গত একশো বছরে মেয়েদের সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখন উচ্চশিক্ষা লাভ করে তারা হচ্ছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, বৈজ্ঞানিক। শিক্ষা-সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে তাঁরা তাঁদের বিদ্যা, বুদ্ধি, মননশীলতার পরিচয় রাখছেন। কিন্তু বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে মহিলা রহস্যভেদীদের সংখ্যা আজও সীমিত। বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য জনপ্রিয় হলেও অনেকের কাছে তা প্রথম শ্রেণীর সাহিত্য বলে গণ্য হয় না। কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যে রহস্য ও গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ মর্যাদা আছে। তার পথিকৃৎদের মধ্যে এডগার অ্যালান পো, আর্থার কনান ডয়েল, জি.কে.. চেষ্টারটন প্রভৃতির পাশে আগাথা ক্রিস্টির নাম এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়।
অন্যান্য ভাষার খবর রাখি না, তবে এক বাংলা ভাষাতেই মেয়ে-গোয়েন্দাদের কীর্তিকলাপ নিয়ে গত শতকের শেষ কয়েক দশক থেকে অদ্যাবধি যত গল্প লেখা হয়েছে, তারও সংখ্যা নেহাত কম নয়। তার থেকে বাছাই করে সতেরোটি গল্প নিয়ে এবার হল এই সংকলন। গোয়েন্দা-গল্প পড়তে যারা ভালবাসেন, এটি তাদের কাছে যোগ্য সমাদর পাবে, এমন আশা তো করাই যায়।
যেসকল গল্পগুলি এই বইতে রয়েছে- মেয়ে গোয়েন্দার ইতিহাস লেখক ও তাঁদের গোয়েন্দা বিন্দিপিসীর গোয়েন্দাগিরি- সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় ইন্দুমতীর সঙ্কট- সুকুমার সেন হীরের টুকরো- গজেন্দ্রকুমার মিত্র গল্পই কী অল্প- আশাপূর্ণা দেবী ডিটেকটিভ নন্দিনী সোম ও দানুমামা- অজিতকৃষ্ণ বসু সিমলার মামলা- নলিনী দাশ সেভেন পার্লস- মঞ্জিল সেন বাচ্চাটা এতো কাদছিল কেন ?- পবিত্র সরকার বিষহরির প্রাসাদ- নবনীতা দেব সেন উত্তরাধিকারী- শিবানী রায়চৌধুরী বুনো হাঁসের খোঁজে- হীরেন চট্টোপাধ্যায় গাগীর এ.বি.সি.ডি. রহস্য- তপন বন্দ্যোপাধ্যায় মারণ বাতাস- সুচিত্রা ভট্টাচার্য আর. ডি. এক্স. রহস্য- স্বাতী ভট্টাচার্য দিয়ালা যখন গোয়েন্দা- রাজেশ বসু বেনেট মুলারের পোট্রেট- হিমাদ্রীকিশোর দাশগুপ্ত গিফট হ্যাম্পার- আশিস কর্মকার যথার্থ কাজের মেয়ে- আগাথা ক্রিস্টি (অনুবাদ : রমেন গাঙ্গুলী)
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জন্ম ফরিদপুর জেলার চান্দ্রা গ্রামে, ১৯ অক্টোবর ১৯২৪।পিতা জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের বিখ্যাত অধ্যাপক।শিক্ষা: বঙ্গবাসী ও মিত্র স্কুল; বঙ্গবাসী ও সেন্ট পল’স কলেজ।সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দৈনিক ‘প্রত্যহ’ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে আনন্দবাজার প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। একসময় ছিলেন ‘আনন্দমেলা’র সম্পাদক এবং পরবর্তীকালে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র সম্পাদকীয় উপদেষ্টা।কবিতা লিখছেন শৈশব থেকে। কবিতাগ্রন্থ ছাড়া আছে কবিতা-বিষয়ক আলোচনা-গ্রন্থ। আর আছে উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনি।শব্দ-ভাষা-বানান-শৈলী নিয়ে রচিত বিখ্যাত বই ‘বাংলা: কী লিখবেন, কেন লিখবেন’।পুরস্কার: ১৯৫৮ উল্টোরথ, ১৯৭৩ তারাশঙ্কর, ১৯৭৪ সাহিত্য অকাদেমি, ১৯৭৬ আনন্দ। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি (২০০৪-২০১১)। সাহিত্য অকাদেমির ফেলো ২০১৬। এশিয়াটিক সোসাইটির ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণপদক ২০১৫। কলকাতা (২০০৭), বর্ধমান (২০০৮), কল্যাণী (২০১০) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডি লিট।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বিদ্যাসাগর লেকচারার হিসাবে ১৯৭৫ সালে প্রদত্ত বক্তৃতামালা ‘কবিতার কী ও কেন’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। ১৯৯০ সালে লিয়েজে বিশ্বকবি-সম্মেলনে একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি।শখ: ব্রিজ ও ভ্রমণ।
সত্যি বলতে মিতিন মাসি আর গার্গী ছাড়া বাংলা সাহিত্যের অন্য নারী গোয়েন্দা চরিত্রের সাথে আমার পরিচয় ছিল না। আর ইংরেজি সাহিত্যের ক্ষেত্রে মিস মার্পলের নাম জানা ছিল। এই বইয়ের মাধ্যমে না জানা অনেক নারী গোয়েন্দাদের সাথে পরিচয় হলো। এভাবে দুই মলাটের ভেতর এতগুলো জানা-অজানা মেয়ে গোয়েন্দাদের জড়ো করার কারণে বইটা বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু পুরোপুরি পাঁচ দেওয়া গেলো না অসংখ্য বানান ভুল বা প্রিন্টিং মিস্টেকের কারণে যেটা মাঝেমাঝেই বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে।
এবার যদি সবগুলো গল্পের মধ্যে থেকে সার্থক নারী গোয়েন্দা কে বা কারা তা যদি বলতে হয় অবশ্যই মিতিন মাসি এবং গার্গীর নাম শুরুতেই চলে আসবে। আর যেসব চরিত্রের সঙ্গে আমার আগে পরিচয় ছিল না তাদের মধ্যে দুই একটা বাদে বেশিরভাগ গল্পই সাদামাটা এবং সাহিত্য হিসেবেও খুব একটা উঁচুমানের লাগেনি। আর যে দুই একটা ভালো লেগেছে সেই গল্পগুলো হলো - ->ডিটেকটিভ নন্দিনী সোম ও দানুমামা - অজিতকৃষ্ণ বসু
->আর. ডি. এক্স রহস্য - স্বাতী ভট্টাচার্য - ডিটেকটিভ মেধাবিনী সেন হলো এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
->রেনেট মুলারের পোর্ট্রেট - হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত - "ক্যাটরিনা ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি" এর আন্ডারে কাজ করা দুই গোয়েন্দা "কিটি" ও "টিনা" হলো এই গল্পের গোয়েন্দা চরিত্র। এই গল্পের প্লটের কারণেই এই লিস্টে নাম দিলাম। কিন্তু গোয়েন্দা চরিত্র হিসেবে কিটি বা টিনা এরা আসলে কতটুকু সার্থক তা নিয়ে আমার যথেষ্ট দ্বিধা আছে।
->গিফট হ্যাম্পার - আশিস কর্মকার - শখের গোয়েন্দা "অদিতি সেন" হলো এই গল্পের গোয়েন্দা চরিত্র। যার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বেশ তীক্ষ্ণ যার পরিচয় গল্পের শুরুতেই পাওয়া যায়।
আর ইংরেজি সাহিত্যের ক্ষেত্রে মিস মার্পল তো অবশ্যই এগিয়ে থাকবেন এই লিস্টে। এই বইয়ে তার একটা ছোট গল্পের অনুবাদ রয়েছে "যথার্থ কাজের মেয়ে" শিরোনামে যেটা খুবই ভালো লেগেছে।