গৌড় সম্রাট শশাঙ্কদেব। ঐতিহাসিক ও অনৈতাহাসিক আবরণে, উনিই বঙ্গদেশের প্রথম স্বাধীন নৃপতি হিসেবে স্বীকৃত হয়ে থাকেন। লোকায়ত বিশ্বাসে ভর করে প্রাচীন বাংলার যেই অবিভক্ত রূপ কল্পিত হয়, তারই শীর্ষস্থানে স্থাপিত করা হয় শশাঙ্ককে। এক প্রচ্ছন্ন ভ্রান্তিবিলাসে মত্ত হয়ে আবেগতাড়িত বাঙালি খোঁজে তাদের জাতীয় নায়ককে। 'আইকন' বিহীন এই দেশে, যা আশ্চর্য করে না। এতে আখেরে কোনো ক্ষতি দেখি না, যদি না ঘটে ইতিহাসের অপমৃত্যু। তবে সাবধানতা প্রযোজ্য। দিনের শেষে, ভৌগলিক ও রাজনৈতিক মাপকাঠিতে বর্তমানের এই বাংলার, সেই যুগে কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
ব্যক্তিগত ভাবে, hero worshipping আমার বেজায় নাপসন্দ। ইতিহাস পাঠে যুক্তি-তর্ক বিসর্জন দিয়ে একটি মানুষকে গৌরবান্বিত বা কলুষিত করাতে, আমার ঘোর আপত্তি। শশাঙ্ক চরিত্রের যথাযথ মূল্যায়নের পথে কণ্টক স্বরূপ দেখা দেয় এই হিরো বা ভিলেনের তকমা। কোথাও গিয়ে যেন ভুলে যাওয়া হয়, যে ইতিহাস আখেরে সময় ও যুগের দাস। শশাঙ্কের কর্মযজ্ঞ তাই মাপতে হবে সেই পরিধির মধ্যেই। তার বিদ্রোহ, তার বিরূপতা, তার নিদারুণ স্বাধীন স্বত্তা, সবটাই!
তবুও, ইতিহাস ও সাহিত্যের মেলবন্ধনে, শশাঙ্ককে নিয়ে বাংলা ভাষায় ফিকশনের সংখ্যা হাতেগোনা। যা কিছু আছে, সেখানেও বঙ্গ সম্রাটকে স্পটলাইট ভাগ করতে হয়, চিরশত্রু হর্ষবর্ধনের সঙ্গে। কেন এই ব্যাপার? যেখানে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে, ঐতিহাসিকের রমরমা। সেখানে, এমন একজন শক্তিশালী চরিত্রকে নিয়ে লেখা নগণ্য কেনো? প্রধান কারণ, রসদের অভাব। ইতিহাস শশাঙ্ক বিষয়ে অনেকাংশেই নির্বাক। নীহাররঞ্জন, রাখলদাস বা রমেশচন্দ্র ঘেঁটে একটা প্রাথমিক কঙ্কাল পাওয়া যায় বটে, তবে সেই কাঠামো, দক্ষ হস্তে ভরাট করে, তাতে প্রাণের সঞ্চার করা, যেকোনো লেখকের পক্ষেই চ্যালেঞ্জিং।
এই বইটি ক্ষীণতনু, এবং দুই-ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশ, 'শশাঙ্ক | উদয়', লিখেছেন ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়। অংশটিকে এক প্রকার 'অরিজিন স্টোরি' হিসেবে গ্রহন করা যায়। শশাঙ্ক এখানে এক তরুণ উচ্চাকাঙ্খী সামন্ত রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন। তার পূর্ব-জীবন সম্বন্ধে ইতিহাস ভাসা-ভাসা উত্তর দেয়। যার ফলে, লেখক নিজেও এ ব্যাপারে নীরব। মগধরাজ মহাসেনগুপ্তের অধীনে, এক মহাসামন্ত থেকে বঙ্গসম্রাট শশাঙ্ক হয়ে ওঠার এক সরলৈখিক কাহিনী বলেই তিনি সন্তুষ্ট।
এই পর্যায়ে খুব একটা স্বাধীনতা নেন নি লেখক। কেবল কালানুক্রমিকভাবে ছুঁয়ে গিয়েছেন শশাঙ্কের জীবনের ছোটখাট মাইলফলকগুলো। গৌড়ের স্বাতন্ত্র্য লাভ, মালবরাজ দেবগুপ্তের সাথে মৈত্রী, স্থানিশ্বরের সঙ্গে বিবাদ, গ্রহবর্মা নিধন, রাজ্যশ্রীর অপহরণ, রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু, সবটাই। সংক্ষিপ্ত আকারে একটা ঐতিহাসিক ক্র্যাশ কোর্স যেন। দুঃখের কথা, এ সমস্ত বর্ণনা ইতিহাস বইয়ে সহজেই লভ্য। কেবল এর জন্য, আলাদা করে উপন্যাস পড়ার উদ্দেশ্য হয় না। এ ছাড়াও, দ্রুতগতির গদ্য, বিস্তৃতির অভাব, লেখাটিকে খুব একটা সাহায্য করে না। চোখে লাগে, ভাষার প্রয়োগও। কোথাও গিয়ে, "কি চাই? কে তুমি?"-র প্রত্যুত্তরে শশাঙ্কের "তোর বাবা" বলা, বা রসিকতার সম্মুখীন হয়ে, মাধবগুপ্তকে "ধ্যুৎ, আপনি না, একটি ইয়ে..." সম্বোধন, ভীষণ দৃষ্টিকটু।
তবে, প্রাথমিক ইতিহাসের বাইরে, লেখক নিজের কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন বেশ কিছু ক্ষেত্রে। শশাঙ্ক জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায়, রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু। বানভট্টের অতিরঞ্জিত ইতিহাসে এই হত্যার পেছনে গৌড় সম্রাটের শঠতার উল্লেখ আছে। লেখক বইতে কেবলমাত্র শশাঙ্ককে বেকসুরই খালাস করেন নি, বরঞ্চ তাকে সত্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিষ্কলঙ্ক ও নিষ্পাপ এক আইডিয়াল হিরো! ভীষণ সাদা কালো এক তুলি দিয়ে একেছেন এই ইতিহাস। এই শশাঙ্ক মাতৃভক্ত, সর্বদাই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হন। একটি যুদ্ধের পরেই ভাবেন, নাহ আর নয়, এরপরেই শেষ। তার আমলের শৈব revivalism, সবটাই হয় সম্রাটের অগোচরে, অন্যের প্ররোচনায়। বৌদ্ধ শ্রমণদের নেহাৎই শ্রদ্ধা করেন। কথায় কথায়, আবেগতাড়িত হয়ে অশ্রুপাতে লীন হন সম্রাট! ভাবা যায়?
যাই হোক, এগিয়ে যাওয়ার নিয়মে এগিয়ে যেতে হয়।
হিমাদ্রীকিশোর দাশগুপ্তের কলমে, বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়, 'শশাঙ্ক | অস্ত', কিছুটা ভিন্নগামী। নামকরণেই বোঝা যায়, এই অধ্যায়ে, সম্রাটের শেষ-কটা দিনের ছবি এঁকেছেন লেখক। প্রথাগত ইতিহাসের বাইরে বেরিয়ে, বিশেষত হিউয়েন সাং-এর লেখনীর উপর ভিত্তি করে এগিয়েছেন তিনি। যার ফলে, শশাঙ্ক এখানে খলনায়ক রূপে বিদ্যমান। দেখা মেলে, বৌদ্ধ পুঁথি ও ধর্মীয় বিবরণের সেই নিষ্ঠুর শশাঙ্ককে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, শ্বেতশুভ্র গুম্ফ সহযোগে সম্রাট পরিচালিত হন শাস্ত্রীয় ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায়। তারই নবীন স্বত্তা একসময় গুড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রভূত বৌদ্ধ বিহার, হত্যা করেছিলেন অজস্র ভিক্ষুদের। এই সেই শশাঙ্ক, যিনি বৌদ্ধ লেখনীর অতিরঞ্জিত অভিযোগ অনুসারে, আঘাত হেনেছিলেন মহাবোধিবৃক্ষের ওপর। বুদ্ধের ছবি মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে স্থাপন করেছিলেন অগুনতি শিবমূর্তি।
এ জিনিস, চাঞ্চল্যকর হলেও, পুরোমাত্রায় ইতিহাস নয়। তবুও এর ভিত্তিতে লেখক বলেছেন শশাঙ্কের গল্প, যা সৃজনশীল তবে অমসৃণ। দুটি অধ্যায়ের মাঝে কয়েক দশকের দূরত্ব থাকলেও, বঙ্গ সম্রাটের এরূপ আকস্মিক পরিণতির কোনো যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি লেখক। সার্বজনীন উপন্যাস লিখতে বসে, রিলে রেসে ব্যাটন নিয়েছেন বটে, তবে দৌড়েছেন একেবারে অন্য এক ট্র্যাকে! শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভাজন অনুযায়ী, বইয়ের প্রথম অধ্যায় যদি Fictionalised History হয়, তবে দ্বিতীয় পর্ব, একান্তই Historical Fiction। এমন এই দ্বৈততা, যা দেখাতে গিয়ে আমার ভীষণ পছন্দের শিল্পী কৃষ্ণেদু মণ্ডল প্রচ্ছদে, শশাঙ্ককে একেছেন ব্যাটম্যানের টু-ফেস ভিলেনের মতন!
যাই হোক, চিনা পর্যটকের বর্ণনা অনুযায়ী গল্পে এসেছে, রক্তবিতি (সাং এর ভাষায়, লো-টো-ব-চি) বিহারের উল্লেখ। আবার সম্রাটের মৃত্যুর কারণ হিসেবে চার-পাপ (কুষ্ঠ পরিণতির) এবং গুপ্তহত্যার কথাও। হর্ষের পৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধ ছিলেন হিউয়েন সাং। তথাকথিত বৌদ্ধবিদ্বেষী শশাঙ্ককে ভালো নজরে দেখেননি কোনোদিনই। তার লেখনীতে গৌড় অধিপতি খলনায়ক রূপেই বর্তমান। এহেন বিবরণের ভিত্তিতে উপন্যাসের শেষাংশ রচনা করতে গিয়ে লেখক নিয়ে ফেলেছেন অনেক বেশি ক্রিয়েটিভ লিবার্টি! কর্ণসুবর্ণের বহুল বর্ননা দিতে গিয়ে, এড়িয়ে গেছেন কামরূপরাজ ভাস্করবর্মার সঙ্গে শশাঙ্কের ভয়াল যুদ্ধ-বিবাদের ইতিহাস। ফাঁকফোকর ভরাট করেছেন ঠিকই, তবে কোথায় গিয়ে, কোনোটাই বিশ্বাসযোগ্য ঠেকে না।
খারাপ লাগে। এমন কিংবদন্তি এক চরিত্র। তাকে নিয়ে চেষ্টা করলে কি দু-তিনশ পৃষ্ঠার উপাদেয় একটি ক্লাসিক লেখা যেত না? যা আরো বিস্তারিত, পরিণত ও অনেক বেশি গোছানো একটি উপাখ্যান হওয়ার দাবি জানায়? কেবলমাত্র, কিছুটা বাস্তবসম্মত ধূসরতার অভাবে, একটি সম্ভাবনাময় উপন্যাস মাঠে মারা গেলো। যুগলবন্দী উপন্যাসগুলোর এই যা দুর্বলতা। অতিকথন মাফ করবেন, তবে আমার হতাশা পুরোদস্তুর প্রযোজ্য।
১.৫/৫