আমরা স্যাপিয়েনস, হোমো স্যাপিয়েনস। সুবিশাল মহাবিশ্বের এক সর্পিলাকার গ্যালাক্সির খুব সৌভাগ্যময় এলাকায় আমাদের নিবাস। এই এলাকার আদুরে নাম গোলডিলকস জোন। কীভাবে এই মহাবিশ্বের সূচনা ও বিকাশ হলো, নীলনয়না এই গ্রহে আমরা কবে এলাম, কীভাবে এলাম – এসব চিরাচরিত জিজ্ঞাসার উত্তর তোমরা হয়তো শুনেছো। হালফিলে বিজ্ঞান দিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর না পেলে, অনেকের কাছে স্বাদটা কেমন যেন পানসে মনে হয়। তোমরা জেনেছো, পৃথিবীর অবস্থাকে জগতের কেন্দ্র থেকে এককোণায় ঠেলে দিয়েছিলেন কোপারনিকাস। কিন্তু তারপরও আমাদের বিশেষত্ব ক্ষুণ্ণ হয় নি-এটা মনে হয় জানো না। ডারউইন এসে বোঝালেন-আমরা আলাদা কিচ্ছু না, বরং অন্যান্য পশুর মতই। তবুও আমাদের স্বপ্নগুলো ধূসর হলো না। আমরা এখনো স্বপ্ন দেখি, গল্প-কবিতা লিখি, কল্পনার ঘুড়ি উড়িয়ে দিই নীলাম্বরে!
বিজ্ঞানের সুধা পান করে তোমরা অনেক কিছু জেনেছো। আবার অনেক কিছুই জানো নি। কী জানো নি? কেন জানো নি? জানা কী দরকার? তোমার চিন্তার বাতায়নে মিষ্টি হাওয়া হয়ে মুখরিত হতে চাই, কানে কানে বলতে চাই – এসো, আমাদের গল্পটা আরো একবার শুনি। একটু ভিন্ন ধাঁচে, একটু ভিন্ন রঙে। আমরা হোমো স্যাপিয়েনস, আর এটা আমাদের গল্প।
"The truth has come and falsehood has vanished. Indeed, falsehood is bound to vanish"
বিজ্ঞানের মারপ্যাঁচ দিয়ে মানুষের ভেতর থেকে পরকাল ভাবনা আড়াল করে দিতে পারলে পাপ,পুন্যের আর ভাবনা থাকেনা। তখন সামগ্রীক ব্যাবস্থাটাই হয়ে দাঁড়ায় আত্তকেন্দ্রিক, আত্বত্রিপ্তির জন্য মানুষ হেন কোন পন্থা নেই যে অনুসরন করবেনা। মানুষের ভেতর মনুষ্যত্ব আর শিক্ষা তখন কলুষিত হয়ে যায়, এমনকি এ জল এক শ্রেনীর বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্ক পর্যন্ত গড়ায়। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি এই কলুষিত হওয়ার মাত্রা এতটাই গভীরে প্রবেশ করেছে যে সেখান থেকে বিজ্ঞানীদের ছাপিয়ে বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকও রেহাই পায়নি। দৃষ্টির ডানা মেলে দেখতে জানলে আমরা আবিস্কার করবো বিশ্বজুড়ে প্রকৃত বিজ্ঞানকে আড়াল করে বিজ্ঞানের নামে আমাদের যে ছাইপাস গেলানো হয় তার ভেতর প্রতারনা কতদূর গড়িয়েছে। রাফান আহমেদের এই বই যেন সে এক জানালা যা দিয়ে আপনি দেখতে পাবেন বিজ্ঞান আসলে কি, কি ভাবে সে কাজ করে আর কতদূর তাকে দুষিত করা হয়েছে। যাদের বিশ্বাসে বিজ্ঞান প্রতারনা চির ধরিয়েছে অথবা যারা এখনও কলুষিত হয়নি তাদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি এই বইকে করে তোলতে পারে সত্যিকারের বিজ্ঞানকে জানার এক উজ্জল নক্ষত্র পথ।
অনেক বছর ধরে ইনফ্লেশন তত্ত্ব, বিবর্তন তত্ত্বকে ‘নিশ্চিত সত্য বলে প্রচার করা হচ্ছে। যদিও এই তত্ত্বগুলাে নিয়ে অজস্র প্রশ্ন, খটকা রয়ে গেছে। তাই, সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে এসব প্রশ্নের উত্তর আসা আবশ্যক। সাধারণ পাঠকের। পক্ষে এই বিদ্যার অলিগলির ভিতরে গিয়ে খতিয়ে দেখার সময় সুযােগ হয় না। সেজন্য তরুণ লেখক ও চিকিৎসক ডা. রাফান এ বিষয়টি বিজ্ঞানের আতশকাচে খতিয়ে দেখে আপনাদের সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
একদম মহাবিশ্ব-সৃষ্টির-গােড়া-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব থেকে মানুষের গল্প শুরু করেছেন। মানুষের মাঝে মহাবিশ্বের বিকাশ নিয়ে যে ধারণা ধ্রুব সত্য বলে প্রচারিত, তাকে। খতিয়ে দেখেছেন। যেভাবে একটি বৈজ্ঞানিক অনুকল্প দাঁড়ায় এবং তা যাচাই করতে হয়, তা দিয়ে তিনি মহাবিশ্বের আজকের অবস্থায় আসার ব্যাখ্যাকে সাধারণ পাঠকের কাছে। উপস্থাপন করেছেন। মহাবিশ্বের সুনিপুণ সমন্বয়ের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলে পাঠককে দেখিয়েছেন কীভাবে এই সমন্বয়ের সর্বোত্তম ব্যাখ্যাকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। পশ্চিমা একাডেমিয়ার ভারী বই, জার্নাল ঘেঁটে গবেষকদের মতামত তুলে এনেছেন। এমন সব বিষয়ের অবতারণা করেছেন যা আমরা প্রায় কেউই জানি না!
চমকপ্রদ এই আলােচনা থেকে তিনি পাঠককে নিয়ে গেছেন বিজ্ঞানের ঘরে। নিজে চিকিৎসক হওয়ার সুবাদে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন মেডিকেলে পড়ার সময়। পাশাপাশি নিজ আগ্রহে বিজ্ঞানের দর্শন নিয়ে পড়ছেন। এডিনব্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষা কোর্সের মাধ্যমে বিজ্ঞানের দর্শন বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেছেন। এ দুইয়ের মিশেলে তিনি বিজ্ঞানের ঘরের আনাচে-কানাচে থেকে এমন সব বাস্তবতা তুলে এনেছেন, যা নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান অনুরাগীদের হতবাক করবে; হতাশও করতে পারে। তবে যারা মনখােলা রেখে শিখতে আগ্রহী, তারা এতে পুলকিত হবে।
বিজ্ঞানের ঘরে পাঠককে ঘুরিয়ে নিয়ে এরপর তিনি শুরু করেছেন প্রাণের কথা, আমাদের কথা। পাঠ্যবই ও পপসাইন্স বইগুলাে প্রাণের আবির্ভাব ও বিকাশ নিয়ে বিবর্তন তত্ত্বের আলােচনায় মুখর। মাধ্যমিক উচ্চ-মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্যবই ও বাংলাদেশের জনপ্রিয় বিজ্ঞান-লেখকের বিভিন্ন বই সামনে রেখে তিনি খোঁজ চালিয়েছেন অ্যাকাডেমিক রিসাের্সে প্রচলিত বিবর্তন তত্ত্বের মৌলিক কাঠামাের ছক এঁকে, বিভিন্ন বইতে বিবর্তনেরস্বপক্ষে-উপস্থাপন-করা উপাত্তগুলােকে বিশ্লেষণ করেছেন। বিবর্তনবাদের স্বপক্ষে যেসব রেটরিক দাড় করানাে হয়েছে, যেমন প্রাণের জাগতিক উৎপত্তি, বিভিন্ন প্রাণির ফসিল ও জিণে-থাকা সাদৃশ্য, মানুষ ও শিম্পাঞ্জির জিনােমে ৯৯ শতাংশ মিল, ডিএনএ’র ৯৮ শতাংশই আবর্জনা, চোখের ডিজাইন ত্রুটি, এপেনডিক্স অপ্রয়ােজনীয় অঙ্গ ইত্যাদির পক্ষে-বিপক্ষে-থাকা রিসার্চ পেপার ও মূলধারার গবেষকদের মত থেকে বাস্তবতা দেখিয়েছেন এবং বিবর্তন দিয়ে সব সমাধা হয়ে গেছে’—এমন ধারণার অসারতা প্রমাণ করে দিয়েছেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞান কোনাে মানুষ নয় যে—এক মুখে এক কথা বলে। আসলে অজস্র বিজ্ঞানীর শতশত রিসার্চে-পাওয়া হাজারটা মতামতের সমাহারে বিজ্ঞানের ক্ষণকালীন সিদ্ধান্ত গড়ে ওঠে মাত্রা যে-কোনাে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের পক্ষে-বিপক্ষে হাজারাে মতামত থাকে। রিসার্চ মেথডলজির ওপর ভিত্তি করে কোনাে রিসার্চ ইন্টারেস্টিং মনে হলেও, পরে দেখা যায়—ওই রিসার্চটি রিপ্রডিউস করা যাচ্ছে না বা তা শুধু অতি সীমিত ক্ষেত্রে কাজ করে অথবা রিসার্চ মেথডলজিটাই প্রশ্নবিদ্ধ! একেক বিজ্ঞানী একই ডাটা নিয়ে গবেষণা করে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে যায়। কাজেই বিজ্ঞান আসলে শত মুখে হাজার রকম কথা বলে। আর যা বলে তা অধিকাংশ সময়েই ভুল হয়। এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের কাছে। বিদঘুটে লাগতে পারে। কিন্তু যারা বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাথে জড়িত, তাদের কাছে এটাই বিজ্ঞানের আসল চেহারা।।
বক্ষ্যমাণ বইতে ডা. রাফান বিজ্ঞানের অন্তঃপুর থেকে তথ্য-উপাত্ত এনে বিবর্তবাদ নিয়ে প্রচলিত বয়ানকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখেছেন মাত্র। শুধু বিজ্ঞান নয়, বরং ইতিহাস ঘেঁটেও চমকপ্রদ তথ্য হাজির করেছেন। বইটি পড়লেই বুঝবেন লেখক বেশ ভালােভাবে সাইন্টিফিক লিটারেচারগুলাে ঘেঁটেই বইটি সাজানাের চেষ্টা করেছেন। আমার পড়ে বেশ ভালাে লেগেছে। বিশেষ করে—ডিএনএ’র ৯৮ শতাংশই জাঙ্ক, মানুষ ও শিম্পাঞ্জির জিনােমে ৯৯ শতাংশই একরকম ইত্যাদি দাবির বাস্তবতা দেখে অবাক হয়েছি। কেন বিবর্তনবাদের পক্ষের লােকেরা এ রিসার্চগুলাে গ্রহণ করতে এত ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তা বােধগম্য হয়েছে আমার।।
এ বইটিকে বিবর্তনবাদ নিয়ে বাংলায় লেখা একটি চমৎকার লিটারেচার—বললে অত্যুক্তি হবে না। ইউনিভার্সিটি পড়ুয়াদের জন্য বইটি সুখপাঠ্য হবে বলেই মনে করি। তবে বিশেষ করে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এই বইটি থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে। কারণ তাদের বইগুলােতে বিবর্তনবাদের পক্ষে শুধু একটি ক্ষুদ্র অংশ দেখানাে হয়েছে, বিবর্তনের জয়গান গাওয়া হয়েছে। কিন্তু ছবির পুরােটা সম্পর্কে ধারণা পেতে এই বইটি পড়া দরকার। সাইন্টিফিক রিসার্চ : কেন ও কীভাবে কাজ করে—তা বুঝতেও এই বইটি বেশ সাহায্য করবে। এরকম একটি বই লেখার জন্য ডা. রাফানকে ধন্যবাদ।
বলতে গেলে অনেক কথা! আর এক বাক্যে বললে লেখক "বিজ্ঞানধর্ম" এর ব্লাসফেমি করেছেন! সুখপাঠ্য। ভেবেছিলাম কাঠখোট্টা, নিরস বৈজ্ঞানিক আলাপ হবে। ধারণা ভুল ছিল। লেখক বায়োলজির ক্লাস নিতেন কিনা কে জানে! তবে নিলে ক্লাস উপভোগ্য হতো সন্দেহ নেই।
৮৬ পৃষ্ঠায়, প্রাণের গান অধ্যায়ের সাবহেডিং কোট হিসেবে দেয়া, "আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে"টা চেন্জ করে দিলে ভালো হবে।
বইটির কভার যেমন চমৎকার বইটির ভেতরের কথা তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি চমৎকার। বইটিতে প্রায় প্রতিটি তথ্যকে রেফারেন্স সহ তুলে ধরা হয়েছে তথ্য লেখার শেষেই। যার ফলে যেকোনো মানুষ যদি বিশ্বাস করতে না চায় তাহলে রেফারেন্স চেক করেই দেখতে পারে।
বইটিতে আমাদের দেশের কিছু বিজ্ঞান বই ও উচ্চ মাধ্যমিকের জীববিজ্ঞান বই এর সেই দিক গুলো উন্মোচন করা হয়েছে যা আমাদের কাছে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বা আমাদের কাছে সত্য তুলে ধরা হয় নি। বইটিতে বিবর্তনবাদীদের নানা চক্রান্ত দেখানো হয়েছে।
হেকেল এর ভণ্ডামো সত্যিই অবাক করার মত। কিংবা পিলটডাউন ম্যান ফসিল এর জোচ্চুরি ছিল হাস্যকর ব্যাপার। কিংবা আরকিওপটেরিক্স এবং ঘোড়ার বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের যা জানানো হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিকে তার ভুল তুলে ধরা।
মিলার উরির পরীক্ষা, ডারউইনের ট্রি অফ লাইফ ছাড়াও আরও অনেক কিছুর আসল সত্য এই বইটিতে আমাদের মাঝে তুলে ধরা হয়েছে। কিংবা এলিয়েন সম্পর্কে অতিরিক্ত মাতামাতি নিয়েও লেখক তার এই অসাধারণ বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে।
জীববিজ্ঞান এর কাঠখটটো নাম গুলোর কারণে আমার জীববিজ্ঞানকে অতিষ্ঠ লাগে তাই বইয়ে যখন হোমোলজিসহ আরও কিছু বিষয় তুলে ধরা হচ্ছিল তখন খানিকটা বিরক্ত হলেও বইটি শেষ করার পর মনে হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ্ নিঃসন্দেহে জীবনীর সেরা বইগুলোর একটি পরলাম।
আমি বইটি সকলকেই পড়ে দেখার জন্য অনুরোধ করব বিশেষ করে ডারউইন এর বিবর্তন তত্ত্বকে যারা বিশ্বাস করে।
শেল্ফে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা বইটা অনেক কষ্টে সৃষ্টে শেষ করলাম! যে বইয়ের ২৫ পৃষ্ঠা জুড়ে শুধু তথ্যসূত্রই থাকে, সে বইয়ের রিভিউ লিখতে গেলে হাত কাঁপবে এটাই স্বাভাবিক। কলা ব্যবসায়ী ও বিজ্ঞানিরা এই বই পড়ে কি প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটা দেখার জন্য কৌতুহল হচ্ছে।
দশ বছর আগেও বাংলায় বিজ্ঞানের নামে যেসব অপসংস্কৃতির আমদানি হয়েছিলো তাদের পুরোহিতরা আজ হারিয়ে গেছে। কিছু ষণ্ডামার্কা পুরোহিত কোনোমতে টেনে নিয়ে চলেছেন এই অপসংস্কৃতি।
যাইহোক!
নাস্তিকদের জবাবে লেখা যথেষ্ট হয়েছে, আর ভাল্লাগেনা নাস্তিকদের কার্যকলাপ৷ পশ্চিমা বুলি য কতটা ফাঁপা সেটাও দেখানো হয়েছে এবছরই (পড়ুন, ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২.০) আর এখন এটা। বাংলায় বিবর্তনবাদকে একদম সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিকমানের একটা বই এটি৷ আমি তো মনে করি উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বইটা পড়া বাধ্যতামূলক করা উচিৎ।
বইটা পড়ে বইয়ের কন্টেন্টের চেয়ে কিছু মানুষের নৈতিকতা আর চরিত্র নিয়ে বেশী ভাবছি। এই মানুষগুলোকে আমি একদম নিষ্পাপ ভাবতাম। চরিত্রের কথা বাদই দিলাম, তারা যেসব লেখা বই আকারে আমাদের গেলাতেন সেসব পুরোপুরিভাবে ভিত্তিহীন আর বানোয়াট কথায় পরিপূর্ণ অথচ সেসবকে একদম অকাট্য ফ্যাক্ট হিসেবে গেলানো হয়েছে আমাদের।
আফসোস, যদি আমাদের স্যারেরা বইগুলো একবার পড়তেন। আসলে দেখেও যদি না দেখার ভান করেন তাহলে আর বলার কিছু নাই।
বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানবাদ। শব্দ দুটি শুনতে প্রায় কাছাকাছি মনে হলেও পার্থক্য বিস্তর। বিজ্ঞান প্রকৃতিতে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার জাগতিক ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করে। আর বিজ্ঞানবাদ গুটিকয়েক মতবাদ ও বিশ্বাসের সমষ্টি মাত্র। বিজ্ঞান যেহেতু পর্যবেক্ষণ নির্ভর, তাই সময়ের পরিক্রমায় বিজ্ঞানের দেয়া বিভিন্ন ত্বত্ত্ব ও ধারণা পরিবর্তিত এবং সংশোধিত হয়। একটি সহজ উদাহরণ দেই : প্রথমদিকে মনে করা হত সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু কিছুকাল পরে সে ধারণা পরিবর্তিত হয়ে নতুন ধারণা প্রবর্তিত হয় সূর্য নয় বরং পৃথিবীই সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে এবং সূর্য স্থির থাকে। কালের আবর্তে এই ধারণাও পরিবর্তন হয়ে এমন দাঁড়ায় যে সূর্য ও পৃথিবী উভয়ই নিজ নিজ কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে আজকে যে ত্বত্ত্ব বিজ্ঞানের নামে একেবারে নির্ভুল ভেবে আমরা বসে আছি তা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু কিছু নামদারী বিজ্ঞানবাদী আমাদেরকে সেই পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া ধ্যান-ধারণাকেই আঁকড়ে থাকতে নানা ছলে-কলে বাধ্য করানোর চেষ্টায় লিপ্ত। আমাদের দেশে প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকে এই ব্যাধির ছাপ স্পষ্টতই প্রতীয়মান। দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানের নামে আমাদের এসব আবর্জনা গিলানো হচ্ছে। এসব আবর্জনা পরিষ্কার করতে, বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের স্বরূপে চিনতে চিন্তা করতে পাঠককে হোমো সেপিয়েন্স Retelling Our Story বইটি কিছুটা হলেও সাহায্য করবে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বইটি বিজ্ঞান পাঠে কষ্টিপাথর রূপে কাজ করবে। কাটা দিয়ে কাটা তোলার মতো বিজ্ঞানবাদকে বিজ্ঞানের আতশে দেখতে সাহায্য করবে। এই বইয়ের ১৮ টি অধ্যায়ে মহাবিশ্ব, প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তন নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। পরিশেষে বলতে চাই উন্মুক্ত হৃদয় নিয়ে পড়লে বইটি পাঠকের জন্য নতুন করে ভাবনার খোরক হবে।
খ্রিস্টান মিশনারীদের লেখা থেকে স্রেফ "চুরি" করা একটি বই। আমরা সবাই জানি রেফারেন্স হিসাবে কোনো কোনো ওয়েবসাইট গুলো দূর্বল ও অযোগ্য। বিজ্ঞান ভিত্তিক কোনো আর্টিকেল লিখতে আপনি যদি ক্রিয়েশন.কম টাইপের কোনো সাইট ব্যাবহার করেন তবে আপনার রেফারেন্স গ্রহণযোগ্য হয় না কেননা এই মিশনারীরা জার্নাল থেকে সস্তা চেরিপিকিং, বিজ্ঞানীদের কোট মাইনিং, তাদের থার্ড ক্লাস মিস ইন্টারপ্রিটেশান ও স্ট্রেইট আপ মিথ্যা দিয়ে আর্টিকেল লিখে তাদের এইসব সস্তা সুডোসাইন্টিফিক কাজের জন্য তাদের কোনো আর্টিকেল কোনো বৈজ্ঞানিক সংস্থা থেকে ভালো রিভিউ ও পায় না। আর টেস্টেবল, ফসলিফায়েবল ও প্রেডিকশন মেক করার মত কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কথা নাই বললাম।
এদের থেকে নিন্ম লেভেলে আছে মুমিন দ্বীনের পথের দাঈয়ী। এরা যে চাতুরতার সাথে বিজ্ঞানিক কোনো থিউরির পিছে লাগতেও পারবে এটাও তেমন কেউ আশাও করে না।
হওতোবা আপনারা জানেন না, তবে এর থেকেও একটা নিন্ম মানের একটা লেভেল আছে। এরা হচ্ছে সে সকল মোমেন দাঈয়ী যারা খ্রিস্টান মিশনারীদের এইলেখা করে চুরি করে তাদের স্টাইল মেরে দিয়েই "নিজের মৌলিক লেখা বলে ছেড়ে দেয়।" ডাঃ রাফানের বই এর বিতক্রম নয়।
বইটার খোঁজ পাই নেগেটিভ মার্কেটিং এর সুবাধে। মুক্তমনা না��ধারি কতিপয় লোকের লাইভে অনেকক্ষণ ধরে আলাপ দেখি, একটা লম্বা আর্টিকেলও পড়া হয়। অভিযোগ হলো - লেখক নাকি খ্রিস্টান মিশনারিদের থেকে চুরি করে বই লিখেছেন। গুরুতর অভিযোগ বটে। ভাবলাম নিজে যাচাই করে দেখি অভিযোগগুলো, কি-এমন বই যে এর জন্য এত হুলুস্থুল। লকডাউনে বইটা পড়ার পাশাপাশি ইংরেজি বইটাও নেট থেকে উল্টালাম। আমার মনে হয়েছে মূল ইংরেজি বইটা থেকে এই বই গঠনগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাশাপাশি যেসব আপাত মিল দেখানো হয় সেগুলো বিবর্তনের টপিক আলোচনায় আসবেই। অবাক করার মত ব্যাপার হলো লেখক বিভিন্ন স্থানে মূল তথ্যসূত্র উল্লেখ করেছেন, সেটাকে এড়িয়ে গিয়ে তার নামে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ করা হয়েছে। সম্ভবত লেখককে ইচ্ছাকৃতভাবে মানহানি করার জন্য এসব করা হয়েছে। মোটের উপর বইটি আমার ভালো লেগছে। দেশে এই ধাঁচ আর মানের বই নেই বললেই চলে। সববিষয়ে একমত না হলেও চিন্তার জগতে যে একটা শক্ত স্রোত টের প��য়েছি তার জন্য লেখককে ধন্যবাদ দেয়াই যায়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় খুব সুচতুর ভাবে বিবর্তনবাদ কে অকাট্য একটি বিষয় হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেও তাই? বিবর্তন কতটুকু বৈজ্ঞানিক নাকি এর পেছনে আছে স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ? বিবর্তন নিয়ে কি Academia এর সবাই একমত? এসব কিছু এবং তার থেকেও বেশি কিছু বিষয় আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে। ৯/১০ শ্রেণি থেকে শুরু করে যেকোন শ্রেণির পাঠকের জন্য সুপাঠ্য একটি বই।
Unknowingly, I also used to think that maybe science doesn't have that many flaws! Perhaps there are no debates among scientific people. That's what our education system teaches us! Pathetic. Thanks to the writer for showing the most accurate definition of science. Loved it!
বিবর্তনবাদ নিয়ে ছোট থেকেই শুনে আসছি। বুঝে হোক বা না বুঝে- এটাকে বিশ্বাস করাও শুরু করেছিলাম। কিন্তু বিজ্ঞান সম্বন্ধে যখন একটু একটু করে জানলাম তখন থেকেই আমার ভুল ভাঙতে শুরু করে। হিউম্যান ফিজিওলজি, জেনেটিক্স ইত্যাদি সম্বন্ধে যখন বিশদ জানতে শুরু করলাম তখন আমি সহজেই উপলব্ধি করলাম যে বিবর্তনবাদ সঠিক কোনো তত্ত্ব নয়। নানা গোঁজামিলপূর্ণ জিনিস দিয়ে ভরপুর এ তত্ত্ব। আসলে যারা স্রষ্টায় বিশ্বাস করে না তারা জীবের উৎপত্তির জাগতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করায় বা করাতে চায়। বিবর্তনবাদ সেরকমই একটি ব্যাপার। কিন্তু এ নিয়ে আমার বিস্তারিত জানার প্রয়োজন ছিল। কেননা আমাদের একাডেমিক পড়াশোনায় এই তত্ত্বটাকে গ্রহণযোগ্যতার কাতারে ফেলা হয়েছে। উপরন্তু বিবর্তনবাদ নিয়ে নিজের মধ্যে যেসকল প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল সেগুলোর কোনো সদুত্তর আমি আমার একাডেমিক পড়াশোনার মধ্যে পাইনি। উল্টো কিছু কিছু গোঁজামিল দেখতে পেয়েছি, যা বিবর্তনবাদ দিয়ে আমার বিপরীত অবস্থানকে আরো দৃঢ় করে দিয়েছে! তাছাড়াও আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ, যাদের অবদানে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারছি, জানতে পারছি, তারাও বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী নন। তাই আমার এমন কিছু তথ্যসূত্র বা বইয়ের প্রয়োজন ছিল যা আমাকে এই সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে সহযোগিতা করবে। এই বইটির মাধ্যমে আমি আমার সেই প্রয়োজন পূরণ করতে পেরেছি। অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র ও বিশ্লেষণের সন্নিবেশ রয়েছে এই বইটিতে। কিন্তু জানার কোনো শেষ নেই। মনুষ্যসৃষ্ট যেকোনো জিনিসেরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই বইটিও তার উর্ধে্ব নয়। তাই প্রতিনিয়তই জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার কাজটা করে চলেছি।
গত ১৪ তারিখ স্বচ্ছ দা'র কাছে একটি বই চাইলাম পড়তে। স্বচ্ছ দা বেশ কিছু ভালো বই দেখালো। তবে সেখান থেকে আমার নজর গেল , "হোমো স্যাপিয়েন্স রিটেলিং আওয়ার স্টোরি "। বেস, নিয়ে নিলাম। পড়তে শুরু করলাম পড়দিন থেকে। বইটি জীববিজ্ঞান বিষয়ে হলেও আমি সবাইকে বলব পড়তে।কারণ এখানে বিবর্তন থেকে শুরু করে এলিয়েন নিয়ে মানুষের ধারণা, বিজ্ঞানের অন্ধকার দিক, ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি গুরুত্বসহ সুগঠিত এবং প্রমাণ সমৃদ্ধ। আমি যদিও বেশ কিছু জীব বিজ্ঞানের জিনিস বুঝিনি। ( কারণ আমি জীব বিজ্ঞান পছন্দ করি না একদমই ) । তবুও মূল যে বিষয় গুলো লেখক আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন সেগুলো বুঝেছি। বইটি শুরু করার পর ভাববেন এতো আমি জানিই, এটা সেটা। হ্যা, আমরা আধুনিকায়নের দৌলতে অনেক কিছু জানি। কিন্তু সুস্পষ্ট নয়, ধোয়াশা। আর ধোয়াশা জ্ঞান কখনোই মঙ্গলময় হতে পারেনা।
এখন ডা. রাফান আহমেদ সম্পর্কে কিছু বলি। তিনি একজন ধর্ম প্রাণ এবং পরিচ্ছন্ন লেখক। সে প্রতিটা লাইন লিখার আগে সুস্পন্ন ভাবে তা নিয়ে গবেষনা করেছে। এবং কি প্রতিটা লাইনের রেফারেন্সও দিয়েছেন। আশা করি সকলের ভালো লাগবে। আর যাদের ইচ্ছা জীব বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার তাদের জন্য এটা মহামূল্যবান রত্নের মত হতে পারে। এতে করে আপনারা চিরাচরিত ভূল তথ্যগুলো থেকে বেড়িয়ে বিজ্ঞান, বিশেষ করে জীব বিজ্ঞানের আসল রূপ দেখতে পাবেন।
এই বইটা গুলির মতন, শক্তিশালী বুলেট, একটার পর একটা।
বেশ নাতিদীর্ঘ হলেও সময় নিয়ে পড়তে হয়েছে। লেখকের অনুবাদ খুবই প্রাঞ্জল আর রেফারেন্স গুলোও খুবই উপকারি পড়ার জন্য।
ধর্মগুরুরা যদি ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা করতে পারেন, মানব পন্ডিতরা কেনো বিজ্ঞানকে নিয়ে করবেন না? কেউ কেউ যে সত্যিই করেন তার মূহ্যমান প্রকাশ ফুটে উঠেছে এই বইয়ে। একসময় এরিস্টটল বলেছেন তাই আমরা মেনে নিলাম টাইপের যুগ ছিল, এখন হয়তো কিছুটা বলদেছে, হয়তো শুধু চরিত্রগুলোই। বিজ্ঞান, বিজ্ঞানবাদ, বিজ্ঞানের দর্শন, সৌন্দর্য ও সীমাবদ্ধতা লেখক গুছিয়ে প্রকাশ করেছেন। সত্যিকারের বোধগম্য ধর্মীয় বয়ান মোটাদাগে কখনোই সত্য প্রমানিত বৈজ্ঞানিক অনুধাবন কে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। আর কিছু কিছু বিষয়ে আমরা বিজ্ঞান অথবা যুক্তিকে লিটমাস হিসেবে ব্যবহার করতে পারবো না, মানুষের মাত্রাভিত্তিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে অথবা অপ্রতুল। তাই একজনের গীত গাইতে যেয়ে অন্যজনের নিন্দা খুব একটা শোভনীয় নয়।
লেখক ডিজাইন বা ID এর কিছু ক্ষেত্র তুলে ধরেছেন যা প্রশংসনীয়। হয়ত কনটিনজেন্সি নিয়েও কিছু অংশ তুলে ধরলে বেশ হতো।