সেটা সাতের দশক। আগুনে নিঃশ্বাস ছাড়ছে রাগী সময়। ফুটন্ত এক লাভাস্রোত ঘুরে বেড়াচ্ছে কলকাতার অলিতে গলিতে। ‘তোমার বাড়ি আমার বাড়ি / নকশালবাড়ি নকশালবাড়ি’--- দেওয়াল লিখনগুলো অন্যান্য পার্টিগুলোর দেওয়াল লেখার মত একদম না। স্কুলের বন্ধু তন্ময়, দেবাঞ্জন, সাগ্নিক, সুদীপ্তদের মুখগুলো কেমন যেন পালটে যাচ্ছিল। অবাধ্য, বেপরোয়া, পুরনো সবকিছুকে ভেঙেচুরে বেরোতে চাইছিল যেন। ক্লাস নাইনের ছাত্র সুদীপ্ত, তার বাবা, বড়দা, স্কুল আর পাড়ার বন্ধুরা--- বলতে গেলে গোটা শহরটাই আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল। সস্তার প্লাইকাঠের আলমারির মাথায় গোলকিপিং গ্লাভস তুলে রেখে, স্কুলের স্যরের লেভ ইয়াসিন বানানোর স্বপ্ন দূরে ঠেলে হাতে পাইপগান আর পেটো তুলে নিয়েছিল উত্তর কলকাতার একটি স্কুলের ছাত্র পুর্ণেন্দুও। তারপর পোস্টার, লিফলেট, দেওয়াল লেখা, শ্লোগান, বোমা, গুলি, বন্দুক, অ্যাকশন, এনকাউন্টার, অ্যামবুশ, গোপন মিটিং... জ্বলন্ত সময়টাকে সারা গায়ে মেখে ছুটে চলা গোটা শহর জুড়ে। পুলিশ, সি আর পি, মিলিটারি, মাকু, নবকংগ্রেসি--- রাস্তায়, স্কুলে, পাড়ার মোড়ে, ফুটপাতে, অলিতে গলিতে সে এক ভীষণ লড়াই। ‘যত বড় তুমি হও / তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড় নও আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়--- এই শেষ কথা বলে / যাবো আমি চলে...’ শহীদ হবার চাকরি করতে নেমেছিল যেন সবাই। আসলে সময়টাই তো ছিল ওইরকম। চোখে একটাই স্বপ্ন--- গরীব মানুষের রাজ, ডিক্টেটরশিপ অফ দ্য প্রলেতারিয়েত। রক্তগঙ্গা বইয়ে সেই দ্রোহের আগুন নিভিয়েছিল রাষ্ট্র। নিহত হাজার হাজার ছেলে। ফেরার আর কারারুদ্ধ তার প্রায় কয়েকগুণ। একদিন ঘরে ফিরল সবাই, যারা তখনও জীবিত। ব্যতিক্রম শুধু একজন। ঠিকানা, বন্ধু, মা, ছেড়ে আসা ছেলেবেলা, লেভ ইয়াসিন হতে চাওয়া গোলকিপিং গ্লাভস হারিয়ে ফেলার দুঃখে যে মানুষটা কষ্ট পায়, ঝরনা লাফিয়ে পড়া পুকুরে দু’ হাত ছড়িয়ে আলবাট্রাস পাখির মত সাঁতার কাটে, শিমুল তুলোর মতো প্রেমে পড়ে, নির্জন মাঝরাতে বেহালায় সুর তোলে--- ‘রহে না রহে হাম, মহকা করেঙ্গে / বনকে কলি বনকে শবা, গাতে রহেঙ্গে ...’ তিন যুগের বেশি সময় ধরে দীর্ঘ একটা রক্ত আর আগুনের নদী সাঁতরাতে সাঁতরাতে কোথায় এসে ঠেকল নৌকোটা? ডানা থেকে খসে, বীজ থেকে ফুটে উড়তে উড়তে এসে পড়েই সে ফের উধাও হয়ে যায়। কার আড়ালে আশ্রয় নেবে এক চোখে দেখা সেই স্বপ্নটা? ডানা ভেঙ্গে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়বে না তো কেতজেল? শেষ পর্যন্ত কী হল সুদীপ্তর স্কুলের অভিন্নহৃদয় বন্ধু পুনের? সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই বিখ্যাত লেখক সুপ্রিয় চৌধুরীর এই অসাধারণ উপন্যাস...
সুপ্রিয় চৌধুরীর জন্ম উত্তর কলকাতার সাবেকি পাড়ায়। কৈশোরের অনেকটাই কেটেছে রেললাইন আর উদ্বাস্তু কলোনি ঘেঁষা শহরতলিতে। যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের ঠিকানা মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতার সীমান্তবর্তী সংখ্যালঘু মহল্লা। পুঁথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরোলেও নানাধরনের পাঠে প্রবল আগ্রহ। শখ: ফুটবল, ফিল্ম আর পশুপাখি পোষা।
অপনেন্টের ফরোয়ার্ডের পা থেকে বল তুলে নেওয়ার মত , আন্দোলনের পতাকা মাটিতে পড়তে না দিয়ে বুক দিয়ে আগলে রাখা অসমসাহসী যে ছেলেটা,যে ছেলেটা পারেনি লম্বা টুর্নামেন্টের খেলা মাঝপথে ছেড়ে দিতে,যাকে লেভ ইয়াসিন বলে ভাবতে ভালোবাসতেন স্কুলের গেম টিচার, যে ছেলেটা ক্লাস ফাইভেই নিজের পরিচয় দেয় 'পুনে, পূর্ণেন্দু বলে, অবলীলায় বলতে পারে' ক্লাসে পাড়ায় অনেক শালা পিছনে কানা পুনে বলে ডাকে,অবশ্য কোনও শুয়োরের বাচ্চার সামনে বলার হিম্মত নেই,' তার গোপন নাম পরবর্তী বইয়ে লেখক অবিনাশ ছাড়া আর কী দিতে পারতেন! সত্যিই তো তার বিনাশ নেই, তার বিশ্বাসের বিনাশ নেই, তার সমর্পণের বিনাশ নেই, বিনাশ নেই তার ডেডিকেশনের। জেল পালিয়ে ছুটে চলা ছেলেটার হারিয়ে গেছে মা, বন্ধু, ছেলেবেলা, শহর,তিনতলা স্কুল বাড়ি,ফুটবল ম্যাচ,গুলি খেলা আর ঘুড়ির প্যাঁচ, মায়ের শাড়িতে ধোঁয়া আর ডালের গন্ধ....সেই ছোটবেলা থেকে ভালোলাগা প্রায় সবটুকু। দ্রোহজ শেষ হয়েছিলো সেই চিঠি দিয়ে যেখানে পুনে জানিয়েছিল সে পাড়ি দিয়েছে পালামৌ এর আদিবাসী গ্রামে। ওই চিঠিটা পড়তে পড়তে দ্রোহজর পাতা চোখের জলে ভিজেছিল। কারণ ওই বইয়ের পাতা জুড়ে নেমেছিল সাতের দশক। শহর কলকাতা, শহরতলি, জুড়ে নকশালবাড়ির ছায়া। সেই আন্দোলনে ভাঁটা পড়ে কালের নিয়ম মেনে। উজ্জ্বল , উচ্ছল ,পড়াশোনায় তুখোড় বা সাধারণ ছেলেরা হারিয়ে গেল আন্দোলনের জোয়ারে, নির্মম অত্যাচার, মৃত্যু, পঙ্গু জীবন, অবসাদ পরিণতি নিয়ে এলো । লেখক সুপ্রিয় চৌধুরীর দ্রোহজ আমার পড়া নকশাল আন্দোলনের এক বিশ্বস্ত বই। দ্রোহজতে হারিয়ে যাওয়া পূর্ণেন্দুর কী হলো অবসরে ভেবেছি অনেক, চাঁদের মতই উজ্জ্বল হওয়া উচিত তার জীবন। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন লেখক স্বয়ং, কেতজেল পাখি উপন্যাসটি লিখে। দ্রোহজ না পড়লেও পড়া যায় অনায়াসে এই বই, কিন্তু তবু বলব, সিক্যুয়েল হিসেবেই পড়ুন। আন্দোলনের ধারাটায় সামিল হোন, তবে তো সুদীপ্ত, পূর্ণেন্দু, মৃন্ময়, অমিতেশ সাগর, বাবলু, প্রদ্যোত, প্রতীপ, কল্লোল এদের ভালোবাসতে পারবেন। তবে তো অবিনাশের ভেতরে হাতড়াবেন , আতি পাতি করে খুঁজবেন সেই দামাল ছেলেটাকে। যাকে অমিতেশ স্যার একটা পাখির গল্প শুনিয়েছিলেন, দক্ষিণ আমেরিকায় আমাজনের জঙ্গলে দেখা যায় যাকে, আদিবাসীরা নাম দিয়েছে কেতজেল পাখি, যে বন্দী অবস্থায় বেশিদিন বাঁচে না। অবিনাশ নিজেকে ওই পাখির মত করে তৈরি করেছে আজীবন। খাঁচা কেটে আকাশে উড়তে চেয়েছে। আর তাই অলৌকিক কোনো অতি মানবের মত, অশরীরীর মত বন্দুক কাঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে জঙ্গল মহলে, চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সেই মানুষ আবার কষ্ট পায় তার ছেলেবেলা হারিয়ে যাওয়ায়, প্রেমে পড়ে, নির্জন রাতে বেহালা বাজায় তার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় শহরের সাংবাদিক অভিরূপ। এই সাক্ষাতের জন্য বহুপথ পাড়ি দিতে হয় জঙ্গলের, অবশেষে মুখোমুখি হয় লিডার অবিনাশের। লেখক এখানে অভিরূপের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন রণবীর সেনা, সালোয়া জুড়ুম, লাল দস্তার কথা। বলেছেন জ্ঞানেশ্বরি এক্সপ্রেসের কথা, পুলিশি অত্যাচার, জোতদারদের অত্যাচারে বিরুদ্ধে এগিয়ে আসা দীর্ঘ স্থায়ী জনযুদ্ধের কথা। আলোচনায় এসেছে শ্রীলঙ্কা ,জনতা বিমুক্তি পেরিমুনা আন্দোলনের কথা, গরীব মানুষের রাজের কথা, ডিক্টেটর শিপ অফ দ্য প্রলেতারিয়েতও। এই কাহিনী জুড়ে যে আন্দোলন, লড়াই,বা সংগঠন ,সেই সব অজানা তথ্য, অচেনা জগৎ চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন লেখক। নকশাল বা মাওবাদী হয়ে ওঠার নেপথ্যের ইতিবৃত্ত , অদ্ভুত সাবলীল ভাষায় বলে গেছেন তিনি। মানুষ মৃত্যুঞ্জয় হতে পারে তার কাজ দিয়ে, জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে চলা মানুষগুলোকে কুর্ণিশ, ঠিক ভুলের হিসেব না করেই তাদের অদম্য সাহস, প্রতিকূল পরিবেশে যাপন করা দিন রাত্রিকে কুর্ণিশ আমার, আর লেখককে আমার শ্রদ্ধা। ক্যাফে টেবিলের প্রিন্টিং নিয়ে কিছু বলার নেই,প্রকাশনা ও বাঁধাই খুব ভালো। একটির বেশি বানান ভুল বা ভুল প্রিন্ট চোখে পড়েনি। স্বর্ণাভ বেরার প্রচ্ছদ খুব ভালো লাগলো। বেহালা আর বন্দুক, শিল্প আর হিংসা,দুই বৈপরীত্য এর যুগল মিশ্রণ আর আবছা অবয়বে ডানা ঝাপটানো পাখি , বইয়ের নাম কেতজেল পাখি ,সার্থক।
১৬০ পাতার ছোট আকারের বইটি যাকে বলে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলার মতো। এই বইটিকে প্রমোট করা হয়েছে লেখকের প্রথম উপন্যাস 'দ্রোহজ'-র সিকুয়েল হিসেবে। তবে 'দ্রোহজ' না পড়া থাকলেও এই বইয়ের রসাস্বাদন করতে পাঠকের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবেনা। সে কথা লেখকও প্রাক-কথনেই বলেছেন। আর যে পাঠক আগে 'দ্রোহজ' পড়েছেন তিনিও আগের কাহিনীর অজস্র রেফারেন্স এদিক ওদিক খুঁজে পাবেন।
একটা থ্রিলারের ধাঁচে শুরু হয়ে কাহিনী এগিয়ে চলেছে নিজের গতিতে। কাহিনী নিয়ে আমি বিশেষ কিছু বলতে যাবো না, কারণ একেবারেই স্পয়লার দিতে চাইনা। লাতিন আমেরিকার কেতজেল পাখি নাকি বন্দীদশায় বেঁচে থাকতে পারেনা। এই কাহিনী তেমনই এক কেতজেল পাখির যে কিনা আদতে এক প্রাক্তন নকশাল, অধুনা মাওবাদী সন্ত্রাসী নেতা। তার কাহিনী লেখক এক সাংবাদিকের জবানীতে অত্যন্ত মুন্সীয়ানার সাথে তুলে এনেছেন। সঙ্গে তুলে এনেছেন মাওবাদ ও সন্ত্রাস নিয়ে কিছু অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক সমকালীন প্রশ্ন। নিজের মতো করে উত্তর দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন তার কিছু কিছুর।
কিছু দৃষ্টিকটু মুদ্রণ প্রমাদ ছাড়া আর নেগেটিভ কিছু বলার নেই এই বইটি নিয়ে। তবে প্রচ্ছদটা আরেকটু আকর্ষণীয় হবে আশা করেছিলাম।
দ্রোহজ পড়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া পোস্ট করার পর জানতে পারি যে এর একটি সিক্যুয়েল আছে তা হল কেতজেল পাখি। এবার দ্রোহজ আমার ভীষণই ভালো লেগেছিল এবং প্রায় যতজনকে পেরেছি পড়তে বলেছি বইটা। সুতরাং সেই বইয়ের দ্বিতীয় পার্ট তো পড়তেই হতো। আমহর্সস্ট্রিট এর বইমেলা থেকে বইটি কিনেছিলাম, একদিন আগে শেষ করলাম।
দ্রোহজ যারা পড়েছেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই জানেন বইটি নকশাল আন্দোলনকে নিয়ে লেখা এবং সুদীপ্ত, পুণে এরকম অনেক চরিত্র নিয়ে তৈরি। দ্রোহজ তে পুরো বইটাই আমরা পড়ি সুদীপ্তের বয়ানে। আর কেতজেল পাখি হচ্ছে একজন পত্রিকার সিনিয়র ইনভেস্টিগেটিং অফিসে অভিরূপের বয়ানে লেখা। দ্রোহজতে যে পুণের অর্থাৎ পূর্ণেন্দুর একটি চিঠি ছাড়া কিছুই খুঁজে পায়নি সুদীপ্ত। কেতজেল পাখিতে সেই পুণেই ফিরে আসে অবিনাশজি হয়ে।
সাতের দশকের সেই রাগী সময়। আগুনে নিঃশ্বাস ছাড়া সময়। রাস্তাঘাটে, অলিগলির মোড়ে খ্যাপাটে চেহারার সব ছেলেছোকরার দল। চোখে আগুন। কোমরে গোঁজা পাইপগান, হাতে হাতবোমা। দেওয়ালে স্টেনসিলে আঁকা চেয়ারম্যান মাও। তলায় ক্যাপশন, '৭০ দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন'। যেন ফুটন্ত একটা লাভাস্রোত ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা কোলকাতা জুড়ে। সেই আগুনের স্রোতে ঝাঁপ দিয়েছিল কত হাজার হাজার ছেলে মেয়েরা। তার মধ্যে ছিল, সুদীপ্ত, তার বাবা, বড়দা, মৃন্ময়, স্কুল আর পাড়ার বন্ধুরা। বলতে গেলে গোটা শহরটাই। রক্তগঙ্গা বইয়ে সে দ্রোহের আগুন নিভিয়েছিল রাষ্ট্র। নিহত হাজার হাজার ছেলে। ফেরার আর কারারুদ্ধ প্রায় কয়েকগুণ। অবশেষে ঘরে ফিরল সবাই, যারা জীবিত��� শুধু ফিরলো না কয়েকজন.....সারা জীবনের জন্য ঠাঁই নিল জঙ্গলের গভীরতায়। আস্তে আস্তে গড়ে উঠল রেড করিডোর অথবা গেরিলা জোন। দেশের ভিতর আরেকটা দেশ। প্রধানমন্ত্রীর বয়ানে, 'দ্য সিঙ্গেল লার্জেস্ট ইন্টারনাল থ্রেট'।
১৬০ পাতার বইটা পুরোটাই দাঁড়িয়ে ওই রেড করিডোর এর গভীর জঙ্গলে। যেখানে অবিনাশজির সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত অভিরূপ, সেখানেই রেড করিডোর গড়ে ওঠার আগে, পেট খারাপ আর ম্যালেরিয়া তে মারা যেতো বেশিরভাগ মানুষ, কোনো চিকিৎসা ছিল না, এখানেই আদিবাসী মেয়েদের বারংবার ধর্ষণ করত শহুরে ফরেস্ট রেঞ্জার রা, এখানেই গরীব মানুষদের মারতে মারতে মেরে ফেলতো বড়লোক জমিদাররা, পড়াশোনা শেখার অপরাধে মৃত্যু বরণ করতো এই দুর্বল মানুষগুলোও। প্রতিবাদ কি জিনিস সেটাই জানতো না তারা। যা এই জেলপালানো কমরেডরা ওদের শেখায়, মেয়েদের জন্য শুরু করা হয় আত্মরক্ষা করার শিক্ষাব্যবস্থা, সবাইকে দেওয়া হয় শিক্ষা, শহর থেকে ডাক্তাররাও নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত ছেড়ে চলে আসেন এই মানুষগুলোর সেবা করতে। যে অবিনাশজি এর মাথার দাম পুলিশ ও সরকারের তরফ থেকে প্রায় লক্ষ ছাড়িয়েছে সেই অবিনাশজি জঙ্গলের ভেতর ওদের কাছে ভগবানের মতো। যাকে ছাড়া ওরা নিজেদের জীবন চালানোর কথা ভাবতেও পারে না।
লেখকর লেখা নিয়ে বেশি কিছু বলবো না। কারণ এত দক্ষ লেখনী নিয়ে আর কিছু বলা যায় না। পুরো একদিন টানা বসে বইটি শেষ করেছি, এক নিঃশ্বাসে বলতে ঠিক যেটা বোঝায়। এতটাই মোহিত হয়েছি।
ইচ্ছে রইল লেখকের আরো বই পড়ার। কেউ সাজেস্ট করলেও খুশি হবো ওনার লেখা অন্য কোনো বই।
সত্তরের দশকের কলকাতা শহর ও তার টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা আজ প্রায় সবারই জানা.. সত্তরের দশকের ওই ঘরছাড়া কিশোরদের মধ্যে সবাই কিন্তু আবার ঘরে ফিরে আসতে পারেনি.. কেউ মরেছে গোষ্ঠীদ্বন্ধে, কেউ মরেছে পুলিশের গুলিতে আর কেউ হয়েছে ফেরার.. কোথায় গেছে? কেমন আছে? কি করছে? কেউ জানেনা এর উত্তর.. দীর্ঘদিনব্যাপী ঘটেছিল এই নকশাল আন্দোলনকে এক বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জের সাথে তুলনা করলে এই সমস্ত কিশোর যেন খসে পড়া তারা.. তেমনই এক ছিটকে আসা তারার কাহিনী এনে আমাদের সামনে হাজির করেছেন লেখক সুপ্রিয় চৌধুরী তাঁর এই 'কেতজেল পাখি' উপন্যাসে.. একাত্তরের নকশাল আন্দোলনের সময় গা-ঢাকা দেওয়া একটি ছেলে আজ কিভাবে জঙ্গলমহলের একটি দলের নেতা হিসাবে জীবন কাটাচ্ছে তা ধরা পড়েছে এই উপন্যাসের প্রতিটা পাতায়.. এই রোমহর্ষক ও অকুতোভয় পথচলার প্রেরণা হিসাবে শুধুই কি ছিল রাজনীতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা নাকি ছিল আরও বড় কোনো কারণ? পুরোনো জীবনে ফিরে আসার সুযোগ থাকলেও কেন সে বেছে নিল আরও কঠিনতর এই সংগ্রামের জীবন? সুপ্রিয় চৌধুরীরই লেখা 'দ্রোহজ' উপন্যাসের এক মারকাটারি চরিত্র পূর্ণেন্দু ওরফে পুনেকে নিয়ে আলাদা করে বুনে ফেলা হয়েছে এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট.. জঙ্গলমহলের মাওবাদী আন্দোলন আর কলকাতার নকশাল আন্দোলন কিভাবে এক সুতোয় বাঁধা পড়েছে, সেই সত্যই আমাদের সামনে এনেছে এই উপন্যাস..
২০১৪ সালে লেখকের প্রথম উপন্যাস দ্রোহজ, বইটি আউট অফ প্রিন্ট ছিল প্রায় ১০ বছর, ২০২৪ সালে বইটি সংগ্রহ করে পড়ি, আসলে পড়ার ইচ্ছা ছিল অনেকদিন এর, বইটি পড়ে এক প্রকার মুগ্ধ হয়েছিলাম। এর পরই জানতে পারি দ্রোহজ বইটির একটি সিক্যুয়েল আছে "কেতজেল পাখি"। বইটি তাই সংগ্রহ করতে দেরি করিনি।। সুপ্রিয় বাবুর লেখা এমনিতেই অসাধারণ সেটা তার লেখা প্রথম উপন্যাস পড়ে বুঝতে পেরেছি।। বইটির নামটিও খুব প্রাসঙ্গিক, লাতিন আমেরিকার কেতজেল পাখি নাকি বন্দীদশায় বেঁচে থাকতে পারেনা। এই কাহিনী তেমনই এক কেতজেল পাখির যে কিনা আদতে এক প্রাক্তন নকশাল, অধুনা মাওবাদী সন্ত্রাসী নেতা।। এই বইটিকে প্রমোট করা হয়েছে লেখকের প্রথম উপন্যাস 'দ্রোহজ'-র সিকুয়েল হিসেবে। তবে 'দ্রোহজ' না পড়া থাকলেও এই বইয়ের রসাস্বাদন করতে পাঠকের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবেনা। সে কথা লেখকও প্রাক-কথনেই বলেছেন। আর যে পাঠক আগে 'দ্রোহজ' পড়েছেন তিনিও আগের কাহিনীর অজস্র রেফারেন্স এদিক ওদিক খুঁজে পাবেন।
✳️ পটভূমি -
দ্রোহজ ছিল নকশাল আন্দোলন এর জীবন্ত বিবরণ। সাতের দশকের সেই রাগী সময়। আগুনে নিঃশ্বাস ছাড়া সময়। রাস্তাঘাটে, অলিগলির মোড়ে খ্যাপাটে চেহারার সব ছেলেছোকরার দল। চোখে আগুন। কোমরে গোঁজা পাইপগান, হাতে হাতবোমা। দেওয়ালে স্টেনসিলে আঁকা চেয়ারম্যান মাও। তলায় ক্যাপশন, '৭০ দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন'। যেন ফুটন্ত একটা লাভাস্রোত ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা কোলকাতা জুড়ে। সেই আগুনের স্রোতে ঝাঁপ দিয়েছিল কত হাজার হাজার ছেলে মেয়েরা। তার মধ্যে ছিল, সুদীপ্ত, তার বাবা, বড়দা, মৃন্ময়, স্কুল আর পাড়ার বন্ধুরা। বলতে গেলে গোটা শহরটাই। রক্তগঙ্গা বইয়ে সে দ্রোহের আগুন নিভিয়েছিল রাষ্ট্র।নিহত হাজার হাজার ছেলে। ফেরার আর কারারুদ্ধ প্রায় কয়েকগুণ। অবশেষে ঘরে ফিরল সবাই, যারা জীবিত। শুধু ফিরলো না কয়েকজন.....সারা জীবনের জন্য ঠাঁই নিল জঙ্গলের গভীরতায়। আস্তে আস্তে গড়ে উঠল রেড করিডোর অথবা গেরিলা জোন। দেশের ভিতর আরেকটা দেশ। প্রধানমন্ত্রীর বয়ানে, 'দ্য সিঙ্গেল লার্জেস্ট ইন্টারনাল থ্রেট'। ১৬০ পাতার বইটি পুরো দাঁড়িয়ে ওই রেড করিডোরের গভীর জঙ্গলে।। যেখানে মাওবাদী নেতার সাথে কথপোকথনে ব্যস্ত সাংবাদিক অভিরুপ।। উপন্যাসটি এগিয়েছে একটা থ্রিলারের ধাঁচে, এগিয়ে চলেছে নিজের গতিতে। রেড করিডোর গড়ে ওঠার আগে লেখকের দক্ষ লেখনীতে ফুটে উঠেছে আদিবাসীদের প্রতিনিয়ত যন্ত্রণার কথা তাদের উপর হওয়া অন্যায় জুলুম ও অবিচার এর গল্প। আর সেই অন্যায় এর বিরুদ্ধে লড়তে থাকা একদল মানুষ এর গল্প।
✳️ পাঠ প্রতিক্রিয়া -
১৬০ পাতার বইটা পুরোটাই দাঁড়িয়ে ওই রেড করিডোর এর গভীর জঙ্গলে। পড়তে পড়তে অনেকবারই মনে হয়েছে রেড করিডোর এ এরা যা করছে, করেছে বেশ করেছে, সব মানুষেরই প্রতাবাদ জানানোর অধিকার আছে।। তাদের কাহিনী লেখক এক সাংবাদিকের জবানীতে অত্যন্ত মুন্সীয়ানার সাথে তুলে এনেছেন। সঙ্গে তুলে এনেছেন মাওবাদ ও সন্ত্রাস নিয়ে কিছু অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক সমকালীন প্রশ্ন। নিজের মতো করে উত্তর দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন তার কিছু কিছুর। লেখকর লেখা নিয়ে বেশি কিছু বলবো না। কারণ এত দক্ষ লেখনী নিয়ে আর কিছু বলার থাকে না।। নকশাল ও সমকালীন দেশের রাজনীতি নিয়ে যারা পড়তে চান দ্রোহজ ও কেতজেল পাখি কোনোভাবেই মিস করবেন না।