উপন্যাসটির নাম "লাইলী-মজনু" হওয়ায় বুঝতে একটু অসুবিধা হয়নি যে এটি হবে একটি নিখাদ প্রেমের উপন্যাস। কেননা, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রেমের প্রতীকরূপে যতজন প্রেমিক যুগল বিখ্যাত হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে লাইলী-মজনু অন্যতম। তাই, জগদ্বিখ্যাত এই প্রেমিক যুগলের নাম শোনেননি এমন কাউকে হয়ত খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমিও ইতিপূর্বে লাইলী-মজনুর নাম শুনেছি কিন্তু তাদের প্রেমের কাহিনীর অন্তর্গূঢ় তাৎপর্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না আমার। এজন্য তাদের প্রেমকাহিনী সম্পর্কে আমার তীব্র কৌতূহল থাকায় প্রবল আগ্রহ নিয়ে লাইলী-মজনুর প্রেমকাহিনীতে অবগাহন করেছিলাম অর্থাৎ উপন্যাসটি পড়া শুরু করেছিলাম।
উপন্যাসের প্রথমে পুত্রসন্তানের অভাবে ও শোকে-দুঃখে আরবেশ্বর সম্রাট আব্দুল্লাহ সাম্রাজ্য ত্যাগ করে বনবাস যাপনের জন্য মনস্থির করেন। ঠিক এমন সময় সম্রাট আব্দুল্লাহকে তার মন্ত্রী অনেক বুঝিয়ে ধৈর্য ধারণ করার পরামর্শ দেন। এরপর আরও দীর্ঘকাল ধৈর্য ধারণের পর একদিন প্রত্যুষে বাদশাহ আব্দুল্লাহ রাজপ্রাসাদ আলোকিত করে একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন। জ্যোতিষী মারফত এই শিশুর নামকরণ করা হয় "কএস"। এই কএস যখন শিশুকাল পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণ করেন, তখন হঠাৎ একদিন সওদাগর আব্দুল আজিজের কন্যা সুরসুন্দরী লাইলীকে একবার চোখের দেখা দেখে অভিভূত হয়ে যান। তারপর থেকে কএস লাইলীকে না দেখে আর থাকতে পারে না। অন্যদিকে লাইলীও প্রথম দেখাতে প্রেমে পড়ে যায় বাদশাজাদা কএসের। তারপর থেকে পাঠশালাতে পড়ার নাম করে দুজনে অনেকক্ষণ সময় অতিবাহিত করত। তাদের দুজনের মধ্যে এই সখ্য ভালো চোখে দেখতেন না লাইলীর পরিবার। তাই, লাইলীর পড়াশোনা বন্ধ করে তাকে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি করে ফেলা হয়। কিন্তু কএস যে লাইলীকে না দেখে উদভ্রান্ত হয়ে যায়। পুত্রের এমন ছন্নছাড়া অবস্থা দেখে পিতা বাদশাহ আব্দুল্লাহ স্বয়ং বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে যান লাইলীর পিতার কাছে। লাইলীর পিতা অত্যন্ত খুশি মনে এই প্রস্তাব গ্রহণ করতেন কিন্তু কএসের লাইলীর প্রতি অতিরিক্ত প্রেম - এই শুভ কাজ সম্পন্নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর কএস লাইলীর জন্য সুখশয্যা ছেড়ে পাগল হয়ে বনবাস যাপন করতে থাকেন। এই পাগল হয়ে যাওয়ার জন্য সে মজনু নামে আখ্যায়িত হন।
এরপর আরও একবার মহা জাঁকজমকের মাধ্যমে দুজনে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ আসে কিন্তু....
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ প্রেমের উপন্যাস আমি এর আগে আরো কয়েকটা পড়েছি। কিন্তু এই উপন্যাসটি আমার নিকটে প্রেমের উপন্যাস গুলোর মধ্যে আলাদা এবং শ্রেষ্ঠ। তার একটি কারণ হল, এই উপন্যাসের প্রধান দুটি চরিত্র লাইলী এবং মজনু দুজন দুজনের জন্য দীওয়ানা। মজনু যেমন লাইলীর জন্য উদভ্রান্ত, লাইলীও তেমনি মজনুর জন্য বিরহিণী। দুজন দুজনার মধ্যে এমন প্রেমের টান আমি খুব কম উপন্যাসের মধ্যেই দেখেছি।
প্রেমের উপন্যাসের মধ্যে আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস হল শরৎচন্দ্রের "দেবদাস"। কিন্তু সেই উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র দেবদাসকে তার ভালোবাসার মানুষ পার্বতী, তাকে ছেড়ে অন্য কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু লাইলী-মজনু উপন্যাসে দুজন দুজনকে পৃথিবীর কোন শক্তি আলাদা করতে পারেনি। তাই আমি মনে করি অন্য সকল উপন্যাসের প্রমের থেকে লাইলী-মজনু উপন্যাসে দুজনার প্রেম সর্বাপেক্ষা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
আর লেখক যেভাবে প্রত্যেকটি ঘটনার বিভিন্ন উপমা টেনে সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন এই উপন্যাসটি, তাতে যেন লাইলী-মজনুর হৃদয়ের বেদনা আমিও অনুভব করতে পারলাম।
এর আগে শেখ ফজলল করিমের অপূর্ব কিছু কবিতা পড়েছি। আমার খুব ভালো লেগেছিল সেসব কবিতার ভাষা। তাই, বইটি পড়ার পূর্বে আমার বিশ্বাস ছিল লেখক এই অমর প্রেমের কাহিনী অনেক সুন্দর করে চিত্রিত করতে পারবেন। তবে, বইটি পড়ে আমার প্রত্যাশার চেয়ে আরও বেশি পূরণ হয়েছে।
আপনাদের যদি বাংলা ভাষা সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকে তবে এই উপন্যাসটি পড়তে পারেন, আশাকরি আপনাদেরও হৃদয় স্পর্শ করে যাবে।
বই : লায়লী মজনু লেখক : শেখ ফজলল করিম প্রকাশনী : আলেয়া বুক ডিপো মুদ্রিত মূল্য : ১৫০ ৳ মোট পৃষ্ঠা : ১০৪ প্রকাশ : ২০১১