আমি যখন কাজী নজরুল ইসলামের “সঞ্চিতা” পড়তে বসি, তখন মনে হয়েছিল—আমি যেন হঠাৎ এক ঝঞ্ঝার মুখোমুখি হয়েছি। আবার কিছু দূর এগোতেই বুঝলাম, শুধু ঝড় নয়, এখানে আছে ফুলের সুগন্ধও, প্রেমিক হৃদয়ের অশ্রুও, মানবতার মহান আহ্বানও। এ বইটি নিছক কবিতার সংকলন নয়, বরং কবির আত্মার বহুস্তরীয় প্রকাশ।
“বিদ্রোহী” কবিতা পড়তে গিয়ে যেন বুকের ভেতর কাঁপন জেগে উঠেছিল—
“আমি ঝঞ্ঝার মতন তাণ্ডব-নৃত্য করি বিশ্বজগৎ মহাশূন্যে।”
এই ঘোষণার মধ্যে আমি বুঝলাম, নজরুল কেবল এক কবি নন, তিনি যুগের বজ্রকণ্ঠ। তাঁর বিদ্রোহ কেবল রাজনীতির বা শাসকবিরোধী নয়, বরং মানুষের আত্মমুক্তির আকাঙ্ক্ষারও প্রতিধ্বনি।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, সেই একই নজরুল আবার একেবারেই ভিন্ন রূপে আমার কাছে ধরা দিলেন। যখন পড়লাম “দোলনচাঁপা দোলে রাতে, দোলে তার সোনালি বাতাসে”—মনে হলো এই তো অন্য এক নজরুল, যার হৃদয় প্রেমে, প্রকৃতিতে আর স্নিগ্ধতাতে ভিজে গেছে। বিদ্রোহের ঝড় আর প্রেমের মাধুর্য—দুটো বিপরীত স্রোতকে একসাথে ধারণ করতে পেরেছেন তিনি। আমি পড়তে পড়তে উপলব্ধি করেছি, এটাই নজরুলের মহিমা।
“সঞ্চিতা”-য় আরেকটি যে দিক আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে, তা হলো তাঁর মানবতাবাদ। যখন তিনি বলেন—
“হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারি, বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।”
তখন মনে হয়েছে, এ কণ্ঠ শুধু বাংলার নয়, সমগ্র মানবতার। ধর্ম-বর্ণের বিভেদ অতিক্রম করে নজরুল মানুষের জয়গান গেয়েছেন। আমি পড়তে পড়তে অনুভব করেছি, কবি যেন আমাকেই প্রশ্ন করছেন—আমি কি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখেছি?
আরেকটা দিক আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে—তাঁর কবিতার সুরেলা ছন্দ। পড়তে পড়তেই মনে হয়েছে যেন কোনো গান শুনছি। তাঁর কবিতার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ধ্বনি সংগীতের মতোই বয়ে চলে। এ কারণেই হয়তো নজরুলের কবিতা গেয়ে ওঠে, বাজে বাঁশির মতো, কখনো শোনায় ঝড়ের মতো। আমি বুঝেছি, কবি আসলে সংগীতেরই সন্তান।
__ফোকলোর চর্চায় নজরুল__
নজরুলকে আমি যতই পড়েছি, ততই মনে হয়েছে তিনি কেবল আধুনিক কবি নন, ফোকলোরেরও এক প্রাণবান ধারক। শৈশবের গ্রামীণ জীবনে বাউল, মরমি গান, যাত্রা আর লোককাহিনী তাঁর শিরায়-শিরায় প্রবাহিত হয়েছিল। “সঞ্চিতা”-য় সেই লোকজ উপাদান আমি স্পষ্টভাবে খুঁজে পেয়েছি।
আমি লক্ষ্য করেছি, তাঁর উপমা-চিত্রকল্প অনেকটাই লোকপ্রাণের সঙ্গে যুক্ত। বজ্র, অগ্নি, ঝড়, নদী—এসব চিরচেনা গ্রামীণ প্রতীক। তাঁর ছন্দে ভাটিয়ালির ঢেউ, তাঁর ভাষায় মরমি সাধকের সুর। কখনো মনে হয়েছে, তিনি যেন লোককবিতাকে আধুনিক রূপে ঢেলে দিয়েছেন।
বিশেষ করে তাঁর সংগীতে যে ফোকলোরের প্রভাব, তা অনস্বীকার্য। কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি, মারফতি সুর তিনি ব্যবহার করেছেন এমনভাবে, যাতে লোকসংস্কৃতি আধুনিক সাহিত্যের সাথে যুক্ত হয়েছে। আমি মনে করি, নজরুল ফোকলোরকে কেবল ব্যবহার করেননি, বরং একে নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
“সঞ্চিতা” পড়ে আমার মনে হয়েছে—এ শুধু কবিতার বই নয়, এটি যেন এক আলো-ঝড়। এখানে বিদ্রোহ আছে, প্রেম আছে, মানবতা আছে, আবার লোকজ সুরও আছে। আমার কাছে এটি এক অমূল্য সম্পদ, যা একইসাথে উদ্দীপ্ত করে, আবেগে ভরায়, আবার গভীরভাবে ভাবায়।
আমার উপলব্ধি—“সঞ্চিতা” হলো সেই কাব্যগ্রন্থ, যেখানে নজরুল নিজেকে চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিদ্রোহী কবি, প্রেমিক কবি, মানবতার কবি এবং ফোকলোরের আধুনিক রূপকার হিসেবে।