প্রুফ রিডিং দরকার এর সেকেন্ড এডিশন আসার আগে। বাকিটা লেখক ও প্রকাশকের ব্যাপার।
নেগেটিভ রিভিউ দেখে যাঁরা বই কেনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, তাঁরা ব্যতীত অন্যদেরকে আমি বলবো 'শতী সহস্রাননা' ট্রাই করে দেখতে। মারমার কাটকাট টাইপের কিছু না হলেও উপন্যাসের সামগ্রীক প্লটটা বেশ ভালো লেগেছে আমার কাছে। অ্যাভারেজ এক্সপেকটেশন নিয়ে শুরু করলে হয়তো অনেকের কাছেই ভালো লাগবে বইটা।
সজল চৌধুরী'র করা দুর্দান্ত প্রচ্ছদটা বইটার কলকাতা এডিশনের প্রচ্ছদের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভালো লেগেছে। একদম বিষয়ভিত্তিক প্রচ্ছদ যাকে বলে আর কি। বাঁধাই আর কাগজের মান একদম চিরকুট সুলভ নান্দনিক।
পাঠক প্রতিক্রিয়া বইটা প্রি অর্ডার করার পরে একটা নেগেটিভ রিভিউ দেখি। এরপরে আর কেনার ইচ্ছা ছিলো না। কিন্তু যেখানে অর্ডার করি তাদের ক্ষতি হবে তাই নিতে হয়েছে। এখন বইয়ের কথা বলি- এই বইটা একটা হিন্দু মিথোলজিক্যাল হরর বই। স্টিফেন কিং এর বইয়ের হরর না। বইটা ৩টা ভাগে ভাগকরা ১. ডাকিনী ২. যোগিনী ৩. মহামায়া
এইখানে আমার কাছে ডাকিনী ভাগটা খুব ভালো লেগেছে; এর কারন এইখানে মনোবিজ্ঞানের অনেক সুন্দর সুন্দর কথা ছিল। আর ছিলো বেশ কিছু সভ্যতা নিয়ে কথা। এই ভাগে বোঝা যাবে না আসলে কাহিনী কোন দিকে যাচ্ছে। নতুন অনেক ইতিহাস জানতে পারলাম, যেমন সংস্কৃত ভাষা থেকেও যে তামিল ভাষা পুরাতন এইটা আমার জানা ছিলো না। ২টা সময়ের কাহিনী একসাথে চলে। এর পরে আবার হুট করে হাজার হাজার বছর আগের একটা কাহিনীতে চলে যায়। মূলত ঐখান থেকে কাহিনীর শুরু যা শেষ হয় মহামায়া ভাগে গিয়ে।
যোগিনী ভাগটা আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগেনি, কেন যে ভালো লাগলো না বুঝি নাই। কিন্তু এই ভাগটা কাহিনীর একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাগ। সর্বশেষ মহামায়া এইটা পুরা আলিফ লাইলা। বইটা ভারতে ভালো নাম করেছে এর পিছে কারন আছে। এইখানে কাহিনীটা হিন্দু ধর্মের মানুষ আর ভারতে যারা বাস করে তাদের জন্য বেশী ভালো লাগবে কারন উনাদের কাছে অনেক নাম, স্থান পরিচিত বিশেষ করে ধর্মের ব্যাপার। যা আমার কাছে একটু কঠিন লেগেছে।
নেগেটিভ দিকঃ এইখানে কিছু জিনিস আমার ভালো লাগে নাই, এর মাঝে লেখক এইটা জাহির করতে চেয়েছেন জিন জাতি বলতে কিছু নাই। লেখক বেশ কিছু বই পড়েছেন বইটা লেখার জন্য জিন জাতি নিয়ে ইসলাম ধর্মের কিছু বই পড়লে এই ভুলটা হত না। আরেকটা ছিল ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে হত্যা করার কাহিনী হরর দিয়ে বিকৃত করা হয়েছে। সাথে চিরকুটের প্রুফ রিডারের কিছু ভুল আছে। উনি দাঁড়ি পরে কোন স্পেস দেয় নাই এইটা পড়ার সময় আমার বিরক্তের কারন হয়েছে অন্য কারো নাও হতে পারে। মনে হয়েছে আভ্র থেকে বিজয়ে নেওয়ার সময় কিছু বানান ভুল হয়ে গেছে। আর ১-২টা বাক্য গঠনে সমস্যা ছিল এইটা আসলে মূল বইয়ের নাকি এই বইয়ের আমি সঠিক জানি না।
Story is good, but the writer claimed that China and various other parts of the world were in-fact Indian, most probably he wrote that after smoking large quantity of weed to write such bullshit BJP-RSS propaganda.
শুভ শক্তির সাথে অশুভ শক্তির যে লড়াই আবহমানকাল থেকে চলে আসছে সেটিই পুরো গল্পের ভিত্তি। ইতিহাস-পুরাণ-মিথলোজির সাথে আধুনিক সভ্যতার এক অসাধারণ সংমিশ্রণ হয়েছে এই বইয়ে। তুলনামূলক নতুন লেখক হিসেবে যা সত্যিই প্রশংশার দাবিদার। ফার্স্টের দিকে প্লট ডেভেলপমেন্টের সময় আলাদা আলাদা টাইমলাইনে খেই হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা আছে। প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে প্রচুর ইনফরমেশন দেওয়া হয়েছে যার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ।
সম্পূর্ন বইটি ভাগ করা হয়েছে 'তিন' ভাগে ১. ডাকিনী ২. যোগীনি ৩. মহামায়া প্রায় ৩০০ পেইজের বইটি খুব আ���ামরি বড় না হলেও, প্লট নেহাৎ ছোট না। প্রথম থেকেই গল্পের কাহিনী 'তিন' টাইমলাইনে পাশাপাশি চলতে থাকে। প্রথম টাইমলানে থাকে সাইকায়াট্রিস্ট 'প্রথমা সেন'। কাউন্সেলিং এর জন্য তার কাছে আসে এক অদ্ভুত পেশেন্ট। তার বছর দশেক আগের টাইমলাইনে থাকে ইন্ডোলজিস্ট 'অরুন সেন'। 'সরস্বতী' সভ্যতার খোজে 'রাখিগড়ি'-তে খনকার্য চলাকালীন সে খুজে পায় প্রাচীন সভ্যতার এক গণসমাধি যা নিয়ে এলাকাবাসীর মনে আছে এক আদিম সংস্কার। তৃতীয় টাইমলাইনের স্পেসিফিক সময়কাল দেওয়া নেয়। এই টাইমলাইনে লেখক পরিচয় করায় প্রাচীন এক দেবীর, 'তিন' অসুর ও এক জাদুকরের। কাহিনীর ভিত্তি এই টাইমলাইনেই রচিত।
কাল্ট থ্রিলার/সুপার ন্যাচারাল থ্রিলার/ফ্যান্টাসি/হরর এর মধ্যে যেকোন ঘরানার বই পছন্দ করলে চোখ বন্ধ করে নিয়ে বসে যান। সিন্ধু-সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস, গ্রিক-ইজিপ্ট মিথোলজি, বৈদিক-পুরাণ সংস্কৃতি সব কিছুর এক অসাধারন সংমিশ্রণ। ব্যক্তিগত পাঠ প্রতিক্রিয়া, সেরা!সেরা!!সেরা!!!
Boi ta mythological horror and thriller er akta perfect amalgamation. Kichudin age Facebook e ekti choto review pai, tate bole golper surute ekti bacha cheler harie jawa r ak tritiangsher sheshe ekti mey er dakini te rupantorito hoar bornona onek din moner modhye theke jabe, ami puropuri agree kori. Raater ghum kere near moto sei description. R sei voi ta upovogyo. Kichuta chhoa peyechi Amish er way te debota der manusher moto kore dekha ba lekhar. Ami jani na lekhok present r past er ghotona gulo ke ato ghono ghono kano alter korchilen, tate golper khei samanyo harachilo. Bengal troika r prochhod r page quality khub valo r tototai kharap tader proofreading/editing. Ato jaigai banan vul, r se theke tini hoye gache, nehat e golper jonye eta ke na dekha kore thakte hoi. Over all, it's a good read.
পৌরাণিক ইতিহাসের সাথে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের মিশেলে তৈরী এক অসাধারণ রহস্যকাহিনী। প্রচুর ঐতিহাসিক তথ্যে পরিপূর্ণ থাকলেও তথ্যভারাক্রান্ত মনে হয় না। কিন্তু লেখক চরিত্রগুলোকে বিস্তীর্ণ সময়জালে বুনতে চেষ্টা করায় খুব ছোট ছোট কিছু অসংগতি রয়ে গেছে। অবশ্য খুব খুঁটিয়ে না দেখলে তাতে কাহিনীটির রসাস্বাদনে কোন সমস্যা হয় না। আর আকর্ষণীয় লেখনীর দৌলতে একাধিকবার পড়ে ফেলাও বিচিত্র নয়।
শেষ করলাম লেখক Nilanjan Mukherjee এর লেখা অসাধারণ উপন্যাস - "শতী সহস্রাননা।"
দেবী, শক্তির উৎস, মহাজাগতিক ঐশ্বরিক মূর্তির প্রতীক - যিনি যুগে যুগে জন্ম নিয়ে চলেন নিরন্তর, অসুরের সঙ্গে চলে ভীষণ লড়াই এবং প্রতিবারের মতোই তিনি জয়ী হন। কারণ, সত্যের জয়, শুভ শক্তির জয় অনিবার্য।
মানুষ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য প্রকৃতিকে তথা এই মহাশক্তির আধাররূপী মা-কে চায় বন্দী করতে, পরিবর্তে চায় নিজেই ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি হতে - ভুলে যায়, আর যাই হোক, তার সীমানা রক্ত মাংস চামড়া দিয়ে মোড়া এক কাঠামোর মধ্যেই। তার মায়ের মতো দয়া নেই, মমতা নেই, নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে আপ্রাণ ভালোবাসার ক্ষমতা নেই। পরিবর্তে তার আছে লোভ, কাম, ক্রোধ, মোহ, হিংসা, পাপের বাড়ন্ত ঝোলা - যা তাকে ভুলিয়ে দেয় যে সে'ও আদতে এই মায়েরই সন্তান। মা যুগে যুগে লড়ে যান সন্তানের সঙ্গে মন প্রাণের বিরুদ্ধে এক লড়াই, শেষ পর্যন্ত বধ করতে হয় অসুর তথা অশুভ শক্তি'কে। এই কাজে তাঁকে যুগ যুগ ধরে সাহায্য করেন তাঁর ডাকিনী যোগিনী'রা। সবাই মিলে বাঁচিয়ে রাখেন এই মহাবিশ্ব'কে। _____________
বইটির পাতায় পাতায় প্রাচীন যুগের সভ্যতা, প্রত্নতত্ত্ব এই সব বিষয়ের পাশাপাশি দেবী আনুনা'র ইতিহাস এবং যুগে যুগে তাঁর পরিবর্তন হয়ে শেষ পর্যন্ত আধুনিক যুগে এসে তাঁর পুনর্জাগরণ - সব কিছু এত নিপুণভাবে লেখক ঘটনাক্রমে সাজিয়েছেন, তার জন্য সত্যিই ওনাকে কুর্নিশ জানাই। এই লেখা বোঝার মতো বোদ্ধা আমি নই, কিন্তু আপনি সত্যিই পারেন সব মানুষকে এই মোহময়ী পরিসরে বেঁধে ফেলতে। 😊
উপন্যাসটি পড়া শুরু করলে আপনি শেষ না করা পর্যন্ত বই বন্ধ করতে পারবেন না এটুকু বলতে পারি। আমি বইটি শেষ করেছি ১২ঘন্টার কিছু বেশী সময়ে। যাঁদের এসব বিষয়ে পড়ার কোনো উৎসাহ নেই, তারাও পড়ে ফেলুন, চমকে যাবেন। Masterpiece it is. 🙂❤️
শেষ করলাম উপন্যাস "শতী সহস্রাননা" (বলে রাখি বইটি কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক দের জন্য)।তান্ত্রিক হরর বা থ্রিলার বলা যেতে পারে। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন রূপে ও সময়ে দানব বা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এক প্রাচীন মহাদেবী তাঁর যোগীনি ও ডাকিনী যুদ্ধ করে আসছেন। তাঁরা বারবার ফিরে ফিরে আসেন এই বিপদ থেকে জগৎ কে রক্ষা করতে।এই হলো প্লট। অনেক চরিত্র ও তাদের জটিল মনের জগৎ আর অনেক গুলি সময়কাল ,পুরাণ,সভ্যতার ইতিহাস, বিভিন্ন ধরণের ধর্মীয় আচার ,যৌনতা,নগ্নতা ,তন্ত্র সব মিলিয়ে যেনও কোথাও কোথাও অগোছালো মনে হচ্ছিলো পড়বার সময়ে ।কিন্তু লেখক এতো সুন্দর ভাবে লিখেছেন বলেই একঘেয়ে লাগেনি। তবে প্রচুর তথ্যে পূর্ণ এই উপন্যাস। সিন্ধু ও সরস্বতী সভ্যতার ইতিহাস ও অন্যান্য সভ্যতার সাথে সম্পর্ক ,বৈদিক সংস্কৃতি,মাইথোলোজি, সেই সময়ের দেবী ,ভাষার ব্যবহার,কোডিং ,তন্ত্রের বিভিন্ন আচার আর সঙ্গে প্রচুর ছবির (যদিও সাদাকালো) মাধ্যমে লেখক যথাসম্ভব সহজভাবে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকের ব্যাপারেও খুব সুন্দর আলোচনা রয়েছে। তবে শেষ অংশ আমার ভালো লাগেনি overdramatic মনে হয়েছে। প্রুফ চেকিং ও সম্পাদনা তে সচেতনতার অভাব স্পষ্ট। তা না হলে, জায়গায় জায়গায় বানান ভুল, একই বাক্য একাধিক বার , ১৯৮৪ সালে ক্যামেরা মোবাইল ফোন,বিজয়া দশমীর দিন চন্দ্রগ্ৰহন হতোনা :)😊. বই এর প্রচ্ছদ বেশ আকর্ষণীয় কিন্তু বইএর মধ্যে ব্যবহার করা বিভিন্ন মূর্তি ও লিপির ছবিগুলির ফ্রন্ট সাইজ খুবই ছোট যে বিশেষ করে লিপিগুলি ঠিকমতো দেখা বেশ কঠিন।ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌনতা ,নগ্নতা ও হিংস্রতার বিবরণ আরোপিত লেগেছে। তাও বলবো লেখক এই উপন্যাসের মাধ্যমে বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস,পুরাণ সংস্কৃতির সংযোগ তথ্য ও যুক্তি দিয়ে যেভাবে বুঝিয়েছেন সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়। সেই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দিকের গভীর আলোচনাও আমার ভালো লেগেছে। এই সব কারনেই বইটি পড়তে সকলকে অনুরোধ করবো। লেখকের পরবর্তী সৃষ্টির অপেক্ষায় রইলাম।
মানুষের মন অত্যন্ত জটিল একটি বস্তু.. কখন এই মনের মধ্যে কি চলছে তা বোঝা অসম্ভব শুধু নয় অসাধ্যও বটে.. তবে নীলাঞ্জন মুখার্জীর লেখা এই "শতী সহস্রননা" উপন্যাস শুধু যে মনোবিজ্ঞানের কথা বলেছে তা কিন্তু নয়.. এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসাবে মনোবিদ্যা যেমন উঠে এসেছে তেমনই উঠে এসেছে ঐতিহাসিক, অলৌকিক ও ভৌতিক ঘটনার ছায়াও.. প্রধানত ���ই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই ভরে উঠেছে উপন্যাসের পাতা.. তবে "শতী সহস্রননা"-কে কিন্তু শুধুমাত্র ভূতের গল্প হিসাবে নামাঙ্কিত করে বিভাজন সৃষ্টি করা যাবে না.. উপন্যাসের প্রতিটা ধাপে লেখক যেভাবে তাঁর ইতিহাসচর্চার ছাপ রেখেছেন তাতে এই উপন্যাসকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিভাগে আনার চেষ্টা করা সত্যিই অসাধ্য.. মনোবিদ্যা আর ইতিহাসচর্চার এমন আশ্চর্য সুন্দর সংমিশ্রণ করে যে একটা আস্ত উপন্যাস লেখা যেতে পারে, তা এই কাহিনী না পড়লে সত্যি বোঝা মুশকিল.. দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়কে নিয়ে উপন্যাস রচনা করতে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে চরিত্র অঙ্কন.. আর সেই নিখুঁত চরিত্র অঙ্কনেই এই কাহিনী এগিয়ে গেছে প্রথমা, সুরমিতা, অরুণ ও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে সাথে নিয়ে.. আর তাই টানটান রহস্যে ঘেরা এই উপন্যাস একবার পড়তে শুরু করলে থামা বেশ কঠিন..
পাঠ প্রতিক্রিয়া: উপন্যাসটির প্লট অভিনব। তবু সব উপকরণ থাকা সত্ত্বেও রান্নাটা ঠিক জমলো না। এই উপন্যাস পড়ে জানা যাবে, বহু দেশের বহু সভ্যতার সাথে আমাদের সিন্ধু সভ্যতার। মনোবিজ্ঞানের বেশ কিছু ইনফো আমরা পাচ্ছি। কিন্তু, সবচেয়ে বড়ো সমস্যাটা হলো, লেখনীর মাধ্যমে পাঠককে ধরে রাখাটা যায়নি। মাঝে পড়তে পড়তে রীতিমতো জোর করে শেষ করতে হবে তাই পড়ছি এমন সিচুয়েশন চলে এসেছিল। গল্পে সাসপেন্স আছে কিন্তু গতি নেই। আর ছোট ছোট অনেক বানান ভুল চোখে পরেছে। কিছু ক্ষেত্রে বাক্য সাজানোতেও খুঁত চোখে পড়েছে আমার।
তবে ভালো দিক কী কিছুই নেই? আছে। ১.উপন্যাসটির প্রচ্ছদটি আমার বড়ো ভালো লেগেছে। ২. গ্ৰিক, মিশর থেকে শুরু করে বহু সভ্যতার সাথে আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম— এসব দিকগুলোর মিল গুলো জানা যায়। যেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। মোদ্দাকথা, জ্ঞান অর্জন করা যাবে এমন ইনফো অনেক আছে। 🙊
অনেক আশা নিয়ে পড়তে শুরু করেছিলাম। তথ্যের আধিক্য থাকলেও কৌতুহলে আটকা পরে গেছিলাম। অসামান্য প্লট ও গল্পের বুনন থাকলেও শেষে গিয়ে সমস্ত জট পাকিয়ে গেছে। সাউথ ইন্ডিয়ান মুভির উড়ে যাওয়া অ্যাকশন, মহিষাসুরমর্দিনী, হ্যারি পটার, X-Men সব মিলিয়ে ভয়ংকর রকমের গাঁজাখুরি হয়ে গেছে। এরকম বইয়ের ওইরকম শেষ ভাবাই যায় না।
বেশকিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে শেষতক এক সুতোয় বেঁধে ফেলার চমৎকার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন রচয়িতা। চমৎকার কিছু তথ্য সন্নিবেশ করে বইটিকে নিছক আজগুবী ভূতের বই হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছে। কৈশোরে সুখপাঠ্য হবে বইটি।