বিবি থেকে বেগম-এ বিধৃত হয়েছে বিশ শতকের বাঙালি মুসলমান নারীর ক্রমবিবর্তনের ইতহাস। বাঙালি মুসলামমান নারী দশকের পর দশক ধরে উচ্চ থেকে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছে। উচ্চ থেকে উচ্চতর পদেও আসীন হয়েছে, কিন্তু ভেতরে তার চেতনা অজাগ্রত, ভেতরে সে শোচনীয় রকম বিকলাঙ্গ। তার চেতনা অজাগ্রত ও অবিকশিত এ কারণে নয় যে সে অপরাগ; এ কারণে যে সে সুবিধাবাদী ও পরজীবী স্বভাবসম্পন্ন। তাই নারীর পক্ষে এখনো হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত মানুষ। অথচ এ বঙ্গে রটনা এমন যে এখানে আবির্ভূত হয়েছিলেন মহানারীগণ এবং তাদের মহান পৃষ্ঠপোষকেরা এবং মহাসমারোহে ওই মহা ভাবমূর্তিসকল পূজিত হয় এখানে। আকিমুন রহমান তন্ন তন্ন বিশ্লেষণ করে দেখান ওইসব ভাবমূর্তি সামান্যতা, দেখান নারী প্রতিভাদের মৌলিকতাহীনতা। তার বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে তোলেযে নারী প্রতিভারাও অন্য সাধারণ নারীর মতোই পুরুষের দেয়া ছক অনুসারেই বিকশিত হয়েছে। এই নির্মোহ মূল্যায়ন ক্ষিপ্ত করে তোলে এই সমাজের অন্ধ ভাবমূর্তি পূজারীদের। ৫৬ জন প্রগতিপন্থী বুদ্ধিজীবীরা সম্মিলিত বিবৃতি লেখাটির প্রকাশ বন্ধ করে দিতে সমর্থ হয় পাক্ষিক শৈলী পত্রিকায়।
ভীষণ তীক্ষ্ণ এবং তীব্র ভাষায় বাংলা ভাষার কিছু নারী চরিত্র, তাদের রচয়িতা এবং নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে খ্যাত কয়েকজন মনীষী সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা করেছেন লেখক। আনোয়ারা, মনোয়ারা, সালেহা চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন তারা কতটা পুরুষতন্ত্রের ধারক বাহক। এটা একদম সত্যি যে এই উপন্যাসগুলো ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল এবং একইসাথে তৎকালীন সমাজের অনেকের জন্যই সেগুলো আবির্ভূত হয়েছিল নারীদের আদর্শ জীবনযাপন বিধি রূপে। প্রতিটা উপন্যাসের মূল সুর নারীরা পুরুষদের অধস্তন এবং স্বামীরা স্ত্রীদের প্রভু। শিক্ষা থেকে দৈনন্দিন আচরণ সবই সেই পুরুষ প্রভুদের অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত হত। আর মূঢ় নারীরা সেগুলোকেই নিজেদের অধিকার ভেবে ডগমগ হয়ে থাকত। দুঃখের বিষয়, আজকালকার অনেক উচ্চশিক্ষিত মেয়েরাও নিজেদের পরিপূর্ণ মানুষ ভাবতে পারে না। এর পেছনে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুরুষতন্ত্রের প্রভাব যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী মেয়েদের নিজেদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে ভেবে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অক্ষমতা। প্রবন্ধগ্রন্থটির সাহসী এবং চমকপ্রদ দিক হচ্ছে বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল প্রমুখ মনীষীদের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়া যে তাঁরাও আসলে পতিপালিত নারী বুদ্ধিজীবীই ছিলেন। স্বামীদের নাম থেকে শুরু করে কোন আচরণ, পর্দা কোনটাই ব্যক্তি জীবনে নিজেরা বর্জন করতে পারেন নি। তাঁদের চোখে স্বামীর যথার্থ সঙ্গিনী হয়ে ওঠাই নারীশিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। এখানে সম্পূর্ণরূপে আসলে লেখকের সাথে একমত হওয়া কঠিন৷ প্রতিটা অভিযোগ সত্যি হলেও সে যুগে এক লাফে এগিয়ে একদম স্বাধীনভাবে নারীশিক্ষার প্রবর্তন এবং নিজেদেরকে স্বাবলম্বী মানুষ ভাবা কি একজন নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল? বিরাট পরিবর্তন কি একদিনে সম্ভব? ধাপে ধাপে না এগুলো তো অনেক বড় আয়োজন ও মুখ থুবড়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে উল্লিখিত নারীরা নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে বর্তমানের সাথে সংজ্ঞায় পুরোপুরি না মিললেও তাঁদের অবদানকে কোনোভাবেই এক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু প্রবন্ধটির ঋজু ভাষা এবং যুক্তির তীক্ষ্ণতা যে পুরুষতন্ত্রের শিকড়ে এক শক্ত আঘাত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিবাদী হলেও যুক্তি এবং ভাষার সাবলীলতার কারণে প্রবন্ধগ্রন্থটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য এবং প্রয়োজনীয়।