ভদ্রলোক এখন বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক। বইটি বছর বিশেক আগে প্রকাশিত হয়েছে। তাই বইটিকে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নয়, বরং অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের 'নির্বাচিত প্রবন্ধ'ই বলতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করব। প্রবন্ধগুলো পড়তে পড়তে হয়তো নিজের অজান্তেই আবিষ্কার করবেন পাণ্ডিত্যের সাথে আর কী কী উপাদান তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হতে সহায়তা করেছে।
বইয়ের প্রবন্ধগুলো সবই একই ধাঁচের নয়। নানা স্বাদের লেখা নিয়েই সাজানো হয়েছে প্রবন্ধসংকলনটিকে। মোটাদাগে বললে, রাজনীতি, সাহিত্য, ইতিহাস, শিক্ষা এবং রম্য রচনার ছলে লেখা প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে বইটিতে। ইহজাগতিকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষতা সংক্রান্ত প্রবন্ধটি বিশেষ সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ সেখানে প্রাবন্ধিক আনিসুজ্জামান বাংলাদেশে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের কাহিনি আলাপ করতে গিয়ে পাঠককে সংক্ষেপে ধারণা দিয়েছেন ইহজাগতিকতার পুরো ইতিবৃত্ত নিয়ে।
তিনি নিজে বাংলাসাহিত্যের অধ্যাপক। কিন্তু সাহিত্যসংক্রান্ত লেখাগুলো পড়তে ভালো লাগেনি। ইনসাইটফুল কিছু নয়, গড়পড়তা মানের। বঙ্কিম চাটুয্যেকে আলাদা মর্যাদা দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকের চোখ এড়াবে না। তেমনি দৃষ্টিকটু লাগবে কাজী নজরুলকে বিচার করবার অগভীর আলোচনা।
ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশ রাজনীতি নিয়ে লেখাগুলো এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। পাঠককে নতুন ভাবনার খোরাক দেবে দেশভাগ, বাঙালি বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব নিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দিনের সাথে কাজ করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সেকারণেই হয়তোবা তাঁকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটি স্মৃতিচারণার আদল নিয়েছিল। স্বাধীনতার এই মহান সৈনিককে আরও নিবিড়ভাবে জানার ও বোঝার পাটাতন তৈরি করবে প্রবন্ধটি।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত প্রবন্ধখানা 'রদ্দিমাল'। কেননা তাতে পাঠকের কাছে আগ্রহজাগানিয়া নয়া ভাবনা নেই, উল্টো জাতির জনককে নিয়ে দলীয়কর্মীর মতো বাকসর্বস্ব কথাবার্তা আছে।আনিসুজ্জামানের মতো একজন প্রাজ্ঞ মানুষের কাছে ঢের বেশি বিশ্লেষণী লেখা কাম্য ছিল।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা অনেক আগেই লক্ষ করেছেন আনিসুজ্জামান। তাঁর শিক্ষা সম্পর্কীত ভাবনা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। শিক্ষা নিয়ে রচিত প্রবন্ধগুলো পাঠকের চিন্তারাজ্যের খোরাক যোগাবে।
আনিসুজ্জামানের 'নির্বাচিত প্রবন্ধ' পড়ে সন্তুষ্ট নই। প্রবন্ধের বাছাইয়ে গলদ, তাঁর লেখাতেই পর্যবেক্ষণশক্তির অভাব, যুক্তি এবং কিছুক্ষেত্রে মতাদর্শের পক্ষপাত সুস্পষ্ট।